রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / কিউবা ভ্রমণের স্মৃতি
১১/২১/২০১৬

কিউবা ভ্রমণের স্মৃতি

- তামান্না আলীম

কিউবার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণের গল্প। কিউবায় ইন্দো-মার্কিনি জনসংখ্যা কমতে শুরু করে ক্রিস্টোফার কলম্বাস এই দ্বীপটি আবিষ্কার করার পর থেকে। সেটা ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। গত কয়েক শতাব্দী ধরে স্প্যানিশ উপনিবেশ থাকাকালীন উন্নয়নের পরিণতি ছিল এটা। আফ্রিকা থেকে বিপুল সংখ্যক কালো মানুষকে এখানে এনে ক্রীতদাস হিসেবে কফি ও আখ উৎপাদনের কাজে লাগানো হতো। মেক্সিকো ও পেরু থেকে স্পেন অভিমুখী নৌযানগুলো বিভিন্ন সম্পদ নিয়ে বছরভর যে যাত্রা করত, তার মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল হাভানা। স্প্যানিশ শাসন ছিল ভয়ানক, শোষণ বঞ্চনায় পরিপূর্ণ। মাঝে-মধ্যে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে অত্যন্ত কঠোর হাতে সেসব দমন করা হতো।

ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বিপ্লবী বাহিনী ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে জয়লাভ করতে সমর্থ হয়। কিউবায় কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রতি দৃঢ়সমর্থন ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের। তখন থেকেই কিউবায় কমিউনিস্ট শাসন দৃঢ়তার সঙ্গে চলে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় তা ষাট, সত্তর ও আশি দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় বিপ্লব রফতানি করা হয়। ’৯০ দশকের মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা কিউবা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠছে।

আমার ভ্রমণ শুরু হলো কিউবার ভারাদেরো থেকে। এটি মাতানজাস প্রদেশের বৃহত্তম পর্যটন শহর। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন শহর হিসেবেও এটি পরিচিত। ভারাদেরো সমুদ্র সৈকতে ফি বছর লক্ষ লক্ষ বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটে। এখানে আছে ২০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ শ্বেতশুভ্র বালুকাসমৃদ্ধ সমুদ্রতট। ভারাদেরোয় প্রাকৃতিক আকষর্ণের মধ্যে আছে গুহা এবং ছোটো ছোটো প্রবালদ্বীপ। যেখানে সহজেই যাওয়া-আসা করা যায়। ভারাদেরোয় সবচেয়ে ভালো দিকটি হচ্ছে এখানকার বাস সার্ভিস। ‘ভারাদেরো বিচ ট্যুর’ নামের দ্বিতল বাস সার্ভিসে সারা দিনের ভ্রমণ খরচ মাত্র পাঁচ পেসো। শহরে ঢোকার সহজ উপায় হচ্ছে এই সার্ভিস। এই শহরের বিনোদনও চিত্তাকর্ষক। প্রতিরাতেই শহরের কেন্দ্রস্থল পর্যটক ও স্থানীয়দের ভিড়ে ঠাসা থাকে। সারা রাত ধরে চলে নাচ-গান। এখানকার সড়কের দুইপাশে আছে সারি সারি বার ও রেস্তোরাঁ। প্রদর্শিত হয় বিখ্যাত কিউবান সিগার, হাভানা রাম ও তাদের বিখ্যাত মোজিটো এসব সকল বয়সী নারী-পুরুষকে বিনোদনে উচ্ছল করে রাখে।

হাভানা যাত্রা
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে হাভানা হচ্ছে বৃহত্তম শহর এবং এটি একাধারে কিউবার রাজধানী। এই স্থানে রয়েছে নান্দনিক সব প্রাসাদ, ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জাদুঘর ও চার্চ। নৈশবিনোদনের জন্যেও এই শহর খ্যাতি ও আকর্ষণের অবিসংবাদিত কেন্দ্র। ঔপনিবেশিক আমলের বিস্ময়কর সব স্থাপত্যশৈলী ও মনোরম সমুদ্রতট এই শহরের জীবনপ্রবাহকে দীপ্যমান করে রেখেছে। স্প্যানিশ ও আফ্রিকান ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বিশেষ স্বকীয়তা গড়ে তুলেছে।

আমাদের ভ্রমণের সময় পঞ্চাশ দশকের একটি ফোর্ড গাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল। পুরো ভ্রমণকালে আমাদের গাড়ির চালক যাত্রাকে অর্থবহ ও আনন্দঘন করে তুলেছিল। তার বলা কৌতুক এবং ইতিহাসের বর্ণনা ছিল খুবই মজার। যেমন একটা উদাহরণ দিই - যা এখনো মনে দাগ কেটে আছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি কোন ধর্মের অনুসারী? জবাবে সে বলল, ‘আমার ধর্ম হচ্ছে আমার পরিবার। আমি আমার ভালোবাসার মানুষজনের জন্য প্রার্থনা করি। চার্চ-মন্দির হলো আমার ঘর।’

