শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / রায়পুর স্কুলমাঠে ঘুমিয়ে থাকা অজ্ঞাত যুবক
১০/১৩/২০১৬

রায়পুর স্কুলমাঠে ঘুমিয়ে থাকা অজ্ঞাত যুবক

-

চৌদ্দশত পাঁচ বঙ্গাব্দে শীতকাল গাঢ় হয়ে ওঠার পূর্বে এক ভোরে, ভেজা শিশির নাঙা পায়ে মাড়িয়ে হালকা শীত ও কুয়াশার আচ থেকে শরীর বাঁচাতে আঁচলটাকে ভালো করে গায়ে জড়িয়ে, রায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সুবিশাল মাঠের মাঝ বরাবর হেঁটে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় জোনাকির মা। গতরাতে তার ফুলে থাকা বাটলার দুগ্ধবতী ছাগীটা দুটি বাচ্চাসমেত ফিরে না আসায় চিন্তাগ্রস্ত একটি নির্ঘুম রাত পাড়ি দিয়ে, সকালের আলো ফোটবার সাথে সাথে স্কুলমাঠের কোনায় অবস্থিত প্রাচীন নারকেল গাছটার গোঁড়ায় উচু ঢিবিটার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে, গলা উচু করে সামনে তাকিয়ে মাঠের মাঝখানে কালো মতো কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখে, আশান্বিত হৃদয়ে দ্রুত পায়ে মাঠের মাঝখানে এসে সে যা দেখতে পায় তাতে তার চোখ রীতিমতো চড়কগাছ। সে দেখে, এই শীতল ভোরে সারাটা শরীর শিশিরে ভিজিয়ে এক অজ্ঞাত যুবক ঘুমিয়ে আছে টানটান। উত্তরে মাথা আর দক্ষিণে দুটি পা স্বল্প দুরত্বে ছড়িয়ে দিয়ে যুবক শুয়ে আছে নিশ্চিন্ত। স্বামী হারিয়ে বিগত যৌবনা এই নারী এমন পরিস্থিতিতে লোকটাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্তে নিজের করণীয় ঠিক করে উঠতে পারে না। পায়ে পায়ে আরো নিকটবর্তী হয়ে অনুচ্চস্বরে দুটি মেকি কাশি দিয়ে জোনাকির মা ঘুমন্ত যুবকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় বিফল হয়ে তাকে ডেকে তোলবার সিদ্ধান্ত নেয়। ডেকে তোলবার সিদ্ধান্ত নিয়ে সে পূনর্বার দ্বিধান্বিত হয় এই ভেবে যে, ঠিক কী বলে সম্বোধন করা সঙ্গত হবে এই যুবককে? জোনাকির মা’র ষোল বছর বয়সী একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা রয়েছে এবং বয়েস ও শারীরিক কাঠামো বিবেচনায় সকলেই তাকে বিগত যৌবনা বলে রায় দিবে। তাই এই ঘুমন্ত যুবককে সে ভাই না বলে ‘মনি’ সম্বোধন করে প্রথমে নিচু ও পরে চড়া স্বরে ডাকতে থাকে। কিন্তু তার এই ডাকাডাকিতে চুলে শিশির জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা যুবকের মধ্যে কোনো রূপ সচেতনতা পরিলক্ষিত হয় না। এমতাবস্থায় আবারও করনীয় ঠিক করে উঠতে না পেরে ঘুমন্ত যুবকের শরীর ঘিরে পায়চারি করতে থাকে জোনাকির মা।

