বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / ‘ভীষণ ইচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গ্লোবাল কাজ করার’ বলিউড-হলিউড'র খ্যাতনামা প্রযোজক আনাদিল হোসেন
০৩/১৬/২০১৬

‘ভীষণ ইচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গ্লোবাল কাজ করার’ বলিউড-হলিউড'র খ্যাতনামা প্রযোজক আনাদিল হোসেন

-

আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত প্রযোজক আনাদিল হোসেনের জন্ম ও বেড়ে উঠা ঢাকায়। আট বছর বয়সে তিনি পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। সেখানে পড়াশুনা শেষ করে চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে চলে যান আমেরিকা। সেখানে বেশ কিছু চলচ্চিত্র ফার্মে কাজ করার পর নিজেই খুলে বসেন ডিলিউড নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। আনাদিল কাজ করেছেন ডগ লিম্যান ফেয়ার গেম, করণ যোহর (কাল হো না হো, কাভি খুশি কাভি গাম), মিরা নায়ার (নেমসেক ও কয়েকটি তথ্যচিত্র), আশুতোষ গোয়ারিকর (স্বদেশ), রাকেশ মেহরা (দিল্লি-৬)-এর মতো জাদরেল সব পরিচালকের সঙ্গে। অভিনেতাদের তালিকায় আছেন শন পেন, ক্যাথরিন জেটা জনস, নিওমি ওয়াটস্, ক্রিস্টিন স্টুয়ার্ট, শাহরুখ খান, প্রীতি জিনতা, অমিতাভ বচ্চন, ইরফান খান, রানি মুখার্জী, কাজল, ঋত্বিক রোশনের মতো আন্তর্জাতিক সব তারকা।
তাঁকে Business Insider হলিউডে সবচেয়ে প্রভাবশালী ২০ ভারতীয়র তালিকায় রেখেছে। এই তালিকায় একমাত্র বাংলাদেশি তিনি।
সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে গেলেন আনাদিল। যাওয়ার আগে কথা বললেন অনন্যার সঙ্গে।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মোজাফ্ফর হোসেন।

ঢাকায় এবার কতদিন পর এলেন? এবার আসার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?
প্রায়ই আসি, কারণ আমার বাবা এখানে থাকেন। এবারো মূলত ফ্যামিলি ভিজিট। তবে আমি এখানে আরো নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চেষ্টা করছি। কয়েকটি সিটিং দিয়েছি। আমার এ-বছর তিনটা ফিল্ম বের হচ্ছে। আমার খুব স্বাভাবিকভাবেই ইচ্ছে আছে এখানে কি ধরনের সুযোগসুবিধা আছে তা এক্সপ্লোর করার। প্রতিবছরই যখন দেশে আসি তখন অনেকে বলেন দেশে কিছু করার জন্যে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড আমাকে একটা টিভি সিরিজের অফার দিয়েছে ঢাকার জন্যে। আমার এখানে কিছু কাজ করতে চাই।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে কি আপনার কোনো ধারণা আছে? এই ক্ষেত্রে কি কিছু করার পরিকল্পনা আছে?
অবশ্যই ইচ্ছে আছে। আমি অনেক বছর ভারতে কাজ করেছি। তাই খুব ভালো করে জানি কি ধরনের চ্যালেঞ্জ এই উপমহাদেশে আছে। ভারতের মতো জায়গায় যেখানে একটা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আছে, সেখানেও কাজ করা সহজ না। আমি কলকাতায় কাজ করেছি, দিল্লি করেছি, গোয়া, আগ্রা, বম্বে, রাজস্থানে কাজ করেছি। এছাড়াও এই অঞ্চলে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ব্যাংককে কাজ করেছি; মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেছি, আফ্রিকায় কাজ করেছিÑ আমার বৈশ্বিক একটা অভিজ্ঞতা আছে। আমি জানি যে, বাংলাদেশে অনেক মেধা আছে, এখন ফান্ডিংও হচ্ছে; কিন্তু একটা অবকাঠামো তৈরি হয়নি। এটার জন্যে একটা শক্তসমর্থ কমিউনিটি লাগবে, বড় একটা ইন্ডাস্ট্রি লাগবে, যারা ইন্ডাস্ট্রির ভেতর থেকে উন্নতি করবেন। তখন মানুষজন এই ক্ষেত্রে অর্থলগ্নি করতে আগ্রহী হবে। এই সার্বিক অবস্থানটাই আমি এখানে এক্সপ্লোর করতে চাই। আর বাংলা ছবি খুব বেশি দেখা হয় না। তবে আমি দেখার প্রয়োজন মনে করি। এবার বেশ কিছু ডিভিডি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি।

