বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / পুরুষ
১১/১৪/২০১৬

পুরুষ

- স্বকৃত নোমান

ঠিক আঠারো বছর বয়সে মাদল বাড়ি ছাড়ে কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। বাড়ি সে আরো আগেই ছাড়ে, আট বছর বয়সে। সত্যতা প্রমাণের জন্য তার বুড়ো মাকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে স্মৃতি হাতড়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলবে, ‘মাদল ত পেডেত্তুন পড়িয়ারেই নিরুদ্দিশ অই গেলগই।’

মায়ের সঙ্গে নাড়ির যোগ কোনো কালেই ছিল না মাদলের। সন্তান জন্মদানে অনাগ্রহী মা তাকে তার বাবার চাপে পড়ে কষ্ট করে জন্ম দিয়েছে, দুটি বছর দয়া করে বুকের দুধ খেতে দিয়েছে, পরবর্তী ছ বছর খোয়াড়ের হাঁস-মুরগির মতো তাকেও দেখেশুনে রেখেছে, তারপর ধীরে ধীরে সে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।

প্রত্যেক কার্যেরই কারণ থাকে। মাদল যে তার মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে গেল তার পেছনেও কারণ আছে। মাদলের ভাইবোন মিলে একটা ক্রিকেট টিম। ফুটবল টিমও বলা যেতে পারে। প্রথমে দুই বোন, তারপর মাদল, তারপর বাকিরা। মাদলের জন্মের পর একটা বছর বিরতি ছিল মাত্র, তারপর বিরতিহীনভাবে নয় বছরে গুনে গুনে নয়জন। টিমটা সামাল দিতেই প্রৌঢ়ত্বের দখলে চলে যায় মাদলের মায়ের যৌবন।

মাদলের বাবা ছিল এতিমখানার বাবুর্চি। বাড়ি থেকে প্রায় চৌদ্দ মাইল দূরে এতিমখানা। খাওয়া-থাকা সেখানেই। মাসের শুরুতে মুসাফিরের মতো একবার বাড়ি আসত, বউয়ের হাতে কিছু টাকাপয়সা ধরিয়ে দিয়ে আবার চলে যেত। সারা মাস সে ডুমুরের ফুল। ছেলে বলেই হয়ত মাদলকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিল তার বাবা, ঠিক আট বছর বয়সে। বাবার মতো মাদল এতিমখানাতেই থাকত, এতিমদের সঙ্গেই খেত এবং বিছানা ভেজাত। প্রথম প্রথম মাসের শুরুতে একবার বাবার সঙ্গে বাড়ি আসত, বাবার সঙ্গেই আবার ফিরে যেত। বছরখানেক মাসে একবার করে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকল, পরবর্তী বছর থেকে বাড়ি যেত শুধু দু-ঈদে দু-বার।

পরবর্তীকালে বাবার রেখে যাওয়া একটা লাল টালি খাতায় তার জন্মতারিখ আবিষ্কার করে জানতে পারে, বাবাকে যেদিন কবরে শোয়াল তার কয়েকদিন আগেই তার বয়স সতের পূর্ণ হয়েছিল। বাবার কুলখানি হয়ে যাওয়ার পর মাদলের বগলের নিচে দুটি পাখা গজাল। চারপাশে তাকিয়ে সে অনুভব করল, না, তাকে কেউ বেঁধে রাখেনি, সে মুক্ত। বসন্তকালে গাছে গাছে মধুর সুরে ডাকতে থাকা পাখিদের মতো মুক্ত। একদিন গজিয়ে ওঠা অদৃশ্য ডানা দুটোয় সওয়ার হয়ে সে উড়াল দেয়। এক উড়ালে রাজধানী ঢাকায়। পরে আর কোনোদিন বাড়ি ফেরেনি।

সুতরাং সঠিক হিসাবে মাদল আসলে আট বছর বয়সেই বাড়ি ছাড়ে। তারপর থেকেই মায়ের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এতিমখানা থেকে মাসে বা বছরে বাড়ি গেলেও মায়ের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা হতো না। অন্য ভাইবোনদের নিয়ে ব্যস্ত থাকত তার মা। সে খেল কি খেল না তা নিয়েও খুব একটা মাথা ঘামাত না। তার অসুখ-বিসুখ হলেও মাকে খুব একটা উদ্বিগ্ন দেখা যেত না। বুঝে হোক কিংবা না বুঝে, মায়ের আদর-¯েœহ আশাও করত না সে। ভাবত, মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক বুঝি এমনই, তার সঙ্গে তার মায়ের যেমন। যতদিন বাড়ি থাকত দড়িছাড়া আবালের মতো মাঠে-ঘাটে টোঁ-টোঁ করে ঘুরে বেড়াত, সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে বড়বোন সালেহা অথবা খোদেজার বেড়ে দেওয়া একথালা ভাত খেয়ে ঘরের সামনের কামরায় ঘুমিয়ে পড়ত। মায়ের সঙ্গে দেখা হতো খুবই কম।

