শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / অভয়ারণ্য: প্রাণির প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য মঞ্চ
১১/১৭/২০১৬

অভয়ারণ্য: প্রাণির প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য মঞ্চ

-

কথায় আছে - ‘জীবে প্রেম করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর’। তবে ইদানীংকালের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জীবে প্রেম দূরে থাক উল্টো প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতম আচরণ করতে এতটুকু পিছপা হয় না অনেকেই। বিষয়টি নিয়ে কথা হলো - বাংলাদেশ এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ‘অভয়ারণ্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান রুবাইয়া আহমেদের সঙ্গে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই জলাতঙ্কের দোহাই দিয়ে নির্বিচারে কুকুর নিধন বন্ধ হয়েছে।

শুরুতে জানতে চাইবো অভয়ারণ্য সম্পর্কে। অভয়ারণ্য মূলত কী?

অভয়ারণ্য মূলত একটি প্রাণি-কল্যাণ সংস্থা। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো প্রাণি-কল্যাণ বলতে সব ধরনের প্রাণির কথাই বলছি আমরা। তবে একসঙ্গে সব প্রাণি নিয়ে কাজ করা সম্ভব নয় বলে প্রাথমিকভাবে আমরা এদেশের সবচেয়ে অবহেলিত প্রাণি - কুকুর নিয়ে কাজ করছি। জলাতঙ্কের দোহাই দিয়ে কিছুদিন আগেও নির্বিচারে কুকুর মেরে ফেলা হতো। আমরা ২০১২ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুরদের টিকা দেয়া এবং বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ হাতে নিই। মাঝের দেড় বছর এই প্রকল্প বন্ধ থাকলেও স¤প্রতি তা আবার শুরু করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পশু-পাখির যত বা সুরক্ষায় সচেতনতা নেই বললেই চলে। বরং পশু-পাখি অত্যাচার, হত্যা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার বলা চলে। এমন প্রতিকূল অবস্থায় অভয়ারণ্যের মতো সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তাটা কিভাবে এল? শুরুর দিকে বাধা-বিপত্তিই বা কেমন ছিল?

অর্থনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে প্রাণি-কল্যাণের আসলে কোনো সম্পর্ক নেই। এমনও হতদরিদ্র মানুষদের আমি দেখেছি যারা রাস্তায় কুকুরকে খাবার দিচ্ছেন। আবার অনেক উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যে দেখা যায় প্রাণির প্রতি সহিংস আচরণের অভ্যাস। প্রকৃতপক্ষে প্রাণিরা সমাজেরই অংশ, তাই প্রাণিকল্যাণ বাদ দিয়ে মানুষের কল্যাণও বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়।

বাধা-বিপত্তির কথা বলতে গেলে কিছু মানুষ থাকবেই আপনাকে বাধা দেয়ার জন্য। সবচেয়ে বড় বাধাটা ছিল আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকে ভেবেই পাননা প্রাণি-কল্যাণ নিয়ে কাজ করার দরকারই বা-কী। তবে অনেক আশাব্যঞ্জক দিকও দেখেছি। সিটি কর্পোরেশন কিংবা পলিসি মেকারদের কাছ থেকে যে সাপোর্ট পেয়েছি তা বিবেচনা করলে বাধার চেয়ে সহায়তাই বেশি পেয়েছি বলতে হয়।

কুকুর আমাদের দেশে চরম অবহেলিত প্রাণি বলা চলে। অথচ কুকুরের মতো প্রভুভক্ত প্রাণি দ্বিতীয়টি নেই। এই প্রাণিটিকে এরকম তুচ্ছ গণ্য করার পেছনে কী কারণ রয়েছে বলে মনে করেন?

প্রথম কথা হলো কুকুর বা এ-জাতীয় প্রাণিদের আমরা অনেকেই ভয় পাই। জলাতঙ্ক একটা কারণ অবশ্যই তবে এটা মাথায় রাখতে হবে কুকুর জলাতঙ্কের বাহক হতে পারে তবে কারণ কখনোই নয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে অজ্ঞতা এবং সচেতনতার অভাবও বড় কারণ। এক্ষেত্রে একটা কথা বলতে হয় প্রভুভক্ত কথাটা বলা বোধহয় ঠিক না। প্রাণিকূলে সব প্রাণিই সমান এবং কেউ কারো চেয়ে বড় কিংবা ছোট এমন ভাবাটাও ঠিক না।

