বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / কুমুদিনী কমপ্লেক্স: সেবা ও সম্প্রীতির তীর্থভূমি
১১/০৭/২০১৬

কুমুদিনী কমপ্লেক্স: সেবা ও সম্প্রীতির তীর্থভূমি

- হাসান হাফিজ

নদীর নাম লৌহজং। দক্ষিণ পাড়ে রণদাপ্রসাদ সাহার (আরপি সাহা) আদি বাড়ি। স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ আরপি সাহার ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে এখানে। আরো আছে নাটমঞ্চ, নাটমন্দির। সংরক্ষিত আছে ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক রথ। শিগগিরই সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হবে অটিস্টিক শিশুদের কেন্দ্র, ওল্ড হোম। নদী ছোট হলেও বিদায়ী আশ্বিনে বেশ স্রোতস্বিনিই দেখা গেল তাকে। নৌকা দিয়ে পারাপার চলে। বৈঠা বা দাঁড়ের কোনো ব্যবহার নেই। উত্তর-দক্ষিণে বড় রশি বাঁধা আছে। সেই রশি হাতে ধরে চলে নৌকা এপার ওপার করার কাজ। কোনো সেতু বানানো হয়নি। উত্তর পাড়ে পৌঁছুলেই ডান পাশে দুর্লভ প্রজাতির গাছপালার বাগান। বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মার পরিকল্পনায় গড়ে তোলা হয়েছে এই বৃক্ষসমাবেশ। দেখে মন জুড়িয়ে যায়।

উত্তর পাড়ে অনেকগুলো স্থাপনা। মোট ১১০ একর এলাকা জুড়ে। অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী হাসপাতাল, কুমদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও কলেজ, লাইব্রেরি, মিউজিয়াম, ডেয়ারি, বেকারি,মাছচাষের কয়েকটি পুকুর। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর গ্রাম বহুদিন ধরেই আপন গৌরবে উজ্জ্বল,আলোকময়। পড়েছে মির্জাপুর উপজেলায়। এই গ্রামটি এক কালে অন্য পাঁচ দশটা গাঁয়ের মতোই ছিল সাদামাঠা,আটপৌরে। এই নাম দূর দূরান্তের বিশেষ কেউ জানতো না। যেন জাদুর ছোঁয়ায় সেই নাম নতুন এক তোলপাড় ও স্পন্দনের সৃষ্টি করলো দেশজুড়ে। সীমানা পেরিয়ে বাইরের জগতেও ছড়িয়ে পড়লো এর সুনাম এবং মানবিক, সেবামূলক কর্মযজ্ঞের সৌরভ। এই স্বপ্নযাত্রার বুঝি শেষ নেই। স্বদেশের কৃতীজনেরাই শুধু নয়, বিশ্ববরেণ্য অনেক ব্যক্তিত্ব এখানে এসেছেন। আনন্দময়, বিহ্বল সময় কেটেছে তাঁদের। এখানকার বিপুল ও বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ, সেবা সম্প্রীতির কর্মধারা,অঙ্গীকার, নিবেদন দেখে মুগ্ধ, বিস্মিত হয়েছেন তারা।

গত পয়লা অক্টোবর ২০১৬ ছিল ভারতেশ্বরী হোমসের বার্ষিক সাহিত্য সংস্কৃতি সপ্তাহের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক, ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। মুগ্ধ চোখে দেখেছি স্বনামধন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বাঁ দিকে পড়ে কুমুদিনী হাসপাতাল। মূল সড়ক থেকে কিছুদূর গেলেই প্রথমে হাসপাতালের আউটডোর, নাম বিধানালয়। তাসমিমা হোসেনকে স্বাগত জানালেন কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের এমডি রাজীবপ্রসাদ সাহা। তিনি আর পি সাহার নাতি। তাঁর বাবা ভবানীপ্রসাদ সাহাও একাত্তরে শহীদ হন। একাত্তরে রাজীব ছিলেন তিন বছরের শিশু। আমাদেরকে আরো স্বাগত জানালেন রাজীবপ্রসাদের মা, ট্রাস্টের পরিচালক শ্রীমতী সাহা, ভারতেশ্বরী হোমসের প্রাক্তন অধ্যক্ষা ও ট্রাস্টের পরিচালক প্রতিভা মুৎসুদ্দী, ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষা প্রতিভা হালদার, হোমসের শিক্ষিকা কবি ও গল্পকার হেনা সুলতানা প্রমুখ। ডাবের পানি, ক্ষুদ্রাকার সুস্বাদু মার্বেল সিঙ্গারা, প্রজাপতি নিমকি দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো আমাদের। তাসমিমা হোসেন তারপর একে একে পরিদর্শন করলেন আউটডোর, বিভিন্ন ওয়ার্ড, মহিলা মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ল্যাব, কলেজ, নার্সিং স্কুল ও কলেজ। হাসপাতাল ভবনে চারটি মিনার- হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এই চার ধর্মের প্রতীক। হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার মান কেমন? আমাদের জানানো হলো, যথাসম্ভব আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য তারা সবসময় সচেষ্ট থাকেন। আইসিডিডিআর, বি এবং অস্ট্রেলীয় হাইকমিশন যৌথভাবে তাদের চিকিৎসাসেবার যৌথ অংশীদার হয়েছে সময়ে সময়ে। হাসপাতালে বিখ্যাত লোকজনের নামে ওয়ার্ড রয়েছে। কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ (প্রতিষ্ঠার বছর ২০০১) সম্পূর্ণ আবাসিক। ভারতীয় কাশ্মীরের ১৬০ জন ছাত্রী, নেপালের ৪০ জন ছাত্রী বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন। প্রতিবছর ১২৫ জন ছাত্রী ভর্তি করা হয়। নার্সিং কলেজে এতই বিখ্যাত যে, এখান থেকে পাস করা কাউকে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ পর্যন্ত দিতে হয় না।

