বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / ভূস্বর্গ কাশ্মীর দেখে এলাম
০৯/০৬/২০১৬

ভূস্বর্গ কাশ্মীর দেখে এলাম

- নাসিমা হক

সম্প্রতি ঘুরে এলাম ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর। অনেকদিন থেকেই খুবই ইচ্ছে হতো কাশ্মীরে যাব। ইদানীং আমাদের কয়েকজন বন্ধু ঘুরে এসে গল্প করল। তাতেই আমরাও উৎসাহিত হয়ে গেলাম। কবি শঙ্খ ঘোষের কাশ্মীর ভ্রমণের কাহিনিও আমাদের আরেকটু উস্কে দিয়েছে। ঢাকা থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে কলকাতায় পৌঁছানো গেল। পরদিন রাজধানী এক্সপ্রেসে কলকাতা থেকে দিল্লি যাত্রা। সেদিনই দিল্লি থেকে বিমানে শ্রীনগর। শ্রীনগর বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই পেয়ে গেলাম আমাদের অভ্যর্থনাকারীকে। তিনি আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে অপেক্ষা করছিলেন। একটু অপেক্ষা করতেই গাড়ি নিয়ে এসে পৌঁছলেন আমাদের চালক তথা গাইড রাজা। গাড়িটা তার নিজের এবং বেশ দামি গাড়ি।

ওরা আমাদের পৌঁছে দিলেন আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে। ১নম্বর ডাল গেটে আমাদের হোটেল। ভালো ব্যবস্থা।
শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থলে রাজনগরে এই হোটেল। ডাল লেকের এপারে রাস্তার পাশে অসংখ্য হোটেল। ডাল লেকের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য হাউসবোট পর্যটকদের জন্য আরাম আয়েশের সব ব্যবস্থা নিয়ে। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কাছেই দোকানপাট। সেখানে একটু চা খেয়ে কিছু কেনাকাটা সেরে হোটেলে ফিরে এলাম। আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে বন্ধু ও গাইড ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে শুরু হবে আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ। হোটেলের ভেতরেই সামনের দিকে একটি ছোট বাঙালি ধাবা। ভালোই হলো। রাতের খাবার সেখানেই সারলাম।
হোটেলেই বাংলাদেশের একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো। চমৎকার ব্যবহার। ওরা লাদাখ, কারগিল, শ্রীনগর ভ্রমণ শেষ করে পরদিন জম্মু হয়ে দেশে ফিরে যাবেন। ওরাও বাঙালি ধাবাতেই খাচ্ছেন। খাবার বেশ ভালোই।

পরদিন সকালে গাড়ি এসে গেলে আমরা গেলাম কাশ্মীরের বিখ্যাত মোগল গার্ডেনগুলো দেখতে। ডাল লেকের তীরে তীরে এসব বাগান বা পার্ক। প্রথমেই গেলাম চশমেশাহী পার্ক। টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেলে পাহাড় কেটে কেটে তৈরি এসব বাগান।
বিমানবন্দর থেকেই দেখছি ফুলের সম্ভার। গাঢ় কমলারঙের ফুল অজ¯্র ফুটে আছে। প্রতিটি বাড়ির গেটে আলো করে আছে আগুনরঙা এই ফুল। নানারঙের রকমারি ফুলের সম্ভারে পরিপূর্ণ কাশ্মীর। ফুল ফোটে অজ¯্র। করবী আমাদের দেশেও ফোটে। ওখানে দেখলাম অজ¯্র ফুলে ছাওয়া করবী গাছ। নানারঙের ফুল দেখে বিশাল চিনার গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসলাম। চারদিক পাহারা দিচ্ছে সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। এখান থেকে ডাল লেক তো দেখাই যাচ্ছে। দূরে দূরে বসতি। গ্রাম। সব মিলিয়ে অপূর্ব। চশমেশাহী বাগানের বৈশিষ্ট্য হলো এক আশ্চর্য ঝরনার পানি, যা অসম্ভব শীতল। কথিত আছে এ-পানি সর্বরোগহর। তাই ঝরনার কাছে খুব ভিড়। সবাই বোতলে ভরে নিয়ে যাচ্ছেন এ-পানি। সেদিন ছুটির দিন ছিল বলে অসম্ভব ভিড় ছিল। যেমন পর্যটকের ভিড়, তেমনি আছেন স্থানীয় মানুষজন। আছে সব বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা। চশমেশাহী থেকে আমরা গেলাম নিশাত গার্ডেন ও শালিমার গার্ডেন দেখতে। সবই পাহাড় কেটে কেটে তৈরি করা মোগল আমলের বাগান।

