বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / কার্টুনিস্ট মিতুর মুখোমুখি
১২/০৮/২০১৬

কার্টুনিস্ট মিতুর মুখোমুখি

-

যে-কোনো শিল্পভাবনা এবং তার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটা বেশ গুরুগম্ভীর ব্যাপার বলা চলে। তবে কার্টুনশিল্প এ দিক থেকে কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম বৈকি। কার্টুন হোক বা ক্যারিকেচার, তা একদিক থেকে যেমন হাস্যরসের মাধ্যম ঠিক একইভাবে মুক্তচিন্তা প্রকাশের প্ল্যাটফর্মও বটে। এই ‘দুধারি’ দৃষ্টিনন্দন শিল্প নিয়ে কথা হচ্ছিল এ-সময়ের ব্যস্ত কার্টুনিস্ট নাসরীন সুলতানা মিতুর সঙ্গে। ঢাকা কমিক্স স্টুডিওতে বৃষ্টিস্নাত বিকেলের আড্ডায় এই শিল্পের নানাদিক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত নাসরীন সুলতানা মিতুর কার্টুনিস্ট সত্তা সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া গেল।

প্রশ্ন : প্রথমেই আপনার কার্টুনিস্ট হওয়ার নেপথ্যের গল্পটা জানতে চাচ্ছি।
মিতু : শুরুটা হয়েছিল ২০০৬ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় মূলত এক বন্ধুর উৎসাহে এই ক্ষেত্রে প্রবেশ করা। এরপর জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট এবং উন্মাদের বর্তমান প্রধান সম্পাদক আহসান হাবীবের সান্নিধ্যে আসা। এক্ষেত্রে বলতেই হয় ওনার কাছ থেকে অনেক সাহায্য ও উৎসাহ পেয়েছি, যা না থাকলে হয়তো এতদূর আসা হতো না।

প্রশ্ন : কার্টুন আঁকতে গেলে কোন কোন বিষয় মাথায় রাখেন? সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে একটু বলবেন কি?
মিতু : এটা নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের কার্টুন আঁকবেন তার উপর। এই যেমন হাস্যরসের জন্য কার্টুন আঁকার সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আঁকা কার্টুনের পেছনের ভাবনা ভিন্ন হবে স্বাভাবিক। কার্টুন আঁকার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, ব্যাপারটা যতটা না স্কিলের, তার চেয়ে বেশি আইডিয়ার উপর নির্ভর করে। আপনি যা ভাবছেন বা যে মেসেজটা দিতে চাচ্ছেন, তা যাতে সহজে পাঠকের বোধগম্য হয়, সে অনুযায়ী চিন্তাভাবনা সাজাতে হবে।

প্রশ্ন : শিক্ষাগত জীবনে আপনি তো এ বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করেননি। সেক্ষেত্রে কার্টুন আঁকার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন কি?
মিতু : এদিক থেকে আমার ভাগ্য ভালো ছিল বলতে হয়। তেমন প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়নি এক্ষেত্রে। বাসা থেকে বলা ছিল - রেজাল্ট ভালো রেখে যা ইচ্ছা করতে পারি। তাই পড়াশোনা ঠিক রেখে তার পাশাপাশি এই কাজে মনোনিবেশ করতে পেরেছি।

প্রশ্ন : কার্টুন এবং ক্যারিকেচার দুটোই ভিন্ন জিনিস, যা অনেক সময় আমরা এক করে ফেলি। এদের মধ্যে মূল পার্থক্য কি?
মিতু : কার্টুন ও ক্যারিকেচার যে একেবারেই ভিন্ন কিছু তা নয়। এই যেমন - অনেক রাজনৈতিক কার্টুনে নেতার চেহারা পোর্ট্রটে করার সময় ক্যারিকেচার ব্যবহার করতে দেখা যায়। আবার শুধুমাত্র ক্যারিকেচারই আলাদাভাবে আর্টের একটা রূপ হতে পারে। এক্ষেত্রে অনেকেই ভাবেন কোনো ব্যক্তিকে বিদ্রুপ করার জন্যই শুধু ক্যারিকেচার ব্যবহার করা যেতে পারে। আদতে সম্মান প্রদর্শনের জন্যও কারো ক্যারিকেচার আঁকা যেতে পারে।

