মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / খাবার-দাবার / পুরান ঢাকার নাশতা ও ভাজাভুজি
১২/১৫/২০১৬

পুরান ঢাকার নাশতা ও ভাজাভুজি

-

ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকা মুঘল সাম্রাজ্যের সুবেবাংলা তথা বাংলা প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে আমাদের এই প্রিয় শহর জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিত ছিল। তখন সারা বিশ্বে মসলিনের ব্যবসার কেন্দ্র ছিল এই রাজধানী ঢাকা। আর মূলত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীগণ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এই শহরে আসতেন। এই দেশে থাকাকালীন অনেকের সফর হতো লম্বা। সেই সময়ে তাদের পছন্দের খাবার রান্না করে এই দেশিয় বাবুর্চিরা শিখে নিয়েছিল অনেক ভিন্নধর্মী ও মুখরোচক পদ। সেই ধারাবাহিকতায় এখানকার খাবারে রয়েছে স্বাদ আর ঐতিহ্যের সুনাম।

পুরান ঢাকার রয়েছে মুখরোচক খাবারের সুখ্যাতি, যার মধ্যে ভাজা-পোড়া ও নাশতা জাতীয় খাবারের চাহিদা বেশ। এরমধ্যে মধ্যে সিঙ্গারা, সমুচা, নানাধরনের পুরি যেমন ডালপুরি, ডালররুটি, আলুপুরি, ডিমপুরি, টাকি মাছের পুরি, কিমার পুরি। আরও রয়েছে ক্রাম্বচপ, বেগুনি, নানা ধরনের চপ, মোগলাই পরাটা, পেঁয়াজু, গররুর চাপ, নানা কাবাব, কাটলেট, নিমকি, মিষ্টি ইত্যাদি - যার পুরো তালিকা তৈরি করতে গেলে হয়ে যাবে বিশাল। সকাল, তারপর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পরবর্তী পুরান ঢাকার প্রাণ-চাঞ্চল্য বেড়ে যায়। পাড়া-মহল্লাতে এই সমস্ত খাবারের চাহিদা সর্বাধিক। অলি-গলি আর রাজপথের ধারে ছোট-বড় খাবারের দোকানগুলোতে শুরু হয় নানাধরনের ভাজা-পোড়ার কেনাবেচা। এসব খাদ্যসামগ্রীর পরিচিত ঘ্রাণ পথচারী আর আশপাশের মানুষদের আকৃষ্ট করে প্রতিনিয়ত।

পুরান ঢাকাজুড়ে রয়েছে এমন অসংখ্য মুখরোচক খাবারের ঠিকানা, যেগুলোর কোনো কোনোটির বয়স অর্ধশতাব্দী, আবার কোনোটির বয়েস শত বছরের কাছাকাছি। যা বংশ-পরম্পরায় চলে আসছে। বিকেল হলেই দেখা যায় দোকানি বড় বড় কড়াইয়ে গরম তেলে বিরামহীনভাবে ছাড়ছেন একের পর এক নানাধরনের মজাদার ও মুখরোচক নাশতার বাহারি সব পদ। এক সময় শুধু পুরান ঢাকাতেই এই সব খাবারের আধিক্য ছিল। কালক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, যদিও অন্য সব স্থান থেকে স্বাতন্ত্র্যে সমৃদ্ধ পুরান ঢাকার খাবার।

পুরান ঢাকার ২৮ নর্থ ব্রুক হল রোডে অবস্থিত ‘কাফে কর্নার’-এর যাত্রা শুরু হয় অর্ধশতাব্দীরও আগে। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দা থেকে শুরু করে ঢাকায় যারা দীর্ঘদিন ধরে আছেন, তাদের মধ্যে কাফে কর্নারের ক্রাম্ব চপ খাননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখনো সেই পুরোনো ধাঁচের প্লেটে সদ্যভাজা ক্রাম্ব চপ, সঙ্গে পাউরুটি আর সালাদসহ পরিবেশন করা হয়। আছে কিমা চপ আর চিকেন ফ্রাই। শুধু খাবারই নয়, আশপাশের এলাকাজুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী নানাস্থাপনা আর প্রতিষ্ঠান-তার মধ্যে জুবিলী স্কুল, অদূরে লালকুঠি, বইয়ের জন্য বিখ্যাত বাংলাবাজার ইত্যাদি।

এই দোকানটির অনেকটা কাছাকাছি বিপরীতে জনপ্রিয় ‘চৌরঙ্গী রেস্তোরাঁ’র অবস্থান। এটিও পুরান ঢাকার অতি পুরাতন রেস্তোরাঁর একটি, যেখানে সকাল-বিকেলের নাশতায় সুস্বাদু লুচি, ডাল পরিবেশন করা হয় যা অত্যন্ত জনপ্রিয়।

পুরান ঢাকার ফরিদাবাদে রয়েছে অনেক পুরানো ‘কিছুক্ষণ রেস্তোরাঁ। যেখানে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে দেয়ালে বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের ছবি। এই রেস্তোরাঁয় সকালে জনপ্রিয় নাশতা আর বিকেলে কাটলেট, চপ ইত্যাদির জন্য ভিড় লক্ষণীয়। পুরান ঢাকায় দুপুরের আগে সবচাইতে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে সিঙ্গারা ও সমুচা। রেস্তোরাঁর পাশাপাশি অনেক ছোট দোকানেও সবজি অথবা পনির সিঙ্গারা, সমুচা দুটোই পাওয়া যায়। এগুলো দুপুরের আগেই শেষ হয়ে যায়। পুরান ঢাকার অনেক আদি মিষ্টির দোকানে মিষ্টির পাশাপাশি সবজি সিঙ্গারা পাওয়া যায়, যা খেতে খুবই মজাদার।

৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সূত্রাপুর ডালপট্টিতে ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধুর পুরির স্বাদ চাখতে এখনো অনেকেই ছুটে আসেন নানা জায়গা থেকে। পাটুয়াটুলির ঐতিহ্যবাহী শাহী দিল্লি হোটেলের লুচি আর ভাজি একবার খেয়ে, বারবার ফিরে আসে অনেকেই।

পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোড, নাসিরুদ্দিন সরদার লেন, কসাইটুলি, লালবাগ, নারিন্দা, জোড়পুল লেন, সূত্রাপুর, পাতলা খান লেন, রায়সাহেব বাজার, তাঁতিবাজার, সিদ্দিকবাজার, আলুবাজার, বংশাল, সিক্কাটুলি, বেচারাম দেউড়ি, বনগ্রাম, শাঁখারিবাজার, ইসলামপুর, টিকাটুলি, পাটুয়াটুলী, নাজিমুদ্দিন রোডসহ নানা স্থানে বিকেল হলেই বাহারি নাশতা কেনাবেচার আয়োজন শুরু হয়।

যতই হোক যানজট আর থাকুক জীর্ণ দালান, ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় লালিত পুরান ঢাকার অলিগলি আর পথের ধারের শত বছরের পুরানো খাবারের দোকানগুলোতে মজাদার এইসব খাবারের স্বাদ নিতে ছুটে আসে অনেকেই। এবং খাওয়া শেষে পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়েই ফিরে যায় সকলে।

- ছবি ও লেখা: মোহাম্মদ ওয়াসিম, ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজঃ Puran Dhakar Khabar, এডমিনঃ আপনার রান্নাঘর।