এখানে সিনেমার ক্ষেত্রে দুটি সংকট। এক. পর্যাপ্ত থিয়েটার নেই। দুই. বিদেশে মার্কেট তৈরি হয়নি। এক্ষেত্রে বিগ বাজেট নিয়ে কাজ করে পোষাবে কি?
আপনি সিনেমার কথা বলছেন। এখানে কিন্তু সবকিছু এখন টিভিতে চলে যাচ্ছে। অনেক অনেক টেলিভিশন চ্যানেল আছে, আরো আসছে। এটিও সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ওদের সাথে যদি ডিস্ট্রিবিউশন ডিলিং করা যায়, মন্দ হয় না। বড় সমস্যা হলো, ভারত আর বাংলাদেশে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই। ভারতের সিনেমা এখানে আসে না, বাংলাদেশের সিনেমা ভারতে যায় না। আমি জানি এটা কেন হচ্ছে, কিন্তু মানতে পারি না। বাইরে থেকে প্রভাব আর সহযোগিতা যদি না আসে তবে ভেতরের কোনো উন্নতি হবে না। এখানে কলকাতা এবং বাংলাদেশ- দুটো ইন্ডাস্ট্রিই একধরনের ইনসিকুউরিটিতে ভোগে। এটাও তো ঠিক যে আমরা পাইরেটেড সিনেমা দেখি, এতে দুই ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্তমানে আপনি কি কি করছেন?
আমি যেহেতু সিনেমা অর্থাৎ ফিকশন মুভিজ করি, সেসব নিয়েই আছি। তবে গত পাঁচ বছর ধরে আমি আমার কোম্পানি থেকে দুটো ফিচার ডকুমেন্টরি নির্মাণ করছি। একটা হলো পরিবেশ বিপর্যয়ের ওপর। অন্যটি আর্মস ট্রেড নিয়ে। দুটো তথ্যচিত্রের কাহিনি জনপ্রিয় দুটি বই থেকে নেয়া। একটা হলো Naomi Klein-Gi Changes Everything বই থেকে। আমাদের শিরোনাম একই। ৯০ মিনিট দীর্ঘ এই তথ্যচিত্রটি থিয়েটারে মুক্তি দিয়েছি। গতবছর টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রিমিয়ার হয়েছে। এখন আইটিউনস-এ ডাউনলোড করা যায়। আর দ্বিতীয় তথ্যচিত্রটির নাম Shadow World এটা ভীষণভাবে রাজনৈতিক ছবি। এটার একটা স্পেশাল স্ক্রিনিং হবে এ বছর ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যালে। ছবিটি আর্মস ট্রেড নিয়ে, কেন কিভাবে হয়, কারা যুক্ত- এসব উঠেছে এসেছে।

এমন বোল্ড বিষয় নিয়ে, কোনো সমস্যা হবে না? মানে উপর থেকে চাপটাপ?
হলে হবে। তবে আমার মনে হয় না বেশি কিছু হবে। আমরা তেরজন আইনজীবী নিয়ে বসেছি কাজটা শুরু করার আগে। তাছাড়া বইটা কয়েক বছর থেকেই বাজারে আছে, কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা তো নতুন কিছু বলিনি। এগুলো মানুষ জানে। আমরা শুধু বলেছি, এটার কারণে এটা হয়। তুমি কি মেনে নেবে? পরিবেশ নিয়ে কাজ করার সময় আমরা একই কাজ করেছি।