নানারকমের নানারঙের ফুল দিয়ে সাজানো। গোলাপের এত বিপুল সম্ভার আর কোথাও দেখিনি। যে ফুলই ফোটে, ফোটে অজ¯্র। আর এত মোটা গোলাপের কা- কখনও দেখিনি। গাছগুলো বোধহয় শতাধিক বছরের পুরানো। প্রথমদিন আমাদের গার্ডেন দেখে আর ছবি তুলেই কাটলো। পর্যটকদের মধ্যে দেখলাম ভারতের নানা অঞ্চলের মানুষ। প্রত্যেকের ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা।
আমাদের সঙ্গে একই ট্রেনে এসেছেন বাংলাদেশের দুটি পরিবার। তাদের সঙ্গেও সেখানে দেখা হয়ে গেল। সেখান থেকে ফিরে আমরা গেলাম- একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খেলাম। মেনু হলো, অনেক বাদাম (কাজু, আখরোট ইত্যাদি) ও সবজি দিয়ে তৈরি কাশ্মীরী পোলাও আর রোগেনজুস। এই রোগেনজুস মাটনের একটি প্রিপারেশন। এখানে মাটন মানে কিন্তু সবই ভেড়ার মাংস। কারণ খাসি এখানে পাওয়া যায় না। রান্না বেশ ভালো। হোটেলের মালিকের সঙ্গে তোলা নেহরু এবং ইন্দিরা গান্ধীর অনেক ছবি টাঙানো ছিল। তার মানে হোটেলটাও বেশ পুরানো। সেদিন ভয়ানক রোদ ছিল। তাই সেদিনের মতো বেড়ানো ওখানেই শেষ। তারপর হোটেলে ফিরে বিশ্রাম।

বাংলাদেশের পরিবারটি পরদিন জম্মু হয়ে ফিরে গেল। ওখানে ধাবায় খেতে বসে সিঙ্গাপুরের একটি মেয়ের সঙ্গেও আলাপ হলো। সে লাদাখ হয়ে, অনেক ট্রেকিং করে এখন শ্রীনগরে বেড়াতে এসেছে। এই মেয়েটির নাম লোয়েল। ওর শ্রীনগর, লাদাখ খুবই ভালো লেগেছে। আমরা একই হোটেলে আছি। হোটেলের সামনে শালের দোকান থেকে ও ওর মায়ের জন্য একটি চমৎকার শাল কিনল। কী রং কিনবে বুঝতে পারছিল না। ওর অনুরোধে আমি ওকে একটু সাহায্য করলাম। শ্রীনগরে সেদিনই ওর শেষ দিন। পরদিন ও চলে যাবে। কাশ্মীরের বিখ্যাত সামগ্রী হচ্ছে কার্পেট, শাল, নানারকম হাতের কাজ এমব্রয়ডারি, ফল ও শুকনো ফুল এবং বাদাম। পরদিন আমরা সকাল ৮টায় রওনা দিলাম পহেলগাঁওয়ের উদ্দেশে। পথে একটি পাঞ্জাবি ধাবায় ব্রেক ফাস্ট করে নিলাম।

পহেলগাঁও যেতে যেতে দেখি, ডানদিকে ঝিলাম নদী বয়ে যাচ্ছে। এই ঝিলাম নদীতে বসেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সন্ধ্যা রাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা।’ এখন প্রশস্ত হাইওয়ে ধরে আমরা এগুচ্ছি। এই রাস্তাই চলে গেছে জম্মুর দিকে। রাস্তার বাঁ দিকে অসংখ্য ক্রিকেট ব্যাটের দোকান ও ফ্যাক্টরি ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেট ব্যাট। কাশ্মীরের রিড় গাছ ছাড়া এই ব্যাট হয় না। এর কাঠ খুবই শক্ত। এই গাছের আরেক নাম কাশ্মীরি উইলো। পুরো শ্রীনগর জুড়ে অজ¯্র উইলো গাছ। কোথাও কোথাও উইপিং উইলোও আছে। তবে তার সংখ্যা কম। আর আছে চিনার, পপলার, পাইন। পহেলগাঁও যাবার পথে হাইওয়েতে পেরিয়ে গেলাম অবন্তীপুর। এখান থেকে বেঁকে গেছে অনন্তনাগের পথ। অনন্তনাগ থেকে ৮ কিলোামিটার দূরে মার্তন্ডর সূর্যমন্দিরের সামনে ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আলোকের ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও’ এই গানটি। শঙ্খ ঘোষের লেখা থেকে জানা গেল এ-তথ্যটি।

