বুধবার,২৩ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / আমার মা - আনিসুজ্জামান
১১/১৬/২০১৬

আমার মা - আনিসুজ্জামান

-

তাঁর প্রজ্ঞার আলোয় উদ্ভাসিত বাঙালির মনন। প্রকৃতই বাতিঘর তিনি। সারস্বত সমাজের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত ভারতের কলকাতায়। সম্ভ্রান্ত মুসলিম সুশিক্ষিত পরিবারে তিনি বর্ধিত, বিকশিত হয়েছেন। পিতা ডা. এটিএম মোয়াজ্জেম (১৮৯৭-১৯৭৫)। মায়ের নাম সৈয়দা খাতুন। জন্ম আনুমানিক ১৯১২ সাল, মৃত্যু ১৯৬৫ সালে। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের পিতামহ শেখ আবদুর রহিম বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় রচনা করেছিলেন মহানবী হযরত মুহম্মদের (স.) জীবনীগ্রন্থ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গবেষণা করেছেন শিকাগো ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। যুক্ত ছিলেন জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্পে। দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভিজিটিং ফেলো ছিলেন প্যারিস, নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পালন করেছেন বিশ্বভারতীর ভিজিটিং প্রফেসরের দায়িত্ব।

মৌলিক, গবেষণা সম্পাদনা মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ শতাধিক। সাহিত্য ও সমাজ সম্পর্কিত তাঁর প্রণীত ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা, কলকাতা, লন্ডন ও টোকিও থেকে। কৃতি, মেধা ও অনলস সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অজস্র সম্মাননা পুরস্কার ও সংবর্ধনা। মিতবাক, স্থিতধী, আলোকিত এই বিদ্বজ্জন পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী বসু পদক, এশিয়াটিক সোসাইটির পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদাসাগর স্মারক ফলক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মশতবার্ষিক স্মারক ফলক এবং রবীন্দ্রভারতী ও নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদালয়ের সাম্মানিক ডিলিট। ভূষিত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে, স্বাধীনতা পুরস্কারে। ২০১৫ সালে অর্জন করেছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণ। তিনিই প্রথম এবং এখনো পর্যন্ত একমাত্র বাংলাদেশী নাগরিক, যিনি এই সম্মাননায় বৃত হয়েছেন।

অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের বড় তিন বোন। ছোট এক ভাই। তাঁর স্ত্রীর নাম বেবী। দুই কন্যার নাম রুচি ও শুচি। পুত্রের নাম আনন্দ।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। বর্তমানে পালন করছেন বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব। যুক্ত রয়েছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের সঙ্গে, সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে। তাঁর প্রণীত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: রবীন্দ্রনাথ, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, কাল নিরবধি, পুরোনো বাংলা গদ্য, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, স্বরূপের সন্ধানে, মুনীর চৌধুরী, চেনা মানুষের মুখ, বিদ্যাসাগর-রচনাসংগ্রহ, দীনবন্ধু রচনাসংগ্রহ, মুনীর চৌধুরী রচনাবলী, নজরুল রচনাবলী (যৌথ), এবিএম মূসা স্মারকগ্রন্থ (যৌথ) ইতাদি। অনূদিত নাটক- আদর্শ স্বামী, পুরনো পালা।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের ব্যক্তিত্ব আপনার জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন?
উত্তর: আমার মায়ের বিশেষ গুণ ছিল সত্যপ্রিয়তা। নিজের জীবনের দুঃখকষ্টের দিনগুলির কথা সে অকপটেই আমাদের বলত। আমরা যাতে সত্য বলি, অন্যায় করলেও যেন তা স্বীকার করি, তা সে সবসময়েই চাইত। এর কিছু প্রভাব, মনে হয় যে আমার জীবনেও পড়েছে।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে যে অবস্থানে রয়েছেন, সেক্ষেত্রে আপনার মায়ের অনুপ্রেরণা ও অবদান কতখানি? আপনার অর্জিত সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা কেমন?
উত্তর: মাকে বিরক্ত করছিলাম বলে, সে আব্বার কম্পাউন্ডারকে ডেকে আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিতে বলেছিল। সেটা হয়তো ঠান্ডা মাথায় করা হয়নি, কিন্তু আমার জীবনের পড়াশোনার প্রাথমিকপর্ব কেটেছিল মায়েরই ত্বত্তাবধানে। আরেকটা কথা, আমার মা-আব্বা দু’জনেই আমাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাতে নিজের পথ বেছে নেওয়া আমার পক্ষে সহজ হয়। মা বিশেষ করে অনুপ্রেরণা দিয়েছে আমি যেন নিজের পছন্দমতো কাজ করতে পারি, সে-বিষয়ে।

প্রশ্ন: মাকে আপনি কখনো মিস করেন?
উত্তর: সবাই করে, আমিও করি। মায়ের সঙ্গেই আমার বন্ধন বেশি ছিল।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের রান্নার কথা বলুন। তাঁর করা কোন্ কোন্ রান্না আপনার বিশেষ পছন্দের, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?
উত্তর: সকলেই প্রথম যে-রান্না খায়, তা মায়ের হাতের। তাই সবারই মনে হয়, তার মায়ের রান্নার মতো আর হয় না। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। মায়ের অনেক রান্না, বিশেষত ডিমের হালুয়া আমার খুব প্রিয় ছিল।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের কোন্ কোন্ গুণ আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে?
উত্তর: তার সত্যপ্রিয়তার কথা আগে বলেছি, তাছাড়া সে সমাজসচেতনও ছিল।

প্রশ্ন: মাকে নিয়ে কোনো মর্মস্পর্শী বা অত্যন্ত আনন্দঘন কোনো ঘটনা থাকলে বলুন।
উত্তর: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে একদিন বাড়ি ফিরে এসে টের পেলাম, মায়ের কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে গেছে। খবরের কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া ছিল মায়ের অভ্যাস-দেখলাম, কাগজ পড়তে পারছে না। ডাক্তার ডাকা হলো। তিনি মনে করলেন, রাতে তার স্ট্রোক হয়ে গেছে। মায়ের স্বাভাবিক জীবন আর ফিরে আসেনি। এর কিছুকাল পরে আমি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাই। সেখানে থাকতেই জানতে পারি, মা আর নেই।

প্রশ্ন: মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবার ব্যাপারে আপনার কোনো ধরনের উদ্যোগ আছে কি? যদি থেকে থাকে, তাহলে পাঠকবৃন্দের সঙ্গে সেটা শেয়ার করার জন্যে অনুরোধ জানাই।
উত্তর: না, কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিইনি, নেওয়ার ইচ্ছেও নেই। তার স্মৃতি আমার একান্ত ব্যক্তিগত- তা ব্যক্তিগতই থাকুক।

প্রশ্ন: আপনার এবং ভাই-বোনদের জন্যে মায়ের ত্যাগতিতিক্ষার কোনো স্মরণীয় ঘটনা আছে কি?
উত্তর: আলাদা করে বলার কিছু নেই।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের দেওয়া কোনো বিশেষ পরামর্শ বা টিপসের কথা কী মনে পড়ে? তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য উক্তি কী আপনাকে তাড়িয়ে ফেরে?
উত্তর: না, তেমন নয়।

প্রশ্ন: সন্তানের জন্যে মায়ের যে সামগ্রিক শ্রম, সাধনা এবং ত্যাগ, সেসবের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা আজকাল দেখি না। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কী, দয়া করে বলবেন?
উত্তর: সময় বদলেছে, ছেলেমেয়ে মানুষ করার বাপারেও ধ্যানধারণার বদল হয়েছে। তাছাড়া, এখন জীবনে ব্যস্ততা বেড়েছে, মায়েরা অনেকেই কর্মজীবী। যারা সার্বক্ষণিক গৃহিণী, তারাও নানা দায়িত্ব পালন করে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মায়েদের কমেনি, আচরণের ধরনটা হয়তো পাল্টেছে।

সাক্ষাৎকার: হাসান হাফিজ