আপনি এইচআইভি নিয়ে মিরা নায়ারের সঙ্গে ভারতে একটা তথ্যচিত্র করেছিলেন?
ওটা বছর দশেক আগে। আমি চারটা শর্ট ফিল্ম মিরা নায়ারের সঙ্গে প্রডিউস করেছি। চারটা পনের মিনিটের শর্ট ফিল্ম ভারতের চারজন শীর্ষস্থানীয় পরিচালক পরিচালনা করলেন, অভিনয় করলেন বিখ্যাত অভিনেতারা- যাদের দর্শক অনুসরণ-অনুকরণীয় বলে মনে করেন। প্রতিটার বিষয়বস্তু ছিল সামাজিক সমস্যা ও সচেতনাতামূলক। এইচআইভি, সমকামী সম্পর্ক, সেফটি এবং হেলথ এইসব বিষয় নিয়ে। এখানে প্রচলিত মিথগুলি আমরা ভাঙতে চেয়েছিলাম। আর অতি সম্প্রতি মিরা নায়ারের সঙ্গে The Reluctant Fundamentalist করেছি।

The Reluctant Fundamentalist তো একজন পাকিস্তানি লেখকের লেখা উপন্যাস?
হ্যাঁ। মহসীন হামিদ। আমি আসলে অনেক বইয়ের ফিল্ম আডাপশনে কাজ করেছি। নেমসেক আছে। মহসীন হামিদের এটা। আমার দুটো তথ্যচিত্রের প্লট বই থেকে নেয়া। পলিটিক্যাল ড্রামা ফেয়ার গেমও আত্মজীবনীভিত্তিক বই থেকে করা।

ডিটেকটিভ?
ডিটেকটিভ ঠিক না। সিআইএ’র এজেন্ট ছিলেন লেখক Valerie Plame। এটা তাঁর আত্মজীবনী। উনি আর উনার স্বামী অস্ত্রশিল্পের বিরুদ্ধে খুব সোচ্চার ছিলেন। ওঁরা বলেছিলেন যে, ইরাকে কোনো রাসায়নিক অস্ত্র ছিল না। মুভিটা দেখার সুযোগ হয়েছে। শন পেন আর নিওমি ওয়াটস্ অভিনয় করেছেন। তখন অবশ্য আপনার সংশ্লিষ্টতা জানতাম না। এটা আমার নিজের ভীষণ প্রিয় কাজ। Doug Liman-এর মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে পারাটাও একটা বড় অভিজ্ঞতার অংশ।

বাংলাদেশে কি কোনো সামাজিক ইস্যু নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে?
নিশ্চয়। তারেক মাসুদ-ক্যাথরিন মাসুদ আমার অনেকদিনের বন্ধু। তাঁদের সঙ্গে সবসময় আমার কথা হতো। তাঁরা দু’জন আমাকে বাংলাদেশে কাজ করার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমার খুব ইচ্ছে আছে, আগামীতে বাংলাদেশে কাজ নিয়ে ফিরে আসার। আমি জানি এখানে অনেক মেধা আছে। সবসময় ভারতে বলি, দেখো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিক বাঙালি। শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন বাংলাদেশি। সত্যজিত বাঙালি। কাজেই বাঙালিদের মেধার সঙ্গে তোমরা পারবে না। আমার মনে হয়, বেঙ্গল থেকেই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ইন্টেলেক্চুয়াল আর্ট আসে। আমার ভীষণ ইচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা গ্লোবাল কাজ করার। দেশের ও বিদেশের লোকবল নিয়ে একটা বড় ব্যানারে কাজটি করতে চাই। খুব শক্তিশালী গল্প- এরজন্যে আমার আরো সময় দরকার। এটা আমার একটা ড্রিম প্রজেক্ট বলতে পারেন।