কিছু সময় কেটে যাবার পর, কুয়াশা আরো একটু ফিকে হয়ে আলো স্পষ্ট হয়ে উঠলে রায়পুর স্কুল মাঠের পাশ দিয়ে ডহরের দিকে বয়ে যাওয়া উচু দীর্ঘ রাস্তাটা ধরে জলিল শেখ তার তেলতেলে বলদ দুটির কাঁধে জোয়াল আর নিজের কাঁধে লাঙল চড়িয়ে ডহরের দিকে যেতে থাকে। বায়ে তাকিয়ে মাঠের মাঝে জোনাকির মা’কে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা চঞ্চল হয়ে উঠে জলিল শেখ টিপ্পনির স্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘কি ভাবি! এই সাত সকালে একলা একলা মাঠের মইদ্যে কী করো?’ জবাবে জোনাকির মা তার মায়ায় আর্দ্র হয়ে আসা কণ্ঠে বলে, ‘জলিল ভাই এট্টু দাঁড়াও! দেখ, কোন এক লোক এই শীতের মইদ্যে এইখানে ঘুমায় রইছে। এত ডাকি লোকটার একদমই কোনো সাড়াশব্দ নাই।’ এই কথায় কোনো কারণ ছাড়াই রহমান ম-লের কথা মনে পড়ে জলিল শেখের। যে তার সাত-সাতটি যুবক পুত্র নিয়ে বিগত কয়েক বছরে আল ঠেলে জলিল শেখের অন্তত দশহাত উর্বরা ধানি জমি দখল করে নিয়েছে। এ বিষয়ে জলিল শেখ কোনো প্রকার প্রতিবাদের সুর তুললেই পুত্রদের নিয়ে রে রে আওয়াজ তুলে তেড়ে আসে রহমান ম-ল। মাত্র কয়েক বছর পূর্বে বংশে ও সম্পত্তিতে তারা দু’জন পরস্পরের সমান থাকলেও শুধু কতকগুলো মারকুটে পুত্রের পিতা হবার জোরে রহমান ম-ল তার বিষয়-সম্পত্তি অনেকখানি বাড়িয়ে নিয়েছে। তাই রহমান ম-লের বিপরীতে হৃতবল জলিল শেখ অবচেতনে তাকে অভিসম্পাত করে, ‘ছেলেদের জোর দেখাস! তোর ওই ছেলে-পিলে ঠাঁটা পড়ে মরবে!’ আর তাই আজ সকালে জমিতে যাবার পথে যখন জোনাকির মা এমন দৃশ্যের কথা বলে তার সাহায্য প্রার্থনা করে তখন জলিল শেখ বলে ওঠে, ‘আর কিডা! দেখ রহমান ম-লের হারামজাদাগুলোর কোনো একটা হবে, গাঁজাগুলি খেয়ে এহানে-সেহানে পড়ে থাকা তো ঐগুলোরই কাজ!’ এ কথা বলতে বলতে হাঁটার গতি একটুও না কমিয়ে উপরন্তু বলদ দুটিকে হাট! হাট! বলে তাড়া দিয়ে জলিল শেখ চলে যায় নিজের পথ ধরে। জোনাকির মা সে উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে সেখানেই থেকে যায় অন্য কারো অপেক্ষায়। বেলা বাড়তে থাকে, কুয়াশা কেটে যায়। আশপাশের বাড়ি-ঘর থেকে একজন দুজন করে লোক জড়ো হয় ঘুমন্ত যুবকের চারপাশে।

