বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / নিষিদ্ধ লোবান: মুক্তিযুদ্ধে নারীর সংগ্রাম
১০/২৯/২০১৬

নিষিদ্ধ লোবান: মুক্তিযুদ্ধে নারীর সংগ্রাম

- মোজাফ্ফর হোসেন

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা। কেন্দ্রীয় চরিত্র এক নারী, বিলকিস। ২৬ মার্চ প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা পাক-হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পর, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে রংপুর থেকে মিলিটারি ছড়িয়ে পড়ে মফস্বল শহর ও গ্রামগুলোতে। সঙ্গে যুক্ত হয় লুটেরা বিহারিদের ধ্বংস তা-ব। বিলকিসের গন্তব্যস্থল জলেশ্বরী গ্রাম। সেখানে তার মা, কিশোর ছোটভাই, বিধবা বড় বোন ও তার দুই ছেলেমেয়ে আছে। জলেশ্বরীর আগের স্টপেজ নবগ্রাম স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ে। আর এগোনো সম্ভব না। বিলকিস কোনো বিকল্প পন্থা না পেয়ে একা একাই হাঁটা শুরু করে। খানিক হাঁটার পর টের পায় ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করছে কিশোর বয়সী এক ছেলে। নাম সিরাজ। ওই সিরাজ সামনে এগোতে নিষেধ করলেও বিলকিস হাঁটতে থাকে দৃঢ়ভাবে। শুরু হয় বিলকিসের যুদ্ধমুখী অভিযান।

জলেশ্বরীতে তখন মিলিটারি, বিহারি আর শান্তি কমিটির লোকজনের রাজত্ব। বাঙালিদের ভেতর পড়ে আছে কেবল অন্ধ অসহায় আলেফ মোক্তার। তার কাছে বিলকিস জানতে পারে, শহরের একপ্রান্তে একদল যুবককে মিলিটারিরা মেরে ফেলে রেখেছে। জানাজা হতে দেয়নি। এই লাশগুলোর মধ্যে বিলকিসের ছোটভাই খোকাও আছে। বিলকিস সব শুনে উঠে পড়ে, সে নিজের হাতে তার ছোটভাই খোকার লাশ মাটি দেবে, এই প্রত্যয় নিয়ে। সিরাজ অদম্য বিলকিসকে থামাতে না পেরে তার যুদ্ধসঙ্গী হয়। মিলিটারিদের নিষেধ উপেক্ষা করে লাশ দাফনের কাজ করা, এ-এক যুদ্ধই বটে। ওরা দু’জনে গেরিলা স্টাইলে মধ্যরাতে পড়ে থাকা লাশগুলো একটার পর একটা উল্টিয়ে দেখে। খোকাকে পাওয়া যায় না। অসংখ্য লাশ, সব পরখ করে দেখাও সম্ভব না। ওরা সিদ্ধান্ত নেয়, সবগুলো লাশই দাফন করবে। সে রাতে ছ’টি লাশের দাফন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয় তারা। রাত ফিকে হয়ে এলে তারা রাস্তায় পাশেই এক পাটগুদামে আশ্রয় নেয়। পরের রাতের অপেক্ষা। গুদামে অন্ধকারে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে সিরাজ। তার আসল নাম প্রদীপ। সে ইন্ডিয়া যায়নি, এখানেই মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে।

রাত গাঢ়-ঘন হলে আবারো তারা রাস্তায় নামে, লাশ সরানো এবং দাফনের কাজে। এ সময় বিলকিস জানায় যে, সে লাশ দাফনের কাজ শেষ হলে নবগ্রামে মনসুরদার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে নিয়োজিত হবে। মা-বোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে তার কাছে তখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করা। সে একজন নারী, এই পরিচয়ের চেয়ে তখন বড় হয়ে ওঠেÑসে একজন মুক্তিকামী যোদ্ধা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে সংগ্রামী ইতিহাস, তার সঙ্গে পুরুষের পাশাপাশি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন লক্ষ-কোটি নারী। তারই এক ধরনের স্বীকৃতি মেলে সৈয়দ হকের এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে।

এক পর্যায়ে খোকার লাশ খুঁজে পায় বিলকিস-সিরাজ। কিন্তু আর বেশিদূর এগোতে পারে না। ধরা পড়ে যায় ওত পেতে থাকা বিহারী ছোকরাদের কাছে। তারা ওদের মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সিরাজকে আলাদা ঘরে শারীরিক নিপীড়ন চালিয়ে বিলকিসের ঘরে আসে মেজর। বিলকিসকে বলে - ‘স্বীকারোক্তির জন্যে তোমাকে বাধ্য করব না।...কোনো কিছুর জন্যেই তোমাকে বাধ্য করব না, এমনকি তোমার দেহের জন্যেও নয়।... তুমি নিজেই আমার কাছে আসবে।’ অর্থাৎ সেই পরিস্থিতিটা নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি করতে চায় মেজর। মেজর জৈবিকভাবে অক্ষম হলেও, সে একজন ধর্ষক পুরুষ। মেজর অক্ষম। আর তার সেই অক্ষমতায় বিলকিস এবং সিরাজ নামধারী প্রদীপকে দাঁড় করায় আরো নির্দয় বাস্তবতার মুখোমুখি। মেজরের নির্দেশমতো সিরাজকে নগ্ন করা হয় বিলকিসের সামনে। নগ্ন করা হয় বিলকিসকে। মেজর বলে, ‘আমি এখন কুকুরের সঙ্গে কুকুরের মিলন দেখবো।...বাঙালিরা কুকুরের অধিক নয়। কুকুরের ভাইবোন নেই।’ সিরাজকে নগ্ন করেই প্রহরী চিৎকার করে ওঠেÑ ‘স্যার, ইয়ে তো হিন্দু হ্যায়?’ সিরাজ নামধারী প্রদীপ বন্দুক কেড়ে নিতে গেলে তাকে মেরে ফেলা হয়। প্রদীপের বোন জেনে বিলকিসকেও হিন্দু ভেবে তার দেহের প্রতি মেজরের আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়। সুযোগটা কাজে লাগায় বিলকিস। সে দেহ থেকে কাপড় সরিয়ে মেজরের সামনে দাঁড়ায়। তার আগে তার কিছু শর্ত আছে। শর্ত হলো, প্রদীপের লাশ কাঠের ওপর পোড়াতে হবে। স্থান হতে হবে নদীর তীর। শর্তে রাজি হয় মেজর। নদীর ধারে আগুন দেয়া হয় কাঠে। ভেতরে প্রদীপের মৃতদেহ। আগুনে প্রায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বিলকিস। তাকে মেজর নিয়ে যেতে এলে ‘বিলকিস তাকে আলিঙ্গন করে।...পর মুহূর্তেই বিস্ফারিত দুই চোখে সে আবিষ্কার করে, রমণী তাকে চিতার ওপর ঠেসে ধরেছে, রমণীর চুল ও পোশাকে আগুন ধরে যাচ্ছে, তার নিজের পিঠ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। রমণীকে সে ঠেলে ফেলে দিয়ে লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু রমণীকে আগুন দিয়ে নির্মিত বলে এখন তার মনে হয়।...মশালের মতো প্রজ্বলিত সমস্ত শরীর দিয়ে তাকে ঠেসে ধরে রাখে বিলকিস।’