যখন শুটিং চলে তখন আপনার কাজের চাপ কেমন থাকে? বা আপনার কাজের ধরন কি?
একেকটি প্রকল্পে একেকরকম ভূমিকা থাকে। প্রথমে একটা গল্প খোঁজা, এরপর একজন পরিচালক খোঁজা, তারপর অর্থলগ্নীকারক খোঁজা। এরপর গল্পটা দাঁড় করিয়ে একটা ক্রিয়েটিভ টিম তৈরি করা। তারপর তৈরি হয়ে গেলে সেটি বিক্রি ও বিপণনের ব্যবস্থা করা। আর ফিজিক্যাল প্রোডাকশন তো আছেই। কাস্টিং, লোকেশন নির্বাচন, টেকনিক্যাল ক্রুদের এককরা- এমন অনেক কাজ করতে হয়। একটা শহর পর্যন্ত তৈরি করি আমরা। যখন ছবিটা শেষ হয়ে যায়, তখন আবার সেটি গুঁড়িয়ে ফেলি। এরপর পোস্ট প্রডাকশনে নিয়ে কাজ করতে হয়। একটা আইডিয়াকে ফিজিক্যালি দাঁড় করাতে যা যা করা লাগে, তার সবটার সঙ্গে আমি জড়িত থাকি।

স্বদেশ, কাভি আলবিদা না কেহনা, কাল হো না হো, দিল্লি ৬- এই বলিউড ছবিগুলোতে আপনার ভূমিকা কি ছিল?
ওরা যখন বলিউড থেকে বিদেশে শ্যুট করতে এল, আমি ওদের লোকাল প্রডিউসার হলাম। সামান্য কিছু অংশে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তবে কাল হো না হো ছবির প্রায় আশি শতাংশ দেশের বাইরে ছিল। এটা ছিল বলিউডের প্রথম ছবি যার পুরো গল্পের পটভূমি আমেরিকা-কেন্দ্রিক। আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে রিয়েল লোকেশনে কাজ করেছি।

বলিউডের অনেক সুপারস্টারের সঙ্গে আপনি কাজ করেছেন। করণ জোহর, শাহরুখ খান, প্রীতি জিনতা, অমিতাভ বচ্চন, ইরফান খানসহ আরো অনেকে। তাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আমি ইংল্যান্ডে ফিল্মের ওপর ডিগ্রি করলাম। তারপর আমি নিউইয়র্কে চলে গেলাম ক্যারিয়ার শুরু করার জন্যে। আমি ভাবি নাই যে ওখানে বসে আমি বলিউড হিন্দি সিনেমা বানাবো। আমি ভাবলাম উডি এলেনের মতো গ্রেট ফিল্মমেকাররা এখানে থাকেন। আমি ভাবলাম, বলিউডে সবচেয়ে বেস্ট ইউনিটের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আসছে, এটা করা উচিত। এরপর আমি শুরুতে কাল হো না হোতে কাজ করলাম। এখন আমি বলি, আইরনিক্যালি বলিউডি আমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কারণ বলিউডে কাজ করার কারণে আমি দ্রুত কাজগুলো শিখতে পেরেছি। দেখা গেল কাজ করতে করতে আমি বলিউডের অ্যাম্বাসেডর হয়ে গেলাম। কারণ আমি যখন শুরু করেছিলাম তখন কেউ বলিউডের কাজ করতে চাইতো না। বলিউডের রেপুটেশন ভালো ছিল না। সময় মতো পয়সা দেয় না, খারাপ ব্যবহার করে, লোকেশন নোংরা করে, জিনিসপত্র ভাঙে- এসব। রেপুটেশন গড়ে তোলার ব্যাপারে আমি ওদের বুঝিয়েছি। সেটিতে কাজ হয়েছে। পরে দেখা গেল অন্যরা বলিউডের কাজ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
আর অভিজ্ঞতা বলতে- রানী মুখার্জী খুবই সুইট ছিল। শাহরুখ খুবই প্রফেশন্যাল। উনি সেটে আসলেই সকলকে মাতিয়ে তোলেন। আর প্রতিদিন সেটের সকলতে থ্যাংক ইউ বলেন।

আপনি সাহিত্য বা শিল্প নিয়ে পড়াশুনা করতে চেয়েছিলেন; সেখান থেকে চলচ্চিত্র-ব্যবসায়ী হলেন কিভাবে?
আমি সবসময় বলি আমি আংশিক ফিল্মমেকার, আংশিক বিজনেস উইম্যান। আর সম্পূর্ণই আর্টিস্ট। আমার আর্ট কলেজে যাওয়ার কথা ছিল, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার কথা ছিল; হঠাত করেই ভাবলাম আমি ফিল্ম নিয়ে পড়াশুনা করব। এই আইডিয়াটা কবে, কিভাবে মাথায় এল বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি প্রচুর ফিল্ম দেখলাম। শুধু টেলিভিশনে না, হলে গিয়েও। ছবি দেখার মুহূর্ত, ছবি দেখতে যাওয়ার মুহূর্ত- সবকিছুই আমার ভীষণ ভালো লাগত। তখন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই ক্রাফ্টা শেখার খুব আগ্রহ ছিল।
এরপর আমি ইংল্যান্ডে একটা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নিলাম। ডিগ্রি শেষ করার পর কি করবো কোনো আইডিয়া ছিল না। ভাবলাম একটা প্রোডাকশন কোম্পানিতে পিয়নগীরি করি। এরপর একটা ছোটখাটো কর্পোরেট ফিল্ম কোম্পানিতে কাজ জুটিয়ে নিলাম। খুব ছোট হওয়াতে দ্রুত কাজগুলো শিখতে পেরেছি। এরপর মনে হলো আমি আমেরিকাতে যাই, এটিই হলো আমাদের লাইনের তীর্থস্থান। আমি নিউইয়র্কে গেলাম। অনেক লোকে জিজ্ঞেস করল, এলএ (লস অ্যাঞ্জেলস)-তে গেলে না কেন? নিউইয়র্ক সাংস্কৃতিকভাবে আমার কাছে উপভোগ্য মনে হচ্ছিল। তাছাড়া আমি চাচ্ছিলাম না একটা ইন্ডাস্ট্রিতে যেতে যেখানে মানুষ খালি ফিল্মই করে, আর কিছু করে না।

ডিলিউড প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা কিভাবে মাথায় এল?
১৯৯৮ সালে নিউইয়র্ক গেলাম। কিছুদিন সেক্রেটারি ওয়ার্ক করলাম। এখানে সেখানে কাজ করে বেড়ালাম। তারপর আমার মনে হলো, আমার নিজস্ব স্থিতিশীল কিছু থাকা উচিত, যেখান থেকে পয়সাও আসবে ভালো। কারণ আমেরিকায় তো আর চাকরির জন্যে আবেদন করা যায় না। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি অমক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করবেন। এরপর ইনটার্ন করতে হবে, লোক জানতে, চিনতে হবে, তারপর চাকরি হবে। আমাদের এখানকার মতোই কে কার মামা-খালু-এসবও দেখা হয়।
কাল হো না হো হিট হওয়ার পর আমার কাছে আরো বলিউড সিনেমা আসতে থাকল। তখন মনে হলো, নিজেদের একটা কোম্পানি থাকলে আরো সার্ভিস অফার করতে পারব। সেই ভাবনা থেকে প্রতিষ্ঠিত হল ডিলিউড। এটার ক্রেডিট দিই আমি আমার বিজনেস পার্টনার Driss Benyaklef-কে। ও মরক্কের মানুষ। আমরা ২০০১ সাল থেকে একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করি।