আউটডোরে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার রোগী চিকিৎসা সুবিধা পান। ফি মাত্র ২০ টাকা। হাসপাতালে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সব চিকিৎসাই করা হতো বিনামূল্যে। কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা ১৯৩৮ সালে। কুমুদিনী ছিলেন আর পি সাহার মা। তিনি বিনা চিকিৎসায় মারা যান। রণদা তখন সাত বছরের শিশু। মায়ের পুণ্য স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি অর্জিত সব সহায় সম্পদ মানবকল্যাণ ও সেবামূলক কার্যক্রমে নিবেদন করেন। রণদা প্রসাদ সাহা স্মারকগ্রন্থ বেরিয়েছে ২০১৩ সালে। মোট ৩৪৮ পৃষ্ঠার বইটি পড়লে মনীষী,দানবীর আর পি সাহা সম্পর্কে বিশদে জানা যাবে। সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন আনিসুজ্জামান, প্রতিভা মুৎসুদ্দী,করুণাময় গোস্বামী, দ্বিজেন শর্মা,মফিদুল হক, হেনা সুলতানা।

সন্ধ্যার আগে দুর্গপ্রতিম ভারতেশ্বরী হোমসের মাঠে তাসমিমা হোসেনকে সিনিয়র ও জুনিয়র সেকশনের ছাত্রীরা গার্ড অব অনার প্রদান করে। তিনি তাদের মনোজ্ঞ দৃষ্টি নন্দন ডিসপ্লে দেখেন। ব্যান্ডের গমগমে আওয়াজের সঙ্গে পরিবেশিত হলো বেশ কয়েকটি দেশাত্মবোধক সংগীতের সুর। যেমন চল চল চল ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল, সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান, আমরা করবো জয় একদিন ইত্যাদি। রাতে পিপিএম হলে বার্ষিক সাহিত্য সংস্কৃতি সপ্তাহ ২০১৬ এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। বিজয়ীদের হাতে তিনি তুলে দিলেন পুরস্কার। বিজয়ী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও নিতান্ত কম না। মোটমাট ১১৮ জন। ছাত্র বললাম এ কারণে যে, ভারতেশ্বরী হোমসে ছাত্ররাও পড়ে,যদিও সংখ্যায় অল্প। তারা মূলত কর্মচারীদের পুত্রসন্তান। তাদের বলা হয় ডে স্কলার। তারা প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এখানে পড়তে পারে। তারপর অন্য বিদ্যায়তনে চলে যেতে হয়ে। পিপিএম হলের কথা বলেছি। এর মানে হলো প্রিন্সিপাল প্রতিভা মুৎসুদ্দী। দীর্ঘকাল তিনি ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষা ছিলেন। বয়স আশিরও বেশি। এখনো তিনি কর্মচঞ্চল, সজাগ, সচেতন। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অন্যতম পরিচালক। বিয়ে করেননি। জীবন উৎসর্গ করেছেন মানবকল্যাণে।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তাসমিমা হোসেন স্মৃতিচারণ করে বললেন যে, তাঁর ছোটবোনেরা যখন এখানে পড়তো, সেই ষাট দশকে, তখন তিনি এখানে আসতেন নিয়মিত। কোমলমতি ছাত্রীদের তিনি আহ্বান জানালেন মানুষের মত মানুষ হতে। বললেন নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান ভারতেশ্বরী হোমসের নিয়ম-শৃঙ্খলা, শিক্ষার মান দেখে আমি মুগ্ধ অভিভূত হয়েছি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনিয়র শিক্ষিকা হেনা সুলতানা ও মনিরা সিদ্দিকা। রাতে পুরস্কার বিতরণী শেষে ছিল নৈশভোজ। অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশেষ খাবারের আয়োজন। খাদ্যগ্রহণের আগে রেওয়াজ অনুযায়ী সমবেতভাবে ছাত্রীরা প্রার্থনা করে নিল।

