বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / একজন পশু প্রেমিক
০৯/০৬/২০১৬

একজন পশু প্রেমিক

- আহসান হাবীব

গফুর সাহেব একজন বিশিষ্ট পশুপ্রেমিক। তার ঘরে বিড়াল, কুকুর, ছাগল, ভেড়া, গরু, খরগোশ, কবুতর সবই আছে। তার বাসার পিছনে বিরাট জায়গা। ঢাকা শহরে এমনটা দেখা যায় না। খালি জায়গা এরকমভাবে পড়ে থাকা... কিন্তু গফুর সাহেবের ক্ষেত্রে হয়েছে। ডেভেলপাররা নানা টোপ ফেলে চেষ্টা করছে জায়গাটা হাত করতে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। তার এক কথা, এ জায়গা ছাড়লে আমার পশু-পাখিরা যাবে কোথায়?
‘স্যার, ওদের জন্য না হয় আমরা ছাদে একটা মিনি চিড়িয়াখানার মতো করে দেব।’
‘কি? ছাদে চিড়িয়াখানা?’
‘কেন নয় স্যার? চীনে তো আজকাল মাল্টিস্টোরড অ্যাপার্টমেন্টে বিভিন্ন তলায় মাটি ফেলে চাষ-বাসের ক্ষেত-খামার পর্যন্ত হচ্ছে।’
‘এটা চীন না বাংলাদেশ...এখানে পশু-পাখি মাটির কাছাকাছি থাকবে। এটাই নিয়ম।’
‘কেন স্যার, আমরাও ছাদে মাটি ফেলব...ষোল তলার উপর মাটি ঘাস, তার উপর আকাশ কত কাছে একবার ভাবুন স্যার...’
‘স্যরি আপনি এবার আসুন।’
ডেভেলপারকে বিদায় করে তিনি আজমলকে ফোন দিলেন। আজমল কাঁটাবনের পশু-পাখির দোকানের একজন ব্যবসায়ী। গফুর সাহেবের সাথে খাতির আছে।
‘হ্যালো আজমল?’
‘জি স্যার বলেন।’
‘আমার ঘোড়ার খবর কি?’
‘স্যার, ঘোড়াতো অনেকই আছে। কিনবেন কবে?’
‘সম্ভব হলে আজই।’
‘তাইলে স্যার এখনি আইসা পড়েন।’
‘আচ্ছা, আমি টাকা-পয়সা নিয়ে চলে আসছি।’
এই সময় চায়ের কাপ নিয়ে স্ত্রী ঢুকলেন। গম্ভীর।
‘কি ব্যাপার?
‘কিসের কি ব্যাপার?’
‘তুমি মনে হচ্ছে ঘোড়া কিনতে যাচ্ছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘পশুপ্রেম তো অনেক হলো, আর কত?’
‘এখানে আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। ঠিক পশুপ্রেমের কারণে আমি ঘোড়া কিনছি না। হ্যাঁ কিছুটা পশুপ্রেমতো আছেই। তবে আসলে আমি ঘোড়া কিনছি প্রয়োজনে।
‘মানে?’
‘মানে দেখছ না ঢাকা শহরের অবস্থা? ট্রাফিক জ্যাম...তাই ভাবছি...’
‘কি ভাবছ?’
‘তাই ভাবছি ঘোড়ায় করে অফিস করব।’
‘কি? ক্কি??’ স্ত্রী মাজেদা বেগম ঝপ করে সোফায় বসে পড়েন। তার মাথাটা যেন চক্কর দিয়ে ওঠে। তিনি এসব কি শুনছেন? তার স্বামী ঘোড়ায় চড়ে অফিসে যাচ্ছে...ওফ গড...
এ সময় পাশের ঘর থেকে মেয়ে মাইশা ঢোকে। সেও নিশ্চয়ই ঘোড়া প্রসঙ্গ শুনেছে।
‘ওহ বাবা দারুণ হবে। তুমি ঘোড়ায় চড়ে অফিস করবে। মাথায় থাকবে একটা টেক্সাস হ্যাট, হাতে চাবুক...পায়ে থাকবে লোহার চাকা লাগানো হাঁটু পর্যন্ত চামড়ার জুতা... ওয়েস্টার্ন মিউজিক বাজবে... ট্যাট টা ট্যাট ট্যা ট্যা...
‘মিউজিক? মিউজিক কেন?’ বাবা অবাক!
‘বাহ, ওয়েস্টার্ন ছবিতে দেখ না?’
‘উফ! তুই এখান থেকে যাবি?’ মা চেঁচিয়ে উঠেন।