শুধু মায়ের সঙ্গে নয়, দূরত্বটা তৈরি হতে থাকে তার ভাইবোনদের সঙ্গেও। কে জানে কেন, কখনোই তাদের আপনজন বলে মনে হতো না তার। এতিমখানায় থাকার সময়, যখন তার বয়স প্রায় তের, বড় দু-বোনের ছোটটি, খোদেজা, ময়মনসিংহের এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেলে তার জন্য এতটুকুও তার খারাপ লাগেনি। একটা মেয়ে কেন একটা ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায় তার কারণ তখনো তার বুঝে আসেনি। ধারণা, বাড়ির জিনিসপত্র ছুরি করেই বুঝি পালিয়ে গেছে তার বোন। তাই মনে মনে বোনকে খুব গালি দিয়েছিল―এত বড় নিমকহারাম! মেয়ে হয়ে বাবার ঘর ছুরি করল!

দেখতে খুব সুন্দরী ছিল তার বোনটি। লম্বা-চওড়ায় চেহারা-সুরতে রঙে-ঢঙে একেবারে গ্রামবাছা। অগ্নিঝরা রূপের কারণেই গ্রামের তরুণ ছেলেপিলেরা তাদের বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করত, বড় হয়ে মাদল বুঝতে পারে। আরো বুঝতে পারে, খোদেজার এই রূপ দেখেই ময়মনসিংহের ছেলেটা শ্বশুরের দারিদ্র্যের কথা চিন্তা না করে পছন্দের পাত্রীকে নিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায়।

সেই যে গেল, আর কোনোদিন ফিরল না খোদেজা। বাবার মরা মুখটি দেখতেও না। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিল কিনা কে জানে। না পাওয়ারই কথা। কোথায় ময়মনসিংহ আর কোথায় সীতাকুÐ! শত শত মাইলের দূরত্ব। পরিবারের কারো সঙ্গে খোদেজার যোগাযোগ নেই, সবাই তার কথা বলতে গেলে ভুলেই গেছে। মায়েরও খুব একটা মনে পড়ে না। মাদলেরও না। তবে কণ্ঠস্বর ভুলে গেলেও বোনের চেহারাটা কিন্তু তার বেশ মনে আছে। নাকের বাঁ-দিকে একটা কালো আঁছিল, ভরাট দুই চোখ, নিচের পাটিতে একটা গেজদাঁত। মাঝেমধ্যে চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন কিছুক্ষণের জন্য চুপ মেরে যায়। বোনের জন্য হয়ত ভেতরটা কাঁদে।

