বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / জীবনযাপন / নতুন প্রজন্মকে জানান '৭১-এর ইতিহাস
১২/১৫/২০১৬

নতুন প্রজন্মকে জানান '৭১-এর ইতিহাস

-

প্রত্যেক জাতিরই তার শেকড় সম্পর্কে জানা দরকার। যেমন আমাদের শেকড় হলো একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। একটি দেশের নতুন প্রজন্ম তখনই দেশের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত হবে, যখন তারা তাদের দেশের গৌরবময় ঐতিহ্য এবং শেকড়ের সন্ধানে পাবে। কিন্তু প্রতিবার রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও পাল্টে যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার উপায় তাহলে কী? এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরই রাখতে হবে সক্রিয় ভূমিকা।

এখনো এ-দেশের প্রত্যেক পরিবারেই কেউ না কেউ আছেন, যিনি সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলেন অথবা মুক্তিযুদ্ধের কথা জানেন। তাদের দেওয়া তথ্য থেকে আমরা সহজেই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি। এজন্য সন্তানদেরকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বধ্যভূমি, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি স্থানের গুরুত্ব বোঝানোর চর্চা প্রত্যকে পরিবারেই থাকা উচিত। এছাড়া অভিভাবকরা কখনো গল্পের আকারে কিংবা তথ্য ও প্রামাণ্য দলিলের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে পরিচিত করাতে পারেন। এই প্রেক্ষিতে আমার বাবার কাছে শোনা মুক্তিযুদ্ধের একটি সত্য গল্প এখানে তুলে ধরছি:

৭১-এর জুলাই-আগস্ট। যুদ্ধ চলছে গত কয়েক মাস ধরে। সাধারণ মানুষ এখানে-ওখানে পালিয়ে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। যতই যুদ্ধ চলুক, যতই ভীতিকর অবস্থা থাকুক, দৈনন্দিন কাজকর্ম তো না সারলেই নয়! টানা পাঁচ মাস যুদ্ধের কারণে পিতা-পুত্রের চুল কাটানো আর হয়ে ওঠে না! এ-নিয়ে বড়ই অস্বস্তিতে বাপ-বেটা। নন্দনকাননে লুকিয়ে থাকার সময় কোনো এক গলিতে বাবার নজরে এল ছোট্ট এক সেলুন। ভাবলেন, নিজের সঙ্গে সঙ্গে ছয় বছরের ছেলেটারও চুলটা কাটিয়ে নেবেন। নাপিত গলা পর্যন্ত কাপড়ে মুড়িয়ে চুল কাটার সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত। ছেলে সঙ্গেই দাঁড়ানো। হঠাৎই সে সময় খট্খট্ খটাখট্ বুটের আওয়াজ! চোখের পলকেই সেলুন আর তার আশপাশের পুরো এলাকাটা মিলিটারিরা ঘিরে ফেলল। ‘মুক্তি হ্যায় ইধার, মুক্তি হ্যায়’। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সব পাকিস্তানি সামরিক সৈনিকেরা বাংলার দামাল অকুতোভয় অল্পবয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে ব্যতিব্যস্ত! কোনো বাছবিচার না করেই যাকে সামনে পাচ্ছে পটাপট ট্রাকে তুলছে। কেউ সামান্য আপত্তি করলেই তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলছে! নাপিত বেচারা চিরুনি কাঁচি সব ফেলে দৌড়ে পালানোর জন্য প্রস্তুত। এরই মাঝে বাবা তার কাছে এক টুকরো কাগজ আর কলম চেয়ে নিলেন। তাতে তাড়াহুড়ো করে নন্দনকাননে লুকিয়ে থাকার আস্তানার ঠিকানাটা লিখলেন। অনুনয়-বিনয় করে নাপিতকে বললেন, ‘আমাকে যদি ধরে নিয়ে যায় কিংবা মেরে ফেলে, আমার ছেলেটাকে এই ঠিকানায় পৌঁছে দিও। না হলে কাউকে দিয়ে অন্তত একটা খবর পাঠিও।’

ঘটনার আকস্মিকতায় সেই নাপিত ছেলেটার জীবনেরই বা কী গ্যারান্টি, সে-কথা একবারও তার চিন্তায় এল না। মুক্তিযুদ্ধের এমন ছোট ছোট কিন্তু হৃদয়বিদারক কিংবা লোমহর্ষক অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে গল্পের আকারে শুনিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস জানার ব্যাপারে উতসাহিত করা যায়।

এছাড়া স্কুল থেকে শিক্ষাসফরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রজেক্ট আয়োজন করার মাধ্যমেও ছেলেমেয়েদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার পথ সুগম করা যেতে পারে। এসব সম্ভব না হলেও, অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় উপায় হতে পারে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র কিংবা গল্প-উপন্যাস। সন্তানকে ছোটবেলাতেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য-শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে তার মধ্যে দেশপ্রেম সৃষ্টি হবে, তাতে সন্দেহ নেই।

আমাদের মাঝে এমন অনেক অনেকেই আছেন, যারা এখনো ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাত্রি বা এর পরবর্তী সময়ে স্বজন হারানোর দগদগে ক্ষত নিয়ে দিন পার করছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা সে সময়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানার মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানা যাবে। একাত্তরের উত্তাল সময়কার ১৫-২০ বছরের কিশোর যুবকেরা এখন ষাট পার হয়েছেন। এখনও স্মৃতিশক্তি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেনি। এদের মধ্যে কিন্তু যারা একটু চিন্তাশীল, অনুভূতিপ্রবণ এবং যাদের কলমে সামান্যতম গতি ও ক্ষমতা আছে, তারা আর দেরি না করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে নতুন প্রজন্মের কাছে একাত্তরের তরতাজা স্মৃতি রেখে যেতে পারেন।

এছাড়া আজকাল স্কুল-কলেজে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দিবসগুলো পালন করা হয়। আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, এই পালন করাটা যেন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা না হয়। এর পাশাপাশি এই দিনগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝানোটাও খুবই জরুরি।

- সারোয়াত সুলতানা