জড়ো হওয়াদের একজন হলো ছবুর; ডাবল সিলিন্ডারের ইঞ্জিনওয়ালা ট্রলার চালিয়ে সপ্তাহান্তে খুলনায় যাতায়াত করে। বিজ্ঞোচিতভাবে ঘুমন্ত যুবকের চারপাশে পায়চারি করতে করতে সে জানায়, এ লোকের বাড়ি হলো আরো উত্তরে, বাহিরদিয়া বালুমহলের পেছনে ভাঙন কবলিত গ্রামগুলির কোনো একটার বাসিন্দা সে। লোকটার ছিল পোনা মাছের ব্যবসা। তার ট্রলারে করে অনেকবার বিরাট দুটি এলুমিনিয়ামের হাড়ি নিয়ে সে যাতায়াত করেছে, হাড়িগুলো কখনো খালি কখনো ভরা। যখন ভরা হাড়ি নিয়ে ফিরতো লোকটা, তখন তার হাত দুটি ডোবানো থাকতো হাড়ির ভেতর, বিরামহীন পোনা মাছের শরীর আর পানি থাপড়ে তাতে অক্সিজেন সরবরাহ করতে গিয়ে চুপসে সাদা হয়ে উঠতো তার হাত। তীব্র রোদ কিংবা ভীষণ বৃষ্টিতেও লোকটা এতটুকু বিচলিত না হয়ে হাড়ির পানিতে অক্সিজেন সঞ্চালনের কাজ চালিয়ে যেত। ছবুর সকলকে লোকটার হাতের দিকে দৃষ্টি দিতে বলে, ‘দেখছো না? হাতগুলো কেমন মরা মাছের মতো সাদা।’ এ কথায় জোনাকির মা ঝুকে পড়ে লোকটার হাতের দিকে তাকায়, তাকায় অন্যেরাও। শ্যামলা বর্ণের স্বল্প পশমওয়ালা হাতের দিকে তাকিয়ে তারা ছবুরের কথার বিশেষ সত্যতা খুঁজে পায় না। ঠোঁট উল্টে একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাইয়ি করে।

আরো কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুলমাঠে অজ্ঞাত যুবকের ঘুমিয়ে থাকার সংবাদ জনান্তিকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামময়, বাজার থেকে খেয়াঘাট, সর্বত্র। এ খবর শোনার পর কুদ্দুস মাঝি তার হাতের বৈঠাটা নদীর পাড়ের নরম মাটিতে পুতে নৌকোটাকে বেঁধে রেখে চলে আসে স্কুল মাঠে। বাজার পাড়ি দিয়ে আসবার সময় পান-বিড়ির চালু দোকানটা বন্ধ করে তার সঙ্গী হয় দোকানদার তাঁরা মিয়াসহ বাজারে হেঁটে বেড়ানোদের আরো অনেকে। এভাবে রায়পুর বাজার ও গ্রাম থেকে পিল পিল করে আসতে থাকা মানুষের শরীরের ধাক্কায় ক্রমশ রায়পুর স্কুলমাঠে জমে থাকা কুয়াশা কেটে যেতে থাকে। স্কুল মাঠে ঘুমিয়ে থাকা যুবককে ঘিরে তখন জমে উঠেছে দারুণ এক জটলা। সকলেই একবার করে জোনাকির মা’য়ের কাছে জানতে চাচ্ছে, ‘বিষয়টা কী? তুমি কিভাবে কী দেখলে?’ জোনাকির মা-ও দারুণ উৎসাহে সবাইকেই বলে যাচ্ছে গতরাতে তার বাচ্চাসমেত হারিয়ে যাওয়া ছাগীটার গল্পসহ তার দেখা পুরো ঘটনা।

