শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / এগারো নারীর হাতে শীর্ষদশ ২০১৫ সম্মাননা
০৯/০৬/২০১৬

এগারো নারীর হাতে শীর্ষদশ ২০১৫ সম্মাননা

-

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলো অনন্যা শীর্ষদশ-২০১৫ প্রদান অনুষ্ঠানে। দশটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার ১১ জন বিশিষ্ট নারীকে দেয়া হলো অনন্যা শীর্ষদশ ২০১৫ সম্মাননা। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠানের। কৃতী নারীদের দেয়া হয় উত্তরীয়, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। সম্মাননা তুলে দেন নারী আন্দোলনের তিন বিশিষ্ট নেত্রী মাহফুজা খাতুন, খুশী কবির এবং ডা. দীপু মনি। ফ্যাশন হাউস বিবিয়ানার পক্ষ থেকে সম্মাননা জয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সৌজন্য উপহার।
অনন্যার সম্পাদক ও প্রকাশক তাসমিমা হোসেনের সঞ্চালনায় সম্মাননা প্রদান পর্বটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে এবারের সম্মাননা প্রাপ্ত নারীদের নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর সঙ্গে ছিল সাধনা নিবেদিত নৃত্যানুষ্ঠান এবং ভাবনগর পরিবেশিত চর্যাপদের গান। বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী অণিমা মুক্তি গোমেজও লোকসংগীত পরিবেশন করেন।

এবারের সম্মাননাপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নারীরা হলেন : লুভা নাহিদ চৌধুরী (সাংগঠনিক দক্ষতা), সোনিয়া বশির কবির (প্রযুক্তিপেশা), ওয়াসফিয়া নাজরীন (পর্বতারোহণ), মালিহা এম কাদির (উদ্যোক্তা), অণিমা মুক্তি গোমেজ (সংগীত), সুপ্রীতি ধর (সাংবাদিকতা), মাবিয়া আক্তার ও মাহফুজা খাতুন (খেলাধুলা), অপর্ণা ঘোষ (চলচ্চিত্র), উম্মে তানজিলা চৌধুরী মুনিয়া (শিক্ষা) এবং সাহিদা আক্তার স্বর্ণা (সমাজকর্ম)।
উল্লেখ্য, পাক্ষিক অনন্যা পথচলার ২৮ বছরের মধ্যে গত ২৩ বছর ধরে সমাজের নানা ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে কৃতী নারীদের সম্মাননা জানিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত সর্বমোট ২২০ জন নারীকে সম্মাননা জানানো হয়েছে।

লুভা নাহিদ চৌধুরী
মহাপরিচালক, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন


লুভা নাহিদ চৌধুরী শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক বেসরকারি ট্রাস্ট বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক। তাঁর উচ্চশিক্ষা স্থাপত্যবিদ্যায়। ঢাকার একটি স্থাপত্যবিষয়ক সংস্থার তত্ত্বাবধায়ক। শিল্প ও সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা ‘কালি ও কলম’, ‘সিক্স সিজনস রিভিউ’ এবং ‘যামিনী’-এর সম্পাদকম-লীর সদস্য। একই সঙ্গে দেশের দু’টি নেতৃস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা আইস মিডিয়া লিমিটেড ও বেঙ্গল পাবলিকেশন্সেরও প্রধান তিনি। এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ব্র্যাকের গভর্নিং বডির সদস্য। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ১৯৮৬ সালে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। কর্মজীবন শুরু বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদপ্তরে। প্রয়াত মিথুন দে-র কাছ থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে দীক্ষা নেন। পরবর্তীকালে তাঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন বরকাত হোসেন। অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন এবং ডিএল রায়-এই তিন গীতিকারের সংগীতে দক্ষ তিনি। সম্প্রতি তাঁর উল্লেখযোগ্য সংগীত পরিবেশনা ছিল লন্ডনের অ্যালবার্ট হলে। এ-পর্যন্ত তাঁর গানের দু’টি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। বাবা আনিস চৌধুরী ছিলেন সাংবাদিক ও সুপরিচিত নাট্যকার। মা রাজিয়া চৌধুরী ছিলেন স্কুলের শিক্ষিকা।