তবে না, শেষ পর্যন্ত গফুর সাহেব সত্যি সত্যিই ঘোড়া একটা কিনেই ফেললেন। তবে ঘোড়া কিনতে গিয়ে তার একটা অভিজ্ঞতা হলো। সেটা হচ্ছে বেশিরভাগ ঘোড়াই যেন অপুষ্টিতে ভুগছে। কেন? হোয়াই? দেশে কি ঘাসের অভাব পড়েছে? এই যে অফিস আদালতে সবাই কাজ না করে ঘাস কাটছে এসব ঘাস যাচ্ছে কোথায়? নাকি গোডাউনে স্টক করছে কোরবানি ঈদের সিজনে ছাড়বে বলে? সে যাই হোক, তিনি টানা দু’দিন প্র্যাকটিস করে ঘোড়ায় চড়া শিখে ফেললেন। ঘোড়ার মুখে লাগাম লাগানোটাও তাকে শিখতে হলো, পিঠে কিভাবে জীন পরানো... ইত্যাদি সবই তাকে শিখতে হলো।
প্রথম দিন অফিসও করে ফেললেন ঘোড়ায় চড়ে। জ্যাম এড়িয়ে গাড়ির আশ-পাশ দিয়ে... কখনো ফুটপাথ দিয়ে দিব্যি আধা ঘণ্টায় অফিসে চলে এলেন। অবশ্য পথে ঘোড়া থামিয়ে একাধিক চ্যানেলে ইন্টারভ্যু দিতে হলো। সবাই তার এই কর্মকা-কে ভূয়সী প্রশংসা করল। পরদিন সব পত্রিকায় বক্স নিউজ এল ‘গফুর সাহেব ইতিহাস গড়লেন’। বক্স নিউজের উপরে তার ছবি, ঘোড়ার পিঠে লাগাম হাতে হাসিমুখে বসে আছেন তিনি।
ভালো চলছিল। একদিন তিনি মেয়েকে তার ভার্সিটিতে লিফটও দিয়ে এলেন ঘোড়ায়, মেয়েও মহা উত্তেজিত।
কিন্তু একদিন বিপদ হলো। জ্যামের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যাওয়ার সময় এক মন্ত্রীর পাজেরো গাড়ির উপর ‘ইয়ে’ করে দিল গফুর সাহেবের ঘোড়া। ছোটটার সঙ্গে বড়টাও করল। ব্যস! শুরু হয়ে গেল হাউ মাউ খাউ অবস্থা। ছুটে এল পুলিশ সার্জেন্ট, ট্রাফিক... মহা হাউ কাউ! গফুর সাহেবের ঘোড়া আটক করা হলো। ঘোড়ার মুখের লাগাম জিন সব বাজেয়াপ্ত করা হলো। কিন্তু ওদিকে গফুর সাহেবের ঘোড়া আটকানোর খবর মিডিয়ায় চলে যাওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। মিডিয়া গফুর সাহেবের পক্ষে। ফলে মন্ত্রী মুখ চুন করে নির্দেশ দিলেন তার ঘোড়া তাকে ফিরিয়ে দিতে।
পুলিশ কাস্টডি থেকে ঘোড়া ফেরৎ নিতে গিয়ে আরেক জ¦ালা! ঘোড়া তো হ্যাঁ করছে না, মুখ বন্ধ করে আছে। লাগাম পরানো যাচ্ছে না। কি করা? একজন পুলিশ বুদ্ধি দিল, ‘মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে দেখতে পারেন।’
‘কেন? তুড়ি বাজাব কেন?’
‘আমরা মানুষরা তুড়ি বাজিয়ে হাই তুলি না?’
আরেক পুলিশ বলল, ‘ওভাবে না, আপনি নাকে সুড়সুড়ি দেন। হ্যাঁচ্চো দিবে তখন মুখ খুলতেই লাগাম পরিয়ে ফেলবেন।’
গফুর সাহেব ওসব কিছুই করলেন না। তিনি তার ঘোড়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বললেন। মুখ হা হয়ে গেল ঘোড়ার, যাকে বলে চোয়াল ঝুলে পড়া আরকি... আর ঐ ফাঁকে টপ করে ঘোড়ার মুখে লাগাম পরিয়ে দিলেন গফুর সাহেব।
ঘোড়ার জিন চাপিয়ে চলেই যাচ্ছিলেন। এক পুলিশ আটকালো।
‘ভাইজান একটা কথা।’
‘কি কথা?’
‘কি এমন বললেন ঘোড়ার কানে কানে যে ও একবারে মুখ হাঁ করল?’
‘বলেছি কাল থেকে আর ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যাম থাকবে না!’