নাম ডিলিউড কেন?
হলিউড আর বলিউডে কাজ করছিলাম। তাই একটা স্বতন্ত্র নাম দরকার ছিল। আমার ডাকনাম ডলি, আনাদিল থেকে ডিলি। ডিলি থেকে ডিলিউড। আমি এটিকে ফান হিসেবে নিলেও মার্কেটিংয়ে বেশ কাজে লেগেছে। অনেকে মনে করেন এটা আমার নিজস্ব কিংডম! আমাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আমরা মাল্টিকালচারাল বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে গুছিয়ে করতে পারি। কারণ আমরা দুজনই মাল্টিকালচার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি। আমরা দুজনই বিভিন্ন ভাষাও জানি।

ডিলিউড থেকে প্রথম কোন ছবিটা হয়?
স্বদেশ। পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর। আমেরিকায় নাসাতে যে শুটিং হয়েছে সেটি আমাদের করা।
আপনি পুরস্কৃত পরিচালক Doug Liman(Fair Game), Wes Anderson(Darjeeling Limited), Karan Johar(Kal Ho Naa Ho, Kabhie Alvida Naa Kehna), Mira Nair(The Namesake), Ashutosh Gowariker(Swades, What's your Rashee?), Rakeysh Mehra(Delhi 6) এঁদের মতো বিখ্যাত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। ওঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
আমি যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁরা সকলেই কমবেশি পুরস্কৃত। যে ছবিতে কাজ করেছি, সেই ছবিগুলোও কোথাও না কোথাও পুরস্কৃত হয়েছে। আমি ছোটবেলা থেকেই মিরাকে শ্রদ্ধা করতাম। এই জগতে আমরা যারা দক্ষিণ এশিয়ার, তাদের রোল মডেল ছিলেন মিরা। আমি যখন যাদের সঙ্গে কাজ করি, দেখি তাদের নিজস্ব একটা প্রসেস আছে, তাদের কাছ থেকে অনেককিছু শেখার আছে।

১২ দিনে ৪ মহাদেশের ৫ দেশে শুটিং করেছেন। কিভাবে সম্ভব হল?
জাস্টিন বার্থা আর ক্যাথরিন জেটা জোনস-এর ছবিতে ওদের রিলেশন ব্রেকআপ হয়। জাস্টিন বার্থা বিশ্বভ্রমণে বের হন। আমরা আক্ষরিকভাবেই ১২ দিনের মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে হংকং গেলাম, হংকংয়ে আমরা দুইদিন শ্যুট করে বম্বে গেলাম দুদিন শ্যুট করলাম। এরপর আমরা কেনিয়া গেলাম তিনদিন শ্যুট করলাম, এরপর প্যারিস ও তুরস্কে দুদিন করে শ্যুট করলাম। এমন করে পরিকল্পনা করেছিলাম যে, রাতে প্লেনে ভ্রমণপথে ঘুমটা সেরে নিতাম, সকলে নেমে শুটিং সারতাম। ড্রিস আমাদের আগে আগে গিয়ে সব সেটআপ রেডি করে পরের শহরে চলে যেত।

আপনাকে Business Insider হলিউডে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভারতীয়দের তালিকায় রেখেছে। অভিনন্দন আপনাকে। কিন্তু, এখানে তো আপনাকে ভারতীয় হিসেবে ট্রিট করা হলো? অবশ্য তালিকায় একমাত্র বাংলাদেশি আপনি।
আমি আসলে আগে থেকে জানতাম না। ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে কিছু করেনি। আর একটা বিষয় হলো, আমেরিকাতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-ভারত সবাইকে ইন্ডিয়ান ভাবা হয়। তবে পাকিস্তান হলে আলাদা করা হয়।

আপনাকে জিজ্ঞেস করা হলে?
আমি কোনো সময় বলি না যে, আমি ভারতীয়। আমি সবসময় বলি আমি বাংলাদেশি। কারণ আমার আইডেনটিটি নিয়ে আমি খুব পরিষ্কার। আমি যখন ভারতে যাই, আমি স্পষ্ট করে বলি আমি বাংলাদেশি।