অভয়ারণ্যের কথায় আসা যাক। কিছুদিন আগেও জলাতঙ্কের দোহাই দিয়ে প্রায় সময়ই নির্বিচারে বেওয়ারিশ কুকুর-নিধন দেখা যেত। আপনাদের অক্লান্ত চেষ্টায় দেশে প্রথমবারের মতো ‘সিএনভিআর প্রোগ্রাম’ এর মাধ্যমে কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেয়া হয় যার ফলে কুকুর নিধন এখন অনেকটাই কমে এসেছে। এক্ষেত্রে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে অভয়ারণ্যের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।

শুরুর তিন বছর ধরে নিজেদের অর্থায়নেই আমরা প্রকল্পটি চালিয়ে যাই। তবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন গাড়ি এবং ভাড়া দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছে। বর্তমানে হিউম্যান সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল নামক আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাহায্যে কার্যক্রমটি আবারো চালু করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় গত তিন বছরে ঢাকা শহরের ৩৬টি ওয়ার্ডে প্রায় ১০ হাজারের মতো কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা শহরে আবারো জোন-৩-তে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং পরবর্তীতে রাজধানীর অন্যান্য স্থানসহ জেলা শহরগুলোতেও এই কার্যক্রম চালু করা হবে।

আমাদের দেশে এমন অনেক কার্যক্রম রয়েছে, যা প্রাণির প্রতি সহিংস এবং বেআইনি। এই যেমন বহু বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মোরগ, ষাঁড়ের লড়াই আয়োজন করা হত যা বন্ধে পরবর্তীতে হাইকোর্টের রুল জারি করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো প্রাণির প্রতি সহিংস আচরণ কী মূলত সচেতনার অভাবে হচ্ছে? নাকি এ-ধরনের আচরণ যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছে?

এটা শুধু আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে রয়েছে তা নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এই আয়োজন রয়েছে। শুধু অন্য প্রাণির ক্ষেত্রেই না,অনেক সময় দেখা যায় দুটো মানুষ হয়তো রাস্তায় মারামারি করছে এবং একদল তা উপভোগ করছে। সচেতনতার অভাব একটা কারণ হয়তো, কিন্তু এ ধরনের অভ্যাস শুধুমাত্র মানুষের মধ্যেই আছে। আমরা অনেকদিক থেকে নিজেদের অনেক উন্নত মনে করি। তবে আমাদের মধ্যে এমন কিছু অন্ধকার দিক রয়েছে এবং সময় এসেছে চিন্তা করার আসলে আমরা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু উন্নত হয়েছি।

কুকুর হত্যা বন্ধে হাইকোর্ট থেকে রুল জারি করার পর অনেকাংশেই কুকুর-নিধন কমে এসেছে। এক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে কুকুর হত্যা বন্ধে আরো সুনির্দিষ্ট আইন এবং প্রচারণার দরকার আছে বলে মনে করেন কি?

সরকারের পক্ষ থেকে ২০১২ সাল থেকেই কুকুর-নিধন কর্মসূচি একেবারে বন্ধ করা হয়েছে। তবে যেটা বন্ধ হয়নি সেটা হলো কুকুরের উপর অত্যাচার। প্রাণির প্রতি সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হতে আরো সময় লাগবে। আর সুনির্দিষ্ট আইন এখনই রয়েছে এবং তার আধুনিকীকরণের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যাপকভাবে প্রচারণার দরকার।

স¤প্রতি ফেইসবুকে পোস্ট করা ভিডিওতে কুকুর পিটিয়ে মারা ব্যক্তির খোঁজ পেতে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা দিয়েছেন আপনারা, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কী ধরনের সাড়া পেয়েছেন?

প্রচারণা হয়েছে ঠিকই তবে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে তা পৌঁছেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এক্ষেত্রে দেশের সকল গণমাধ্যমের আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন দেখেছি, তবে অনেককেই দেখেছি ঐ ব্যক্তিকে ঠিক একইভাবে শাস্তি দেয়ার কথা বলছেন। এক্ষেত্রে আমাদের মাথায় রাখা উচিত কারো সহিংস আচরণের সমাধান মানে তাকে একই ধরনের শাস্তি দেয়া এমনটা ভাবা নয়। সেজন্য দেশে আইন রয়েছে এবং সেভাবেই শাস্তি হবে। আমরা সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে বিশ্বাস করি।

গত বছর অভয়ারণ্যের ফাইল করা কেসের ভিত্তিতে দেশে প্রথমবারের মতো প্রাণির প্রতি নির্দয় আচরণের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে এ ধরনের অভিযোগ পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে সবসময় পৌঁছায় না। এক্ষেত্রে আইনশৃংখলা বাহিনীর নিজ উদ্যোগ্যে বিশেষ অভিযান কিংবা কমপ্লেইন-বক্স-এর মতো কার্যক্রম হাতে নেয়া উচিত বলে মনে করেন কি?

হ্যাঁ,এ ধরনের কার্যক্রম অবশ্যই শুরু করা উচিত। এই ব্যাপারগুলো নিয়ে প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো - নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে, উদ্যোগী হতে হবে। সবকিছু সরকার কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ছেড়ে না দিয়ে প্রাণির প্রতি সহিংস আচরণ দেখলে তা বন্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের দেশে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে কুকুর-পোষার চল দেখা গেলেও তা মূলত বিদেশি জাতের কুকুরেই সীমাবদ্ধ। দেশিয় বেওয়ারিশ কুকুরগুলো এক্ষেত্রে অবহেলিতই থেকে যায়। ব্যাপারটা কিভাবে দেখবেন?

আপনি কুকুর বা কোনো প্রাণিকে যদি শুধুমাত্র শখের উপকরণ হিসেবে দেখেন তবে কুকুরটা কোন জাতের, দেখতে কেমন এমন প্রশ্ন আসে। কিন্তু যদি 'এমন কেউ যার প্রাণ আছে' এভাবে দেখেন তবে এই বিষয়গুলো অনেক তুচ্ছ মনে হবে। প্রাণের তো কোনো ব্রিড নেই, তাই যারা সত্যিকার অর্থে প্রাণিদের ভালোবাসেন তাদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা নেই।

এবার অভয়ারণ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই। ভবিষ্যতে এই সংগঠন থেকে কী কী কার্যক্রম শুরু করার চিন্তাভাবনা রয়েছে?

এক কথায় বলতে গেলে পরিকল্পনা হলো, ভবিষ্যতে অভয়ারণ্যের মতো সংস্থা থাকার দরকারই যেন না হয়। আমরা যেন নিজেরাই সচেতন হই এবং প্রাণির প্রতি অত্যাচার একেবারেই বন্ধ করি।

আপাতত অভয়ারণ্য মহাখালীতে সরকার প্রদত্ত স্থানে প্রাণি কল্যাণ সেন্টার এবং ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরু করবে।

এমন অনেকেই রয়েছেন যারা পশু-পাখির সুরক্ষায় কাজ করতে চান। এক্ষেত্রে আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উপায় সম্পর্কে বলবেন?

আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আবেদনপত্র বা ইমেলে নিজের বায়োডাটা এবং স্কিলসেট পাঠাতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে এই কাজটা শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে অনেক পরিশ্রমের। এছাড়া যে কেউ যে কোনো স্থানে থেকে পশু-পাখির সুরক্ষার কাজ করতে পারেন। তবে এর জন্য অনেক সময় দিতে হবে, সুনির্দিষ্ট সমস্যা নির্ধারণ করে কাজ করে যেতে হবে।

অভয়ারণ্যের প্রধান সদস্যমন্ডলী এবং সাংগঠনিক অবকাঠামো সম্পর্কে বলবেন কি?

আমি ছাড়া বোর্ড মেম্বারে অন্যান্য সদস্যরা হলেন ড. জগদীশ দত্ত (ভাইস চেয়ারম্যান) ড. আজমল সোবহান, মাহরুখ মহিউদ্দিন (ট্রেজারার), মেহনাজ ফয়সাল, মুসা মোহাম্মদ এবং রাজিমা সেলিম চৌধুরী। এর পাশাপাশি আমার পরিবার বিশেষ করে আমার দুই মামা হুমায়ূন চৌধুরী এবং ইকবাল কাদের চৌধুরীর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মূলত তাদের সহায়তার কারণেই ব্যক্তিগতভাবে আমি এই কাজে মনোনিবেশ করতে পেরেছি।

সবশেষে কুকুরসহ অন্যান্য প্রাণির প্রতি সহিংসতা বন্ধে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কি?

সবার উদ্দেশ্যে বলবো, সময় এসেছে সব ধরনের সহিংস আচরণ বন্ধ করার। আমাদের মধ্যে রাগ-ক্রোধ, ঘৃণা থাকবেই তবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর পাশাপাশি কে কি করল, কার শাস্তি হওয়া উচিত এটা না ভেবে নিজে সঠিকপথে থাকায় গুরুত্বারোপ করতে হবে। তাহলে সহিংসতা প্রাণির প্রতি বলেন, মানুষের প্রতিই বলেন কিংবা গাছের প্রতি, সবকিছুই একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে।

- নাইব মুহাম্মদ রিদোয়ান