রণদাপ্রসাদ সাহার ঠাকুরদার মায়ের নাম ছিল ভারতেশ্বরী দেবী। মাতৃহীন রণদাপ্রসাদ ব্রিটিশ ভারতে প্রথম বিশ^যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিনিয়র ছিলেন আর্মিতে। সাহসিকতার জন্য আরপি সাহা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারের সম্মাননা ‘সোর্ড অব অনার’। সেটা গ্রহণ করেছিলেন রাজা ৫ম জর্জের হাত থেকে। মাত্র তিন জন ভারতীয়কে সেবার এই সম্মাননা দেয়া হয়েছিল। কিছুটা পাশ্চাত্য ধাঁচে ভারতেশ^রী হোমসের (প্রতিষ্ঠা ১৯৩৮) শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়। শরীরচর্চা, রন্ধনবিদ্যা এখানে বাধ্যতামূলক। নিয়মিত রুটিনও বটে। অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এর বিশেষত্ব হলো এখানে মেয়েদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হয়।

আর পি সাহার পুত্রবধূ শ্রীমতী সাহা যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। অকাল বৈধব্যের শোককে তিনি পরিণত করেছেন শক্তিতে। দৃঢ় মনোবল নিয়ে মোকাবেলা করেছেন অনেক চ্যালেঞ্জ। স্বামী-শ্বশুরকে হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষটি অনেক গুণে গুণান্বিতা। একাত্তর ও স্বাধীনতা পরবর্তী কালে আরপি সাহার কন্যা জয়াপতিও শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন এসব প্রতিষ্ঠানের। তিনি এখন বিলেতে থিতু হয়েছেন।

বলছিলাম শ্রীমতী সাহার কথা। তাঁর কণ্ঠও ভালো। অনুষ্ঠানের পরের দিন ২ অক্টোবর সকালবেলা যখন আমরা দুর্গাপূজার প্রস্তুতি দেখতে যাই, তখন আমাদের প্রার্থনা সংগীত শোনালেন। দুর্গাপূজা আসন্ন। চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। চলছে ধোয়ামাজা, রান্নাবান্নার উদ্যোগ আয়োজন। কোনোটা প্রসাদ ঘর, কোনোটা ভাঁড়ার, কোনোটা মাংস ঘর। বড় বড় কাঠের বারকোশ, মটকি, মাটির ভাঁড়,অজস্র মালসা মওজুদ করে রাখা হয়েছে। সনাতন ঢেঁকিঘরও দেখলাম আমরা। চিঁড়ে কোটার প্রস্তুতি চলছে। তেঁতুলবিচি সিদ্ধ করে তার ভিতরের রস নেওয়া হচ্ছে। প্রতিমার রঙ উজ্জ্বল করবার কাজে লাগানো হবে। কেউ বাটনা বাটছেন, চলছে ঝাড়মোছ, কেউ তদারক করছেন। প্রতিমা যেখানে, তার পাশেই স্বপাকভোজী ব্রাহ্মণদের জন্যে রসুইঘর। রয়েছে পাঁচটি বড় গ্যাসের চুলো। এই পা-ারা প্রতিবছর আসেন সিলেট অঞ্চল থেকে।

নারায়ণগঞ্জে কুমুদিনীর প্রধান কার্যালয়। সেখানে আছে জুট বেলিং, হ্যান্ডিক্র্যাফটস, জাহাজ কোম্পানি। সেখানে একটি বিশ^বিদ্যালয়ও স্থাপন করা হয়েছে আর পি সাহার নামে। মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজও তাদের প্রতিষ্ঠিত। আরো বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনুদান দিয়েছেন, দিচ্ছেন। মির্জাপুরের কুমুদিনী কমপ্লেক্সে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব অনেকেই এসেছেন। এর মধ্যে আছেন লর্ড আর জি কেসি, ডা. ঝান্ডা,আগা খান, আইয়ুব খান, ইস্কান্দার মির্জা, শরৎ বসু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, জেনারেল অরোরা, শেখ হাসিনা, প্রণব মুখার্জি, নরেন্দ্র মোদি প্রমুখ।