শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / আমি কান পেতে রই
০৯/০৬/২০১৬

আমি কান পেতে রই

- আফরোজা পারভীন

মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে অনেকটা পানির মাছ ডাঙায় ফেলার মতো অবস্থা টুয়ার। ও যেন খাবি খাচ্ছে। মফস্বলে জীবনটা বাধা ছিল না। প্রবহমানতা ছিল সে জীবনে। বারণ ছিল না, ভয় ছিল না, সংশয় ছিল না। নিজের বাড়িতে থাকা খাওয়া, ইচ্ছের টানে ঘোরা, সবই ছিল অবারিত। ছয় ভাই-বোনের সংসারে বাবা-মায়ের সময় ছিল না ছেলেমেয়েদের চোখ দিয়ে আগলে রাখার। বাবা তো চাকরি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। মা রান্না-বান্না-ঘরকন্না অতিথি সৎকার এমন হাজারটা কাজে খালি দৌড়াতেন। মেয়ের শরীর ঠিক আছে কিনা, পড়াশুনা করছে কিনা, এতটুকু দেখেই তিনি খুশি ছিলেন। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করত, প্রতিবেশিদের প্রতি আস্থা ছিল, তাই ছেলেমেয়েদের ওপর চোখ পেতে রাখার দরকারও পড়েনি তখন। সন্তানরা খারাপ কিছু করবে না, শিক্ষকরা শিক্ষাই দেবেন, এটাই ভাবতেন বাবা-মা। তাই ছেলেমেয়ে নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তায় সময় পার করতেন না তারা।

পড়াশুনায় টুয়া বরাবরই ভালো। স্থানীয় কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে ভালো ফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কোনোই বেগ পেতে হয়নি তাকে। অল্প কিছুদিন এলাকার একটা মেয়ের সঙ্গে ডাবলিং করে রোকেয়া হলে সিটও পেয়ে গেছে। বাবা-মা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। মেয়ে এবার তরতর করে এগিয়ে যাবে।

কিন্তু স্বস্তি নেই টুুয়ার। নিয়মে সে কখনোই বাধা পড়েনি। এবার পড়ল। সন্ধ্যা হলেই মুরগি যেমন ঘরে ঢোকে, তাকেও হলে ঢুকতে হয়। ঠিক আছে, সে ঢুকবে। বাড়িতে তো সন্ধ্যার আগেই ফিরত। কিন্তু বাধা নিয়মেই টুয়ার যত বিরক্তি, যত আপত্তি। আর ডাইনিং-এ সেই একই খাবার চলছে তো চলছেই। কাঁহাতক আর সহ্য হয়। টুয়া ভালো খেয়ে মানুষ। বাবা ব্যাগ ভর্তি করে টাটকা মাছ আনতেন, ময়রা বাড়িতে দই মাখন দিয়ে যেত, তেল চকচকে মুরগি রান্না হতো। মায়ের হাতের লাউ কই, কই ভাপা, চিড়িংর মালাইকারি, নারকেল পোলাও কোথায় সেসব! সে সবতো দূরে, সাধারণ মাছ তরকারি যা রান্না হয়, মুখে দেয়া যায় না। মার রান্না ঘন ডালের জন্য মন কাঁদে। ও কিছুই খেতে পারে না। না খাওয়া আর নিয়মে বাধা পড়ে ও শরীর মনে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

টুয়া বরাবরই স্বল্পভাষী। সহজে কারো কাছে মন খুলে দিতে পারে না। তাই বন্ধুও তেমন জোটে না। ক্লাসের দু’চারজনের সাথে কথাবার্তা হয়। তাদেরই একজন পাখি। পুরানো ঢাকার আদি মানুষ। থাকে ইস্কাটনে। ওদের নিয়ে অন্যদের মাঝে ফিসফাস কানাকানি কানে গেছে টুয়ার। ওর বাবার নাকি তিন বিয়ে, ওর ভাই বোন সিনেমা করে, ওরা খুব খারাপ, এমন অনেক কথা। টুয়া মনে করে দেখে, হ্যাঁ ওর বোনের বেশ কিছু সিনেমা সে দেখেছে। দেখতে বেশ, সাইড রোল করে।

