বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / রাজধানীর রাজহাঁস সাপ-পাখি ও ডাহর
০৯/০৬/২০১৬

রাজধানীর রাজহাঁস সাপ-পাখি ও ডাহর

- ইনাম আল হক

আটটি রাজহাঁস দশ-বারো ফুট দূরে হল্লা করে ভেজা ঘাস খাচ্ছে। আর, মাঝে মাঝে মাথা উঠিয়ে সন্দেহের চোখে আমাদের দেখছে। দুরবিন রেখে হতবাক হয়ে আমরা সে দৃশ্য উপভোগ করছি। এদের মাথায় টানা দুটো কালো দাগ। সহজেই চেনা যায়, এরা হচ্ছে ‘দাগি-রাজহাঁস’। মাথায় রেখা থাকে বলে এর ইংরেজি নাম হলো ‘বার-হেডেড গুজ’।

শীতের এক দুপুরে মিরপুর চিড়িয়াখানায় জলাশয়ের খাড়া পাড়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। জলাশয়ের কিনারায় গুটি গুটি হেঁটে যাচ্ছে আটটি রাজহাঁস। ঘটনাটা ১৯৮৮ সালের; সম্প্রতিকালের নয়।

প্রতি শীতে সে সময় এই জলাশয়ে অনেক বুনোহাঁস আসত। একটি দুর্বল দুরবিন নিয়ে আমরা যেতাম সে হাঁস দেখতে। কোনটি কোন প্রজাতির হাঁস, তা নিয়ে তর্ক করতাম। আমাদের স্বল্প-অভিজ্ঞতা আর সালিম আলির বইয়ের দুর্বল ইলাস্ট্রেশন দিয়ে সব তর্কের মীমাংসা হতো না। সেবার চিড়িয়াখানায় সহ¯্রাধিক পরিযায়ী হাঁসের সঙ্গে আটটি দাগি-রাজহাঁস এসে আমাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। রাজহাঁসগুলো সেখানে কয়েকদিন ছিল। তারপর আর তাদের দেখা পাইনি।

সেই শেষ দেখা। তারপর চিড়িয়াখানায় আর কোনো রাজহাঁস আসতে দেখিনি। তবে অন্যান্য পরিযায়ী হাঁস আসত; ল্যাঞ্জাহাঁস, তিলিহাঁস, সিঁথিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, টিকিহাঁস, ইত্যাদি। কিন্তু এখন সবই শেষ। মিরপুর চিড়িয়াখানার নাম হয়েছে জাতীয় চিড়িয়াখানা। জলাশয়টির পাড়ে এখন আর ঘাস নেই, লক্ষ মানুষের পায়ে পায়ে সবই ধূলিময়। জলাশয়ের কলুষিত পানিতে কোনো বুনোহাঁস এসে বসে না। সেখানে দেখা যায় ডানা-কেটে রাখা তিনটি অলস গগনবেড়।

চিড়িয়াখানার জলাশয়ে দাগি রাজহাঁস আর কোনোদিন দেখা দেবে না। সম্ভবত ল্যাঞ্জাহাঁস, তিলিহাঁস, সিঁথিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, টিকিহাঁস, কিংবা শরালিহাঁস, কিছুই এখানে আর দেখা দেবে না। জনাকীর্ণ জাতীয় চিড়িয়াখানা তো বটেই, এ দেশের অধিকাংশ লোকালয়ে এরা আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন।
রাজধানীর আর দু-একটি জলাশয়ে গত দুই দশকে একই ধরনের অকাল অন্তর্ধানের ঘটনা ঘটেছে। সাভারে ক্ষয়িষ্ণু শালবনের মাঝে এখনও টিকে আছে কিছু জলাশয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দু’তিনটি জলাশয় আমজনতার কাছে বেশি পরিচিত। কয়েক বছর আগেও শীতকালে এখানে পানমুরগি, ল্যাঞ্জাহাঁস, তিলিহাঁস ও গিরিয়াহাঁস দেখা যেত।

জাবি ক্যাম্পাসের জলাশয়ে এক সময় ‘গয়ার’ দেখা যেত। বিগত দশকে বিশে^র বিপদগ্রস্ত প্রাণীর তালিকায় নাম উঠেছে এর। ডুব-সাঁতার কেটে মাছ শিকারের কাজে বিরতি দিয়ে মাঝে-মধ্যে সাপের মতো সরু গলা পানির ওপর তুলে পাখিটি শ^াস নিত। এই গলার জন্যই পাখিটিকে লোকে বলে ‘সাপ-পাখি’। এর প্রচলিত দু’টি ইংরেজি নাম ‘¯েœকবার্ড’ এবং ‘ডার্টার’।

শাপলা-ডগার মাঝে হঠাৎ করে এ পাখির লিকলিকে গলা জেগে উঠতে দেখে পানির নিচে এর অসাধারণ মালিককে অনুমান করার মতো মানুষ ক্যাম্পাসে বেশি ছিল না। নির্জন দুপুরে এ পাখি পানি ছেড়ে মেহগনি গাছের ডালে বসে রোদে ডানা মেলে ধরত। তখন দু-চারজন সমঝদার একে দেখে চমৎকৃত হয়েছে।