ফেরার সময় আমরা ফিরেছি অনন্তনাগের পথ হয়ে। চলতে চলতে হাইওয়ে থেকে পহেলগাঁওয়ের রাস্তায় যখন ঢুকে পড়লাম, তখন চোখে পড়লো অন্য দৃশ্য। সরু রাস্তার দু’পাশে বাড়িঘর, দুইএকটা দোকান আর দু’পাশে একদিকে আপেল আর অন্যদিকে আখরোটের বাগান। ও হ্যাঁ, হাইওয়ের ডানপাশে শূন্য জাফরানের ক্ষেত দেখেছি মাইলের পর মাইল। ওরা বলে কেশর। জাফরানের ভরা ক্ষেত দেখতে হলে আসতে হবে সেপ্টেম্বর মাসে। সেটা তো আর দেখা হলো না। ফুলের রেণু থেকে জাফরান সংগ্রহ করা হয়। আপেল, আখরোটও পরিপক্ক হয় সেপ্টেম্বর মাসে।

যাক, পহেলগাঁওয়ের রাস্তা ধরে বেশ এগিয়ে যাবার পর শুরু হলো হাতের বামে পাহাড় রেখে যাত্রা। ডানদিকে খর¯্রােতা পাহাড়ি নদী। সে এক অপরূপ দৃশ্য। ওপরে আকাশ, দু’দিকে সুউচ্চ পাহাড়, মাঝখানে পথে চলেছে গাড়ি। আর ডানদিকে সেই পাহাড়ি নদী। নদীর বুকে পাথর। মানুষ সমান বড় পাথরও আছে কোথাও কোথাও। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে অনেকে সেখানে নেমে গিয়ে বসেছে নদীর বুকে। ছেলেরা ¯œানও করছে অনেকে। আমরাও নেমে দাঁড়িয়ে একটু ছবি তুললাম। একদল ছেলে স্কুল বাস থেকে নেমে ছুটে এসে আমাদের সঙ্গে ছবি তুলল।

তারপর আবার পথচলা। সেই অপূর্ব পাহাড়ি নদী লিডারকে পাশে রেখে। দুপুরে আমরা পৌঁছলাম একটা জায়গায়। সেখানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে সকলের গাড়ি রাখা। এরপর আর বড় গাড়ি যাবে না। ওপরে যেতে হলে যেতে হবে ঘোড়ায় চড়ে। নারী, পুরুষ, বাচ্চারাসহ সবাই ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে। আমরা ঘোড়ায় চড়ার সাহস করলাম না। তাই আমাদের যেতে হলো ছোট গাড়িতে চড়ে। কতদূর যেতে চাই, তার কী রেট সবই একটা বোর্ডে লেখা রয়েছে। ‘বজরঙ্গী ভাইজান’ চলচ্চিত্রের শুটিং যেখানে হয়েছে, সে পর্যন্ত যাওয়া যায়। আরও ওপরের ১৪ হাজার ফুট পর্যন্ত যাওয়া যায়। অনেকে গেলও। আমাদের ট্রেনের সহযাত্রী বাংলাদেশের দু’টি পরিবারের সঙ্গে সেখানেও দেখা হলো। একটা ছোট গাড়িতে চড়ে আমরা ৭ হাজার ফুট ওপরে পহেলগাঁও ভ্যালি পর্যন্ত গেলাম। সেখানে নেমে আবার ফিরে এলাম আমাদের গাড়ির কাছে। তারপর আবার ফিরতি যাত্রা। এবার অন্যপথ ধরে গ্রামের ভেতর দিয়ে দিয়ে আমরা ফিরে এলাম বিকালে আমাদের হোটেলে। পহেলগাঁও পেরিয়ে আরও অনেক উঁচুতে অমরনাথ মন্দির। সেই তীর্থযাত্রায় যারা বেরিয়েছে এমন হাজার হাজার যাত্রীর সঙ্গেও পথে দেখা হয়েছে আমাদের।