কুদ্দুস মাঝি গোল হয়ে থাকা মানুষদের বুকের ওপর হাত দিয়ে ঠেলে জায়গা করে নিয়ে যুবকের ঘুমন্ত শরীরটাকে প্রদক্ষিণ করে জানায়, গত এক সপ্তাহব্যাপী ঘাটের ঐপারে সে এই লোককে চিন্তাক্লিষ্ট মুখে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। পুরো দিনে অগণিত বার অগণন সংখ্যক লোক নিয়ে সে এপার-ওপার করলেও প্রতিবারই সে এই যুবককে একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। এবং এই এতগুলো দিনব্যাপী সে কখনোই এই যুবকের মধ্যে নদী পাড়ি দেবার কোনো রকম তাড়া কিংবা লক্ষণ কোনোটাই প্রত্যক্ষ করে নাই। গতকাল সন্ধ্যায় যখন, এ বছর প্রথমবারের মতো তীব্র উত্তরে বাতাস ধেয়ে এসে কুদ্দুস মাঝির ডান হাতের কনুইয়ের পুরোনো ব্যথাটাকে উষ্কে দেয়, তখন সে সেদিনের মতো আর নৌকো না বাইবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং যখন সে শুন্য নৌকোটা বেয়ে নদীর এপাড়ের ঘাটে ফিরে আসবার জন্য বৈঠা তোলে তখন সেখানে পাঁচ-ছয়জন অচেনা লোক এসে হাজির হয়। লোকগুলোকে দেখে কুদ্দুস মাঝি তার ভাসিয়ে দেওয়া নৌকো ঘুরিয়ে ঘাটমুখি করে অভ্যাসবশত তাদের তাড়া দেয়, ‘ভাই, তোমরা তাড়াতাড়ি উঠে পড়!’ লোকগুলোর কেউ-ই তার নৌকোয় না উঠে কর্কশ গলায় উল্টো তাকে দ্রুত ঘাট ছেড়ে চলে যাবার হুকুম করে। তাদের হুকুমে কুদ্দুস মাঝি যথেষ্ট ভয় পেয়ে কনুইয়ের ব্যথা বিস্মৃত হয়ে নৌকো ঘুরিয়ে দ্রুতই এইপারে চলে আসে। আসবার সময় পেছন থেকে সে প্রথমে খানিকটা ধ্বস্তাধস্তি ও পরে এই যুবকের, ‘আমারে নিয়ো না ভাই, আমারে কই নিয়ে যাইতেছ?’ জাতীয় আর্তনাদ শুনতে পায়। কুদ্দুস মাঝির এই বিবরণ শুনে সকলেই আবার ঝুকে পড়ে ঘুমন্ত যুবকের দিকে, তারপর আবার কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে বলে, ‘নাহ্! ধ্বস্তাধস্তি হলি তো তার শরীরে মাটি-কাঁদা লাইগে থাকার কথা, দেহ না নীল রংয়ের প্যান্টটা তার এহনো কেমন চকচকে?’ কুদ্দুস মাঝি তারপরও জোর দিয়ে বলে, ‘তোমরা যা-ই কও না কেন, আমি কিন্তু ভুল দেখি নাই।’

ওপার থেকে আসা ইট ভাটার শ্রমিক সরবরাহকারী, সবাই যাকে ‘ভাটার দালাল’ বলে চেনে সে এবার মুখ খুলে জানায়, এই লোকটা সাত-আট দিন আগে দুপুর গড়িয়ে গেলে একবার ভাটায় এসেছিল তার মালিককে খুঁজতে। তবে ইট ভাটার শহরবাসী মালিককে খুঁজে না পেয়ে সে তার কাছে আসে। প্রথমে সে ভেবেছিল লোকটা হয়তো কাজের সন্ধানে এসেছে এবং সেই ভাবনা থেকে তাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই ‘ভাটার দালাল’ সেখানে কাজ পাবার জন্য তার কাছে জামানতস্বরুপ পনেরোশত টাকার কথা বলে, এবং সেকথা শুনে লোকটা কটমট চোখে তার দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, ‘ম্যানেজার কোথায়?’ সে তখন ম্যানেজারের কক্ষ দেখিয়ে দেয়। ম্যানেজার সাহেব ঐ সময়ে তার কক্ষেই অবস্থান করছিল। লোকটা চলে যাবার পর ম্যানেজারের রুমে ঢুকে সে দেখতে পায়, এই শীতে ভীষণ ঘেমে নেয়ে ওঠা ম্যানেজার তার মাথার ওপরের চার পাখাওয়ালা বৈদ্যুতিক ফ্যানটাকে ঝড়ের গতিতে চালিয়ে দিয়ে রুমালে মুখের ঘাম মুছে নিচ্ছে। এবং সে তাকে বিশেষ কিছু না জানিয়ে, সবকিছু দেখে রাখার নির্দেশ দিয়ে দ্রুতই নিজের পুরাতন ভেসপাটাতে স্ট্যার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে নিজের কলাপ্সিবল লৌহ দরজাওয়ালা বাড়িটার দিকে চলে যায়। ঘুমন্ত যুবককে ঘিরে থাকা মানুষেরা ‘ভাটার দালালে’র দেওয়া এহেন তথ্যকে এবার আর যাচাই-বাছাই করার সুযোগ পায় না। এবং সর্বাংশে এ তথ্য তারা বিশ^াস না করলেও উড়িয়ে দেবার সাহস পায় না।

