শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / ফুটবল পায়ে একদল কিশোরী এবং স্বপ্নযাত্রার সূচনা
১০/১০/২০১৬

ফুটবল পায়ে একদল কিশোরী এবং স্বপ্নযাত্রার সূচনা

-

‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’-এমন এক শব্দগুচ্ছ, যার অনুপিস্থিতি একটি জাতির অস্তিত্বে¡ সরাসরি আঘাত হানে। আপাতদৃষ্টিতে এদেশের সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন হলেও অজ পাড়াগাঁয়ের কিশোরীর ক্ষেত্রে তা কতটুকু সত্য, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় এ দেশের অনেক প্রান্তে মেয়েদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই, অথবা থাকলেও তা পরিবার বা অল্পবিস্তর পড়াশোনা Ñ এসবেই সীমাবদ্ধ। তবে গ্রামের কোনো এক কিশোরীর চোখে স্বপ্ন যদি হয় ফুটবল খেলা, তবে তা ভ্রু-কুঁচকে যাওয়ার মতো বিষয় বৈকি। আর গতানুগতিক বাঁধাধরা নিয়মে অভ্যস্ত চোখ কপালে ওঠার অবস্থা হয়, যখন একদল কিশোরীর ফুটবল খেলার স্বপ্নই একদিন দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনে। সম্প্রতি এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে একের পর এক গৌরবময় বিজয় ছিনিয়ে আনা একদল স্বপ্নবিলাসী কিশোরীর কথা থাকছে এই লেখায়।


অনূর্ধ্ব-১৬ প্রমীলা ফুটবল দল : লড়াই যখন শত প্রশ্নের সঙ্গে

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ প্রমীলা ফুটবল দলের কোচ গোলাম রব্বানীকে প্রায়ই একটি প্রশ্নের
সম্মুখীন হতে হতÑ ‘এই মেয়েরা কি ৯০ মিনিট ফুটবল খেলতে পারবে?’ ভাবুক মনে কিছুক্ষণ চিন্তা করলে অল্প কয়েকটি শব্দের এই প্রশ্নটির সঙ্গে এমন হাজারো প্রশ্নের মিল খুঁজে পাবেন। যুগে যুগে যেসব প্রশ্ন পুরুষ-প্রধান সমাজে নারীর ভূমিকা ও সামর্থ্যকে বারবার অবহেলা করেছে। একই সঙ্গে খুঁজে পাবেন সেসব প্রশ্নকর্তাদের মুখ, যাদের কদর্য হাসির আড়ালে নারীর প্রতি অনুচিত নির্দেশ রয়েছে বলা হয়েছে ঘরের ঐ কোণটাতেই তোমার স্থান, এসব ‘পুরুষের কাজ’ তোমায় মানায় না।

এমনই হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েই চলতি বছরের ২৭ অগাস্ট শক্তিশালী ইরানের বিরুদ্ধে মাঠে নামে প্রশ্নবিদ্ধ এই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা ফুটবল দল। ফলাফল ৩-০ ব্যবধানের সহজ জয়। অনূর্ধ্ব-১৬ দলের খেলোয়াড় মার্জিয়ার প্রথম গোলের পর থেকে প্রতিযোগিতার শেষ ম্যাচ পর্যন্ত এই স্বপ্নবিলাসী কিশোরীদের জয়রথ কখনো থামেনি।

পরের ম্যাচেই সিঙ্গাপুরের জালে পাঁচ গোল তারই প্রমাণ। তবে অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা এবং নানা প্রশ্নের বেড়াজালে বন্দি কিশোরীরা সব শেকল ভেঙে নিজেদের আসল রূপ দেখালেন এর পরের ম্যাচে। তাই কিরঘিজস্তানের বিরুদ্ধে ১০-০ স্কোরলাইনটা সেদিন নিছক একটা জয়ই ছিল না, বরং বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলের অগ্রযাত্রার পথে নতুন মাইলফলক অতিক্রমের নিদর্শন ছিল। শারীরিকভাবে তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী কিরঘিজদের বিপক্ষে বাঙালি কিশোরীদের এই বিশাল জয় একই সঙ্গে সানজিদা, মার্জিয়া কিংবা আনুচিংদের সামর্থ্য নিয়ে করা প্রশ্নগুলোর উপযুক্ত জবাব হয়ে এসেছে।