পরদিন আমাদের সকাল সকাল বেরুতে হবে। আমরা যেহেতু ঘোড়ায় চড়বো না, আর সেখানে অমরনাথ যাত্রীরও প্রচুর ভিড় রয়েছে, তাই স্থির হলো, আমরা বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট সোন মার্গ না গিয়ে অন্য একটি জায়গায় যাবো।
তার নাম মানস্বাল্ লেক। পরদিন আমরা গান্ডেলবাল পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরে ধরে পৌঁছে গেলাম একটি পার্কে। সামনে বিশাল লেক। চারদিকে পাহাড় তো রয়েছেই। সামনে দেখি চমৎকার পদ্মবন। এখানে লেকে আমরা শিকারায় ভ্রমণ করব। কাশ্মীরে নৌকাকে বলে শিকারা। গাইডসহ আমরা গিয়ে শিকারায় উঠলাম।

চমৎকার বসার ব্যবস্থা। এই লেকে ট্যুরিস্টদের ভিড় নেই। আমরা ছাড়া বোধহয় অনেক দূরে আরেকটি নৌকা। আমাদের নৌকা চলছে। বৈঠায় জলের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ওপারে পাহাড়ের ঢালে বসতি আছে। সেখান থেকে কিছু কোলাহল ভেসে আসছে। লেকের জল পরিষ্কার। লেকের চারদিকেই পদ্মবন। অসংখ্য পদ্ম ফুটে আছে। ওপরে আকাশ দু’দিকে পাহাড়, আর আমরা শিকারায়। আধঘণ্টা পর আমরা পার্কের কাছে পৌঁছলাম। পাহাড় কেটে কেটে তৈরি করা সিঁড়ি বেয়ে পার্কে উঠলাম। ওপরে পার্কে ওঠার আগে একটি সুপ্রাচীন চিনার গাছ আমাদের বিমোহিত করেছে। তার কা- যে কত মোটা ছিল, তা বর্ণনা করা কঠিন। হয়তো বনগাঁর পথের ধারে আমরা যে প্রাচীন রেইনট্রি দেখি, তার ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি মোটা সেই চিনার গাছের কা-। পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আমরা সেই পার্কে পৌঁছুলাম। স্থানীয় আরও কিছু মানুষও এসেছেন। কিন্তু ট্যুরিস্টের ভিড় নেই। আমরা ওপরে বিশাল আখরোট গাছের ছায়ায় বসে রইলাম অনেকক্ষণ। হয়তো ঘণ্টাদুয়েক। তারপর ফিরে আবার শিকারা যাত্রা। আবার গ্রামের পথ ধরে শ্রীনগরে ফেরা। ঢাকা শহরে থেকে কোথাও আমাদের দুদ- প্রকৃতির কোলে শাান্ত হয়ে বসার সুযোগ হয় না। মন খারাপ করে ভাবছিলাম, আমাদের দেশেও কত সুন্দর নদীনালা, পাহাড় ও বন আছে। কোথাও পর্যটকদের জন্য এমন বেড়ানোর ব্যবস্থা নেই।

দুপুরে আমাদের আমন্ত্রণ ড্রাইভার কাম গাইড রাজার বাড়িতে যেতেই হবে। সেখানে তার বাবা, মা, বোন আর ছোট্ট ভাগ্নির সঙ্গে দেখা। সেখানে বিপুল আপ্যায়ন। কোপ্তাকারি, রোগন জুস, আখনি আরও অনেক অনেক আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম। ওখানে থেকে গেলাম আমাদের আরেক বন্ধু যিনি আমাদের জন্য হোটেল ইত্যাদি সব ব্যবস্থা করেছেন সেই শওকত ভাইয়ের বাড়ি। সেখানেও অনেক আপ্যায়ন হলো। কাশ্মীরি চা কাহওয়া পান করলাম। কেশর, সঙ্গে বাদামের গুঁড়ো (এলমন্ড)। অনেকে এতে এলাচ ইত্যাদি মশলাও দেয়। এই চা খুব রিফ্রেশিং। স্বাদ ভালো। শওকত ভাইয়ের ভাই, বুড়ো বাবা, স্ত্রী, দু’টি ছোট ছেলে নিয়ে তার পরিবার। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা বিদায় নিলাম। শওকত ভাই কলকাতায় গিয়ে শাল বিক্রি করেন। এটাই তার পেশা। আমাদের এক বন্ধুর সূত্রে তার সঙ্গে আলাপ।

