বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / একাত্তরের বিস্মৃতপ্রায় নারী মুক্তিযোদ্ধারা
১২/১৫/২০১৬

একাত্তরের বিস্মৃতপ্রায় নারী মুক্তিযোদ্ধারা

-

বাংলাদেশ যে আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, তার নেপথ্যের কারিগর একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য হলেও কোনো এক অদ্ভুত কারণে একাত্তর নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় নারী মুক্তিযোদ্ধারা বিস্মৃতই থেকে যান। অথচ মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের খাদ্যের জোগান, গোপন সংবাদ সংগ্রহ ছাড়াও পুরুষদের মতো সরাসরি যুদ্ধ করেছেন তারামন বিবি, সিতারা বেগম, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা কিংবা রওশনের মতো অগণিত নারী। মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শরণার্থীদের সেবায় নিয়োজিত নার্স কিংবা পাক বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের শিকার হওয়া বীরাঙ্গনাদের কথা চিন্তা করলে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন এমন নারীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে অদম্য দেশপ্রেমী কয়েকজন নারী মুক্তিযোদ্ধার সাহসী গল্প অনুসন্ধানের ক্ষুদ্র প্রয়াস করা হয়েছে এই লেখায়।

তারামন বিবি
মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য যে-ক’জন হাতেগোনা নারীর কপালে স্বীকৃতি মিলেছে, তাঁদের মধ্যে তারামন বেগম একজন। তারামন বিবি নামে পরিচিত এই মহীয়সী নারী মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীরপ্রতীক উপাধিতে সম্মানিত হন। মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া এই অকুতোভয় নারী একসঙ্গে যেমন মুক্তিবাহিনীর অন্যান্য যোদ্ধার খাদ্যের জোগান দিয়েছেন বা রান্নার ব্যাপার সামলেছেন, তার পাশাপাশি একটা সময় নিজেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন স্টেনগান। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা তারামন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে পাশের ইউনিয়ন কোদালকাঠিতে পৌঁছান। লক্ষ্য ছিল একটাই, যে-করেই হোক মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। তবে একজন নারী হিসেবে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার পথটা সুগম ছিল না। কিন্তু নাছোড়বান্দা তারামনের দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে তার মাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে মুহিব নামের তৎকালীন একজন হাবিলদার ও মুক্তিযোদ্ধা তারামনকে ধর্ম মেয়ে করে নেন। শুরুর দিকে মুক্তিবাহিনীর জন্য রান্না করা এবং অস্ত্র পরিষ্কারের দায়িত্ব থাকলেও আস্তে আস্তে নিজের হাতে স্টেনগান তুলে নেন তারামন। সম্মুখ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে গোপনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য মাথায় গোবর, মুখে কালি মেখে ক্রল করে করে শত্রু শিবিরের কাছাকাছি চলে যাওয়ার মতো দুঃসাহসী কাজ করে করেছেন এই দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা।

সিতারা বেগম
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেধাবী ছাত্রী সিতারা বেগম ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেনা মেডিক্যালের লেফটেন্যান্ট। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক কিছুদিন আগে ছুটিতে কিশোরগঞ্জে নিজ বাড়িতে যান তিনি। এরপরই দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সিতারা বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধ আসন্ন। তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষু এড়িয়ে ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং শরণার্থীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রথমে ভারতে পাড়ি জমান। পরে যুদ্ধ চলাকালীন সীমান্তসংলগ্ন ভারতের সোনামুড়ায় স্থাপিত ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’-এ (যা পরে আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে স্থস্তান্তর করা হয়) কমান্ডিং অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ওষুধপত্র এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের স্বল্পতা থাকার পরও নিজ মেধা ও শ্রম দিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করে গিয়েছেন এই মহীয়সী নারী। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার সিতারা বেগমকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে।

কাঁকন বিবি
একাত্তরের উত্তাল সময়টায় মুখোমুখি যুদ্ধ ছাড়াও শত্রু পক্ষকে ঘায়েল করার অন্যতম প্রধান রণকৌশল ছিল প্রতিপক্ষের গতিবিধি নজরদারি করা এবং গোপনীয় তথ্য জানা। এই দুঃসাহসিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজটাই নিরলসভাবে করে গিয়েছেন ৭১-এ মুক্তিবাহিনীর ‘ইনফর্মার’ কাঁকন বিবি। সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর নির্দেশে মুক্তিবাহিনীর ইনফর্মারের দায়িত্ব নিয়ে কখনো স্বামীর খোঁজে, কখনো বা ভিক্ষুকের বেশে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পের আশপাশে চলে যেতেন এই অসীম সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা। তবে স্থানীয় রাজাকারদের চোখে পড়ায় কাঁকনকে সহ্য করতে হয় নির্মম অত্যাচার। পাকবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের শিকার হন তিনি, শারীরিক নিপীড়নের পাশাপাশি শরীরে লোহার শিকের ছ্যাঁকও সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। তবে এত অত্যাচারের পরও কিছুতেই মুখ খোলেননি তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় এমন অসংখ্য কাঁকন বিবির ত্যাগ তিতিক্ষা ও কষ্টের বিনিময়ে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলার।

শিরিন বানু মিতিল
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাক বাহিনীর বর্বরতা সহ্য করতে পারেননি কিশোরী শিরিন। তাইতো ছেলে সেজেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বেশ কিছুদিন ছদ্মবেশে যুদ্ধও করেছিলেন। একাত্তরের ২৮ মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখলে রাখা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ করেন মুক্তিসেনারা, যাঁদের অধিকাংশেরই কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। সেদিন ছদ্মবেশ ধারণ করে একমাত্র নারী যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেন শিরিন। পরবর্তী সময়ে তার মূল পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে আর সম্মুখযুদ্ধ করা হয়নি। তবে এই অদম্য সাহসী মুক্তিযোদ্ধা কলকাতায় শরণার্থী শিবির থেকে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করার কাজ করে গিয়েছেন নিরলসভাবে।

তারামন বিবি, সিতারা বেগম কিংবা নাম না-জানা অসংখ্য বীরাঙ্গনা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যদি সবশেষে এক বিজয়ের গল্প হয়, তবে তার নেপথ্যের হিরো এরাই। ইতিহাসের পাতায় এবং এদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে এই নামগুলো বেঁচে থাকবে চিরকাল।

- মুহাম্মাদ রিদোয়ান