শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / রোকেয়া ও আধুনিকতা
১২/০৩/২০১৬

রোকেয়া ও আধুনিকতা

-

রোকেয়া কাল-অগ্রগামী এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তার বিশিষ্টতা তাকে অনন্য সাধারণই করে তোলেনি, কালের মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এতটা যুগ-অগ্রগামী, এতটা ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। যদিও রোকেয়ার সাহিত্য প্রতিভা অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে তার সমাজ সংস্কারের অক্লান্ত চেষ্টা ও গুরুত্বের কাছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোয় বেগম রোকেয়ার জন্ম। তখন সমাজ ছিল অনেক পশ্চাৎপদ। সেই পশ্চাৎপদ সামাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশটির প্রধান ছিল মুসলমান। সমকালীন হিন্দুসমাজের চেয়ে মুসলান সমাজ ছিল অনেক অনগ্রসর। এ অনগ্রসরতা শুধু অর্থনৈতিক ছিল না, মুসলমানদের চিন্তাধারায়ও এর ছাপ ছিল প্রকট। মুসলমানরা পিছিয়ে ছিল আবার পিছিয়ে পড়া এ মুসলিম সমাজের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ অংশটি ছিল মুসলিম নারীসমাজ। মুসলিম নারীর শিক্ষা গ্রহণ ছিল বাধাগ্রস্ত। ফলে গৃহকোণে বন্দি অবগুণ্ঠিত নারীরা ছিল একেবারেই অক্ষরজ্ঞানশূন্য, অবহেলিত। সেই রক্ষণশীল অতি প্রতিকূল পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেও রোকেয়ার মধ্যে যে আধুনিক বোধ দেখা যায়, চিন্তার যে স্ফুরণ দেখা যায়, তা সত্যিই অসাধারণ। বর্তমান সময়েও রোকেয়ার মতো আধুনিক মনন বিরল।

রোকেয়ার নারীচিন্তা ছিল আধুনিক ও বলিষ্ঠ। নারীকে তিনি মানুষ হিসাবে দেখেছিলেন। নারীর সেই চিরপরিচিত সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতা ভেঙে ভিন্ন মূল্যায়নে ব্রতী হয়েছিলেন। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এটি ছিল প্রায় অসম্ভব এক ভাবনা। কিন্তু রোকেয়া সেই অনগ্রসর আর জড়চিন্তার জগতে বিরাট আলোড়ন তুলতে চেয়েছিলেন। সহস্র বছরের কুসংস্কারের ভিতে ঘা মেরে, এ সমাজের স্থবির চিন্তাগুলোকে আঘাত করে জাগাতে চেয়েছিলেন সমাজকেই। সেই অবরুদ্ধ চিন্তার জগতে তা ছিল যেন এক একটি বিশাল বিস্ফোরণ। প্রথাগত চিন্তাকে দুমড়েমুচড়ে রোকেয়া নির্ভীক নাবিকের মতো উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। শৃঙ্খলিত থেকেও রোকেয়ার তাই প্রশ্ন -

‘এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যজগতে আমরা কি? দাসি। পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসায় উঠিয়া গিয়াছে শুনি; কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? না। আমরা দাসি কেন?’

রোকেয়ার তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তর আজ একশ পঁয়ত্রিশ বছর পরও কি দেয়া সহজ? সেই একশত পঁয়ত্রিশ বছর আগের নারীর যে সামাজিক ও মানসিক অবস্থান তা থেকে কি বেরিয়ে আসতে পেরেছে বর্তমান আধুনিক নারী? নারীর দাসত্ব বিশেষত মনের দাসত্ব, চিন্তার জগতের সীমাবদ্ধতা কি সত্যিই ঘুচেছে?

