বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / একজন গৃহিণীঃ অন্তঃপুরের বাসিন্দা না অন্নপূর্ণা?
১১/০২/২০১৬

একজন গৃহিণীঃ অন্তঃপুরের বাসিন্দা না অন্নপূর্ণা?

-

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকা নারীর আসল পরিচয় কী? তিনি কি কেবলই একজন গৃহিণী, অন্তঃপুরের বাসিন্দা? নাকি তিনিই ঘরের অন্নপূর্ণা, সকলের মুখের হাসি ফোটানোর কাজে নিয়োজিত এক অনিঃশেষ প্রাণ?

টিনের চশমা খুলে খালি চোখে একজন গৃহিণীর জীবনচিত্র

মধ্যবিত্ত সংসারে কিছুসংখ্যক মানুষের কপালে চিন্তার খানিকটা ভাঁজ ফেলে জন্ম, তারপর ঘরের ‘লক্ষী মেয়ে’ হয়ে ধরাবাঁধা শৈশব। মাঝখানে অল্প-বিস্তর পড়াশোনা, অতঃপর পরের সংসারে ঘোমটা পড়া লাজুক বউয়ের ভূমিকায় আবির্ভাব। অল্পকিছুদিনে যেতে না যেতেই শাড়ির ভাঁজ কোমরে গুঁজে হাতে কখনো ঝাঁটা, কখনো বা ডিশ ক্লিনার নিয়ে জীবন পার। বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীর জীবন এখনো এই-একই পান্ডুলিপির পুনঃ মঞ্চায়নেই সীমাবদ্ধ। গৎবাঁধা সংলাপ আউড়ে অভিনেতা হয়তো ভাল পয়সা-কড়ি পান, তবে এই পান্ডুলিপির কুশীলবের বেলায় তাও জোটেনা। কারণ তিনি একজন গৃহিণী, আর তার এই ঘরকন্নে সামলানো আর যাই হোক পেশা নয়। তাই ঘরের ঘোমটা পড়া লাজুক বউ অল্প কয়েকদিন পরেই হয়ে যান ঘরের অস্বীকৃত ‘কাজের লোক।’ ঘরের পুরুষ সদস্য কিংবা চাকুরীজীবী নারী সদস্যের অফিস-আদালতের এসি চেয়ারে বসে করা কাজ যখন পরিশ্রমের মর্যাদা পায় তখন বিশাল ঘরের মেঝে মুছতে গিয়ে কিংবা প্রচন্ড গরমে জ্বলন্ত উনুনের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা মজার মজার রান্না করে চলা নারীটির মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম কখনোই বাইরের বিশ্বে ‘কাজ’-এর মর্যাদা পায়না। কারণ এর আর্থিক মূল্য নেই, এ যে গৃহিণীর পরম দায়িত্ব।

নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য কত?

২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেব অনুযায়ী- এর আগের অর্থবছরে নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য ছিল ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। বিষ্ময়কর বললেও কম বলা হবে- এই আর্থিক মূল্য সেই অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশের সমান! এই গৃহস্থালির কাজগুলোর মধ্যে রান্না, পরিবারের বৃদ্ধদের দেখাশোনা করা, শিশুর পরিচর্যা, বাড়িঘর পরিষ্কার করাসহ অন্যান্য কাজ অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব কাজ গৃহকর্মীদের দিয়ে করালে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হত তা বিবেচনায় এই আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য, শহরের হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া ঘরের কাজে নিযুক্ত পরিচারিকারা এসব কাজ করার জন্য যে অর্থ পান তা নিতান্তই নগন্য।

ঘরের কাজে নারীঃ শ্রম যেখানে মর্যাদাহীন

ঘর-সামলানো যেহেতু কোনো পেশা নয় সেক্ষেত্রে তা করতে গিয়ে কতটুকু মাথার ঘাম পায়ে ফেলা হল তা নিয়ে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই ১৮৮৬ সালের মে মাসের প্রথম দিনটিতে কর্মদিবস আট ঘন্টা করার দাবিতে আন্দোলনে নেমে প্রাণ হারিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। তারপর থেকে অফিস-আদালতে কাজের সময়সীমা আট ঘন্টায় নেমে এসেছে, শ্রমিকদের সম্মানে পালন করা হচ্ছে মে দিবস। কিন্তু ঘরের কাজ করতে গিয়ে নারীকে কোনো দিক থেকেই একজন শ্রমিকের থেকে কম কাজ করতে হয়না। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউউবিবি) দ্বারা পরিচালিত গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একজন গৃহিণী প্রতিদিন গড়ে ৪৫ রকমের কাজ করে থাকেন। এসব কাজ করতে দৈনিক গড়ে ১৬ঘন্টা সময় ব্যয় হয়! অর্থ্যাৎ ঘরের কাজে ব্যস্ত নারী একদিনেই অফিস-আদালতে দুদিনের সমান সময় পরিমাণ কাজ করেন। এসব কাজ যেমন মানসিক পরিশ্রমের অন্যদিকে শারীরিক দিক থেকেও কম পরিশ্রমের নয়। তীব্র গরমে রান্না ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা কিংবা পরিবারের বৃদ্ধ ও শিশুদের অসুখ-বিসুখে সেবা করার মতো কাজগুলো আমাদের দেশের অধিকাংশ গৃহিণী একাই করে থাকেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা কোনো যন্ত্র অথবা অন্য কারো সাহায্য ছাড়াই। অথচ এত পরিশ্রমের পরেও ‘সারাদিন কিছুই করেনা’ এমন কথা প্রায়ই শুনতে হয়।

গৃহস্থালি কাজে দিন-রাত পরিশ্রমে নিয়োজিত নারীকে তার কাজের আর্থিক মূল্য প্রদান করা না গেলেও প্রাপ্য সম্মান ঠিকই দেয়া যায়। এক্ষেত্রে দেশের জিডিপিতে নারীর গৃহস্থালি কাজও অন্তর্ভূক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। তা না হলে ঘরের কাজ করেন এমন নারীকে গৃহিণী না বলে ‘গৃহ ব্যবস্থাপক’ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত আর কিছু না হোক, পরিবার থেকে, স্বামী-সন্তানের পক্ষ থেকে অন্তত সম্মান জানানো যেতে পারে। একবার অন্তত বলা যেতে পারে- নারী তুমি অন্তঃপুরের বাসিন্দা নও, তুমিই অন্নপূর্ণা।

- শাহরিয়ার মাহি