ওয়াসফিয়া নাজরীন
পর্বতারোহী


প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের সাত অঞ্চলের সর্বোচ্চ সাত পর্বত শৃঙ্গ জয় করেছেন অভিযাত্রী ওয়াসফিয়া নাজরীন। তিনি এখন পর্যন্ত সর্বকনিষ্ঠ বাংলাদেশি এবং দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে ২০১২ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন।
ওয়াসফিয়া ঢাকার স্কলাসটিকা স্কুল থেকে ও এবং এ লেভেল সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় এগনেস স্কট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। এরপর স্কটল্যান্ডে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে তিনি যুদ্ধবিরোধী এবং মানবতার পক্ষে বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে সক্রিয় আন্দোলনকর্মী ছিলেন। তিনি উন্নয়নকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন।
এর আগে ২০১১ সালে তিনি আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত কিলিমানজারো এবং দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত অ্যাকোনকাগুয়া জয় করেন। একই বছর ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত এলবার্সের চূড়ার ৩০০ মিটার নিচে থেকে খারাপ আবহাওয়ার জন্য ফিরে আসেন। এছাড়া তিনি ২০০৯ সালে নেপালের লু রী পর্বত, ২০১০ সালে আইল্যান্ড পিক জয় করেন। ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুস জয় করেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বর্ষসেরা অভিযাত্রীর খেতাব পেয়েছেন ওয়াসফিয়া নাজরীন।

সোনিয়া বশির কবির
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মাইক্রোসফট বাংলাদেশের


সোনিয়া বশির কবির সফটওয়্যার জায়ান্ট ও বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর আগে তিনি ছিলেন ডেল-এর কান্ট্রি ম্যানেজার। দেশিয় উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের প্ল্যাটফর্ম টাই বাংলাদেশের তিনি ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশ ওমেন ইন টেকনোলজির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের প্রযুক্তি খাতে সোনিয়া বশির কবির অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
মাইক্রোসফটের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার ফাউন্ডার্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। সুযোগ্য নেতৃত্ব, উদ্ভাবন এবং ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য অবদানের উপর ভিত্তি করে ফাউন্ডার্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে মাইক্রোসফট। তিনি ফাউন্ডার্স অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার আগে বিশেষ অবদানের জন্য মাইক্রোসফটের ‘এক্সিলেন্স প্লাটিনাম ক্লাব’-এর সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
২০১৬ সালে টেকনোলজি ব্যাংকের গভর্নিং কাউন্সিলে তাঁকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ (এলডিসি) বা কম উন্নত দেশগুলোর জন্য টেকনোলজি ব্যাংকের হয়ে কাজ করবেন তিনি। সোনিয়া সিলিকন ভ্যালি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করে ওখানেই কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় পনের বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইটি সেক্টরে কাজ করে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

মালিহা এম কাদির
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহজ.কম


মালিহা কাদির উন্নত বিশ্বে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করে দেশে ফিরে এসে বেছে নিলেন ভিন্ন ধরনের এক পেশা। উদ্যোক্তা হয়ে তিনি গড়ে তুললেন অনলাইনভিত্তিক বাসের টিকিট বিক্রির প্রতিষ্ঠান সহজ.কম। ভিড় ঠেলে সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটার যে বিড়ম্বনা, সেটা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পেরেছে তার এই সহজ.কম। শুধুই ব্যবসার খাতিরে ব্যবসা নয়, প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর একটা টিকিট হাতে পৌঁছে দিতে পারার যে আনন্দ, সেটা এর মধ্যেই পেয়ে গেছেন মালিহা কাদির, পেয়ে গেছেন পুরো সহজ পরিবার! স্মার্টফোন থেকে চাইলেই যেকোনো দিন যেকোনো সময়ের টিকেট বুকিং দেয়া যেতে পারে। আর ১৬৩৭৪-এ ফোন করলে সহজ টিমই সেটা করে বাসায় বা অফিসে পৌঁছে দেবে।
সিঙ্গাপুরে মালিহা এম কাদির কাজ করেছেন ভিসতাপ্রিন্টের সঙ্গে। নোকিয়ার ডিজিটাল কন্টেন্ট সার্ভিস লাইফ টুলসের স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্টসের কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। তাছাড়া হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এমবিএ ডিগ্রি তাঁর এই বিশাল পরিসরের পথচলায় অনেকটাই সহযোগী হয়েছে। সহজ নিয়েই সব স্বপ্ন এখন মালিহা কাদিরের। এটাকে কীভাবে আরও জনপ্রিয় করে তোলা যায়, সে লক্ষেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। শুধুই বাস নয়, লঞ্চ আর হোটেলের বুকিংও শুরু করেছেন তারা।