রোকেয়া সেই সময়েই বুঝতে পেরেছিলেন নারীর দুর্বল মানসিকতা, পরাধীনতা, নির্ভরশীলতাপ্রবণ মনই তাদের (নারীদের) দুর্ভাগ্য আর অবনতির প্রধান কারণ। স্ত্রী জাতির অবনতি প্রবন্ধে রোকেয়া তাই এই বিষয়টি বারবার উল্লেখ করেছেন। এই পরনির্ভরশীলতা দূর করে উন্নত মানসিক গুণগুলো চর্চার মাধ্যমেই যে নারীর উন্নতি তা রোকেয়া জোর দিয়ে উচ্চারণ করেছেন। সুস্থ, মননশীলচর্চার অভাব, অন্যের অনুগ্রহ লাভের আকাক্সক্ষা এবং অনুগ্রহ গ্রহণ করতে যে নারী একসময় আপন সত্তা হারিয়ে মনকে দাসত্বে বন্দি করে, তা বেগম রোকেয়া একশ পঁয়ত্রিশ বছর আগেই বুঝেছেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গেই বলতে হয়, নারীর প্রকৃত অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে? স্বনির্ভর হওয়ার দৃঢ় বাসনায় কতটুকু অগ্রসর হয়ছে তারা? হ্যাঁ, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। অর্থনৈতিকভাবেও নারী স্বনির্ভর হচ্ছে। কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা, মানসিক স্বনির্ভরতা অর্জনে এখনও নারী পিছিয়ে আছে। রুঢ় সত্য হচ্ছে, উচ্চবৃত্তির মানসিক গুণগুলোর অনুশীলনে নারী এখনও অভ্যস্ত হয়নি। একথা অনস্বীকার্য যে নারী এখন পোশাকে ও চলনে অনেক বেশি আধুনিক। কিন্তু আধুনিক পোশাক আর সাজের ওই ছদ্মাবরণে নারী এখনও অনেক ক্ষেত্রেই কেবল ধুঁকে ধুঁকে বয়ে বেড়াচ্ছে সহস্র বছরের কুসংস্কারাচ্ছন্ন পশ্চাৎপদ চিন্তাগুলোকে। নানা সংস্কার নারীর সমস্ত বোধকে আচ্ছন্ন করে আছে আজও। মজ্জাগতভাবে বহন করা এ চিন্তাগুলোর কারণেই সে উন্নয়ন বা উন্নতির প্রকৃত সংজ্ঞা অনুধাবনে অক্ষম। যা প্রকারান্তরে প্রভুত্ব বিস্তারে সাহায্য করে চলেছে পুরুষকে।

শিক্ষাবিদ রোকেয়া তার সমগ্র জীবন নারীশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করতে ব্যয় করেছেন। নারীশিক্ষার প্রসার, শিক্ষাকে কাজে লাগানো এ বিষয়ে রোকেয়া বহু জায়গায় তার সুস্পষ্ট মতামত রেখেছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নারীকে জাগাতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাকে অবশ্যই হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তাই তিনি নারীর শিক্ষালাভের সুযোগের বিষয়ে বরাবরই ছিলেন সোচ্চার। সে যুগে নারীদের জন্য উপযুক্ত স্কুল-কলেজ ছিল না, সে বিষয়টি নিয়ে তিনি বারবার আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন - ‘আমাদের নিমিত্ত জ্ঞানরূপ সুধাভারের দ্বার কখনও সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হইবে কি?’ রোকেয়ার কালকে আমরা অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কো-এডুকেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ছেলেমেয়ে একত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারছে। তারপরও বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে পুরুষের সমান সুযোগ কি মেয়েদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে? অতি মেধাসম্পন্ন মেয়ের ক্ষেত্রেও পরিবারের কাছে উচ্চশিক্ষা প্রদানের চেয়ে ভালো বিয়ে প্রদানই অনেক ক্ষেত্রে এখনও বেশি। জরুরি বিষয়। আর মেধাহীনদের কথা তো বলাই বাহুল্য। ফলে জ্ঞানলাভের চেয়ে স্বামীগৃহের দ্বারই মেয়েদের জন্য অধিক প্রশস্ত।

উচ্চশিক্ষা মেয়েদের জন্যও কি জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মুক্ত? উচ্চশিক্ষিত অধিকাংশ মেয়ের শিক্ষাও শুধু একটি কাগজে পরিণত হয়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ যেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো স্বামী শিকারের উপলক্ষ মাত্র। বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান দ্বারা মনকে আলোকিত করা ও জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ কোনোটিই গুরুত্ব পায় না এ-ধরনের শিক্ষা লাভে। সংসারে প্রবেশের পর স্বামী-সংসার দেখে ও সন্তান প্রতিপালন করে জ্ঞানচর্চার সুযোগ যেমন হয় না, তেমনি এর আর প্রয়োজন আছে বলেও অনেক উচ্চশিক্ষিত আধুনিকরা মনে করে না। এভাবেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও কুপমুন্দকতা থেকে মুক্তি ঘটে না নারীর। রোকেয়ার শিক্ষিত মনন জানত শিক্ষা কী, কীভাবে অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষা পূর্ণতা লাভ করে, শিক্ষা কীভাবে ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করে থাকে। তাই রোকেয়ার দৃপ্ত উচ্চারণ-

‘আমরা কেবল পাসকরা বিদ্যাকে শিক্ষা বলি না।’

‘শিক্ষা অর্থে আমি প্রকৃত সুশিক্ষার কথাই বলি; গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিয়া বা দু’ছত্র কবিতা লিখিতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষা- যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে, তাহাদিগকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী এবং আদর্শ মাতারূপে গঠিত করিবে! শিক্ষা-মানসিক এবং শারীরিক উভয়বিধ হওয়া চাই।’