তা বাড়ি থেকে উড়ে আসার প্রায় সাত বছর পর যে মেয়েটি মাদলের সঙ্গিনী হয় তার বাড়ি যদি সীতাকুÐ বা চট্টগ্রামের কোথাও হতো, পরিবারের সঙ্গে মাদলের যোগাযোগের একটা সম্ভাবনা তৈরি হতো। সঙ্গিনীর বাড়ি গাজীপুরে হওয়ায় সেই সম্ভাবনা মাঠে মারা গেল। মাদলের স্বপ্ন ছিল সে আবারও উড়াল দেবে। বউকে ছেড়ে হলেও। এশিয়া-আফ্রিকা পেরিয়ে থিতু হবে আমেরিকায়, পৃথিবী যেখানে বেহেশত, যেখানে খোদা তার আরশ নামিয়ে দিয়েছেন, দিব্যমানব যেখানে তার শক্তি আর স্বপ্নের জীবন নিয়ে বসবাস করছে। কিন্তু সঙ্গিনীর পেট থেকে ফুটফুটে ছেলেটা, যে দেখতে প্রায় তার মতোই, বেরুনোর পর তার অদৃশ্য ডানাটা খসে যায়। মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে সে আর উড়াল দিতে পারল না, চিরকালের জন্য সংসারে থিতু হয়ে গেল। একটা সময় উড়াল দেওয়ার কথাও ভুলে গেল। অফিস, বাসা, বউ-বেটা, বন্ধুবান্ধবÑএই নিয়ে তার জগৎ। এই জগৎটা তৈরি করতে শরীর থেকে কত মণ ঘাম ঝরিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। অন্তঃনগর এক্সপ্রেসে চড়ে ঢাকায় এসে প্রথমে তো থাকার মতো কোনো জায়গাই পায়নি। কদিন কমলাপুর রেল ইস্টিশনের প্লাটফর্মে কাটিয়েছে। বাড়ি থেকে উড়াল দেওয়ার সময় কাঠের সিন্দুক থেকে চুরি করে আনা মায়ের কি বোনের রূপার কানের দুল দুটি বেচে যে কয় টাকা পেয়েছিল তা দিয়ে একবেলা ভাত, দু-বেলা কলা-পাউরুটি অথবা চা-বিস্কিট খেয়ে খিদা মিটিয়েছে। টাকায় টান পড়লে পরে মালিবাগের একটা গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছে। কিন্তু বেশিদিন করা লাগেনি ষোল ঘণ্টার অমানবিক শ্রমের চাকরিটা। বাবার ইচ্ছায় অল্প বয়সেই উপজেলা সদরের এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে টাইপ রাইটিংটা শিখে নিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতার জোরে তিন মাসের মাথায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে টাইপিস্টের চাকরি নিয়ে গার্মেন্টস ছাড়ল।

দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সে এখন একই কোম্পানির গ্রাফিক্স ইনচার্জ, তার অধীনে সতেরজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার কাজ করে। বেতন বলা চলে ভালোই। ষোল হাজার টাকা বাসা ভাড়া, বিশ হাজার টাকা সংসার খরচ এবং দশ হাজার টাকা তার ব্যক্তিগত খরচ বাদ দিয়ে ডিপোজিটে জমা করার জন্য আরো দশ হাজার টাকা থেকে যায়। বন্ধুবান্ধবও জুটিয়েছে বেশ। এক বন্ধু একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিকের স্পেশাল করসপেন্ডেট, অন্যজন একটি নারীউন্নয়ন সংস্থার ডিরেক্টর, আরেকজন হাইকোর্টের উকিল। এছাড়াও তার বেশ কজন বন্ধু রয়েছে, যাদেরকে মোটামুটি মধ্যবিত্তই বলা চলে। অফিসের কাছেই, মুগদায়, দুই রুমের টাইলসকরা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সপরিবারে থাকে। দু-তিন মাসে একবার বউ বাপের বাড়ি বেড়াতে যায়। তখন তাকে একা থাকতে হয়। কোনো বেলা হোটেলে আর কোনো বেলা বাসায় নিজে রান্না করে চালিয়ে নেয়।

দুই.
ঘটনাটি তমালের বাড়িছাড়ার প্রায় সতের বছর পরের, যখন তার বউ বাপের বাড়ি বেড়াতে যায় এবং সে বাসায় একা। তিনদিন পরেই কোরবানির ঈদ। অফিসপাড়া ফাঁকা, স্টেশনে স্টেশনে নাড়ির টানে বাড়িফেরা মানুষের ভিড়। তমালের তো নাড়ি নেই, তাই নাড়ির টানও নেই। বাড়ির কারো সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সবার ছোট ভাইটি তার ফোন নম্বরটি জানে, মাঝেমধ্যে সে ফোন করে খবরাখবর নেয়। সে ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে তার কথা হয় না। কয়েক বছর আগে একবার ফোনটি মায়ের কানে ধরিয়ে দিয়েছিল ছোট ভাই। তমাল ভেবেছিল মা বুঝি তার গলা শুনে কেঁদে উঠবে। কিন্তু না, মায়ের কণ্ঠ নির্বিকার। ‘কেমন আছ মা?’―জানতে চাইল সে। ‘আছি’―মায়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর। ‘তুই কেমন আছিসরে বাপ?’―পাল্টা জানতে চাইল না মা।