সুপ্রীতি ধর
সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার


২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন চলাকালে আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের জের ধরে উত্থান ঘটে হেফাজতে ইসলামের, তাদের দাবিদাওয়ার অধিকাংশই ছিল নারীকে আটকে রাখার কূটকৌশল। এর প্রতিবাদস্বরূপ সুপ্রীতি ধর তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ করেন মেয়েদের জন্য অনলাইন পোর্টাল ‘উইমেন চ্যাপ্টার’। এখানে মেয়েরা রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি নিজেদের কথা লিখতে পারেন অনায়াসে। এক বছরের মাথায় জার্মানির ডয়চে ভেলে আয়োজিত গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় বেস্ট অব অনলাইন অ্যাক্টিভিজম পুরস্কার পায় উইমেন চ্যাপ্টার। তারপর এটি হয়ে ওঠে অনেকের আন্দোলনের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিজম বিষয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে যান সুপ্রীতি। ছোটবেলায় কিশোরবাংলা পত্রিকায় লেখালেখিতে হাতেখড়ি, প্রচুর বই পড়ার পাশাপাশি একটি স্নিগ্ধ সাংস্কৃতিক পরিম-লে বড় হন তিনি। বাবা-মা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের সন্তান হিসেবে প্রতিবাদ, আন্দোলন চিরকালই তাঁর রক্তে।
প্রথম আলো’র মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু। পাশাপাশি বিবিসি রেডিওতে কাজ করেন তিনি। দীর্ঘ আট বছর পর প্রথম আলো ছেড়ে বিডিনিউজটুয়েন্টিফোর, প্যানোস, রেডিও সাউথ এশিয়া, যমুনা টেলিভিশন, মাছরাঙা টেলিভিশনে কাজ করেন। ২০০৪ সালে পান বেস্ট উইমেন জার্নালিস্ট-এর পুরস্কার।

অণিমা মুক্তি গোমেজ
সংগীতশিল্পী


পল্লিগীতির অঙ্গনে অপরিহার্য নাম অণিমা মুক্তি গোমেজ। রংপুরের ভাওয়াইয়া, সিলেটের ধামাইল, ময়মনসিংহ-ঢাকা-ফরিদপুরের ভাটিয়ালি, চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারী, যশোরের বিচ্ছেদী এবং কুষ্টিয়ার বাউল গানের সাবলীল পরিবেশনায় তিনি দক্ষ।
ঢাকা-নবাবগঞ্জের হাসনাবাদে সেন্ট ইউফ্রেজিস বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষিকা-শিল্পী মায়া গাঙ্গুলির কাছে তিনি সংগীতের তালিম নেন। রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯১ সালে ঢাকা বিভাগীয় লোকসংগীত চ্যাম্পিয়ন পদক প্রাপ্তির মাধ্যমে সংগীতজীবনের মোড় ঘুরে যায়। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী পদক (২০১৬), আসাম শিলচর লোকসংগীত উৎসব সম্মাননা, ভারত (২০১৫), বাংলাদেশ বিনোদন সাংবাদিক সংস্থা পদক (২০১৩), ঢাকা কালচারাল রিপোর্টার্স ইউনিটি পদক (২০০৯), ত্রিপুরা ফোকলোর একাডেমি প্রদত্ত ‘লোকসংগীত অনন্যা সম্মাননা’, ভারত (২০০৯), বাংলাদেশ মিডিয়া জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন পদক (২০০৮) এবং আন্তঃমহাবিদ্যালয় সংগীত চ্যাম্পিয়ন পদক (১৯৯০) তাঁর সংগীতচর্চায় ২৫ বছরের স্বীকৃতি।
শিল্পী নীনা হামিদের কাছে তিনি পল্লিগীতি শেখেন। বাংলাদেশ লোকসংগীত পরিষদের সভাপতি শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর আহ্বানে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং এক পর্যায়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে লোকসংগীতচর্চায় অবদান রাখেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংগীত-এই তিন বিষয়ে স্নাতকোত্তর অণিমা গোমেজের সংগীত-ই সার্বক্ষণিক সাধনা।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, ফিলিপিন্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, উজবেকিস্তান, ইতালি, মিশর, ভুটান ও সৌদি আরবে তিনি পল্লিগীতি গেয়ে সুনাম অর্জন করেন। বেতারে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার পাশাপাশি কবিতা, ছড়া ও প্রবন্ধ লেখেন। বর্তমানে ‘সুরস্রষ্টা সমর দাস’ নিয়ে গবেষণা করছেন।



