মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / স্বপ্নের রাগিণী
০৯/০৬/২০১৬

স্বপ্নের রাগিণী

- মুস্তাফা জামান আব্বাসী

ক’বছর আগে কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে বসেছিলাম। বললেন, আব্বাসী, প্রায়ই পাখি চাও। গুলশানে তোমার নতুন ফ্ল্যাটের যে-জায়গাটায় পাখিটি বসবে তার মাপ দিয়েছ, সেই সঙ্গে পাখির ছবিটি, ব্রাজিল থেকে সংগৃহীত। ছবি না দিলেও জেনে রেখ তোমাকে আমার সবচেয়ে সুন্দর প্রচ্ছদটি এঁকে দিয়েছি। সবাইকে জানিয়ে দি’ : ‘জীবন নদীর উজানে’। কাইয়ুম ভাই আমার চেয়ে বড়, তাই তার ¯েœহের ভারে সবসময় কাত। বললেন, আমি ব্যস্ত। জান কি নিয়ে? বললাম, কি করে জানব? বললেন, ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ‘প্রথম আলোতে’ একটি নতুন পাতা বেরুবে। তার ডিজাইন নিয়ে ভাবছি, ‘স্বপ্ন’টা কেমন হবে?
পদ্মা নদীর পাড়ে বসে। ছোট ছোট স্বপ্নেরা ভিড় করে। গাইছি পিতার ফেলে যাওয়া গান : ‘ভাবি যারে পাই নাক তারে, সে যেন কতই দূরে’। বিচ্ছেদি। এই নদীতীরেই বোটে কাটিয়েছেন কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের অনেকগুলো সুন্দর প্রহর। তাঁর স্বপ্নের খবর পাই ‘মানসী’-তে। চলে যাই নদীর উৎস খুঁজতে, তিস্তা, তোরষা, কালজানি। যাকে নিয়ে ভাবি, সেটাই স্বপ্ন। যা পাওয়া যায় না, সেটাই স্বপ্ন।
স্বপ্ন দেখান যারা, মানবশ্রেষ্ঠ তারাই: সুর¯্রষ্টা, শিল্পী। ওস্তাদ আমজাদ আলি খানকে নিয়ে দুই পুত্র আমান আলি বাঙ্গাস ও আয়ান আলি বাঙ্গাসের গ্রন্থটি সামনে। ওস্তাদজি আঠারটি রাগ সৃষ্টি করেছেন। বইতে বিস্তারিত জানান না হলেও নামেই স্বপ্নলোকের খানিকটা পরিচয়। এগুলো : স্বরসমীর, কিরণ বঞ্চনা, চন্দ্রধ্বনি, সুহাগ ভৈরব, আমিরী টোরি, ললিতধ্বনি, শ্যামশ্রী, সরস্বতীকল্যাণ, প্রিয়দর্শিনী, শিভাঞ্জলি, জওয়াহার মঞ্জরী, মংগরেশ, কমলশ্রী, গণেশকল্যাণ, শুভলক্ষ্মী, রাহাতকৌষ, হাজিফকৌষ। ‘প্রিয়দশির্নী’ ইন্দিরার নামে আর কেউ রাগ সৃষ্টি করেছেন বলে জানা যায়নি। ওস্তাদ আমজাদ বলেছেন, রাগটি তার মানবিক রূপ নিয়ে নয়, বরং তার ঐশ্বরিক রূপ নিয়ে আমার কাছে প্রতিভাত। শুভলক্ষ্মীকে নিয়ে যখন রাগ সৃষ্টি করেন, তার মধ্যে পরিস্ফুট হয় নৃত্যপটিয়সী অসামান্যা রূপসী স্ত্রী শুভলক্ষ্মী। সবগুলো রাগ শোনা হয়নি, শুধু নাম দিয়ে সেই স্বপ্নলোকের কাছে যাওয়ার প্রয়াস।
পিতার সব গান শোনা হয়নি সবার। কান পেতে শুনি, সেখানেও অশ্রুত রাগিণী। রেকর্ডে তিন মিনিট দশ সেকেন্ড, কালের প্রবাহে বাহিরানার প্রকাশ সেখানে। কালজানির প্রবাহে ভাওয়াইয়া একদিনের সৃষ্ট কোনো গান নয়। বহুকাল থেকে রচিত ও সৃষ্ট। তাই বাহিরানা রাগের প্রকাশও নতুন সৃষ্টি। কেমন করে গাওয়া হলো, কোথায় তা বিলম্বিত অঙ্গে, কোথায় নেমে এল, কোথায় আক্ষেপ, গলার ভাঙাটুকুর সঙ্গে সাজুয্য রেখে। দোতরার ডাংয়ের সঙ্গে কতটুকু মিলেছে। সেটুকুই সৃষ্টি, সেটুকুর মধ্যেই বেঁচে থাকা। বাকিটুকু স্থান পাবে শ্রুতি তরঙ্গে। ভেবে দেখতে চেষ্টা করেছি জীবনের যোগ স্থাপনের সঙ্গে তার গাওয়া একেকটি গান দিয়ে। সেইটি সৃষ্টি, যদি কেউ সেভাবে দেখে। আমজাদ আলি অথবা আলি আকবরের মতো তার কয়েকটি গানের নামকরণ করলাম। আগামী প্রজন্ম হয়তো এই নামেই তার গানগুলো শনাক্ত করতে পারবে।