ব্যাস, এটুকুই। কথা আর এগিয়ে নিতে পারেনি তমাল। জন্মের পর থেকে তার প্রতি মায়ের অবহেলা, এখনো সেই অবহেলার মধ্যেই আছে। খুব রাগ হলো তার। তারপর আর কোনোদিন একটিবার ফোন করে মায়ের খবর জানতে চায়নি। মা-ও না। কারো খোঁজ নিতে ইচ্ছেও করে না তমালের। বাড়ি বলতে সে যা বোঝে তার কাছে তা এক ধরনের বিভীষিকা। মায়ের অবহেলা, আঁতুড়ঘরে নবজাতকের কান্না, এগারোটা ভাইবোন, কাঁথা-বালিশে পায়খানা-পেশাব, সীমাহীন দারিদ্র, খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি, একটা ছেঁড়া প্যান্ট, বোনের পালিয়ে যাওয়া, চার আনা দামের একটা চকলেটের জন্য হাহাকার করতে থাকা মন―বাড়ি বলতে সে এগুলোকেই বোঝে। তাই বাড়ির কথা মনে ঠাঁই দেয় না। বাড়িকে সে ভুলে থাকতে চায়, চিরতরে ভুলে যেতে চায়।

ঈদের এক সপ্তাহ আগেই তমালের বউ বাপের বাড়ি চলে গেল। তমাল যাবে ঈদের আগের দিন, মন না চাইলে ঈদের দিন অথবা তার পরের দিন। শ্বশুরবাড়ি বেড়ানোয় তার বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। যায় খুবই কম। বছরে একবার গেলেও দুদিনের বেশি থাকে না।

সেদিন সন্ধ্যায় এক বন্ধুর অফিসে মদের আসর। দুপুরে ফোন করে বন্ধুটি ইনভাইট করেছে। যাবে, সিদ্ধান্ত নিল সে। বন্ধুর সঙ্গে কথা শেষ করে মোবাইলটি টেবিলে রাখার পর আবার বেজে উঠল।

: হ্যালো।
: হ্যালো। এক নারীর কণ্ঠস্বর।
: হ্যাঁ, বলুন।
: কিছু মনে করবেন না, আমি আপনার নম্বরটি পেপারে পেয়েছি, এক মিনিট কথা বলতে চাই আপনার সাথে।
তমাল খানিকটা অবাক হয়। তার মোবাইল নম্বর কখনো পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সে মনে করতে পারে না। চুপ করে থাকে কয়েক মুহূর্ত। হঠাৎ মনে পড়ল, বছরখানেক আগে একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে তার অফিসের জন্য দুজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার চেয়ে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়েছিল। যোগাযোগের জন্য বিজ্ঞপ্তিটিতে অফিসের ল্যান্ডফোন নম্বরের পাশাপাশি তার মোবাইল নম্বরটিও দেওয়া ছিল।
: নম্বরটি কোথায় পেয়েছেন বললেন?
: পুরনো একটা পত্রিকায়।
: ম্যাগাজিনে?
: জি। দয়া করে আপনি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?
: বলুন কী করতে পারি।

অচেনা নারীটি যা বলল তার সার-সংক্ষেপ এই, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ে তার স্বামীর অফিস সহকারীর চাকরি। বাসা মীরপুর আনসার ক্যাম্প সরকারি কলোনিতে। গত চার বছর ধরে সংসারের প্রতি কোনো খেয়াল নেই স্বামীর। সরকারি স্কুলে ছেলেটা ক্লাস এইটে পড়ছে আর মেয়েটা থ্রিতে। তিন রুমের ফ্ল্যাটের এক রুম সাবলেট ভাড়া দিয়ে যা পায় তা দিয়ে টেনেখিঁচে কোনোরকমে সংসারটা চালিয়ে নিচ্ছে বেচারি। স্বামী নিশ্চয়ই আরেকটা বিয়ে করেছে, তার ধারণা; যদিও স্বীকার করে না তার স্বামী। প্রথম দিকে যখন বাসায় আসা কমিয়ে দেয় একদিন সে এর কারণ জানতে চাইলে উত্তরে স্বামী জানায়, অফিসে কাজের প্রচুর চাপ। মীরপুর থেকে রোজ রোজ অফিসে যেতে-আসতে চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়, তাই অফিসের কাছে সে একটা মেসে উঠেছে।

সত্যি-মিথ্যা কিছু জানে না বউ, তাই কথা আর বাড়ায়নি। বাসায় না এলেও তখনো মাসে দশ হাজার করে সংসার-খরচের টাকা দিত। ধীরে ধীরে টাকার অঙ্ক কমতে থাকে। দশ থেকে আটে নামে, আট থেকে পাঁচে, পাঁচ থেকে দুইয়ে। পরে মাসের হিসাব বন্ধ করে দিয়ে দু-তিন মাস অন্তর অন্তর দু-তিন হাজার টাকা করে দিতে লাগল। বর্তমানে তাও দিচ্ছে না। আগে তো মাসে একবার হলেও বাসায় আসত, এখন বছরেও একবার আসে না। স্ত্রীর ধারণাটা এবার বদ্ধমূল হলো, স্বামী নিশ্চয়ই আরেকটা বিয়ে করেছে। কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রমাণের অভাবে জোর দিয়ে কিছু বলতেও পারে না।
মাদল বলল, কিন্তু এটা তো আপনাদের সাংসারিক ব্যাপার, আমি কী করব?

নারীটি বলল, আপনি পত্রিকার সাংবাদিক, নিশ্চয়ই আপনার সাথে মানবাধিকারের এলিনা খানের যোগাযোগ আছে। আমাকে যদি তার কাছে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দেন, সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

: আশ্চর্য, আমি সাংবাদিক এটা আপনাকে কে বলল?
: এই যে পেপারে আপনার মোবাইল নম্বর ছাপা হয়েছে!
: পেপারে মোবাইল নম্বর ছাপা হলেই সাংবাদিক হয়ে যায় নাকি? নানা কারণেই তো নম্বর ছাপা হতে পারে। নম্বরটা যেখানে ছাপা হয়েছে তার আশপাশের লেখাগুলো পড়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন আমি যে সাংবাদিক নই।
কণ্ঠস্বর থেকে নারীটির বয়স অনুমানের চেষ্টা করল মাদল। চল্লিশের কম নয়। বেশিও হতে পারে আবার কমও হতে পারে।
: আচ্ছা, আপনার বয়স কত? নিশ্চিত হতে জানতে চাইল।
: আমার? এই ধরেন পঁয়ত্রিশ।
: আচ্ছা ঠিক আছে, ফোন যখন করেছেন ব্যবস্থা তো একটা করতেই হয়। মানুষ তো মানুষের জন্যই, তাই না।
: জি জি। অনেক কৃতজ্ঞ থাকব।
: এক কাজ করুন, আপনি আগামি কাল দুপুরের দিকে আমাকে একটা ফোন দেবেন। নানা কাজে ব্যস্ত থাকি তো, মনে করিয়ে দেবেন আরকি। দেখি আপনার জন্য কিছু করতে পারি কিনা।
: জি ভাই, অনেক কৃতজ্ঞ থাকব।
‘ফুলকলি’ নামে মোবাইল নম্বরটি সেইভ করে রাখল মাদল। ছদ্মনামে এমন নম্বর তার মোবাইলে আরো আছে। তাদের কেউ স্বামী পরিত্যাক্তা, কেউ অকাল বিধবা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কেউবা চন্দ্রিমা উদ্যান বা কাওরান বাজারের ভাসমান নিশিরঙ্গিনী। মন চাইলে তাদের ফোন দেয়। বউ না থাকলে কাউকে কাউকে বাসায়ও ডেকে আনে।

তিন.
সাধারণত চার প্যাগের বেশি খায় না তমাল। তাও গিলবিসের জিন অথবা ভদকা, ভুলেও কেরু নয়। গিলবিসের জিন তার প্রিয় ব্রান্ড। দামটা বেশি হলেও এতে একটা সুবিধা আছে। তার বউ মদ পছন্দ করে না। কোনোদিন বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কেরুর হুইস্কি বা ভদকা খেয়ে বাসায় ফিরলে একটা বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। চোখের দিকে তাকিয়ে তার বউয়ের প্রথম প্রশ্ন, তোমার চোখ এত লাল কেন?

