শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / আমাদের কাদম্বিনী জাগবে কবে?
১১/১৪/২০১৬

আমাদের কাদম্বিনী জাগবে কবে?

-

সকাল সকাল ফেইসবুকে ঢুকতেই তরতাজা মন ও মেজাজ একসঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো। যথারীতি প্রাসঙ্গিক বিষয় নারী, যে বিষয়ের ওপর লেখালেখি চোখের সামনে এসে গেলে আমি তা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়ি এবং দুঃখের বিষয় হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেসব লেখা পড়ে আমার ভেতরে নেতিবাচক অনুভূতির জন্ম হয়।

পেশায় চিকিৎসক এক আপু লিখেছিলেন, তার বাসার কাজে সাহায্যকারী ভদ্রনারীটি বেশ কয়েক মাস ধরে ভ্যাজাইনাল ক্যান্ডিডিয়াসিস রোগে আক্রান্ত। নির্ধারিত ঔষধের পাশাপাশি তিনি তাকে অন্তত একমাস সহবাস করতে নিষেধ করে দেন। কিন্তু ভদ্রমহিলার স্বামী তাকে সেই সময়টুকু দিতে রাজি নয়। উত্তেজনা নিবৃত্তির জন্য রোগাক্রান্ত স্ত্রীকে জোর করে হলেও তার বিছানায় চাই! ফলাফল তার স্ত্রী কোনোভাবেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন না এবং এভাবেই কাজ করে যেতে হচ্ছে তাকে।

নিম্নবিত্ত অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত পরিবারে নারীর এহেন দুরাবস্থার কথা শুনে আমার প্রতিবেশি এক ভাবীর কথা মনে পড়ে গেল। পেশায় তিনি এবং তার বর দুজনেই ব্যাংকার। হরমোনাল সমস্যা থাকায় দ্বিতীয়বার সন্তান ধারণে চিকিৎসকেরা সেই ভাবীকে একটি সময়সীমা বেঁধে দেন, যার আগে কিছুতেই তাদের সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করা নিষেধ ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা মানেননি তার স্বামী, নিজের অনিচ্ছাসত্তেও স্বামীর সাথে তাকে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়েছে। যার কারণে তিনি সন্তান ধারণ করলেও সেই সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে পারেননি। তিনি নিজেও প্রচণ্ড সাস্থ্য ঝুঁকিতে ছিলেন।

নারীবিষয়ক একটি অনলাইন পেইজের সাথে সম্পৃক্ততা থাকার কারণে নারীর গল্প আমার রোজ শুনতে পারার সুযোগ হয়। সেখান থেকেই প্রাসঙ্গিক আরো একটি ঘটনার কথা বলি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক মেয়ের সাথে বিয়ে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্কমরত তারই ভালোবাসার মানুষের। বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্কসহ অন্যান্য বিষয়ে নিজেদের পছন্দ অপছন্দের জায়গাগুলো তারা একে অন্যকে জানিয়ে দেয়। মেয়েটি জানায়, সে কোনোভাবেই পায়ুপথে সম্পর্ক স্থাপন করাকে গ্রহণ করতে পারবে না; শারীরিকভাবে না, মানসিকভাবেও নয়। বিয়ের আগের প্রতিশ্রুতি বিয়ের প্রথম রাতেই ভেঙে ফেলে ছেলেটি। তার ‘ছোটখাট’ চাহিদা পূরণের জন্য একটু ছাড় তো মেয়েটিকে দিতেই হবে, এজন্যই তো সে বিয়ে করেছে তাকে।

এইরকম অনেক অনেক নারীর গল্প চারপাশে পড়ে আছে। সেই গল্পেরা বদ্ধ ঘরে যখন চোখের জল ফেলে, তখন আমি পুরুষদের ধুয়ে দেই, তাদের ব্যঙ্গ করে অনলাইনে লিখি, সেই লেখা পড়ে কিছু পুরুষ কথা দেয় যে তারা তাদের জীবনে নারীর সাথে এমন নগণ্য আচরণ করবে না। কিছু নারী এই লেখা পড়ে আহা-উহু করে। কিন্তু কিছুদিন পরে আবার এরাই চুপিচুপি গোপনে আমার কাছে কাঁদে। ভালোবাসার কাছে এদের অসহায়ত্বের কথা জানায়। এই পুরুষেরাই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। এই একই গল্পেরা আবারো জল ফেলতে থাকে।