এবার জমে ওঠা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ অক্ষরের ‘মোবাইল টু মোবাইল’-এর দোকানদার, শৌখিন যুবক ইউছুব আলির লুঙ্গির খুটে গুজে রাখা বড়-সড় কালো মোবাইল ফোনটা বেঁজে ওঠে। লুঙ্গির খুট থেকে মোবাইল ফোন বের করতে করতে জটলা ছেড়ে কিঞ্চিৎ পাশে চলে যায় ইউছুব আলি, তারপর রিসিভ বাটন টিপে মোবাইলটাকে কানে চেপে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘না! না! হ্যা! হ্যা! আমি দোকানে নাই। এখানে নেটওয়ার্ক সমস্যা, আপনি অধা ঘন্টা পরে কল করেন।’ ইউছুব আলির চিৎকার করে বলা কথায় উপস্থিত অনেকের দৃষ্টি তার ওপর নিক্ষেপিত হয়। কান থেকে ফোন নামিয়ে পুনরায় লুঙ্গির খুটে গুজে নিতে নিতে ইউছুব আলি সকলের উদ্দেশে বলে, এই লোককে তোমরা চিনতে পারো নাই। চিনতে পারবাও না। ওর বাড়ি হলো আমতলির দিকে। বেশ কয়েক দিন হয় সে আমার দোকানে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইলে কথা বলেছে। আমি তার কথায় বুঝতে পেরেছি, সোনাকান্দি ইউনিয়নের দোর্দ- প্রতাপ চেয়ারম্যান হাজি আসগর আলীর মেঝ কন্যার সাথে লোকটার ছিল গভীর প্রেম। ইউছুব আলি সকলকে জানায়, মেয়েটা একদিন বোরখা পরে তার দোকানেও এসেছিল। এবং তার পরদিন দশখানা মোটর সাইকেল ভরে চেয়ারম্যানের লোকেরা এসেছিল লোকটার খোঁজে, খুঁজে না পেয়ে ইউছুব আলিকে শাসিয়ে গেছে তারা, ‘খবরদার! আর কখনো যদি ওকে তোর দোকানে বসতে দেখেছি তো জানে মেরে ফেলবো।’ ইউছুব আলি বলে, এই ঘটনা ঘটেছে আরো দশ-পনেরো দিন পূর্বে। এই ঘটনার পর লোকটা কখনোই আর তার দোকানে আসে নাই, এমনকি ইউছুব আলি তাকে কখনো আর বাজারেও দেখে নাই। সকাল থেকে জোনাকির মা ঘুমিয়ে থাকা লোকটার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে এতক্ষণে বেশ খানিকটা মায়ায় পড়ে যায়। আর ঘুমিয়ে থাকা লোকটার বিষয়ে এরূপ একটি গল্প শোনার পর, স্বামীহারা জোনাকির মায়ের গলার আলজিভওয়ালা জায়গাটাতে কেমন যেন একটু ব্যথা-ব্যথা করে। তার আর কথা বলতে ইচ্ছে হয় না।