তারপর শুরু হয় জেরার পালা। তমাল ঠান্ডা মাথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়। কিন্তু তার বিএ পাস বউ, সে কি মদের গন্ধ বোঝে না? ব্যাস, দু-তিন দিন কথাবার্তা বন্ধ। বাসায় দমবন্ধ করা একটা পরিবেশ। আদর করে জড়িয়ে ধরে রাগ ভাঙাতে চাইলেও পাথরের মতো শক্ত রাগটা কিছুতেই ভাঙতে পারে না, বউ উল্টো কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।

সাংসারিক এই গলযোগের হাত থেকে রেহাই পেতে সে সিদ্ধান্ত নেয় জীবনে কোনোদিন কেরু কোম্পানির মদ খাবে না, খেলে বিদেশিটাই খাবে। যতই খাও, কোনো গন্ধ নেই। গন্ধ নেই তো বাসায় ঝামেলাও নেই। তিন-চার প্যাগ খেয়ে রাত করে বাসায় ফিরলেই হলো, ঢুলুঢুল চোখে বউ দরজাটা খুলে খাওয়ার জন্য ভাত বেড়ে দিয়ে সোজা বিছানায়।

সেদিন তো বাসায় তার বউ নেই, চার প্যাগ কেন, পুরো বোতল সাবাড় করে দিলেও কোনো অসুবিধা নেই। না, বোতল সে একা সাবাড় করেনি, করেছে তিনজনে মিলে। প্রতিজনের ভাগে প্রায় সাত-আট প্যাগ করে পড়েছে। চার প্যাগের পরই তমালের টালমাটাল অবস্থা। দুই বন্ধু মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। একজন ফেইসবুকে বান্ধবীর সঙ্গে চ্যাট করছে, অন্যজন রসালাপ করছে। তারও ইচ্ছে হলো মোবাইলে কারো সঙ্গে কথা বলার। দুপুরে যে নারীটি ফোন করেছিল, যার নম্বর সে ‘ফুলকলি’ নামে সেইভ করেছে, নম্বরটি ডায়াল-লিস্টেই ছিল। কল দিয়ে সে অন্য রুমে চলে গেল।

: হ্যালো।
: জি। কেমন আছেন?
: দুপুরে আপনিই তো ফোন করেছিলেন, তাই না?
: জি জি আমিই।
: আপনার প্রবেøমটা নিয়ে আমি ভাবলাম। আচ্ছা, আপনি তো কোনো সাংবাদিকের সহায়তা নিতে পারেন এই ব্যাপারে।
: মীরপুর সাংবাদিক কলোনির এক সাংবাদিকের কাছে গেছিলাম ভাই। মানবাধিকার সংস্থাকে দিয়ে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে আশ্বাস দিয়ে আমার কাছ থেকে সাত শ টাকাও নিল। কিন্তু পরে তার মোবাইলে যতবারই ফোন করি রিসিভ করে না।
: ও আচ্ছা। ফ্রটের পাল্লায় পড়েছেন।
: তাই তো দেখছি।
টানা টানা গলায় তমাল বলে, শোনেন, আমি কিন্তু প্রতারক নই। আপনার সাথে কোনো প্রতারণা করব না। আমাকে টাকাপয়সাও দেয়া লাগবে না।
: জি ভাই, একটা ব্যবস্থা করেন দয়া করে, অনেক বিপদের মধ্যে আছি।
: শুধু আমাকে খুশি করলেই হবে।
: জি?
: কাল দুপুরে আমার বাসায় আসতে পারবেন?
: আপনি বললে তো যেতেই হবে। বড় কষ্টের মধ্যে আছি, কি বলব।
: আমার বউ বাসায় নেই। আপনি ঠিক দুপুর বারোটায় কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে চলে আসবেন। আমি রিকশায় আপনাকে আমার বাসায় নিয়ে যাব। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আপনি শুধু আমাকে খুশি করবেন।
: জি?
: শোনেন, একতরফা কিছু হয় না। পৃথিবীটা গিভ এ্যান্ড টেকের। আমি আপনাকে দেব, আপনি আমাকে দেবেন। সোজা হিসাব, বুঝলেন? আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে মানবাধিকার সংস্থায় জব করে, একজন বড় সাংবাদিক। আপনার বিষয়টি নিয়ে আমি তাদের সাথে আলাপ করেছি। একটা উপায় নিশ্চয়ই হয়ে যাবে, কোনো চিন্তা করবেন না। কাল চলে আসুন, ঠিক আছে?

ফুলকলি নিশ্চুপ। কয়েক মুহূর্ত। তারপর ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে, এক বিপদ দিয়ে যদি আরেক বিপদের হাত থেকে উদ্ধার পাই, কী আর করা!