রাজা আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিলেন। আবার বাঙালি ধাবায় খাওয়া ও হোটেলে বিশ্রাম। ধাবায় কাজ করেন হাওড়ার আশীষ ও মেদিনীপুরের আরও কয়েকটা ছেলে। আশীষ আমাদের বিশেষ যতœ করেছেন। এই বাঙালি ধাবা বিশেষ জনপ্রিয়। যারা অন্য হোটেলে বা হাউস বোটে থাকেন, তারাও এখানে এসে খাচ্ছেন বা খাবার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের ওই হোটেলের ধার ধরে অসংখ্য হোটেল। আর এদিকে আরও বাঙালি ধাবা, পাঞ্জাবি ধাবাও রয়েছে।
পরদিন কথা ছিল শওকত ভাই পরিবারসহ আমাদের সঙ্গে যাবেন গুলমার্গ। এই গুলমার্গ হচ্ছে বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট। কিন্তু সকালে উঠে জানলাম লালচক, সোনমার্গ, গুলমার্গসহ অনেক জায়গায় কার্ফু জারি। তাই আমাদের গুলমার্গ যাওয়া হলো না। আমাদের এলাকায় কার্ফু ছিল না। তাই গাইড এসে নিয়ে গেলেন পরীমহল নামের একটি গার্ডেনে। বনের ভেতর দিয়ে দিয়ে পাহাড়ের পথ বেয়ে গাড়ি চলছে। এটিও একটি মোগল গার্ডেন ও একটি হেরিটেজ স্থান। পাহাড় কেটে কেটে একতলা, দোতলা, তিনতলায় গার্ডেন। অপূর্ব। এখান থেকে পুরো শ্রীনগর দেখা যায়। চারদিকে পাহাড়ের সারি। মাঝে ডাল লেক। তার দু’দিকে বসতি, হোটেল। কথিত আছে পরীমহলে নাকি রাতে পরী নামে। দিনের বেলাও পরীমহল অপূর্ব সুন্দর দেখতে। অনেক ট্যুরিস্টের সঙ্গে দেখা হলো। বাংলাদেশেরও অনেক পরিবারের সঙ্গেও দেখা হলো আমাদের।

সেখানে আমরা গাছের ছায়ায় অনেক সময় কাটালাম। তারপর আবার আমরা ফিরে চললাম পাহাড়ের পথ বেয়ে বনের পথ ধরে। বনের ভেতরের সেই পথটাও খুবই সুন্দর। এখানে যাওয়া ও ফেরার পথে গভর্নর হাউস পড়ে।
পরীমহল থেকে আমরা গেলাম কাছেই নেহরু ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানেও ফুলের বিপুল সমারোহ। অনেক ট্যুরিস্ট দেখলাম। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সপরিবারে অনেকে এসেছেন। বাংলাদেশের কয়েকটি পরিবারও দেখলাম। পরীমহলে ও এখানে পরিচিত মানুষজনের দেখাও পেলাম। আর দেখা হলো সুদূর ইরাক থেকে আসা ছোট বাচ্চাসহ একটি পরিবারের সঙ্গে। পার্কে বেড়ানো ছাড়াও এখানে রয়েছে লেকে বোট রাইডিংয়ের ব্যবস্থা। এ কিন্তু শিকারা নয়, পেডালিং বোট। অনেকেই বোটেও বেড়াচ্ছে। বাচ্চারা, বড়রা সকলেই। আমরা অবশ্য কিছুটা হেঁটে গিয়ে লেকের কোণায় একলা একটা উইপিং উইলো গাছ খুঁজে পেলাম। যার নিচে আমরা বসার জায়গা খুঁজে পেলাম। আমাদের থেকে কিছু দূরে এসে বসলেন ইরাকি তরুণীরা। সঙ্গের বাচ্চারা বোটে খুব মজা হৈচৈ ফুর্তি করছে।