ইউছুব আলির কথা শেষ হলে দোকানদার তারা মিয়া তার পানের রসে ভরে ওঠা গাল থেকে কিছুটা পিক অন্য একজনের চাদরে ফেলে একটা মৃদু হইচই তৈরি করে। তারপর চাপা স্বরে সকলকে, বিশেষত: যারা সেদিন রাত্রে বাজারে উপস্থিত ছিল না তাদেরকে, সেদিন রাত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বলাবাহুল্য, এখানে উপস্থিত লোকদের মধ্যে সে ছাড়া আর বিশেষ কেউ সে রাতে বাজারে উপস্থিত ছিল না। তারা মিয়া জানায়, শীতের শুরুতে সেদিন ছিল হাটবার। সন্ধ্যা থেকেই কুয়াশার বাড়াবাড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিদিন পালাক্রমে বাজার পাহারায় নিয়োজিত পনেরো জনের দলটি ঘন অন্ধকার আর কুয়াশায় রাতের প্রথম প্রহরেই বাজারের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আড্ডা দিতে থাকে। তারা মিয়াসহ অপেক্ষাকৃত বয়েসিদের সাতজনের দলটি শরীরে আলোয়ান চাপিয়ে জড়োসড়ো হয়ে অবস্থান করছিল চৌরঙ্গির প্রাচীন আমগাছটার নিচে। তারা মিয়া জনায়, রাতের দ্বিপ্রহরে দলের সর্দারকে কিছু না জানিয়ে ছোকড়া বয়েসি পাহারাদারেরা একে একে বিদায় নিয়েছিল। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর রাতের শেষ প্রহরে যখন তাদের ঘিরে থাকা ক্লান্ত কুকুর চারটি দুটি জোড়ায় বিভক্ত হয়ে উত্তর দিকের রাস্তাটা ধরে কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে যায় তখন তারাও একে একে কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে পরস্পর বিদায় গ্রহণের প্রস্তুতি নেয়। ভাগ্যিস তারা মিয়া তার হাতের বল্লমটা কিছুক্ষণ আগেই নিজের দোকানের ঝাপি ফাঁকা করে তার মধ্যে চালিয়ে দিয়ে শুন্য হাতে সকলের মাঝে এসে দাঁড়ায়।