হাভানার পুরানো অংশটি হচ্ছে পর্যটকদের জন্যে রত্নতুল্য বিশেষ করে যারা ছবি তুলতে চান এবং ঘুরেফিরে আনন্দ পেতে চান। পুরনো শহরের দুর্ভাগ্যজনক ক্ষয়িষ্ণুতা খুব সহজেই চোখে পড়বে। প্রাচীন এই শহরের রয়েছে অনন্য রোমান্টিক পরিবেশ। সড়কের প্রতিটি কর্নারে ঝুলে আছে শিল্পকর্ম যা খুব সহজেই দেখা ও স্পর্শ করা যায়। সে এক অসাধারণ অনুভূতি, প্রতিটি সড়ক ও কানাগলিতে এসব বৈশিষ্ট্য এবং যা দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম ও ছবি ক্যামেরায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করবে আপনার।

স্থানীয় কিউবানরা পর্যটকদের জন্যে তাদের বাড়িঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। পর্যটকরা এসব রুম ভাড়া করতে পারবেন। সকালে পাবেন ঘরে তৈরি প্রাতঃরাশ। আমরা ২৫ পেসো দিয়ে একটি রুম ভাড়া করেছিলাম। এটি ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ছিল ওয়াশরুম ও গরম পানির সুব্যবস্থাও। হাভানা ঐতিহ্যবাহী পুরনো গাড়ির জন্য বিখ্যাত। রাস্তায় সে-সবের প্রাচুর্য দেখেছি। স্থানীয়রা তাদের নিজস্ব গাড়িকে ট্যাক্সি হিসেবে ব্যবহার করেন। কিছু কিছু পুরনো গাড়িতে নতুন বডি, নতুন গাড়ির ইঞ্জিন ও চেসিস লাগানো হয়েছে। আমি ৫০ দশকের ফোর্ড গাড়ি চালিয়েছি, যেটা ছিল বেশ নির্ভরযোগ্য।

তৃতীয় দিন আমরা ত্রিনিদাদের উদ্দেশে যাত্রা করি। যেটা দ্বীপের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত। সেখানে পৌঁছুতে লাগল চার ঘণ্টারও বেশি সময়। রাস্তায় ছিল অনেক ট্রাক - রুশ, রুমানিয়ান পূর্ব জার্মানি ও জাপানি যানবাহন এসব। কোনোটা নতুন, কোনোটা আবার বেশ পুরনো। শহরতলী ও মহাসড়কে ঘোড়ার গাড়ি বেশ চোখে পড়ে। প্রধান শিল্প হচ্ছে তামাক প্রক্রিয়াকরণ যা থেকে কিউবানরা বিশ্বখ্যাত সিগার তৈরি করে থাকেন। সকালে ঘোড়ার ক্ষুরের টক টক শব্দে আপনার ঘুম ভেঙে যাবে। পাথুরে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে ঘোড়ার গাড়িগুলো। রাস্তায় স্থানীয় লোকজন সবজি, রুটি, ফলমূল বিক্রি করছে। এগুলো স্প্যানিশ উপনিবেশের নিখুঁত চিত্র, যেন ঘড়ি থেমে আছে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে।

ত্রিনিদাদকে বলা হয় কিউবার ‘জাদুঘর শহর’। এ-শহরটি হচ্ছে কিউবার অতীতকে অবলোকন করবার জানালা। স্প্যানিশ ভবনগুলো অনেক যত্ন নিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। চমৎকার সব পাথুরে সড়কে শোনা যায় অতীতের প্রতিধ্বনি। ক্যারিবীয় উপকূলের নান্দনিক এই ছোট্ট শহরে আছে এবড়োখেবড়ো পাথুরে সড়ক, হালকা রঙের কোমল আভায় রঞ্জিত ভবনের সারি, প্রাচীন গাড়ি এ কারণে শহরটি হাভানা থেকে বেশ আলাদা। আমরা এখানে একটি বাড়িতে ছিলাম। বাড়ির পেছনের আঙিনাটা ছিল ওই বাড়ির আত্মার মতো। সেখানে ছিল উজ্জ্বল সবুজের সমারোহ। ফুল, ঝোপঝাড়, পাখিদের কিচিরমিচির - যা অন্যরকম এক মূর্ছনার সৃষ্টি করে। তাজা ফল, চা-কফি এবং ঘরে বানানো সকালের নাশতা পরিবেশন করা হয় আমাদের। সে এক অমূল্য স্মৃতি। রুমগুলো ছিল আরামদায়ক। বাসার লোকেরা ছিলেন আন্তরিক, উষ্ণ এবং উদার। যদিও তারা ইংরেজি বলতে পারে না, আমরাও পারি না স্প্যানিশ বলতে।

দীর্ঘ ৫০ বছরের অবহেলা সত্ত্বেও কিউবা দেখার মতো একটি সুন্দর দেশ। সবখানে জীবনের উদ্যমতা, অন্ধকার কানাগলি, সালসা নৃত্য, গিটার, ড্রামের সুললিত ছন্দোময় তাল, শিল্পকর্ম, ঘোড়ার গাড়ি, ঐতিহ্যমন্ডিত পুরনো গাড়ি - এসব নিয়েই তো কিউবা। আমার ক্যামেরায় ধারণ করে রাখতে চেয়েছি সেই নান্দনিকতা, যার অপার সৌন্দর্য কোনো ক্যামেরার লেন্সে ধারণা করা সম্ভবপর নয়।

অনিন্দিতা রোজারিও অনূদিত