জেনে রাখা ভালো, ২০১৫ সালের এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে ভুটানকে ১৬-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ দল, যার বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই এখন এই অনূর্ধ্ব-১৬ দলের সদস্য। বাকি দুই ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ৪-২ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ৪-০ গোলের সহজ জয় বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো নিয়ে গিয়েছে অনূর্ধ্ব-১৬ এএফসি মহিলা টুর্নামেন্টের মূল পর্বে। আগামী বছর থাইল্যান্ডে এশিয়ান পরাশক্তি উত্তর কোরিয়া, চীন বা জাপানের সঙ্গে একই মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন কৃষ্ণা রানীরা, যা দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক কথায় অনন্য প্রাপ্তি বলা চলে।

ফুটবল-জাদুকরদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এবার জানা যাক, সেই স্বপ্ন-বিলাসী কিশোরীদের সম্পর্কে। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় অনূর্ধ্ব-১৬ দলটির অধিনায়ক কৃষ্ণা রানীর কথা। প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে সর্বাধিক আট গোল করেছেন মাঠে ও মাঠের বাইরে সমান দায়িত্বশীল এই প্রতিভাময়ী ফুটবলার। একের পর এক গোল করার পাশাপাশি তার যোগ্য নেতৃেত্বর ফলেই এই সাফল্য ধরা দিয়েছিল।

প্রতিযোগিতায় সানজিদার খেলা যারা দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই অনুভব করেছেন কী অদম্য প্রতিভা নিয়ে জন্মেছেন এই কিশোরী! বিশেষ করে তার কর্নার এবং ফ্রি-কিক নেয়ার সামর্থ্য দেখে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের এক ফুটবলার পাওয়ার আশা করাটা মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না।

প্রতিযোগিতায় পাঁচ গোল করা আনুচিং মারমা এবং চার গোল করা শামসুন্নাহারের কথাও বলতে হয়। তাদের ফুটবল-শৈলী অনেকেরই মন কেড়েছে। এছাড়া অসম্ভব পরিশ্রম করে খেলা মৌসুমী, মার্জিয়া কিংবা মাহমুদাসহ বাকিদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। অদম্য এই কিশোরীদের আপ্রাণ চেষ্টার ফলেই অনেকদিন পর ফুটবলে কিছুটা হলেও সাফল্যের মুখ দেখলো বাংলাদেশ।

এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ফুটবল প্রতিযোগিতায় লাল-সবুজ পতাকা বহন করে চলা এই কিশোরীদের সাফল্য কিছুদিন পর হয়তো সবার মনে থাকবে না। এই তো অল্প কিছুদিন আগেই লোকাল বাসে করে ঈদে বাড়ি ফিরতে গিয়ে ভোগান্তির সম্মুখীন হলেন এই কিশোরীরা।

তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি এই অনূর্ধ্ব-১৬ দলটিকে নিয়ে এক বছরের বিশেষ পরিকল্পনার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলে একদিন হয়তো এই কিশোরীরাই এশিয়া জয় করে বাকি বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম হবে। তাই কিশোরীর পায়ে নূপুরের পাশাপাশি ফুটবল তুলে দেয়াটা এখন আর অবাক হওয়ার বিষয় নয়। একই সঙ্গে বলতে হয় ‘রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার’-এর পাশাপাশি কবির চোখে স্বাধীনতায় ‘গ্রাম্য মেয়ের অবাধ ফুটবল খেলা’ যোগ করার সময়ও বোধহয় এসে গিয়েছে।

- নাসিফ রাফসান