এমন সময় পশ্চিম দিকের রাস্তাটা ধরে কুয়াশা ভেদ করে জোনাকির আলোর মতো কতগুলো বিড়ির আগুনকে তারা এক সাথে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসতে দেখে। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দশ-বারো জনের একটি সশস্ত্র দল তাদের সামনে চলে আসে, এবং বলে, ‘খবরদার! কেউ দৌঁড় দিলে তার মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া হবে। তারা মিয়া পায়ে পায়ে একটু সরে দাঁড়িয়ে পেছনের নদীমুখি রাস্তাটার দিকে তাকায় এবং সেদিক থেকেও সে অনুরূপ আরো একটি দলকে উঠে আসতে দেখে। পঁচিশ-ত্রিশ জনের দুটি দল একত্রিত হয়ে তাদের ঘিরে ধরে। এবং পশ্চিম দিক থেকে আসা দলটির পুরোভাগে থাকা কাঁচা-পাকা দাড়িওয়ালা লোকটি তার কাঁধের রাইফেলটি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। কাঁচা-পাকা দাড়িওয়ালা এবার হাতের রাইফেল নাচিয়ে জানতে চায়, ‘তোমরা এখানে কী করছো?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তারা মিয়ার ভাষ্যমতে, তাদের অর্থাৎ পাহারাদার দলের সর্দার আমতা-আমতা করে ঠিক যুতসই কোনো উত্তর দিতে সক্ষম হয় না। তখন বাধ্য হয়ে তারা মিয়াকে এগিয়ে আসতে হয়, এগিয়ে এসে সে জানায়, জনাব, আমরা এই বাজারের দোকানদার, একইসাথে বাজারের আশপাশের বাসিন্দা। আমরা আমাদের দোকান-সম্পত্তি চোর-ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পাহারা দেই। এমন বিনয়ী উত্তরে কাঁচা-পাকা দাড়ির রাইফেলওয়ালা খেকিয়ে উঠে বলে, ‘সত্যি করে বল! কে তোদের পাহারায় নিযুক্ত করেছে? তারা মিয়া এবার কাতর স্বরে জবাব দেয়, ‘পুলিশ’। এমন সময় ক্ষুদে স্বর্ণব্যবসায়ী বাসুদেব কর্মকার বিড়বিড় করে বলে ওঠে, ‘আমাদের বাজার আমরা পাহারা দেব না?’ বাসুদেব কর্মকারের এ কথায় রাইফেলওয়ালা বিদ্যুৎগতিতে রাইফেলটাকে বাম হাতে নিয়ে ডান হাত দিয়ে এক প্রচ- চড় কষে দেয় বাসুদেবের গালে। সেই কুয়াশা ঘেরা অন্ধকারেও তারা মিয়া বাসুদেবের চোয়াল থেকে ধোয়া উড়ে যেতে দেখে। তারপর রাইফেলওয়ালা চিৎকার করে তাদের জানিয়ে দেয়, ‘পুলিশ হলো জনগণের শত্রু! এবং তাদের কথায় কিছুই করা যাবে না। আজ থেকে এই জনপদ-বাজার সবকিছুই থাকবে তাদের নিয়ন্ত্রণে, বাজারে পাহারা দেবার কোনো প্রয়োজন নেই।’ এই কথা বলে তারা মিয়াসহ অন্যান্যদের হাতের ড্রাইসেল ব্যাটারি চালিত এলুমিনিয়ামের টর্চগুলো তারা নিয়ে নেয়। এবং যাবার সময় বলে যায়, তোমরা এখানে থাকো! আমারা ফেরার সময় তোমাদের টর্চগুলো দিয়ে যাবো। তবে তাদের চলে যাবার প্রায় সাথে সাথেই টর্চের মায়া ত্যাগ করে যে যার পথ ধরে ঘরে ফিরে যায়। তারা মিয়া এই গল্পটি সকলকে শুনিয়ে পুনরায় ঘুমিয়ে থাকা যুবকের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে, হ্যা! এই সেই যুবক যে নদী থেকে উঠে আসা পূর্ব দিকের দলটির অগ্রভাগে ছিল এবং সে রাতে তার কাঁধেও একটি দশাসই রাইফেল ঝুলছিল। তারা মিয়ার উপস্থাপিত এই বিশদ গল্প উপস্থিত মানুষের কেউ বিশ^াস করে, কেউ করে না। তবে তারা মিয়ার গল্প শেষ হলে অনেকেই ঘুমন্ত যুবককে রেখে স্থানত্যাগ করে।

