বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর - ৮ম পর্ব
০৯/০৬/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর - ৮ম পর্ব

- রিজিয়া রহমান

দিন কারো জন্য বসে থাকে না। মানুষের কিছু নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর সঙ্গে মানুষও ঘুরছে জীবিকার ধান্দায়, স্বার্থের ধান্দায়। বেঁচে থাকতে হবে, এই পৃথিবীর আলো হাওয়া জলবায়ুর সবটুকু ইন্দ্রিয় দিয়ে ভোগ করে। তার জন্য আছে সংগ্রাম। বেঁচে থাকার সংগ্রাম। যে হোঁচট খেয়ে পিছলে পড়ল জীবনের গতিশীলতা থেকে, যে রয়ে গেল পিছে; চলমান জীবন তার কথা ক’দিন কতক্ষণ মনে রাখে? রাখার অবকাশ কোথায়? প্রতিটি নতুন দিন পুরাতনের স্মৃতিকে ম্লান করে মুছে দিচ্ছে।

ফুলজানের পরিত্যক্ত সেই ঘরটা খালি রইল না। মানিকগঞ্জের হাবুর মা এক ছেলের হাত ধরে ছমাসের পোয়াতি শরীর নিয়ে সে ঘরে আস্তানা পাতল।
তার আবির্ভাবটা এমনি একটা ঔৎসুক্যের ব্যাপার যে, ফুলজানের কথা সবাই আরো তাড়াতাড়ি ভুলল। কোন মেসে নাকি ভাত রাঁধা, মশলা পেষা, ধোয়ামোছা, বাড়া-কাড়া সবকিছুই করে হাবুর মা। মায়না পায় কুড়ি টাকা। উপরন্তু দু’বেলার খাওয়া। বেশ সচ্ছল অবস্থাই বলতে হবে। কিন্তু স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করলে পরিষ্কার কোনো জবাব দেয় না। কখনো বলে নিরুদ্দেশ হয়েছে। কাউকে বলে আট মাস হলো কলেরায় মরেছে।

তা এক বছরই হোক আর আট মাসই হোক, এদিকে তো দেখছি ছ’মাসের পেট। আড়ালে মুখ মুচকে হাসল সবাই। এ আর নতুন কী! এ বাড়িতে হরহামেশাই এমন ঘটনা ঘটেছে। এসব ছলচাতুরী এখানকার পুরোনো বাসিন্দারা খুব বোঝে।

এদিকে শবেবরাতের চাঁদের শুরু- শুরুতেই বাড়িওয়ালীকে একচিলতে উঠোনের আধখানা ঢেকে অস্থায়ী একটা চালা বানাতে হলো। ভাড়াটে আসছে বহু। রোজার ঈদ পর্যন্ত তো মৌসুম। তারপর আবার চালা খুলে ফেলবে। থাকবে কেবল ঘরের পুরোনো বাসিন্দারাই। এখন যারা আসছে এদের বেশির ভাগেরই পেশা ভিক্ষে করা। রোজার মাসটা থেকে যতটা পারে কামাই করে আবার চলে যায় এরা। এদিকে তো বাড়িওয়ালী একটা চালা দিয়েই ক্ষান্ত। আর এক কূয়া পায়খানায় সকাল বিকেল যেন কনট্রোলের লাইন লেগে যাচ্ছে। চিৎকার, হৈ চৈ, ঝগড়া, অশ্রাব্য গালাগালিতে কাক চিলও বসতে পারে না।

এরই মধ্যে একদিন সন্ধ্যাবেলা বিকিকিনি মিটিয়ে জোলেখার বাপ বাড়ি ফিরে মহাবিপত্তি বাধিয়ে দিল। কারবার সেদিন ভালো হয়নি। মেজাজ এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে। তারপর বাড়িতে এসেও শান্তি নেই। নিত্যনতুন বাচ্চাকাচ্চা মেয়েবুড়োতে বাড়িঘরে মানুষ থই থই করছে।
তার মধ্যে জোলেখার মা কথা পাড়ল- আলেকজানের বিয়ে দেখার জন্যে।

খিঁচিয়ে উঠল জোলেখার বাপ- উহ্্ বিয়া কইলেই বিয়া। আহ্লাদে আর পথ পায় না।
জোলেখার মা স্বামীর মেজাজের ধার দিয়েও গেল না। একভাবেই জানাল : গেরস্তের মেয়েদের এরচেয়ে বেশি বয়সে বিয়ে হওয়া ভালো না। তাছাড়া শহর বাজার জায়গা ভালো নয়। নানা দেশের নানা কেসিমের লোকের আড্ডা। মেয়ে বেশি সেয়ানা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সমীচীন নয়। এবং সর্বশেষে বলতে বাধ্য হলো যে, কয়েক মাস যাবৎ আলেকজানকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। আর কাজ ছাড়াবার কারণটাও যথাসাথ্য ঢেকেরেখে জানাল। আর বলেই যেন বিমূঢ় হয়ে গেল জোলেখার মা। বোমার মতো ফেটে পড়ল জোলেখার বাপ অছিমদ্দি। সারাবাড়ির লোক তার চিৎকারে উৎকর্ণ হয়ে উঠল- ‘কি এত বড় সাহস! এত বড় গুর্দা! তুই হারামজাদি আছিলি কিয়ের লিগা। নিচে নিচে প্যাটে প্যাটে সব হারামি বুদ্ধি। তগো মায় ঝি দুইডারে খুন করুম। আর তগো নাগার ওই ম্যাছের বাবুসাবরেও ছাড়–ম না। আমার ঘরের ম্যায়াপোলারে বেইজ্জত করবার সাহস পায়। কেস দিমু কোটে... মামলা করুম... আমিও বছিরদ্দিন মাতবরের নাতি অছিমদ্দি। আমার দাদায় পঁচিশ বছর মামলা করছে। সহজে ছাড়–ম আমি? কেয়ার করিনি ওইসব জুতা পায় ঘড়ি হাতে দুই পয়সার ফুটানি বাবুগো? যামু আইজি মেম্বরের কাছে। আগে কেন কইলি না হারামজাদি। হারামজাদিরা তগো দুইডারেই আজ শেষ করুম।