সিনেমা করে, এতে দোষের কি বুঝে উঠতে পারে না টুয়া। আর ঢাকার মানুষেরাও এমন পরচর্চা করে!
সেদিন পাখি বলে, ‘তোরা আয় না আগামী শুক্রবার আমাদের বাড়িতে। আমার জন্মদিন।’
এটুকু বলেই ও থামে না। অনেক অনুরোধও করে।

পাখি চলে যাবার পর বন্ধুদের মিটিং শুরু হয়। এজেন্ডা, ওদের বাড়িতে যাওয়া হবে কিনা। ওর সিনেমা করা বোনের ডিভোর্স হয়ে গেছে, সিনেমার লোকের চরিত্র ভালো না, নানা ধরনের খারাপ লোক ও বাড়িতে আসে ইত্যাদি ইত্যাদি। যাবে না বলেই স্থির করে অন্যরা। ওদের মতে একমত হতে পারে না টুয়া। পাখি ওর ক্লাসমেট, ওর জন্মদিনে দাওয়াত দিয়েছে। না গিয়ে কিভাবে পারা যায়? ও বলে, ‘তোমরা না গেলেও আমি যাব। ওর বোন সিনেমা করে, তাতে আমার কি সমস্যা? ওর জন্মদিনে উপস্থিত থাকাটাই বড় কথা।’

টুয়া ঢাকার রাস্তাঘাট ঠিকমতো চেনে না। কেমন যেন গোলকধাঁধার মতো লাগে। অনেক ঘুরে, চক্কর খেয়ে ঠিকানা মিলিয়ে ও যখন ইস্কাটনের অত্যাধুনিক বাড়িটার দোতলায় প্রবেশ করে, তখন বেশ হকচকিয়ে যায়। সারাটা মেঝের গায়ে জড়িয়ে আছে লাল কার্পেট, বড় নরম সে কার্পেট। সে কার্পেটের শরীরে পা ফেলতে ওর কেমন দ্বিধা হয়। ছাদ থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতির বহর। ওকে দেখে দামি সোফা থেকে উঠে আসে অভিনেত্রী বোন ডলি। চূড়ো খোঁপা বাধা, স্লিভলেস লো কাট ব্লাউজ, চোখে চড়া কাজল, ঠোঁটে ঠিকরে পড়া লাল লিপস্টিক দেখে টুয়ার স্নিগ্ধ রুচি হোঁচট খায়। সোফায় আরো বসে আছে পাখির অভিনেতা ভাই, চিত্রজগতের একজন খলনায়ক, একজন অভিনেতাসহ বেশ কিছু অতিথি। যাদের টুয়া চেনে না। সবাই যেন কথাবার্তা. চাল-চলনে কেমন কেমন। যার অনেকটাই টুয়ার অচেনা।
ডলি আপা হাত ধরে টুয়াকে নিয়ে গিয়ে পাশে বসান সোফায়। সে হাতের স্পর্শ ছিল বড়ই আন্তরিক আর মোলায়েম। সে হাতকে আপন মনে হয়, মনে হয় না ও হাত অচেনা কারো।

ঘরজুড়ে ফুল, বেলুন, রংবেরংয়ের বাতি। সুবাসে মৌ মৌ করছে চারধার। ঘরের মাঝখানে সুসজ্জিত টেবিলে তিনতলা কেক। চমৎকার পোশাক পরে পাখি আসে। টুয়া ওর হাতে উপহার আর ফুল তুলে দিলে ও টুয়াকে জড়িয়ে ধরে। ওর সাথে আর কাউকে না দেখে পাখির চোখ ছলছল করে। ওর চোখ বলে, সে বুঝতে পেরেছে কেন আসেনি ওরা। টুয়ার কেমন যেন নিজেকে অপরাধী লাগে। যদিও তার কোনো কারণ নেই।
পাখির মা আসেন, আসেন অন্য দুইবোন। পরিচয় হয়। মেজবোন বিবাহিত, অপূর্ব সুন্দরী। বন্ধুরা বলেছিল, উনি এখানেই থাকেন। কেন বিবাহিতই যদি হন, স্বামীর বাড়ি না থেকে এখানে কেন? প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খায়। কিন্তু এ প্রশ্ন করা যায় না। পোশাকে সবাই উগ্র, কিন্তু ব্যবহারে আন্তরিক। এ-এক অদ্ভুত বৈপরীত্য!