এভাবে ঘুমন্ত যুবককে ঘিরে নানা জল্পনা-কল্পনার ভিতর দিয়ে বেলা প্রায় দশটা বেজে গেলে দীর্ঘ বছরব্যাপী গোসলে অনীহ সিরাজ পাগলা তার শরীর ও গালের তীব্র দুর্গন্ধ আর মাথার উপর উড়তে থাকা অজস্র মাছিদের নিয়ে সেখানে এসে হাজির হয়। ঘটনাস্থলের আরো কাছে তাকে এগিয়ে আসতে দেখে অনেকেই তার শরীরের ছোঁয়া থেকে নিজের শরীর বাঁচাতে সরে দাঁড়ায়। সিরাজ পাগলা যুবকের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তার মাথার উপর পাক খেতে থাকা অগণন মাছিদের একটি দল নেমে এসে ঘুমন্ত যুবকের গাল-মাথায় বসে ভন-ভন শব্দ তুলে নাচতে থাকে। ঘুমন্ত যুবকের শরীর ঘিরে মাছির এমন উড়া-উড়ি দেখে জোনাকির মা’সহ অনেকের সন্দেহ হয়, এই যুবক মৃত কি না? এমন ভাবতে ভাবতেই তারা উত্তর দিকের রাস্তা ধরে রায়পুর থানার হাবিব দারোগাকে অপর একজন পুলিশসহ এগিয়ে আসতে দেখে।
দারোগা হাবিব মিয়া সেখানে উপস্থিত হয়ে তার হাতে থাকা কাগজ-কলম বাড়িয়ে ধরে জোনাকির মা’সহ উপস্থিত তিন ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা লিখে নেয়। তারপর রায়পুর স্কুল মাঠের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা উল্লেখ করে লিখতে থাকে, ‘আমি এসআই মোঃ হাবিব মিয়া সঙ্গীয় কং-১৭১৫/রমজান আলিসহ বর্ণিত ঠিকানায় অদ্য অঘ্রাণ ২৯, ১৪০৫ সময় সকাল ১০ ঘটিকায় উপস্থিত হইয়া মৃতের লাশ উত্তর দিকে মাথা ও দক্ষিণ দিকে পা, ফাকা পা দুটি একটি অপরটির থেকে একফুট দুরত্বে অবস্থান করিতেছে এইরূপ দেখিয়া উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্য হইতে জনাব তারা মিয়া, বয়স আনুমানিক ৪৮-এর সহযোগিতায় এবং পাশের্^ লিখিত সাক্ষীদের মোকাবেলায় উক্ত লাশের সুরতহাল প্রস্তুত করিতে আরম্ভ করিলাম।’

‘মৃতের নামঃ অজ্ঞাত, পিতার নামঃ অজ্ঞাত, সাং-অজ্ঞাত। বয়সঃ আনুমানিক ৩০ বছর হইবে। পরনে নীল রঙের আধা পুরাতন জিন্সের প্যান্ট ও গায়ে উলের তৈরি কালো রঙের গলা ঢাকা মোটা সোয়েটার ছাড়াও মৃতের পায়ে সদ্য কেনা কালো রঙের চামড়ার স্যান্ডেল পরিহিত অবস্থায় পাওয়া গেল। মৃতের মাথার চুল আনুমান হয় ২ ইঞ্চি লম্বা। চুলের বর্ণ ধুসর, অনুমান হয় মৃতের মুখে সপ্তাহখানেক ব্যাপী দাড়ি কাটা হয় নাই। চক্ষু দুইটি সম্পূর্ণ মুদিত। নারারন্ধ্রদ্বয় পরিষ্কার। দুটি ঠোঁট পরস্পরের সাথে মিলিত অবস্থায় রহিয়াছে এবং সে স্থলে শ্লেস্মা বা কোনো আঘাতের চিহ্ন নাই। হাত দুটি শরীরের সহিত সোজাসুজি। হাতের কব্জি পর্যন্ত উলেন সোয়েটারে আবৃত। আবৃত অবস্থায় প্রাথমিক দেখায় মৃতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেল না। উপস্থিত সাক্ষি তারা মিয়ার সহয়তায় মৃতের লাশ ওলট-পালট করিয়া...’

এই পর্যন্ত লিখে হাবিব দারোগা তার সঙ্গীয় কনস্টেবল রমজান আলি ও তারা মিয়াকে ঘুমন্ত যুবকের হাত-পা ধরে উল্টে ফেলার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ পেয়ে কনস্টেল রমজান যুবকের দুটি হাত ও তারা মিয়া দুটি পা ধরে যখন উচু করে তখন, গলা ঢাকা সোয়েটারের আড়ালে জবাইকৃত মু-ুটি ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে এতক্ষণ যারা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে নানা জল্পনা-কল্পনায় মেতে উঠেছিল তাদের অনেকেই দৌঁড়ে স্থান ত্যাগ করে। শুধু জোনাকির মা মুখে আঁচল চেপে ‘আল্লারে’ বলে চিৎকার দিয়ে সেখানেই মূর্ছা যায়।

খালিদ মারুফ