প্রশ্ন : কার্টুনে বিষয় হিসেবে অনেকসময় রাজনীতি বেশ প্রাধান্য পায়। এর কারণ কি?
মিতু : রাজনৈতিক কার্টুনের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং কার্টুনের আলাদা একটা ধরন। আপনি রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে একটা বিশাল সম্পাদকীয় লিখে পাঠককে যা বোঝাতে চাইবেন, তা হয়তো একটা কার্টুনের মাধ্যমে খুব অল্প সময়েই বোঝানো সম্ভব হয়। আর অনেক সময়ই তো আমাদের ব্যস্ততার কারণে পুরো পত্রিকা পড়া হয়ে ওঠে না। এছাড়া কার্টুন সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে, একজন নিরক্ষর মানুষও কিন্তু রাজনৈতিক কার্টুন দেখে পেছনের চিন্তাটা বুঝতে পারেন। এর পাশাপাশি হাস্যরসের উপাদান তো থাকছেই।

প্রশ্ন : প্রভাবশালী রাজনৈতিক কিংবা ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তিকে কার্টুনের বিষয় হিসেবে বাছাই করাটা বেশ সাহসের বলতে হবে। এর জন্য কখনো ঝুঁকির মুখে পড়েছেন?
মিতু : রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তির কার্টুন আঁকার কারণে ব্যক্তিগত ঝুঁকি বা হুমকির মুখে পড়তে হয়নি এখনো। কিন্তু রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আমার আঁকা একটি কার্টুনের জন্য কিছু সমস্যায় পড়েছিলাম। যদিও সেখানে (কার্টুনে) কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তবু কিছু জায়গা থেকে এমন অভিযোগ এসেছিল যে এ ধরনের কার্টুনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, যদিও এত বড় দুর্ঘটনায় এত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ভাবমূর্তি কীভাবে অক্ষুণ্ণ ছিল, তা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন আছে।

প্রশ্ন : রানা প্লাজার কার্টুনটা সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলুন।
মিতু : এটা খুব প্ল্যান করে আঁকা এমন কিছু নয়। যেদিন দুর্ঘটনা ঘটলো, তার ঘণ্টা দেড়েকের মাথায় আঁকা, ইনস্ট্যান্ট রিফ্লেক্স বলতে পারেন। গার্মেন্ট সেক্টর নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, অথচ এর নেপথ্যের কারিগরদের আমরা কতটা মূল্যায়ন করছি-এমন ভাবনা থেকেই আঁকা।

প্রশ্ন : অন্যান্য অসংখ্য ক্ষেত্রের মতো বাংলাদেশেও কার্টুন জগতে নারীর সংখ্যা একেবারেই কম। এর পেছনে কারণ কী কী বলে মনে করেন?
মিতু : আমাদের দেশে জন্মের পর থেকে একটা মেয়ে সমবয়সী ছেলের চেয়ে কম সুযোগ-সুবিধা পায়। যে কারণে একটা মেয়ে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পায় না। ঠিক একই কারণে কার্টুন বা অফ-ট্র্যাক ফিল্ডেও মেয়েদের অংশগ্রহণ কম। জন্মের পর থেকে মেয়েদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা এত বড় একটা ইস্যু যে, মুক্তভাবে কোনো কিছু করার সুযোগ অনেক মেয়েই পায় না এবং তাদের মধ্যে ভিন্নধর্মী কোনো ক্ষেত্রে কাজ করার আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয় না । এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই দেখা যায়, এমন কিন্তু নয়। প্রকৃতপক্ষে জেন্ডার ইস্যুতে বিশ্বের একেক দেশের অবস্থা একেকরকম ভাবে খারাপ।

প্রশ্ন : একজন নারী হিসেবে এ ধরনের ভিন্নধর্মী ক্ষেত্রে কাজ করাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং? প্রতিবন্ধকতাও কেমন?
মিতু : ভিন্নধর্মী ক্ষেত্রেও যেমন কার্টুন আঁকাটা চ্যালেঞ্জিং কিংবা একটু রিস্কিই, এটা স্বীকার করি। তবে চ্যালেঞ্জটা আসলে মানসিক দিক থেকেই বেশি। আমাদের দেশে গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে নারীরা সবচেয়ে বেশি কাজ করে। অথচ এই ক্ষেত্রেই বরং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব কিংবা অন্যান্য চ্যালেঞ্জ বেশি। প্রতিবন্ধকতার কথা বলতে গেলে অনেক কিছু নিয়েই বলা যায়। তবে প্রতিবন্ধকতার কথা না ভেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস থাকাটাই বেশি জরুরি।

প্রশ্ন : এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। ধরুন, আপনাকে বলা হলো মাশরাফি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প-দু’জন সম্পূর্ণ আলাদা ভাবমূর্তির মানুষের কার্টুন আঁকতে। কার ক্ষেত্রে কীভাবে এবং কোন বিষয়গুলো মাথায় রেখে শুরু করবেন?
মিতু : ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ইতোমধ্যেই একটা কার্টুন এঁকেছি এবং অবশ্যই তার সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই যে নেতিবাচক মানসিকতা আছে, সেটা মাথায় রেখে। মাশরাফির ক্ষেত্রে ব্যাপার একেবারেই আলাদা হবে। আমরা সবাই তাঁকে তাঁর নেতৃত্বগুণ, ক্রিকেটীয় সামর্থ্য এবং দাম্ভিকতাহীন ব্যক্তিত্বের জন্য চিনি। তাই তাঁর এই গুণগুলোর কথা মাথায় রেখেই মাশরাফির কার্টুন আঁকবো।

