শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / স্পটলাইট:আনুশেহ হোসেন ও নারী-অধিকার
১০/০১/২০১৬

স্পটলাইট:আনুশেহ হোসেন ও নারী-অধিকার

-

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সীমারেখা পেরিয়ে যে-ক’জন বাংলাদেশি নারী নিজ কর্মের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম সাংবাদিক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আনুশেহ হোসেন। ফোর্বস উম্যান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কিংবা দ্য হাফিংটন পোস্টের মতো বিশ্বনন্দিত সংবাদপত্রগুলোতে তার লেখনী অথবা নারী-অধিকার এবং সমসাময়িক রাজনীতি সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রচারমাধ্যমে তার বলিষ্ঠ বক্তব্যের জন্য বর্তমান সময়ের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। সম্প্রতি ‘শি-রাইটস’ নামক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে নিজের কর্মজীবন এবং বিশ্বব্যাপী নারীর সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এই ওয়াশিংটনভিত্তিক বাংলাদেশি সাংবাদিক। যার অনুলিপি থাকছে লেখার পরবর্তী অংশে।

প্রশ্ন : সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলাদেশে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য মাইক্রো-ফাইন্যান্স কর্মসূচিতেও কাজ করেছেন আপনি। নারী-অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করা এক কথায় বেশ চ্যালেঞ্জিং বলা চলে। আপনার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? এই ক্যারিয়ারে আসতে ইচ্ছুক এমন পাঠকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ আছে কি?

আনুশেহ হোসেন : আমার শুরুটা ‘ব্র্যাক’-এ ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ অলাভজনক এনজিও হিসেবে ব্র্যাক অনেক আগেই বাংলাদেশের নারীসমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য মাইক্রো-ফাইন্যান্স কর্মসূচি চালু করেছে। এখানে কাজ করার মাধ্যমে আমি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা পরবর্তীকালে আমাকে একজন নারীবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে একজন মানুষ হিসেবে নারীর যেসব অধিকার রয়েছে, সে-সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা পেয়েছি।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নিম্নবিত্ত মানুষগুলো টাকার অভাবে নিজ থেকে কিছু করার সুযোগ পায় না। আর গোটা বিশ্বের নিম্নবিত্ত মানুষদের অধিকাংশই নারী। তবে একই সঙ্গে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই একটি দেশের সেরা সম্পদ এবং বিনিয়োগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। এই নিম্নবিত্ত নারীদের হাতে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে টাকা তুলে দেয়ার চিন্তাধারা সমাজে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এক্ষেত্রে বলতেই হয় নারীদের উপর বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে কম সময়ে বিনিয়োগকৃত অর্থ ফিরে পাওয়া যায়। এই নারীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সামর্থ্য বিচার করলে আমরা বুঝতে পারবো নারীর শ্রমের উপর বিনিয়োগ করা আসলে নিজ দেশের জন্য বিনিয়োগ করার মতো ব্যাপার।

ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত যা করতে পেরেছি, তাতে আমি গর্বিত। তবে এর সঙ্গে এটাও জানি, নারী-অধিকার রক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলোতে এখনো অনেক কাজ করা বাকি। এক্ষেত্রে পাঠকদের আমি প্রথমেই বলবো, ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন। নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে দেখুন আপনার দেশের নারীরা সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে কী ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করছে। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশপাশি এক-দু’টি বিদেশি ভাষা শিখে নিলে ক্যারিয়ারে বেশ কাজে লাগবে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও প্রচার মাধ্যমে নারীর অবস্থান খুব একটা সুবিধাজনক নয়। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর কণ্ঠ কারো কানে পৌঁছায় না। এক্ষেত্রে একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? বিশেষ করে আপনি রাজনীতির মতো ‘পুরুষ-প্রধান’ ক্ষেত্র কিংবা লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে অনেকবার বক্তব্য দিয়েছেন।

