মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ওরা আছে
১২/০৮/২০১৬

ওরা আছে

- জেসমিন আমিন

ইজিচেয়ারে বসে পিছন দিকে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে থাকি। রোকেয়া আলতো হাতে আঙুলের ডগা দিয়ে তেলটুকু ভালোভাবে মাথার ত্বকে মিশিয়ে দিতে থাকে। নরম হাতে আস্তে আস্তে ডলে ডলে। ঘুম ঘুম লাগে। এ কাজটি রোকেয়া ভালোই পারে। তন্দ্রা লেগে আসা আমেজটা ওর অবিশ্রান্ত বকবকানিতে ভেঙে যায়। এত প্যাঁচালও পাড়তে পারে। আরো অনেকবার শোনা হয়েছে। কিছু না বলে চুপচাপ শুনে যাই। চুলে শ্যাম্পু করার দিনটাতে এটা সহ্য করতে হয়। কিছু না বলে শুনে যাই ওর জীবনকথা।

আপনিই বলেন খালাম্মা-বাবা নিই মা নিই কত দুঃখি কষ্টি পরের নাতিগুতো খেইয়ে আমরা ভাইবুন কডা বড় হইয়েছি। জেইনে শুইনেই তো বে করেছিলে। তাহলি আবার কোন মুখি সাইকেল ঘড়ি দাবি কর। এ সবির জন্যি কি কম অত্যেচার করিল। আবার বলে, তোর ভাইভাবিরা আমাকি খাতির সমাদর করে না - করবিটা কত্তি? ওদির নিজিদিরই তো খাতি জোটে না। তোমাকি করবি কোথাত্তে? কনদি খালাম্মা-জেইনে শুইনেই তো বে করেছিল। ত্যাখোন ওসব কথা মনে ছেল না?

তা আমায় তাড়ায় দিইলে। তাড়ায় দে চুপি চুপি আরেট্টা বে করিল। বাবা-মা ছোট বেলাতি মইরে গেইল। আমার মত দুখি কেউ আছে কন খালাম্মা?
তোমরা প্রতিবাদ করোনি?

করিছি। আমার ভাইরা গিরামির মাতব্বরির কাছে নালিশ করিল। তারা বিচার কইরে কলো মেইয়ের তো কুন দোষ নিই। ক্ষতিপূরণ দিতি হবি। তা আমার শ্বশুর গরিব মানুষ। টাকা দিবি কত্তি? আমার নামেতি ঘরের পাশেতি যে জমিটুকু ছেল তা লিখে দিইল। মিছে কতা কব না খালাম্মা শ্বশুর আমায় মায়া করত। মাওরা তো আমি।

বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করি - মাওরা কি?

যাদির মা-বাবা থাকে না, তাদির মাওরা বলে। আর কি এতিম। খালাম্মা শোনেন শ্বশুর আমায় আদর করত। তার সঙ্গি কত সবজি লাগায়েছি। অনেক হলুদ হলো সেবার। কত রকমির ফল-ফলাদির গাছ লাগায়েছি।

নিঃশ্বাস ফেলে রোকেয়া- তা এখন আমার মেইয়েডার হাতে দুটো এট্টা দিয়ে দেখে না- তোমাকে নিতে চায় না তোমার স্বামী?
চায় তো। আমার নামিতি যে জায়গাটুকু আছে, সেজন্যি চায়। ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার কাছতি সেটা নে আমায় ফের তাড়ায় দিবি। মেইয়েটাকি নে যাতি চায়। কিন্তু খালাম্মা আমি যাতি দেব কেন? আমার পরথমকার মেইয়ে। মেইয়ে হলো দেখে কত গালমন্দ করিল। খালাম্মা কনদি-মেইয়ে হলি আমি কি করতে পারি। এখন ওর এই বউয়ির ঘরি ছেইলে হইয়েছে। এখন কি আর আমার মেইয়ের আদর হবি?
ভাইরা বলে মেইয়েকে ওর বাপির কাছে দিয়ে দে। আমরা তোকি আবার বে দেব। সেবার বাপ এইসে নিয়েও গেইল। তার মদ্যি খবর পালাম, মেইয়ে আমার পানিতে ডুইবে মইরে যাচ্ছে। গিয়ে মেইয়েকে নে আলাম। আর দিইনি। মেইয়ের কিছু হলি আমি কি-নে থাকপ?
মেয়ে সঙ্গে নিয়েও অনেকে বে করতি চায়। নানা দিক ভেইবে ভরসা পাইনে বিয়ে বসতি। তার ঘরে ছেইলে মেইয়ে হলি কি আর আমার মেইয়ের আদর থাকপে?
চুল আঁচড়ে খোঁপা বেঁধে দেয় রোকেয়া। আমি অসমাপ্ত সেলাই নিয়ে বসি। রোকেয়া চালের কুলা নিয়ে আসে। বসে বসে চাল বাছা ওর খুব পছন্দ। কারণ তাহলে নড়তে হয় না। সে একটু অলস প্রকৃতির। শুধু রোকেয়া নয়- এদিকের বেশিরভাগ লোকই অলস এবং সে কারণে দরিদ্রও বটে। আশপাশের এলাকার জনগণের অবর্ণনীয় দুর্দশা, অভাব ওদের চিরসঙ্গী।
তোমার ভাইয়ির এই বউয়ির আচার ব্যবহার কেমন?
ঘর পরিষ্কার করতে আসা শ্যামাকান্তর সঙ্গে গল্প জোড়ে রোকেয়া। মুখে সামান্য বসন্তের দাগ, চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সের ছিপছিপে শ্যামলা চটপটে ছেলেটি। ক’দিন আগে রোকেয়া বলেছিল- খালাম্মা আপনার বাসায় কাজ করতি নাকি শ্যামাকান্তর পুলক লাগে।
মানে?
মানে ওর খুব ভালো লাগে।
আশ্বস্ত হই। ভালো লাগার কারণ বোধহয় ইচ্ছেমতো কাজ করতে পায় বলে। কাজে খুঁতখুঁত করি না এবং দেখি কাজ খুব একটা খারাপ হয় না। নাস্তা দেওয়ার কথা নেই-কিন্তু দেই।
ক’দিন ধরে রোকেয়া ওর ছোট ভাইটাকে অফিসে ক্লাস ফোর হিসাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য ধরেছে।
একদিন কাজ করলি তিনদিন বইস থাকপে। এজন্যি বউটা ওর কাছে এট্টুও থাকতি চায় না। বলে- খাতি দিতি পারে না ওর ঘর করব কেন?
বয়স কত তোমার ভাইয়ের?
এই রফিকের বয়েসি হবে।

রফিক আমার কাজের ছেলে-বয়স ষোল-সতেরো। সে কি এই বয়সে বিয়ে করিয়েছ কেন?
মা-তো নিই। তাই সবাই বিয়ে করায়ে দিইলÑ
আমার অবাক দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলে- বুঝলেন না খালাম্মা, ভাত রানতি হবি না?
তুমিই বল একদিন কাজ করলে তিনদিন বসে থাকে। ও কেমন করে অফিসের কাজ করবে?
ভয়ের ঠেলাতি ত্যাখন ঠিকই করবি। আপনি একটু খালুকে বলে দেন না খালাম্মা-রোকেয়া অনুনয় করে। আপাতত ওকে থামাই- আচ্ছা বলব।
আশ্বাস পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে শ্যামাকান্তর সঙ্গে গল্পে মাতে রোকেয়া- এই বউদি কেমন হলো শ্যামাকান্ত? আগেট্টার মতো দজ্জাল?
নাহ, এই বউদি খুব ভালো হইয়েছে। আমার মা-কি বেশ দ্যাখাশোনা করে। দাদাতো এট্টু ইদিক সিদিক দেখলিই আচ্ছা কইরে গরম দ্যায়।
চমকে উঠি, পরক্ষণেই মনে পড়ে এদিকটায় ‘গরম’ মানে হলো রাগ।
এই বউদি দাদাকে বেশ সমঝে চলে। দাদা আগের বউকি বেশি নাই দে দেইখেছে তো কি ফল হইয়েছে-সেজন্যি এটাকি বেশ দাবড়ে রাখে।
এবার তোমার বউ কেমন হইয়েছে বল দিন- শ্যামাকান্তর শ্যামল মুখে উজ্জ্বল আভা খেলে। হইয়েছে একরওম-
শাউড়ির কাছ থিকি কি আদায় করিলে?
ক্ষুণ হয় শ্যামাকান্ত-
কেন শাউড়ির কাছ থিকি আদায় করব কেন? আর দেবেই বা কোথা থিকি। শউর খুব গরিব। দু’বেলা খাতিই পায় না।
রোকেয়া তর্ক করে-
কিন্তু তোমার বুনির বিয়েতে তো অনেক কিছু দেলে-তা দেলাম। এট্টা মাত্তর বুন। শউর বাড়িতি কষ্ট পাবে ভেইবে দেলাম। তা বুনকে দিতি গিয়ে আমাদির দুভায়ের কি অবস্থা। জমিটুকু বিক্কির কইরে দিতি হলো। দাদা যাও শাউড়ির কাছতি সামান্য কিছু নিল, আমি কিছুই নিইনি। আমার শউর তো আমাদির চেয়েও গরিব। থাকলি কি আর চেইয়ে নিতি হয়। এমনিতেই দিত। তার বদলে শউর বাড়িতি আমার খাতির কত। সবাই আমাকে বেশ ভালো জানে। জান রোকেয়া বু, বউ চিঠি লিখতে জানে।
কাজের ফাঁকে শ্যামাকান্ত রোকেয়ার সঙ্গে গল্প করে। আমি সেলাই করতে করতে ওদের কথা শুনি। শ্যামাকান্ত নিরক্ষর-দরিদ্র-নিম্নবর্ণ। ওর কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়।
ঘুরপাক খায় আরেকজনের কথা। বড় ডিগ্রি আছে। দেখতে মোটামুটি। বড় চাকুরে। কিছুদিন আগে অনুরোধ করেছিল- ভাবি একটা মেয়েটেয়ে দেখেন না। আপনাদের ওদিকে তো অনেক ব্যবসায়ী-ট্যবসায়ী আছে। ব্যবসায়ীর মেয়ে ছাড়া বিয়ে করছি না। দেখতে শুনতে মোটামুটি চলনসই হলেই চলবে। কিন্তু ঢাকায় অবশ্যই বাড়ি থাকতে হবে এবং বাড়ি করেও দিতে হবে। সেই সঙ্গে আর যা যা লাগে টাগে।
ঠাট্টা ভেবে হাসতে থাকি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ভদ্রলোক বলে- না না ভাবি হাসি নয়। যা দিনকালের অবস্থা-চাকরির টাকায় চলে বলেন? দেখেছেন না ফারুক, কাজেম ভাই, মিনহাজ ভাই কেমন বিয়ে করলেন? কাজেম ভাইর শ^শুর বাড়ি-গাড়িসহ ষাট তোলা সোনা দিল। জাকিরুল ভাইর শ্বশুর তো তার ইন্ডাষ্ট্রির চল্লিশ অংশ লিখে দিয়েছে। ফারুক পেয়েছে বাড়ি-গাড়ি-টিভি-ফ্রিজসহ আশি তোলা গোল্ড।
ভদ্রলোকের চোখমুখ লোভ এবং উত্তেজনায় চকচক করতে থাকে। ঘটনাগুলো সত্যি। চুপ করে থাকি। উত্তর দিতে রুচিতে বাধে। কর্তাটি আমাকে চেনে। কী বলে ফেলি, এই আশঙ্কায় প্রসঙ্গান্তরে চলে যায় সে।
এই ধরনের অনুরোধ একেবারে নতুন নয়। আরো দু-একজন বলেছে। অনুরোধের চেহারা একেকজনের একেক রকম। তবে মূল বক্তব্য প্রায় একই। কোনো মন্তব্য করা হয়তো উচিত নয়। আমাদের পোকায় কাটা সমাজের মানসিকতাই বোধহয় অনেক বদলে গেছে।
ভেবে স্বস্তি পাই, শ্যামাকান্তরা তবু আছে।