মাহফুজা খাতুন শিলা ও মাবিয়া আক্তার
খেলাধুলা


দক্ষিণ এশিয়ান গেমসের (এসএ গেমস) ২০১৫ সালের আসরে বাংলাদেশকে প্রথম সোনার পদক এনে দেন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। মেয়েদের ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণিতে শ্রীলঙ্কা ও নেপালের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সোনার পদক জেতেন তিনি। সোনার পদক জিতে জাতীয় সংগীতের সুরে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন মাবিয়া আক্তার। জাতীয় পতাকাকে স্যালুট দেয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাঁর কান্না কাঁদিয়েছিল দেশের মানুষকেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই কান্নার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তাল এক আবেগ তৈরি করেছিল সবার মধ্যে।
‘কষ্ট’ শব্দটার সঙ্গে মাবিয়াদের পরিচয় শৈশব থেকেই। ভারোত্তোলন ফেডারেশনের সেক্রেটারি প্রতিদিন আসা-যাওয়ার ভাড়া দিতেন নিজের পকেট থেকে। খেলাটিতে শরীর থেকে যে প্রাণশক্তি ক্ষয় হয়, সেটা পুষিয়ে দিতে প্রতিদিন খাদ্য-তালিকায় আমিষের উপস্থিতি আবশ্যক। মাবিয়ার দোকানদার বাবা কষ্ট করে মেয়েকে এগুলো জুগিয়ে গেছেন।
একই গেমসে দ্বিতীয় স্বর্ণ আসে মাহফুজা খাতুন শিলার হাত ধরে। ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে স্বর্ণ জিতে সকলের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যান তিনি। এর আগের এসএ গেমসে ১০০ ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রুপা জিতেছিলেন। ঘরোয়া টুর্নামেন্টে তিনি সাফল্য পান নিয়মিত।
সোনাজয়ী এই শিলা সংসার চালানোর জন্য পদকটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। ভারতে এই পদক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী শিলার বিক্রি করা সেই পদক ফিরিয়ে এনে দিয়েছেন। তিনি এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশুনা করছেন। মাহফুজা এ পর্যন্ত সাঁতারে পঞ্চাশটিরও বেশি পদক পেয়েছেন। তার আগে বাংলাদেশের কোনো নারী সাঁতারু আন্তর্জাতিক গেমসে দু’টি স্বর্ণপদক জিততে পারেননি।