একজন বিলকিসের আত্মত্যাগ, প্রতিশোধের বোধ, প্রতিবাদের ভাষা বলে দেয় বাঙালিদের স্বাধীনতা অনিবার্য। যে জাতির নারীরা এমন শক্তি ভেতরে সঞ্চয় করে রাখে সে জাতির মুক্তি আটকে রাখা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তার প্রমাণ মিলে যায় বিলকিসের আত্মত্যাগের কয়েক মাস পরে, ১৬ ডিসেম্বরে, মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।

মেজরের আচরণ ও বক্তব্যের রেশ ধরে আমার আলাদা কিন্তু প্রাসঙ্গিক দুটো বিষয়ে কথা বলবার আছে। মেজর ধরে নিয়েছিল তাদের ধর্ষণের ফলে বাঙালি নারীর গর্ভ থেকে যে-যে সন্তান জন্ম নেবে, সে হবে পাকিস্তানের দোসর। কিন্তু সেটি ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। আর যে সকল যুদ্ধশিশু বাংলাদেশ বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছে তারা পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশকেই আপন করে নিয়েছেন। প্রবাসজীবন থেকে বছর বছর অনেক যুদ্ধশিশু আসেন মুক্তিযোদ্ধা মায়ের পরিচয় অন্বেষণ করতে। অর্থাৎ মাতৃপরিচয়ই এখানে মুখ্য।

আর একটি বিষয় হলো - যুদ্ধ বা সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে নারী ও শিশুরা। বিশ্বে আজ অবধি ঘটে যাওয়া প্রতিটি যুদ্ধেই নারী ও শিশুর জন্য অভিন্ন ইতিহাস রচিত হয়ে আসছে। যুদ্ধে বরাবরই নারী ও শিশুরা তৃতীয়পক্ষ ও ক্ষেত্রবিশেষ নিরপেক্ষ থেকেও সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এদেশের নারী ও শিশু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে নজিরবিহীন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। যে-কারণে বিলকিসের মতো অসংখ্য সাধারণ নারী বাধ্য হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে সশরীরে অংশ নিতে। নারীর যুদ্ধটা যেমন ছিল দেশ রক্ষার, পরিবার রক্ষার, তেমন ছিল সম্ভ্রম রক্ষারও। ব্যথিত হবার বিষয় এই যে, যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে নারীদের যোগ্য মর্যাদা দেয়া হয়নি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে হেয় করে রাখা হয়েছে। কারণ আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের চেয়ে সম্ভ্রমটাই আমাদের কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানিরা যেভাবে নারীদের একখ- মাংসপি- ছাড়া আর কিছু ভাবেনি, আমরাও শেষ পর্যন্ত তাদের শরীর থেকে আলাদা করে ভাবতে পারিনি। আমরা এই নিচু মানসিকতা দিয়ে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা নারীদের বিচার করে চলেছি আজো। যেটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সৈয়দ হকের উপন্যাসে অল্প ক’টি চরিত্র দ্বারা নির্মিত ক্ষীণদেহী এই উপন্যাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ অনুষঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে। উপন্যাসটির রচয়িতা এখানে চরিত্র, সংলাপ, আবহ এতটাই কৌশলে এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, মাত্র দু’টি জীবনের তিন-চারদিনের পরিণতি দিয়েই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, নয় মাস স্থায়ী যুদ্ধে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যে বর্বর আচরণ, তাদের সাম্প্রদায়িক চেতনা, এবং দেশের স্বার্থে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতাকামী বাঙালির যে আত্মত্যাগ, তা প্রকৃতভাবে নিপুণ মুনশিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এখানেই তাঁর লেখনীর সাফল্য।

‘সাইলেন্স ইজ দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল ওয়ার্ড’- কথাটা এই উপন্যাসে খুবই সত্যি বলে মনে হয়। উপন্যাসের বিরাট অংশজুড়ে আছে নীরবতার ভাষা। অধিকাংশ বক্তব্য এর চরিত্র এবং প্রকৃতি নীরবতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছে বলেই হয়তো উপন্যাসটিকে এত স্বল্পপরিসরে নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে।