শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিনোদন / আয়না : এই যুগের স্পার্টাকাস
১০/১৯/২০১৬

আয়না : এই যুগের স্পার্টাকাস

-

শরাফত করিম আয়না সাধারণ অভিনয়-শিক্ষক আর পার্টটাইম জাহাজের কুকের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা এক ক্রিমিনাল! তবে ক্রাইমের জগতে তার বিচরণ হলো অন্য দাগি অপরাধীদের হয়ে জেল খাটা অন্যের অঙ্গভঙ্গি সুনিপুণভাবে অনুকরণ করতে পারা অর্থাৎ তার অভিনয়গুণই এক্ষেত্রে তার বড় যোগ্যতা। সাধারণের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও এক হতাশাগ্রস্ত ক্রাইম রিপোর্টার সত্য উদ্ঘাটনের জন্য আয়নার পিছু নেয়। অন্যদিকে পাড়ায় নতুন আসা মেয়েটির প্রতিও আয়না অনুরক্ত হয়ে পড়ে। ক্ষমতা আর টাকার জোরে বড় বড় অন্যায় আর ক্রিমিনালদের এভাবে পার পেয়ে যাওয়ার খেলায় আয়না তার আয়নাবাজি কতদিন চালাতে পারবে? ‘ক্রিমিনাল জেলের ভেতরে নয়, বাইরে থাকে’ - এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এগিয়ে যায় আয়নাবাজি সিনেমাটির কাহিনি।

অমিতাভ রেজা চৌধুরী গুণি নির্মাতা। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে নাটক - সবকিছুতেই সফল তিনি। এবার তিনি নির্মাণ করলেন চলচ্চিত্র। আর অভিষেক ছবিতেই পেয়ে গেলেন বড় ধরনের সাফল্য।

আয়নাবাজি গত ৩০ সেপ্টম্বর মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির পর থেকেই সাড়া ফেলে দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আয়নাবাজির তুমুল প্রশংসা চলছে। ছবিটি এখন দিনে ১০টি করে প্রদর্শনী চলছে; যা ঢাকার প্রেক্ষগৃহের ইতিহাসে দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রদর্শনীর রেকর্ড। ছবির প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, নাবিলা এবং পার্থ বড়ুয়া। তবে সিনেমার মূল গল্পটা ‘আয়না’ নামের চঞ্চলকে ঘিরেই।

সূচনা সংগীতে অর্ণবের ‘প্রাণের শহর’ গানটির দৃশ্যধারণের কাজেও ছিল বেশ স্নিগ্ধতা ও মায়াময়তার ছোঁয়া। এছাড়া চঞ্চল-নাবিলার চুম্বন দৃশ্যটাকে আবেগময় ও রোমান্টিকভাবে পর্দায় উপস্থাপনের কৃতিত্ব অনেকাংশেই যাবে চিত্রগাহকের ঝুলিতে।

ছবিটির কারিগরি দিকটিও ছিল নিখুঁত। শব্দ ও সম্পাদনার কাজে ছিল দক্ষতার ছাপ। ছবির সুন্দর প্রিন্ট, স্পষ্ট সংলাপ ও আহব-শব্দে ব্যবহার ছিল উন্নতমানের। বেশ কিছু দৃশ্যে ড্রোনের ব্যবহার ছিল চমকপ্রদ।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ও পর্দার আনুপাতিক পরিমাপের কারণে সিনেম্যাটিক ফিলের জায়গায় দৃশ্যগুলোকে টিভি নাটকের মতো মনে হয়েছে। বড়পর্দায় অমিতাভ রেজার এটাই প্রথম কাজ এটা বোঝা গেছে ভালোভাবেই। তবে অসাধারণ গল্প ও রহস্যের মোচরে ভরপুর চিত্রনাট্য ও সংলাপ সে ত্রুটিটুকু ঢেকে দিয়েছে।

সিনেমা শেষে ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’-এ নানা মজার ঘটনা দেখিয়ে ছবিটির ইতি টানা হয়েছে। এটিও বাংলা সিনেমায় মোটামুটিভাবে নতুন। বিদেশি ছবির আদলে ক্রেডিট লাইনের মাঝে মাঝে একটি করে ঘটনার দৃশ্য দর্শকের মাঝে ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’ এমন একটি অনুভূতি এনে দেবে!