পাখির মা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেজবোন আন্তরিকভাবে গল্প করেন। বিবাহিত বোন করুণ চোখ তুলে টুয়াকে কাছে টেনে হাতে হাত রেখে ¯েœহমাখাকণ্ঠে জানতে চান তার মা বাবা ভাই বোনের কথা। টুয়ার ওকে খুব ভালো লাগে। মনে হয়, ও যেন এক গভীর সরোবর, যার নিচে আছে পলিমাটি। কেন মনে হয়, জানে না সে।

জন্মদিন পর্ব শেষ হয়। খাওয়ার টেবিলে অবাক হয়ে যায় টুয়া। শুনেছিল ঢাকাইয়ারা নাকি প্রচ- অতিথি পরায়ণ। মানুষকে খাইয়ে কখনোই তাদের তৃপ্তি হয় না। কিন্তু তাই বলে এত খাবার ! বিশাল টেবিলে তিল ধারণের জায়গা নেই। কি নেই খাবার আইটেমে। অত খাবারের নামও সে জানে না। খেতে খেতে হাঁপিয়ে ওঠে টুয়া। পাখির মা তুলে দেয়, বোনরা তুলে দেয়, পাখি তুলে দেয়, এমনকি ভাইও বাদ যায় না। ও যত বারণ করে, ততই পাতে পড়ে। পাখির মা বলেন, ‘না করো না তো মা, আজ তুমি আমার প্রধান অতিথি। শুনেছি, হোস্টেলে খাওয়ার খুব কষ্ট। একদমই কষ্ট করবে না বুঝেছ। প্রতিদিন পাখির সাথে চলে আসবে, খেয়েদেয়ে রাতে যাবে। আমাদের গাড়ি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।’
টুয়ার খুব ভালো লাগে ওদের এই আন্তরিকতা। বাড়ির সাজসজ্জা আর মূল্যবান জিনিসপত্র দেখে ও অবাক হয়। এটা কি ওদের নিজের বাড়ি? এত জিনিস সব ওদের নিজের!

ওকে ভাবতে দেখে পাখি বলে, ‘কি ভাবছিস এত ?’
‘তোদের নিজের বাড়ি?’
‘আরে না, এ-বাড়ি আমরা কিনব কি করে? ভাড়া। পঞ্চাশ হাজার টাকা ভাড়া।’
‘বলিস কি ?’
‘হ্যাঁ, এত কম। অনেকদিন ধরে আছি, তাই আমাদের কাছ থেকে কম নেয়। এখন ভাড়া নিলে আশি হাজার হতো।’
ফেরার সময় ওরা বারবার বলে আবার একদিন দ্রুত আসতে। টুয়া সবাইকে বলে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। মেজপা চম্পা করুণ চোখে তাকায়। সেই ব্যথাভরা চোখ। কেন?
অনেক জিজ্ঞাসা নিয়ে টুয়া রিকশায় ওঠে। আর আসতে আসতে ওর মনে পড়ে, পাখির দুলাভাইকে ও একবারও দেখেনি। কোথায় উনি, কাজে বেরিয়েছেন নাকি? বাড়িতে অনুষ্ঠান, উনি কাজে কেন? কে জানে। আচ্ছা ওদের আয় তো ওই এক ডলি আপার অভিনয়। ভাই আলাদা থাকে। তাতে কি করে পঞ্চাশ হাজার টাকা বাসাভাড়া, খাওয়া, গাড়ি, ওদের দামি দামি পোশাকআশাক জোটে ? চিন্তাটা ওর মাথা থেকে যায় না।
দিনকয়েক করেই পাখি বলল, ‘শুক্রবারে তোকে আবার যেতে হবে। মেজআপা বারবার বলে দিয়েছে। ও এমনিতে কম কথা বলে। সারক্ষণ ঘরেই থাকে। কারো সাথে তেমন মেশে না। তোকে ওর কেন জানি ভীষণ ভালো লেগেছে।’
‘বলেছে নাকি সে কথা? ’
‘না বললে জানলাম কি করে বল? বলছিল, শুক্রবারে টুয়াকে নিয়ে আসিস। ওর চোখদুটো কেমন মায়াভরা। আপন আপন লাগে। হলে কি না কি খায়।’
‘আপাকে বলিস আর একদিন যাবো। এইতো সবে এলাম।’
‘আরে না না, তুই না গেলে আমাকে আস্ত রাখবে না। ভাববে আমি তোকে ঠিক করে বলিনি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, এবার যাব। কিন্তু এরপর আর অত ঘন ঘন ডাকিস না কেমন।’
‘সে দেখা যাবে।’
শুক্রবারে গিয়েছিল টুয়া। সত্যি বলতে কি, ওই মেজ আপার টানেই গিয়েছিল। টানটা কেন, সেটা অবশ্য সে নিজেও জানে না।
আর এদিনও সেই একই চিত্র। সেই আদর, পাতে তুলে খাওয়ানো, ওর হাত ধরে মেজ আপার অনেকক্ষণ বসে থাকা।
তারপর কি যেন হয়, টুয়া মাঝে মাঝেই ও বাড়িতে যেতে থাকে। খাবারের আকর্ষণে নয়, অন্য এক আকর্ষণে। আর যেতে যেতেই ও জানতে পারে, ও বাড়ির মেয়েগুলো অন্যরকম। বড় আপার ডিভোর্স হবার পর সে আর বিয়ে করেনি। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যা পায়, সবই সে সংসারে ব্যয় করে। বোনদের সন্তানের মতো লালন পালন করে। তাতে অবশ্য সংসারের পাহাড়চুম্বি খরচের চার ভাগের একভাগও হয় না। সেজ বোন দিনরাত রাঁধে শুধু মা আর বোনগুলোর জন্য। আর মেজ আপার একটা বিশেষ মর্যাদা আছে ও বাড়িতে। বাড়ির সিংহভাগ খরচ সে চালায়। সে মানে তার স্বামী।

টুয়া একদিন পাখিকে জিজ্ঞাসা করেছিল,
‘আচ্ছা পাখি মেজ দুলাভাইকে তো কখনও দেখি না। উনি আসেন না?’
‘আসেন তো। ’
‘আমি কখনও দেখিনি।’
‘বাদ দে ওসব কথা’
‘কেন, আচ্ছা উনি কি করেন?’
‘মস্ত বড়লোক, জাহাজের ব্যবসা আছে।’
কি যেন একটা ব্যস্ততার অজুহাত তুলে সরে গিয়েছিল পাখি। টুয়া বুঝেছিল, পাখি তাকে এড়িয়ে গেল।
এক শুক্রবারে না বলে কয়েই ওদের বাড়িতে গেল টুয়া। বাড়িটা কেমন যেন সুনসান। কাজের বুয়া দরজা খুলে দিয়ে বলল,
‘আসেন, কিন্তু কেউ তো নেই। বেড়াতে গেছে।’
‘একদম কেউ নেই?’
‘শুধু মেজ আপা আছে তার ঘরে।’
‘ঠিক আছে, আমি আপার সাথে দুটো কথা বলে চলে যাব।’
মেজ আপার ঘরের দরজায় টুকটুক আওয়াজ করার বেশ কিছুক্ষণ পর আলুথালু বেশে দরজা খুলেছিল আপা। চোখমুখ ফোলা ফোলা। দেখলে মনে হয়, কাঁদছিল। টুয়াকে দেখে বলেছিল, ‘তুমি ! ওরা তো কেউ নেই।’
‘আমি কি চলে যাব আপা?’
‘আরে না না, ঘরে এসো, বসো।’
ও খাটের পাশে রাখা চেয়ারে বসেছিল। সাইড টেবিলে এক ভদ্রলোকের ছবি রাখা। আপা সেটা দ্রুত সরিয়ে নেয়। টুয়া বলে,
‘কি হয়েছে আপা, শরীর খারাপ?’
‘না, ভালো আছি।’
‘তবে কি মন খারাপ?’
‘মন খারাপ হবে কেন?’
‘আপা আমি আপনার ছোটবোনের মতো। আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে, আপনার কিছু হয়েছে, কাঁদছিলেন আপনি। কি হয়েছে আপা, আমাকে বলেন। বললে মন হালকা হয়।’ টুয়া ওর কাঁধে হাত রাখে। আর সাথে সাথে বর্ষার জলপ্রপাতের মতো ভেঙে পড়ে মেজ আপা। ডুকরে কেঁদে ওঠে। টুয়ার মনে পড়ে, মা একদিন কাউকে বলছিলেন, কেউ কাঁদলে বাধা দিতে নেই। কাঁদতে সময় দিতে হয়। ও কথা বলে না। নিঃশব্দে ওর পিঠে হাত বুলায়। এক সময় কাঁদতে কাঁদতে ঠান্ডা হয়ে আসে মেজ আপা। টুয়া বলে,
‘কি হয়েছে আপা?’
এবার যেন সমুদ্রের ¯্রােত বইতে শুরু করে। গড়গড় করে বলতে থাকেন আপা।