উম্মে তানজিলা চৌধুরী মুনিয়া
শিক্ষাকর্মী


উম্মে তানজিলা চৌধুরী মুনিয়া একসময়ে সবার কাছে ছিলেন অবহেলার শিকার। প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়ার দুর্ভোগ অন্তহীন। পিতামাতার আরো তিন কন্যা সন্তান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাবা মো. নাসির উদ্দিন ও মা শামীমা আক্তারকে এই চারটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কন্যা সন্তান নিয়ে এক সময়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়েছে। তবে মুনিয়ার অদম্য মেধা আর ইচ্ছাশক্তির কাছে সেই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। মুনিয়া চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার আজিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। মুরাদপুরের সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, চট্টগ্রামের হামজার বাগের রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, হাজেরা তজু কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন। যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকারবিষয়ক সংগঠন ডিসঅ্যাবল্ড স্টুডেন্ট সোসাইটি অব চিটাগং ইউনিভার্সিটি (ডিসকু)-তে।
পড়াশুনার বাইরে গান চর্চা, ফেসবুকে লেখালেখি, অনলাইনে অ্যাপস তৈরির চেষ্টা, কো-কারিকুলাম কার্যক্রম সবকিছুই সমানভাবে চালিয়ে গেছেন। চোখের আলো না থাকলেও মনের আলো দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন অনেক বাধা-বিপত্তি। মুনিয়া এখন পটিয়ার মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শিশুদের পড়াশুনার সুবিধার্থে তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব কিছু ডিজিটাল কনটেন্ট। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও সমাজে ব্যাপক অবদান রাখায় তিনি পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এটুআই প্রকল্পের লিডারপি এ্যাওয়ার্ড, এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মাননা পদক।

অপর্ণা ঘোষ
অভিনেত্রী


অপর্ণা ঘোষ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং মডেল। কাজ করছেন মঞ্চেও। থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নম্বর (২০০৯) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক। বেশ কিছু টেলিভিশন ধারাবাহিক এবং খ-নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি মৃত্তিকা মায়া, সুতপার ঠিকানা ও মেঘমল্লার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের উপর ভিত্তি করে নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ভুবন মাঝি চলচ্চিত্রে ওপার বাংলার পরমব্রত চ্যাটার্জির বিপরীতে অভিনয় করছেন।
তিনি ২০০৬ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় সেরা পাঁচের একজন নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে মৃত্তিকা মায়া চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সহ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৫ সালে তাঁর অতি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো নারীনির্ভর চলচ্চিত্র সুতপার ঠিকানা’র কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়। ছবিটি দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।
তিনি শেকসপিয়ার রচিত ওথেলো, দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিসসহ বেশ কয়েকটি মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন।
অপর্ণা বসুন্ধরা কর্পোরেট, প্রাণ সস, অটবি, নিডো, প্যরাসুট নারিকেল তেল, হোয়াইট প্লাস টুথপেস্ট ইত্যাদি বাণিজ্যিক পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন।

সাহিদা আক্তার স্বর্ণা
বাল্যবিবাহ রোধে নিবেদিত


পাকিস্তানের নারীশিক্ষা অধিকার কর্মী কিশোরী মালালা ইউসুফজাইয়ের মতোই স্বর্ণার স্বপ্ন দিগন্ত বিস্তৃত। অবহেলিত নারী ও শিশুর জন্য যাঁর মন কাঁদে সবসময়। সাহিদা আক্তার স্বর্ণা গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের সিংদিঘী গ্রামের দরিদ্র তোতা মিয়ার মেয়ে। অদম্য ইচ্ছার কাছে চরম দারিদ্র্যও হার মেনেছে তাঁর কাছে। তিনি এখন গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী।
স্বর্ণার স্বপ্ন : গ্রামের গন্ডি পেরিয়ে দেশের অবহেলিত শিশু ও নারীদের পাশে দাঁড়ানোর। সাহিদা আক্তার স্বর্ণা বর্তমানে প্ল্যান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল শিশু সুরক্ষা দলের সদস্য ও যুব নারী সংঘের উপদেষ্টা। গত ৭ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী নরওয়ের অসলোতে অনুষ্ঠিত শিশু ও নারীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি অংশ নেন। ওই সম্মেলনে ১৩টি দেশের ৩২ জন শিশু ও নারী প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইর্না সোলবার্গ। সম্মেলনে স্বর্ণা তাঁর জীবনের দুঃখগাথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাঁর মতোই নিপীড়িত শিশুদেরও সচেতন করে সংগ্রামী হিসেবে গড়ে তোলার গল্প শুনে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইর্না সোলবার্গ তাঁকে বাংলার মালালা ইউসুফজাই বলে আখ্যা দেন।