জাবি ক্যাম্পাসের জলাশয়ে শেষবারের মতো গয়ার দেখেছি ২০০৫ সালে। তারপর তিরোধান হয়েছে এর। ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিয়েছে ল্যাঞ্জাহাঁস, তিলিহাঁস ও গিরিয়াহাঁসের মতো সব পরিযায়ী জলচর পাখি। এখন পানমুরগিও দেখা যায় না। পাতি-শরালি এখন এ ক্যাম্পাসের শেষ সম্বল।
পাতি-শরালি বাংলাদেশের বিলের বাসিন্দা। গ্রীষ্মে এ দেশের অগণিত বিলে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। তখন এরা কারো চোখে পড়ে না। শীতে বিল শুকিয়ে গেলে এরা নগরীর জলাশয়ে এসে জড়ো হয়। তখন সবাই এদের দেখতে পান; বলেন এরা ‘শীতের অতিথি’। আসলে এরা এ দেশেরই স্থায়ী বাসিন্দা; অতিথি বা পরিযায়ী পাখি নয়। এ ক্যাম্পাসে সম্ভবত পরিযায়ী পাখিরা কোনোদিন আর দেখা দেবে না। তেমনি দেখা দেবে না গয়ার নামের সেই বৈশি^ক বিপদগ্রস্ত পাখিটি। দু’তিন প্রজন্ম পিছিয়ে গেলে ঢাকা থেকে হারিয়ে যাওয়া পাখির আরো করুণ কাহিনি বেরিয়ে আসে। শত বছর আগেও সাভারের ছন ও হোগলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বিলেতি সাহেবরা মুরগি, মথুরা ও ডাহর শিকার করতে আসতেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ব-বাংলার শিকারযোগ্য প্রাণী নিয়ে এফ.বি. সিমসন সাহেবের একটি প্রকাশনায় সাভারের ‘বাংলা ডাহর’ পাখির উল্লেখ রয়েছে।

ডাহর শিকার করার জন্য সাহেবদের বিশেষ আগ্রহ ছিল। বাংলার নামেই পাখিটির নামকরণ হয়েছে। এর ইংরেজি নাম ‘বেঙ্গল ফ্লোরিক্যান’ এবং আন্তর্জাতিক নাম ‘হুবারোপসিস বেঙ্গালেনসিস’। বাংলার সঙ্গে নামের এই বন্ধন রয়েছে বলেই যে পাখিটি বধ করতে সাহেবরা ব্যগ্র ছিলেন, তা নয়। বাঘের মতো আবডালে থাকতে এবং অতি সন্তর্পণে চলাফেরা করতে অভ্যস্ত ছিল বলে এ পাখি শিকার করাকে সাহেবরা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতেন।
প্রজনন ঋতুতে পুরুষ ডাহর সজোরে ডানা-ঝাপটে হোগলার ওপরে উড়ে উঠে মুহূর্তের মধ্যে আবার হোগলাতেই হারিয়ে যেত। ঐ মুহূর্তে তাক করে গুলি চালিয়ে ডাহর মারাকে সে সময়ের মূর্খ সাহেব-সমাজ বাহাদুরি বলে গণ্য করতো। বলা বাহুল্য, তাদের সে বাহাদুরির পরিণতি বাংলা-ডাহরের জন্য কাল হয়েছিল। সম্ভবত, সাভারের ডাহরকুলে এক সময় পুরুষ পাখির আকাল পড়ে যায়। ডাহরের প্রজনন বিঘিœত হতে থাকে। গাণিতিক হারে মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ডাহরের মতো ভূচর পাখির অস্তিত্ব আগে থেকেই হুমকির মুখে ছিল। চারিদিকে কংক্রিটের স্তূপ দেখে এখন বিশ^াস করাও কঠিন যে, সাভারে একদা বনমুরগি, মথুরা ও ডাহর বাস করত।

সাভারের শেষ ডাহরটি কবে শেষ-নিঃশ^াস ত্যাগ করেছিল, তা আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু জানি, গত শতাব্দীতে সাভার থেকে ডাহর পাখির বিলুপ্তি ঘটেছে। আসামের কাজিরাঙা প্রান্তরে আজও বিশে^র এই বিপন্ন পাখিটির দেখা মেলে। বাংলা-ডাহর শুধু ঢাকা থেকে হারায়নি, বাংলাদেশ থেকেই বিলুপ্ত হয়েছে। আমরা এ পাখিকে আর কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পারব না। এর টিকে থাকার মতো ঘাসের প্রান্তর এ দেশে কোথাও আর নেই।

রাজধানী থেকে পাখি হারিয়ে গেলে বিলাপ করার প্রয়োজন আছে কি! আমাদের মনে হয়, আছে। রাজধানী তো কেবলমাত্র দেশের প্রশাসন ও ব্যবসায়ের কেন্দ্র নয়। রাজধানীকে আমরা দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্পদের শো-কেস হিসেবে দেখতে চাই। শুধুমাত্র অফিস-কাছারি, পথ-ঘাট, দালান-কোঠা, নর্দমা- শৌচাগার দিয়ে তো রাজধানী হয় না। নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিসর্জন দিয়ে বসতি গড়লে যা হয়, তার নাম বস্তি। কংক্রিটের স্তূপ দিয়ে উঁচু করে গড়া হলেও তা বস্তি।

লন্ডনের নানা পার্কে আজও বুনোহাঁস ছানা নিয়ে হেঁটে বেড়ায়। বুনোহাঁসের দল এ সব পার্ক থেকে হারিয়ে গেলে রাজধানী লন্ডনের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের একটা বড় ক্ষতি হবে বৈকি! ঢাকা নগরীর জলাশয়গুলো দু-তিন দশক আগেও পাখি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল। মূর্খের মতো আমরা তার সবই প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি। প্রাকৃতিক সম্পদে ঐশ^র্যশালী একটি দেশে নগরীর নামে বস্তি গড়ার এই প্রচেষ্টা আমাদের সবার জন্যই অবমাননাকর নয় কি!

ধ্বংস-যজ্ঞের প্রতিযোগিতায় দেশের অন্যান্য নগরী রাজধানীর চেয়ে পিছিয়ে নেই। তবে সেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের শেষ চিহ্নগুলো রক্ষা করার সুযোগ এখনও কিছুটা বেশি রয়েছে।