ছবিটি প্রথম সপ্তাহে চলেছে দেশের ২১টি প্রেক্ষাগৃহে। আয়নাবাজির পরিচালক অমিতাভ রেজা জানান, দ্বিতীয় শুক্রবার চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নতুন নতুন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে ছবিটি।

‘জাতে মাতাল, তালে ঠিক’ চরিত্র শুধু বাংলা না, বিশ্ব চলচ্চিত্রেই বহুল দৃশ্যমান। ক্রাইম রিপোর্টার চরিত্রটির অধিকাংশ সময় এমনকি দায়িত্ব পালনে গিয়েও মদ্যপ থাকাটা, মদ্যপানের উপকারিতাই তুলে ধরা হয়েছে বলে মনে হয়! নায়িকার চরিত্রের তেমন গভীরতা না থাকা, তার বাবা আর কাজের লোকের উপস্থিতি থাকলেও সে নায়ক আয়নার লাভ ইন্টারেস্টের বেশি কিছু নয়, আর যেভাবে হুট করে আয়নার প্রতি এত অনুরক্ত হয়ে পড়ল। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ছোট্ট ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে নায়িকার অতীত জীবনে কোনো ঘটনা থাকতে পারে, তাই আর সাতপাঁচ না ভেবে গোবেচারা প্রকৃতির নায়ক দেখেই আয়নার প্রতি তার গভীর অনুরাগ হয়ে গেল! তবে এমন সমাপ্তি না টানলে মন ভরত না! নীতি-দুর্নীতির দ্ব›দ্ব নয়, জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই-ই প্রতিপাদ্য হয়েছে ছবিটিতে।

এবার আসি অভিনয়ে- আয়না চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীই ছবির প্রাণ! পোস্টমাস্টার-এর ক্ষণস্থায়ী চরিত্রটিকে গোনায় ধরলে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র রূপদান করেছেন চঞ্চল চৌধুরী প্রতিটি চরিত্র রূপায়ণেই নিজের মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। দর্শকরা প্রথম থেকেই করতালির মাধ্যমে তার এনট্রান্স বরণ করে নিয়েছে, তার প্রতিটি কমেডি পারফরমান্সে হেসে উঠেছেন, চরিত্র পরিবর্তনের খেলা দেখে হাততালি দিয়েছেন, তার চরিত্রের রোমান্স থেকে সাসপেন্স দারুণ উপভোগ করেছেন। নায়িকা চরিত্রে মাসুমা রহমান নাবিলাও দারুণ করেছেন। সব মিলিয়ে আয়নার লাভ ইন্টারেস্ট চরিত্রই ছিল তার, কিন্তু তাতে কোনো ন্যাকামি বা নাটুকেপনা না দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন চরিত্রটিকে। ক্রাইম রিপোর্টার চরিত্রে পার্থ বড়ুয়া, পারভারট ক্রিমিনাল লুৎফর রহমান জর্জ থেকে শুরু করে চিত্রনাট্যকারের উপস্থিতিও ছিল চরিত্রানুগ। পরিচিত শিশুমুখ থেকে মিরাক্কেল-খ্যাত জামিলের কমিক উপস্থিতিও দর্শক উপভোগ করেছেন। অল্প সময়ের জন্য অভিনয় করেও অমিতাভ রেজা কম যাননি অভিনয়শিল্পী হিসেবে।

যে অভিনয়কে ভালোবেসে আয়না এই শহরকে মঞ্চ বানাতে চায়, সেই মঞ্চ একদিন হয়ে যায় ফাঁসির মঞ্চ যার জল্লাদের হাসির কাছে এই শহরের সেরা অভিনেতা পরাজয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে। এই যুগের স্পার্টাকাস আয়না যেন তার শেষ নাটকের মঞ্চে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে মানুষখেকো মানুষগুলোর।

- ফারহানা করিম