১৯৩১ রাগ বিরহিণী। ‘একবার আসিয়া সোনার চান মোরে যাও দেখিয়া রে’। আছে আক্ষেপ। যাকে পাওয়া যাবে না সেই দয়িতের প্রতি না দেখার হুতাশন, কোড়াকুড়ি, ডাহুকীর ক্রন্দন ছাপিয়ে যার বিন্যাস। নারী কিভাবে সংরক্ষণ করে তার জীবন, যখন বাপ-মা তাকে অল্প বয়সে পাঠায় দূর দেশে বিবাহ বন্ধনে। এই তিন মিনিটের গানেই সৃষ্টি হয় এক রাগিণী, যার নাম দেয়া যায়: বিরহিণী।
১৯৩৩ রাগ রমজান। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’-তে আছে রমজানের শেষে ঈদের জন্যে আকুতি। সমস্ত বাংলার মানুষ বিশেষ করে মুসলমান আগ্রহভরে প্রতীক্ষা করেছে ঈদের চাঁদের, সেই সঙ্গে আব্বাসউদ্দিনের গাওয়া নজরুলের এই গানটি। এই রাগের নাম দিলাম : রমজান।
১৯৩৭ রাগ নওদাড়ি। ‘আবো নওদাড়িটা মরিয়া’ কুচবিহারের চটকা গানের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। এই রাগের নাম দিয়েছি : নওদাড়ি।
১৯৩৮ রাগ মেঘ। ‘আল্লাহ্ মেঘ দে পানি দে’ গানটি প্রাচীনতম লোকগান। এই রাগের নাম দিয়েছি : মেঘ।
১৯৪০ রাগ বিচ্ছেদ। ‘আমায় এত রাতে কেনে ডাক দিলি’ বাংলার লোকসংগীতের প্রধান রাগ বিচ্ছেদ। কানু বিনা গীত নাই। তার লোকগীতির বৈশিষ্ট্য হলো রাধাকৃষ্ণের বিচ্ছেদ।
১৯৪১ রাগ ঈমান। যে আল্লার কথা শোনে এ ঈমান আল্লাহ্র প্রতি। তাঁর বহু গানে আছে এই পরিপূর্ণ সমপর্ণের চিত্র।
স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে এলাম সুরের রাজ্যে আলি আকবরের কাছে। যিনি আমাদের শিবপুর গ্রামের, বড় হয়েছেন মাইহারে পিতা আলাউদ্দিনের কড়া শাসনে। বিনয়ী ছেলের বিনয়ী পুত্র, ভাষণে কুমিল্লার টান। পঁচাশি বছর বয়সেও তরুণ, হাসিটি সারল্যের। আমাকে দিয়েছিলেন প্রাণভরা ভালোবাসা। রাগসংগীতকে পশ্চিমে প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি ও তাঁর স্ত্রী সমান উৎসাহী, বাংলাদেশের জন্যে তেমনি টান। ঘরে গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী সবাই উপস্থিত, ওস্তাদজী সরোদ হাতে নিয়ে আলাউদ্দিনের মতো সুন্দর মিষ্টি হাসি উপহার দিলেন।
যেন বলছেন, চলেছি পিয়া মিলনে, অনন্তের পানে, যেখানে পরমআরাধ্য শুনছেন আমার রাগিণীর কান্না। মাটির পুতুল, মানুষ এরা কেউই আমার আরাধ্য নন। আলি আকবর সৃষ্ট ‘চন্দ্রনন্দন’ [মুনস্ট্রাক বা চন্দ্রাহত] পৃথিবীর মানুষের সামনে খোলা জানালায় [ইন্টারনেটে]। আমার মেয়েরা, ছাত্রছাত্রীরা কেউ কেউ ইউটিউবে ‘চন্দ্রনন্দন’ শুনে সকালের যাত্রা শুরু করেন। আমিও। মন মুহূর্তে আনন্দে ভরে যায়। কোথা থেকে আসে সেই আনন্দ, জানি না। যেন মনে হয়, স্বর্গের কোনো অলিন্দ থেকে এই সুরের আলিম্পনে বিদ্ধ আমি এক সুরপ্রেমিক। আলি আকবর তার স্বপ্ন বিলিয়ে দিয়েছেন, আমরা কুড়িয়ে নিই সেই স্বপ্ন।
৩০ আগস্ট ২০১৬