: আশ্চর্য! আপনি এটাকে বিপদ বলছেন কেন? আমি আপনার কোনো ক্ষতি তো করব না, তাই না? বরং উপকারই করব। আপনার তো বয়স বেশি হয়নি, দীর্ঘদিন স্বামীর সোহাগ পাচ্ছেন না, তাই না? আসুন আসুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
: আচ্ছা ঠিক আছে। ফুলকলির নিস্তেজ কণ্ঠ।
: ওকে, দেখা হচ্ছে তাহলে কাল।
: আচ্ছা একটা কথা। ঈদের পরে এলে হবে না?
: না না, তখন আমার ওয়াইফ বাসায় চলে আসবে। কালই আসেন।
: আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি তাহলে এখন।

চার.
একে তো পৌষ মাস, তার উপর আকাশ মেঘলা। ঠান্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। মাদলের মাথায় ক্যাপ, চোখে রঙিন চশমা, মুখটি মাফলারে পেঁচানো। ইচ্ছে করেই সে এই সাজ নিয়েছে, যাতে কেউ চিনতে না পারে। রাস্তায় অফিসের বা শ্বশুরবাড়ির কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে না, বলা তো যায় না। তা ছাড়া ফুলকলিকে তার পুরো চেহারাটি দেখাতে চাচ্ছে না। ভবিষ্যতে যদি কোনো ঝামেলা পাকায়! যদি ধর্ষণ মামলা ঠুকে দেয়! নারীকে তার মোটেই বিশ্বাস নেই।

ফুলকলিকে ফোন করে বলে দিয়েছে কমলাপুর ইস্টিশনের সামনে রাস্তার উল্টো দিকের ফুটপাতে দাঁড়াতে। রিকশা থেকে নেমেই সবুজ ফুলেল বোরখাপরা ফুলকলিকে যথাস্থানে দেখতে পেল। তবু নিশ্চিত হতে তার নম্বরে ডায়াল করল। বোরখাওয়ালীর হাতের ফোনটি বেজে উঠল। নিশ্চিত হয়ে সে লাইন কেটে দিল।

একটা রিকশায় চড়ে বসল দুজন। পাড়ার গলির মাথায় নেমে যাবে। মাদল আগে হাঁটবে, পেছনে তাকে ফলো করবে ফুলকলি। বাসায় দারোয়ান নেই। মেইনগেটের কলাপসিবলে সবসময় তালা দেওয়া থাকে। মাদল কলাপসিবলের তালা খুলে তার জন্য অপেক্ষা করবে, সে ভেতরে ঢুকলে পরে তালা লাগিয়ে দেবে।

সাততলা বাসায় উঠতে কোনো ঝামেলা হলো না। বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া গ্রামের বাড়ি চলে গেছে, যারা আছে তাদের অনেকেই ঈদের মার্কেটে। পুরো বাড়ি প্রায় ফাঁকাই বলা চলে। ফাঁকা না হলেই বা কি, কেউ তো আর তার বাসায় আসবে না। অন্য সময় তো আসেই না, এখন তো মোটেই নয়। এলেও কোনো সমস্যা নেই। দুই বাথরুমের একটিতে ফুলকলিকে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে সিটকিনি লাগিয়ে দিলেই হলো। কেউ তো আর বাথরুম তল্লাশি করতে যাবে না। এই শহরে কে কার! কার বাসায় কে কাকে খুন করছে, কার বাসায় মদ-জুয়ার আসর চলছে, কার বাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণ বা নারীবাজি চলছে―এত খবর কে রাখে! সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত।

দরজার দুটি সিটকিনি লাগিয়ে ফুলকলির হাত ধরে মাদল বেডরুমে নিয়ে বসাল। প্রচÐ উত্তেজনা তার ভেতরে-বাইরে। রক্তসঞ্চালন বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। তর সইছে না আর, বোরখায় ঢাকা ফুলকলির বুকের পিচ্ছিল চূড়ায় হাত রাখল। দুহাতে চেপে ধরে বলল, নেকাব খুলছ না কেন?

হাত দুটো পেছনে নিয়ে ফুলকলি ফসকাগেরোটা খুলে মুখের ওপর থেকে নেকাবটা সরিয়ে নিতেই আঁতকে উঠল মাদল। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো হাত দুটি সরিয়ে নিল। কয়েক পা পেছনে সরে দাঁড়াল। ফুলকলি হাসছে। হাঁ-মুখে মাদল তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। নাকের বাঁ-দিকে সেই কালো আঁছিল, সেই ভরাট চোখ, নিচের পাটিতে সেই গেজদাঁত।

তমাল দু-হাতে মুখ ঢাকে।

১৫.০৭.২০১৫