‘তোমার দুলাভাই আমাকে বিয়ে করল আমার রূপ দেখে। কিন্তু স্বীকৃতি দিতে পারল না। আমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। বড় বৌয়ের অনুমতি নেয়নি। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, বিজনেস আরো কত কিছু। মনে ভয়, যদি বউ জেনে যায়, যদি মামলা ঠুকে দেয়, যদি জেল জরিমানায় জড়িয়ে পড়ে, সমাজে হেয় হয়ে যাবে, ব্যবসাপাতির ক্ষতি হবে। তাই অন্তরালবাসিনী আমি, এই কুঠুরিতে আবদ্ধ পনের বছর। বাড়ির নিচের বাগানে যাবার অনুমতিও আমার নেই। যদি কেউ দেখে ফেলে।’
‘দুলাভাই আসেন না?’
‘আসেন লুকিয়ে, সবার চোখের আড়ালে। এই ঘরে ঢোকে, এই ঘর থেকেই বের হয়, ড্রয়িংরুমে পর্যন্ত যায় না।’
‘এ কেমন বিয়ে? এ বিয়ে আপনি করলেন কেন। আপনি কত সুন্দর, কিসের অভাব আপনার?’
‘কেন করলাম? বোঝোনি, এতদিন ধরে এ বাড়িতে এসেও? আমার অভাব নেই, সংসারের আছে । সংসার চলে ওর টাকায়, এ বাড়ির সব খরচ, বিলাসিতা, বিদেশভ্রমণ সব । আমি শুধু থাকি ঘরে আটকা, চার দেয়ালের মাঝে।’
‘কিন্তু আপা নিজেকে শেষ করে দিয়ে আপনি ওদের জন্য এসব কেন করেন?’
‘না করলে করবে কে? ওরা যে আমার ভাই বোন মা, ওদের যে আমি বড় ভালোবাসি।’ মেজ আপা একটু থামেন। তারপর বলেন,
‘জানো বিয়ের পর একবার কাপ্তাই বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওই একবারই। কে যেন আমাদের দেখে ফেলেছিল। তোমার দুলাভাই ভয় পেল। জানো, ওটাই ছিল আমার জীবনে স্বর্গভ্রমণ। আমি যখনই চোখ বুজি, ওই দুটো দিনের ছবি ভেসে ওঠে মনে, স্বপ্নে বারবার দিনদুটো ঘুরে ঘুরে আসে। আর তো কখনই দেখবে না, তাই হয়তো এমন হয়। একটা গান শুনেছ টুয়া, এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন/ কবে যাবো ওগো কবে পাবো তোমার নিমন্ত্রণ? আমি সেই নিমন্ত্রণের আশায় বসে থাকি কান পেতে, প্রতিদিন, প্রতিরাত. প্রতিক্ষণ। তোমার দুলাভাই আমাকে ডাকবে, হাত ধরে নিচে নামিয়ে নিয়ে যাবে, খোলা বাতাসে চুল উড়িয়ে ঘুরব আমি সেই কাপ্তাইয়ের মতো।’
মেজ আপা আবারো হু হু করে কাঁদতে থাকেন। অনেকক্ষণ ওর পাশে বসে থাকে টুয়া। তারপর একসময় বেরিয়ে আসে।
বেরিয়ে দেখে অনেক অনেক মেঘ করেছে, একেই বলে মেঘলা দিন। কিন্তু এদিনে কি কখনও এক বন্দিনীর জীবনে জীবনের নিমন্ত্রণ আসবে! জানে না টুয়া। ও চোখ মুছে দ্রুত হাঁটতে থাকে।