শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / দ্যা বোরখা অ্যাভেন্জার : এক নারী সুপারহিরোর অধিকার আদায়ের অভিযান
১০/২৬/২০১৬

দ্যা বোরখা অ্যাভেন্জার : এক নারী সুপারহিরোর অধিকার আদায়ের অভিযান

-

কখনো চিন্তা করেছেন যে আপনার আশেপাশের অন্যায়কে মোকাবেলা করতে নতুন এক সুপারহিরো আসছে? আপনি নিশ্চই শক্তিশালী, সুঠাম গড়নের এক পুরুষের কথা কল্পনা করেছেন যে বিশাল এক বন্দুক নিয়ে অপরাধীদের কাবু করছে! সুপারহিরোদের নিয়ে এই সঙ্কীর্ণ কল্পনাকেই যেন চুরমার করতে এসেছে দ্যা বোরখা অ্যাভেন্জার। পাকিস্তানের মত কট্টর দেশের এই বোরখা অ্যাভেন্জার সারা পৃথিবী জুড়েই বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।


পাকিস্তানি এই কার্টুন সিরিজটির গল্পের ঘটনাস্থল উত্তর পাকিস্তানের হালওয়াপুর নামক একটি কাল্পনিক শহর। আর এই গল্পের প্রধান চরিত্র জিয়া নামের এক ন্ম্র, ভদ্র স্কুল শিক্ষিকা। সবার প্রিয় এই জিয়ার রয়েছে দ্বিতীয় এক স্বত্বা, এক অন্য পরিচয় যেটি বের হয়ে আসে যখন এক কুচক্রি মহল তার হালওয়াপুর গার্লস স্কুল বন্ধ করতে উঠে পড়ে লাগে।এই চক্রান্তকে রুখতে বোরখা অ্যাভেন্জারের ছদ্মবেশে লড়াই শুরু করে জিয়া। আর এই লড়াইয়ে জিয়া ব্যবহার করে ‘তাখত কাবাডি’ নামের একটি গোপন প্রাচীন মার্শাল আর্ট যার মুলমন্ত্র হল বই ও কলম। এই গল্পের প্রধান দুই কু-চরিত্র হচ্ছে ‘ভাদেরো পাজেরো’ নামের একজন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ ও ‘বাবা বন্দুক’ নামের পাগড়ি পরিহিত এক কট্টরপন্থি। আজকের পাকিস্তান বা অন্যান্য অনেক মুসলিম দেশগুলো যেসব সমস্যা নিয়ে জর্জরিত এই দুই কু-চরিত্র ও তাদের কার্জকলাপ সেই সমস্যাগুলো্রই যেন এক সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি।





২০১০ এ বিখ্যাত পাকিস্তানি গায়ক এবং সমাজকর্মী এরন হারুন রাশিদ এর নজর পরে একটি খবরে যা পড়ে তিনি জানতে পারেন যে তালেবানরা উত্তর পাকিস্তানে কেমন করে একের পর এক মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে। খবরটি পড়ে হারুনের মনে প্রচন্ড অশান্তির সৃষ্টি হয় এবং যারই ফলশ্রুতি দ্যা বোরখা অ্যাভেন্জার। এই ঘটনাবলিকে বিশ্ববাসীর নজরে আনতে হারুন বোরখা অ্যাভেন্জার নিয়ে যেই বছরে টিভি পর্দায় হাজির হন কাকতালীয় ভাবে ঠিক সেই বছরেই স্কুলে যাওয়ার অপরাধে মালালা ইউসুফজাই গুলিবিদ্ধ হয়। মালালার ঘটনার পর বিশ্ববাসীর নজর যখন আবার পাকিস্তানের নারী শিক্ষার দিকে তখন মিডিয়াতে বোরখা অ্যাভেন্জারের তাৎপর্য আরো বেড়ে যায়।

বোরখা অ্যাভেঞ্জার মেয়ে সন্তানের শিক্ষা ছাড়াও বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, কুসংস্কার ও সমাজের আরো অনেক কঠিন সমস্যাকে অনেক সাবলীল ও মজাদার ভাবে তুলে ধরে. আর এই কারণেই কার্টুনটি অসাধারন। কারণ সাধারনত এসব গম্ভীর সামাজিক সমস্যা নিয়ে কথা বললে অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এই কার্টুনটি সমাজের এই গুরুতর সমস্যাগুলোর কথা ও হাস্যরসের মধ্যে এক সুন্দর ভারসম্য বজায় রেখেছে যার কারণে শিশুরা ও বড়রা সবাই বোরখা অ্যাভেন্জার দেখতে পছন্দ করছে।


এই অনুষ্ঠানটির আছে আরেকটি ভিন্ন তাৎপর্য কারণ বোরখা এমন এক পোশাক যা গোটা বিশ্বের কাছে নারীদের শোষণ ও তাদের দমিয়ে রাখার বস্তু হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এরন হারুন রাশিদ খুব সাবলিল ভাবে বোরখা অ্যাভেন্জারে বোরখাকে সুপারহিরো ‘জিয়ার’ পোশাক হিসেবে দেখিয়েছেন। আর বন্দুক আর গ্রেনেডের বদলে খাতা আর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারও একটি দারুন প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। এই কার্টুনের চমৎকার আবহ সঙ্গীতও হারুনের সৃষ্টি। এছাড়া শোটির সঙ্গীতে বিভিন্ন সময়ে অবদান রেখেছে আলি জাফর, আলি আযমাত ও যশের মত আন্তর্জাতিক তারকারা।


বোরখা অ্যাভেঞ্জার ২০১৩ সালে এমি এওয়ার্ড এর জন্য মনোনয়ন পায় এবং এরই মধ্যে পিবডি পুরস্কার, আন্তর্জাতিক জেন্ডার ইক্যুইটি পুরস্কার এবং এশিয়ান মিডিয়া পুরস্কারের মত বেশ কিছু পুরস্কার জিতে নিয়েছে। সম্প্রতি ভারতে জি নেটওয়ার্ক এই কার্টুনটি প্রদর্শন করা শুরু করেছে। সেইসাথে সিরিজটি মোট চার ভাষা - হিন্দি, ইংরেজি, তামিল এবং তেলুগুতে ডাব করে এখন বিভিন্ন দেশে প্রচারিত হচ্ছে।কার্টুনটি দেখলে কিছুক্ষনের জন্য হলেও বাংলাদেশের 'মিনা'র কথা আপনার মনে পড়তেই পারে। কারণ জিয়া যে বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার তার মধ্যে বেশ কিছু বিষয় বাংলাদেশের মিনাও দর্শকদের কাছে তুলে ধরতো।

- শাইনাম জহির