কেন-ই বা ফেলবে না? যে মেয়েটা তার চাচার মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হয়, সেই মেয়ের পরিবার তো সবকিছু জানার পরেও তার সাথে পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করে না। যে মায়ের ছোট মেয়ে সোফার পেছনে কাজের ছেলের দ্বারা যৌনহয়রানির শিকার হয়, সেই মা তো ছেলেটির গরিব পরিবারকে বছরের পর বছর ধরে সাহায্য করে যাওয়ার অভ্যাস বন্ধ করতে পারে না। যে ডাক্তার মেয়েটি তার ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর হাতে সন্তানের সামনেই মার খায়, সে তো রাতের বিছানায় নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার সাথে সহবাস করাটাকে ‘না’ বলতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথের ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিলো সে মরে নাই’, আর আমাদের কাদম্বিনীরা বেঁচে থেকে প্রমাণ করে যে আসলে তারা বেঁচে নেই। কারণ তাদের কণ্ঠ নির্বাক, তারা অন্যায়কে অন্যায় বলতে জানে না। সুতরাং মানসিকভাবে যে পরগাছা হয়ে থাকতে চায় তাকে দু’চার শব্দে স্বাধীনতা এনে দেবার আমি কে? যে শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নারীকে আত্মপ্রত্যয়ী করে না, আত্মসম্মানবোধের জন্ম দেয় না, সেই শিক্ষার সাথে অশিক্ষার এবং সেই অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে বেকারত্বের তফাৎ কী? মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে বেগম রোকেয়ার ‘জাগো গো ভগিনী’ পড়িয়ে কতটুকু লাভ হয় যদি না এই ভগিনীরা নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তন চায়?

হ্যাঁ, আমি বলতেই পারি, মেয়েদেরকে সেক্সুয়ালি অব্জিক্টিফায়েড করার জন্য আজকের মিডিয়া দায়ী, পর্ন দায়ী, পর্ন দেখায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠা ছেলেরা দায়ী। আমি জার্নাল অব সেক্স রিসার্চের ২০১১ সালের ইস্যুতে প্রকাশিত পিটারসেনের গবেষণার ফলাফল টেনে বলতে পারি, পুরুষরা নারীদের চেয়ে শারীরিক চাহিদার কথা দিনে দ্বিগুণ বেশি চিন্তা করে। আমি আমার স্নাতকের পড়াশোনার ভিত্তিতেই বলতে পারি, এপিনেফ্রিন, নরএপিনেফ্রিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের কথা, ফ্রন্টাল এবং প্যারাইটাল লোবের কথা যার কারণে পর্নো দেখানো আচরণগুলো করা ছাড়া একজন পর্নো আসক্ত পুরুষ তার সঙ্গীর প্রতি আকৃষ্ট হয় না।

বৈজ্ঞানিক অনেক যুক্তি দিয়ে এই অসুস্থ আচরণকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী নিজে যদি বিচার না চায় তাহলে কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে দাঁড়াবে কে? প্রেম, ভালোবাসার বাইরেও মানুষের যে অস্তিত্ব আছে শ্রদ্ধা আর সম্মানের, সেই অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার দায়িত্ব শুধু পুরুষদের নয়। এই অস্তিত্ব গ্রহণের মানসিকতা যদি নারীদের না থাকে, তাহলে সে আজীবন নারীই থেকে যাবে, মানুষ হয়ে উঠতে তার এখনো অনেক দেরি।

একটা জিনিস আমি বরাবর বিশ্বাস করি। করুণা মানুষের জন্য নয়। তাই নারী যদি মানুষ হয়ে ওঠার পরিচয়ে শ্রদ্ধা, আত্মমর্যাদা, সম্মানের জায়গাকে ছেড়ে দিয়ে কেবল ত্যাগ, তিতিক্ষা, উদারতা, অন্ধ প্রেমকে স্থান দেয়, তাহলে তাকে বাধ্য হয়েই করুণা ছাড়া আর কিছু দেবার থাকে না।

একজন নারী তার নাড়ি ছিঁড়ে যে সন্তান প্রসব করে, সেই সন্তান পুরুষ আর নারীর পরিচয়ের বাইরে তখনই মানুষ হয়ে উঠবে যখন সেই মা নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রমাণ করার যোগ্যতা রাখবেন। আগে সত্যিই বিশ্বাস করতাম, শিক্ষিত মা শিক্ষিত জাতির জন্ম দেয়। কিন্তু নারীর গল্পগুলো এখন আমায় ভাবায়। কারণ শিক্ষা মানে শুধু কাগজের কিছু সার্টিফিকেট তো নয়। মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে পারার সাহসটাও বটে। আর তাই এখন আমার মনে হয়, সুশিক্ষিত, আত্মমর্যাদাশীল মা-ই সুসন্তানের জন্ম দেয়; যে সন্তান পুরুষ হয়েও নারীদেরকে কেবল সেক্স অবজেক্ট হিসেবে দেখে না, যে সন্তান নারী হয়েও নিজের ক্ষতি মেনে নিয়ে চুপচাপ নিজেকে সমর্পণ করে যায় না।

১৮৫৩ সালে ‘Twelve Years A Slave’-এর লেখক সলোমন নর্থাপ চিৎকার করে বিশ্ববাসীকে বলেছিলেন, টাকা দিয়ে মানুষ কেনা যায় না। তার সেই চিৎকারে মানুষ হয়ে উঠতে চাওয়া দাসদের অনেকে গলা মিলিয়েছিল। আমাদের বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে অনেক নারীবাদীরা চিৎকার করেছেন, করে যাচ্ছেন। কিন্তু গলা মেলানোর সঙ্গীরা কোথায়? মানসিক দাসত্বের বংশরক্ষায় ব্যস্ত কি?

- কানিজ ফাতেমা ছন্দা