রোকেয়া নারীর জন্য প্রকৃত শিক্ষার কথা বলেছিলেন। কারণ তখন নারী শিক্ষার প্রয়োজন ছিল সর্বাগ্রে কিন্তু এই যে প্রকৃত শিক্ষাচিন্তা থেকে তা নারীর তো বটেই পুরুষেরাও এখনও অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। অনুশীলনের দ্বারা শিক্ষাকে কাজে লাগানো, জ্ঞানচর্চার দ্বারা চিন্তাশক্তির উন্নয়ন এ সমাজে কতটুকু চর্চিত হচ্ছে? তার সুযোগ এ সমাজে কতটুকু সৃষ্টি হয়েছে? আর নারীর জন্য প্রকৃত জ্ঞানচর্চার সুযোগের প্রশ্নে ফিরে গেলে আবারও রোকেয়ার পুনরাবৃত্তি করে বলতে হয়-

আমাদের নিমিত্ত জ্ঞানরূপ সুধাভারের দ্বার কখনও সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হইবে কি?

বাইরের চাকচিক্য রোকেয়াকে আকর্ষণ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন হৃদয়ের ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যবান। তিনি নারীর অলংকারপ্রিয়তার প্রতি তীব্র কটাক্ষ হেনেছেন। আঘাত হেনে নারীর অলংকারের মোহ ভাঙতে চেয়েছেন। অলংকারের মাধ্যমে নারীর সৌন্দর্য বর্ধনের চেষ্টাকেও মেনে নেননি। তাই তেজস্বী বেগম রোকেয়ার কাছে সৌন্দর্য বর্ধন মানসিক দুর্বলতা। নারীর সৌন্দর্য বর্ধন সে তো পুরুষের জন্যই। পুরুষের অনুরাগ, অনুগ্রহ বা তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা তো মানসিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। নিজে অন্তঃসারশূন্য হলেই অন্যের তুষ্টির প্রয়োজন হয়। এই অন্তঃসারশূন্যতা দূর করার জন্য বাহ্যিক অলংকারকে বর্জন করে জ্ঞান-অলংকার দ্বারা নারী সমাজের সমৃদ্ধকরণে তিনি আহ্বান জানান-শরীর শোভন অলংকার ছাড়িয়া জ্ঞান-ভূষণ লাভের জন্য ললনাদের আগ্রহ বৃদ্ধি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

রোকেয়ার কাল থেকে বর্তমানে বাইরের চাকচিক্যের কদর আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অলংকার এখনও অতি আকাক্সিক্ষত বস্তু। সমাজ কর্তৃক অতি আদরণীয়। এরজন্য সামাজিক, পারিবারিক অশান্তি ও খুন-খারাবি নিত্যকার ঘটনা। সৌন্দর্য বর্ধনের চেষ্টা নারীকে ছাপিয়ে এখন পুরুষের মধ্যেও সংক্রমিত। পুরুষের জন্যও এখন বাজারে রয়েছে ফেয়ারনেস ক্রিম আর তার চাহিদাও ব্যাপক। অথচ রোকেয়ার মতো আধুনিক হয়ে আমরা যদি জ্ঞানকে ভূষণ করতে পারতাম তবে বাহ্যিক চাকচিক্য আর আভিজাত্য প্রদর্শনের সর্বনাশা মোহ ও প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মিক উন্নতি ঘটাতে পারতাম।

রোকেয়া স্বপ্ন দেখতেন পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনে। যে-সমকক্ষতার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছিলেন। সে সমকক্ষতা দৈহিক আর পোশাকের নয় বরং অগ্রগতি উন্নতি আর মানসিক সমৃদ্ধির। তিনি জানতেন, এজন্য নারীর অর্থনৈতিক জীবন প্রয়োজন, প্রয়োজন কর্মক্ষেত্রের প্রসারণ। এভাবে যখন নারীশিক্ষার কথা কল্পনা করাই দুঃসাহস ছিল, তখন রোকেয়া নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার কথা বলেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন-

‘আমরা লেডি কেরানি হইতে আরম্ভ করিয়া ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি ব্যারিস্টার, লেডি জজ সবই হইব।’

ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে যখন নারীদের গৃহকাজে ব্যতীত ঘরের বাইরে এসে অন্য কোনো কাজ অকল্পনীয় ছিল, তখনও বেগম রোকেয়া গৃহশ্রমকে মূল্যায়ন করেছেন-

‘যে-পরিশ্রম স্বামীর গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না।’

- নূর কামরুন নাহার