আনুশেহ হোসেন : ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বহু বছর ধরে সমাজের বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নারীরা বারবার অত্যাচারিত হয়েছেন, তাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ সংস্কৃতিতেই পুরুষকে পরিবার-সমাজ তথা দেশের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা নারীর নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে। নারীদের সবসময় চুপ করে থাকতে বলা হয়েছে, এমনকি যৌন-নিপীড়নের শিকার হওয়ার পরও।

আপাতদৃষ্টিতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষ সমতা রয়েছে। তবে অনলাইনে নারীদের নিয়ে বানানো ট্রলগুলোতে চোখ রাখলেই প্রকৃত সত্যটা দেখতে পাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের নারী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে নারী-অধিকার রক্ষায় কর্মরত ব্যক্তিরা প্রায়ই এ ধরনের অনলাইন ট্রল কিংবা হেইট-মেইলের শিকার হচ্ছেন। তাই এখন পাবলিক প্লেসগুলোর পাশাপাশি ভার্চুয়াল দুনিয়ায়ও নিজেদের অধিকার রক্ষায় সংগ্রাম শুরু করার সময় এসেছে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রে এবারের নির্বাচনে নারীদের প্রধান ভূমিকা থাকবে বলে বলা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবেও একজন নারীকে দেখা যেতে পারে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এদেশের নারীদের হাতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর মার্কিন নারীদের এই সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

আনুশেহ হোসেন : অবশ্যই তারা যোগ্য, হয়তোবা ভিন্ন উপায়ে। হিলারি-বিদ্বেষীরা ইতোমধ্যেই এই নারীদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে প্রশ্ন করার আগে আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে, এই নারীরাই মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষিত প্রজন্মের অংশ এবং তারা মূলত কোনো নারী বা পুরুষ নয় বরং প্রতিনিধিদের বিভিন্ন পলিসি পর্যবেক্ষণ করে ভোট দিতে যাবেন। তাছাড়া ব্যাপারটা তো এমন নয় যে, এর আগে কখনোই কোনো নারী প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়েননি।

এক্ষেত্রে বলতেই হয়, আমি আসলেই জানি না, একজন নারী কী ভেবে ট্রাম্পকে ভোট দেবেন। লোকটা দিনের পর দিন নারীদের সম্পর্কে কটূক্তি করে যাচ্ছে এবং নারীর প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধাই নেই।

প্রশ্ন : আপনি ফোর্বস ম্যাগাজিনে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে লিখছেন। তো আপনার সবচেয়ে প্রিয় সাফল্যের গল্প কোনটা?

আনুশেহ হোসেন : খুব ভালো প্রশ্ন। আসলে ফোর্বস ম্যাগাজিনে যাদেরকে নিয়ে লিখছি, তাদের সবাই আমার প্রিয়। আমি সবসময় সেসব নারীদের পক্ষে, যাদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা এবং যোগ্যতা রয়েছে, যারা স্বপ্ন দেখতে জানে এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু করে। আত্মবিশ্বাসী এবং স্পষ্টভাষী নারীরা সবসময় আমাকে প্রেরণার উৎস।

প্রশ্ন : কিন্তু যদি একজনকে বেছে নিতে হয়, তবে রোল-মডেল হিসেবে আপনি কার নাম বলবেন?

আনুশেহ হোসেন : নিঃসন্দেহে আমার মায়ের কথা বলবো। আমার দেখা প্রথম নারীবাদী ব্যক্তি আমার মা এবং তিনি এখনো বাংলাদেশে নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর বদলে মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন সেমিনারে যেতাম আমি। অল্প বয়সেই নারী-অধিকারের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে মা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। মা সবসময় চাইতেন আমি এবং আমার বোনরা যেন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে নারীদের জীবন সম্পর্কে জানতে পারি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন আমরা এখনো এমন একটা বিশ্বে বসবাস করছি, যেখানে বিশাল সংখ্যক নারী খাদ্য, চিকিৎসা এবং শিক্ষাসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। আমি যা কিছুই করেছি, তার পিছনে মায়ের অবদান রয়েছে এবং তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

-অনুবাদঃ মুহাম্মদ রিদোয়ান