আপনি খুব পরিষ্কার বাংলা বলছেন। আমি তো ভেবেছিলাম ইংরেজিতেই ইন্টারভিউটা নিতে হবে!
আমি আট বছর বয়স পর্যন্ত ঢাকাতেই ছিলাম, তারপর ইংল্যান্ডে গিয়ে বাংলা কমিউনিটিতে থেকেছি। আর বাবা এখানে ছিলেন বলে ঢাকাতে প্রায় প্রতি বছর আসা হতো। তবে এমনিতেই আমি ভাষা দ্রুত আত্মস্থ করতে পারি। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দির বাইরেও জার্মান-ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতে পারি।

আদর্শগতভাবে আপনি কি ফেমিনিস্ট?
অবশ্যই। আমার মনে হয়, নারী প্রডিউসার হিসেবে আমি অনেক বাধা টপকে আজকের অবস্থানে এসেছি। আমি যখন কাজ শুরু করি তখন আমার বয়স ত্রিশের নিচে। একে তো নারী তারওপর আবার কমবয়সি এবং বাংলাদেশি- তাই জার্নিটা সহজ ছিল না। এটা ভারতীয়রা শুরুতে সহজভাবে নেয়নি। আমি কায়রো-জর্ডান-আফ্রিকাতে কাজ করেছি, সেখানে নারী অথোরিটি হিসেবে কাজ করা কঠিন। তবে আমি কখনো ভাবিনি যে, আমি একজন মেয়ে বলে এটা করতে পারব না। সমাজ এই বোধটা চাপিয়ে দিয়েছে কিন্তু আমি এক্সেপ্ট করিনি। আমি সবসময় স্ট্রং নারীদের সঙ্গে কাজ করেছি। পরিবারেও আমি স্ট্র ক্যারেক্টরের নারীদের দেখেছি। এগুলো আমাকে আমি হতে সাহায্য করেছে। ফিমেল ক্যারেক্টারকে ঠিকমতো উপস্থাপন না করতে পারার কারণে আমি অনেক ছবি ছেড়ে দিয়েছি। আমি সম্প্রতি যে ছবিটি প্রডিউস করেছি, সেটি হলো সোল্ড, নেপালের সেক্স ট্রাফিকিং নিয়ে।

Patricia McCormick এর লেখা সোল্ড উপন্যাসটি কি? বইটি আমার পড়া। লক্ষ্মী নামের এক নেপালি মেয়েকে ভারতে পাচার করে দেয়া হয়। তারপর এগোতে থাকে গল্প।
এক্সাটলি। এই কাজগুলো আমি আমার দায়িত্ববোধ থেকে করে যেতে চাই।

"Anadil is formidable and sexy,strong yet feminine. I would rely on her intelligence anytime,anyplace-- a gorgeous ANOKHI combination! " মিরা নায়ার বলেছিলেন। তাঁর এই মূল্যায়নে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
(হাসি!) আমি ওর সঙ্গে অনেকবেশি কাজ করেছি। এটা আমার জন্যে একটা পুরস্কার ছিল বটে।

আপনি আপনার জীবনচর্চায় বাঙালিয়ানাকে কতটা ধারণ করতে পারছেন?
আমার মনে হয় বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল অতিথিপরায়ণতা। আর আমি বাইরে সবচেয়ে বেশি পরিচিত অতিথি পরায়ণ হিসেবে। আমার বাসায় সকলে আসে আর আমি রান্না করে খাওয়ায়। কিছুদিন আগে করণ যোহরকে রান্না করে খাওয়ালাম। সঙ্গে ছিল আমার ফুফির বানানো আচার। ও ভীষণ পছন্দ করেছে। আমি সবসময় বলি, আমার বাসায় ইন্ডিয়ান খাবার খেতে কেউ আসবে না। আমি শুধু বাংলাদেশি খাবার খাওয়াবো।