আমরা সেই অপূর্ব উইলো গাছের নিচে বসে অনেক সময় কাটালাম। বাইরে সেদিন খুব রোদ ছিল। গাছটার গড়ন খুব সুন্দর। মাথার ওপর থেকে গাছের ডালগুলো নেমে এসেছে মাথার লম্বা চুলের মতো। সামনে লেক। দূরের পাহাড়ের সারি। ওপরে বিস্তীর্ণ আকাশ তো রয়েছে।
এখানে প্রায় দু’ঘণ্টা বসে থেকে আমরা আবার ডাল লেকের ধারঘেঁষে পথ ধরে আমাদের হোটেলে। এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকালে হোটেল ছেড়ে শিকারায় উঠে আমরা গেলাম হাউস বোটে থাকতে। সেও এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। নৌকার ওপরে যেন এক বিশাল বাড়ি। নৌকা থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। ঢুকেই দেখা গেল চমৎকার ব্যালকনি, তারপর কার্পেটে মোড়া বিশাল ড্রইংরুম। তারপর বড়সড় ডাইনিং হল। চমৎকার বেডরুম ২টি ও যেকোনো হোটেলকে হার মানায় এমন এ্যাটাচ্ড্ বাথ। পাশেই সংলগ্ন জমিতে একটি বাড়িতে কেয়ারটেকার থাকেন মা, বাবা পরিবার-পরিজন নিয়ে। হাউস বোটের বারান্দায় বসে ডাল গেটের পথ। মানুষ জন, শিকারায় ভ্রমণরত ট্যুরিস্ট দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল। দেখলাম নৌকায় করে অনেকে শাল, সবজি, ফুল ইত্যাদি বিক্রি করতে আসেন হাউসবোটের ক্ষণিক বাসিন্দাদের কাছে।

ডাল লেকে এই হাউসবোট ৩শ’ বছর ধরে পর্যটকদের আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথ থেকে গেছেন এখানে। তিনি ছিলেন অবশ্য ঝিলম নদীতে। এখন পানির অবস্থা ভালো নয়। সেজন্য হাইকোর্টের রুলিং আছে হাউসবোট মালিকদের ওপর। তাদের বিশেষ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করতে বলা হয়েছে। এই ট্যুরিস্ট স্পটের প্রাণ ডাল লেকের পানিকে রক্ষার জন্য। গ্রেটার কাশ্মীর পত্রিকা পড়ে সে-খবর জানলাম।
ডাল লেকে শিকারায় ভ্রমণও পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। হাউসবোটে থাকার অভিজ্ঞতাও এক অনন্য সঞ্চয়। এখানে পর্যটনই মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। কাশ্মীরে লক্ষ করেছি মেয়েরা খুবই সাবলীল। জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মুসলিম। তাই অনেকের মাথায় ঘোমটা দেয়া থাকে, তবে কোনো বোরখা দেখিনি। হিজাবও দেখিনি। কাউকে কাউকে গাড়ি ও স্কুটার চালাতেও দেখেছি।

পরদিন খুব ভোরে আমাদের গাইড ওপারে এসে পৌঁছলো। আমরা এপার থেকে শিকারায় ওপারে গিয়ে রওনা হলাম বিমানবন্দরের উদ্দেশে।
শওকত ভাই, রাজারা সপরিবারে আমাদের বিদায় জানাতে সঙ্গে গেলেন। এয়ারপোর্টে ভিড় ছিল খুব। আমাদের ফ্লাইটও দু’ঘণ্টা বিলম্ব ছিল। যাহোক নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে আমরা বিমানবন্দরে ঢুকে অপেক্ষা করলাম ও সময়মতো বিমানে উঠলাম।
কাশ্মীর সত্যিই ভূস্বর্গ। মানস্বাল্ লেকে ভ্রমণ করতে করতে মনে হচ্ছিল সুইজারল্যান্ডের থেকে এইবা-কম কি।
আবার ফিরে আসার ইচ্ছা নিয়ে কাশ্মীর ছাড়লাম। ভূস্বর্গ কাশ্মীরের স্মৃতি মানসপটে উজ্জ্বল, অমলিন হয়ে থাকবে।