বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / মার্কিন মুলুকে ‘নারী প্রেসিডেন্ট’: অবাস্তব কল্পনা?
১২/০৮/২০১৬

মার্কিন মুলুকে ‘নারী প্রেসিডেন্ট’: অবাস্তব কল্পনা?

- আনুশে হোসেইন

বহু আলোচনা-সমালোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নভেম্বরের ৮ তারিখ নির্বাচিত হয়েছেন বিতর্কিত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন পপুলার ভোটে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ইলেক্টোরাল কলেজের আসনে এগিয়ে থেকে বিজয় নিশ্চিত করেন ৭০ বছর বয়সী ট্রাম্প। এরই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আসনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারীর উপস্থিতির যে প্রবল আভাস মিলেছিল, তার সমাধিও রচিত হয়। তবে কী বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতির মতো মূলধারার বিষয়ে নারীর অধিকার একেবারে সুনিশ্চিত নয়?

একজন আমেরিকান নাগরিক হিসেবে আপনি হিলারি ক্লিনটন কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকেই ভোট দিয়ে থাকুন না কেন, এটা আপনাকে মেনে নিতেই হবে যে, এ-বছরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নারী-বিদ্বেষের মতো বিষয়ে বাদানুবাদ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। চূড়ান্ত ভোট গ্রহণের কিছুদিন আগে ফাঁস হয়ে যাওয়া ‘অ্যাক্সেস হলিউড’(২০০৫ সালে ধারণকৃত) ভিডিও ক্লিপে নারীদের সঙ্গে ট্রাম্পের অসদাচরণ থেকে শুরু করে তাঁর বিরুদ্ধে আসা প্রায় ডজনখানেক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সম্মানহানি করার চেষ্টায় বারবার স্বামী বিল ক্লিনটনের অতীতের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে আনা কিংবা হিলারিকে জনসম্মুখে ‘ন্যাস্টি ওম্যান’ বা ‘জঘন্য নারী’ বলা -- পুরো ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় সেক্সিজমের প্রাধান্য ছিল লক্ষণীয়।

ফেমিনিস্ট মেজোরিটি ফাউন্ডেশন ও মিস ম্যাগাজিনের প্রকাশক এলেয়ানর স্মেয়াল-এর মতে “যে কোনো ক্ষেত্রেই ‘প্রথম নারী’ হওয়াটা বেশ কঠিন, তা তাকে বাধা-বিপত্তির যে-দেয়ালই পেরোতে হোক না কেন।” তার মতে, শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নারী পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীতে কাজ করা নারীদের মাঝে এক-তৃতীয়াংশকেই যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল। রাজনীতির জায়গাটিতে সবসময়ই পুরুষের প্রাধান্য ছিল আর তাই হিলারি ক্লিনটনের মাঝে সাহস ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক পুরুষই এটা মেনে নিতে পারেনি।

স্মেয়াল এর সঙ্গে যোগ করেন যে, ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য ছিল সে-সকল পুরুষ মানুষকে লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানোর, যারা মনে করে নারীর অর্জন পুরুষ জাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্পের মতে সব নারীই দুর্বল ও তাঁদের মাপকাঠি শুধুমাত্র শারীরিক সৌন্দর্য। তার নারীবিদ্বেষী কথাবার্তাই এর প্রমাণ।”

একজন নারীবাদী বাংলাদেশি-আমেরিকান মুসলিম ও অভিজ্ঞ নারী অধিকারকর্মী হিসেবে ইসলাম ধর্মে বা আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশে নারীদের অধিকার নিয়ে আমাকে প্রায়ই কথা বলতে হয় এবং আমেরিকার মাটিতে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের তৈরি সেক্সিসজমকে মোকাবেলা করার জন্যও প্রস্তুত আমি।

ট্রাম্প শিবির মার্কিনীদের এমন পর্যায়ের নারীবিদ্বেষী মনোভাবের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে, যা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে চমকে দিয়েছে; এবং তা শুধু আমেরিকা প্রথম বিশ্বের অগ্রবর্তী একটি দেশ বলেই নয়, বরং আমেরিকান কিংবা নন-আমেরিকান সবাই দেশটিকে নারীবাদী এক দেশ হিসেবে ভেবে নিত বলে।

কিন্তু সত্য বলতে আমেরিকার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, নারীদের প্রতি বৈষম্য এখানেও তীব্র, বিশেষত সরকারি ক্ষেত্রগুলোতে। ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের জরিপ অনুযায়ী আমেরিকা বর্তমানে বিশ্বের ১৮৯টি নির্বাচিত সরকারের মাঝে নারী প্রতিনিধিত্বের দিকে থেকে ৭৫তম স্থানে আছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সরকারি অফিসে নারীকর্মীর হার ২৫ শতাংশ থেকেও কম। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আমেরিকার ১০০ বৃহৎ শহরের মধ্যে শুধু ১২টির মেয়র নারী।

দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের জন্য আমেরিকায় নারী নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যাটা বোঝা কিছুটা দুঃসাধ্য হতে পারে। কেননা এখানকার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের চর্চার কারণে পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে অনেক দক্ষিণ এশিয়ান দেশই রাজনীতিতে নারীবাদের ক্ষেত্রে আমেরিকা থেকে আলোকবর্ষ এগিয়ে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বারবার ভোট দিয়ে নারী নেত্রীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে বহু বছর ধরেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর মতে, ভারত এদের মধ্যে সরকারি ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বে এগিয়ে কারণ দেশটিতে গত ৫০ বছরের মধ্যে ২১ বছরই রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নারী। বাংলাদেশের ‘ব্যাটলিং বেগম’ -- বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক বংশীয় দ্বন্দ্বের বিখ্যাত উদাহরণ। এছাড়াও এই অঞ্চলে আছেন পাকিস্তানের ভুট্টোরা, ভারতের গান্ধী পরিবার এবং মিয়ানমারের নোবেল পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার নারী প্রতিনিধিত্বের চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে; দক্ষিণ এশিয়া ঠিক বলতে গেলে নারী অধিকারের জন্য কোনো স্বর্গরাজ্য নয়। জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণ এবং তার ফলে সর্বোচ্চ পরিমাণ মৃত্যুহারের জন্য এ-অঞ্চলকে শনাক্ত করেছে। এখানে নারী নেত্রী হত্যার (ভারতের ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো) ইতিহাসও কারো অজানা নয়।

হিলারি প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার প্রচারণা অভিযানের এক ভাষণে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা বলেন, “আমাদের জীবদ্দশায় দেখা অন্য যে কোনো প্রার্থী থেকে হিলারির অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অনেক বেশি। হ্যাঁ, হিলারি বারাক থেকে কিংবা বিল থেকেও বেশি যোগ্য এবং তিনি কমান্ডার-ইন-চীফ হওয়ার জন্য প্রস্তুত। আর হ্যাঁ, তিনি একজন নারী।”

তবে ক্লিনটন যদি এতটাই অভিজ্ঞ ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়েই থাকেন, তাহলে আমেরিকা এবং আমেরিকানদের জন্য একজন নারীকে দেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসন আরোহণ করার অনুমতি দেয়াটা এত কঠিন হলো কেন, এ-প্রশ্ন থেকেই যায়।

অনুবাদ : নুসরাত ইসলাম