প্রশ্ন : এখন পর্যন্ত আঁকা কার্টুনের মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কোনটি?
মিতু : ঠিক ওভাবে এক-দু’টি কার্টুন বেছে নেয়াটা কষ্টকর। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে করা আঁকা কার্টুনটা বিভিন্ন কারণে প্রিয়। এর পরপরই মে দিবসে বারকোড নিয়ে আঁকা কার্টুনটাও বেশ প্রিয়। রাজনৈতিক কার্টুনের মধ্যে ২০১০ সালে শেয়ার বাজার নিয়ে একটা কার্টুন ছিল। এছাড়া আমার আঁকা চার্লি চ্যাপলিন, মেরিলিন মনরো এবং সালভেদর দালির ক্যারিকেচারগুলোও বেশ প্রিয়।

প্রশ্ন : আপনার স্বামী মেহেদি হকও একজন কার্টুনিস্ট। ব্যক্তিগত জীবনে একে অপরের কাজ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কতটুকু হয়?
মিতু : ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাড়াও পেশাগত জীবনে অনেক আগে থেকেই তার সঙ্গে পরিচয় এবং অনেকদিন এক সঙ্গে কাজ করেছি। একে অপরের কাজ নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত, আলোচনা-সমালোচনা তাই সবসময় কম-বেশি করা হয়। তবে প্রফেশনের জায়গাটা একেবারেই আলাদা। সেখানে দু’জনের মধ্যেই পেশাদার মনোভাব থাকে।

প্রশ্ন : এখন পর্যন্ত পাওয়া অ্যাওয়ার্ড বা স্বীকৃতির মধ্যে কোনটি আপনার জন্য সবচেয়ে খুশির উপলক্ষ ছিল? একজন শিল্পীর কাছে অ্যাওয়ার্ডের গুরুত্ব কতটুকু?
মিতু : অ্যাওয়ার্ড যে একেবারে জরুরি তা নয়, তবে এটা পেলে এক ধরনের উৎসাহ কাজ করে। এখন পর্যন্ত পাওয়া অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে ২০১৪ সালে রম্য পত্রিকা উন্মাদের ‘কার্টুনিস্ট অব দ্য ইয়ার’-এর কথা বলব সবার আগে। উন্মাদ আমার ভালোবাসার একটা স্থান এবং এখান পাওয়া থেকে স্বীকৃতি আমার জন্য বেশ আবেগের বলতেই হবে। এছাড়া এ মুহূর্তে ২০০৯ এবং ২০১৫ সালে টিআইবি থেকে পাওয়া অ্যাওয়ার্ডের কথা মনে পড়ছে।

প্রশ্ন : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম।
মিতু : গত কিছুদিন হলো ‘টিকট্যালিক’ নামের একটি প্রজেক্ট শুরু করেছি। এর পেছনে আইডিয়া হলো কার্টুনের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া। আমাদের দেশে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই কঠিনভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনেকটা সায়েন্স কমিক্সের মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষা বলতে পারেন। এর জন্য ওয়েবসাইটের কাজ ইতোমধ্যে চলছে এবং পরবর্তী সময়ে ইন্টারঅ্যাক্টিভ অ্যাপের দিকেও যেতে পারি।

প্রশ্ন : সবশেষে যারা এই ক্ষেত্রে আসতে চান, তাদের কী পরামর্শ দেবেন?
মিতু : এক্ষেত্রে বলব যে, যে-বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, তা ঠিক রেখে কার্টুন আঁকার প্র্যাকটিসটা বজায় রাখা উচিত। অনেক সময় হয়তো পেশা হিসেবে কোনটা বেছে নেবেন, তা নিয়ে নিজের মধ্যেই দ্বিধা কাজ করবে। এক্ষেত্রে নিজের প্রতি এবং কাজের প্রতি সৎ থাকাটা জরুরি। এই যেমন আপনি যদি রাজনৈতিক কার্টুন আঁকায় নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চান, সেক্ষেত্রে আঁকার পাশাপাশি দেশের রাজনীতি, ইতিহাস সম্পর্কেও পড়াশোনা করতে হবে। পুরো ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমের। তাই এ-ধরনের মানসিকতাও থাকা উচিত।

- সাক্ষাৎকার: মুহাম্মদ রিদোয়ান