অছিমদ্দির লম্ফঝম্প আর পরিত্রাহি চিৎকারে সারাবাড়ির লোক ভেঙে পড়ল ঘরের দরজায়। জোলেখার মা চিত্রার্পিতের মতো বসে রইল। তার মনে হলো সত্যি যদি মাটি দু’ভাগ হতে পারত, আজ একমাত্র সেখানেই নিরিবিলি আশ্রয় মিলত।

অছিমদ্দি সারাটা ঘরে যেন চরকি পাঁকে ঘুরছিল। পিছন থেকে কে এসে হাত ধরল। এক ঝটকায় ঘাড় ফিরিয়ে দেখল আর কেউ নয়, স্বযং ফকিরচাঁদ। অছিমদ্দির কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রাম থেকে একেবারে খাদে নেমে এল। ফকিরচাঁদ অছিমদ্দির হাতটা একটু মুচড়ে দিল- ‘কী ঘরের ম্যায়াপোলার সাথে এত কোদাকুদিডা কিসের। খুব দেহাইছ। কও, কে কী কইছে তোমার ঝি বউরে, তার প্যাডডা এক কোপে ফালাইয়া ফালামু। তাই কইয়া ঘরের বউরে চিল্লাইয়া বেইজ্জত করবা নি।’ অছিমদ্দির হাতে আর একটা মোচড় দিল ফকিরচাঁদ।

যন্ত্রণায় অস্ফুট কঁকিয়ে উঠল অছিমদ্দি। ঘরের দরজায় জমে-ওঠা ভিড়ের দিকে তাকিয়ে প্রচ- এক হাঁক ছাড়ল ফকিরচাঁদ- ‘ওই হউনের পালেরা এখানে কী! ভাগ সব! না হয় এক-একডারে ধরিয়া ফাড়িয়া ফালামু।’

ফকিরচাঁদের রক্তচক্ষুর ধমক খেয়ে সুড়সুড়িয়ে সরে গেল সব। এতক্ষণে উঠে ফকিরচাঁদের প্রায় পায়ের ওপর পড়ে গেল জোলেখার মা। ‘ভাই রে তুমি আমার মার প্যাডের ভাইরও বেশি। কও ভাই মাইয়াডার বিয়া দিবার কথা কইয়া কী অন্যায়ডা করছিলাম। যার লিগা এক হাট মাইনষের মধ্যে আমারে এমনে মুখে কালি দিল।’

অছিমদ্দি নীরবে একবার জোলেখার মার দিকে তীব্র জ¦লন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
ফকিরচাঁদ শার্টের কলারে বাঁধা রঙচঙে সিল্কের রুমালটা খুলে মুখ মুছল। তারপরে পকেট থেকে একটা রমনা সিগারেট বের করে দিল অছিমদ্দির হাতে। নিজেও একটা ঠোঁটে গুঁজে দিয়ে ম্যাচ জ¦ালিয়ে অগ্নিসংযোগ করল। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে তরল উদার গলায় বলল- ‘কোনো চিন্তা করিস না। যা সাতদিনের মধ্যে তর ম্যায়ার বিয়া আমি দিয়া দিমু। কিন্তু রা কাড়বার পারবি না কেউ।’

অছিমদ্দিন জোলেখার মা দু’জনেই চুপ করে রইল। ভয়ও পেল দু’জনেই। ফরিকচাঁদ একবার যা বলেছে, তা করবেই। কী যেন কী অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে তারা আবার ডেকে আনল। দাম্পত্য কলহটা এত বড় না করলেই হত ভেবে রীতিমতো অনুশোচনা হলো জোলেখার বাপের।
দেখতে দেখতে শবেবরাত এসে গেল। আর এ বাড়িতে একটা খুশির হিল্লোল দেখা দিল দু’দিন আগে থেকেই। বিশেষ করে ছোটদের মহলে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই। কে কত পাড়া ঘুরবে, কে কত হালুয়া রুটি, খিচুড়ি, গোশত সংগ্রহ করবে তাই নিয়ে আগে থেকেই বচসা শুরু হলো।
নামাজের দিন রাত্রে পুরুষরা অনেকেই গেল মসজিদে। মেয়েরা যার যার নিজেদের ঘর যতটা সম্ভব সাফসুতরা করে, নামাজে বসল। বছরের একটি রাত। সারা জাহানের যত বান্দার একবছরের প্রাপ্য নেয়ামত নিয়ে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হন এই মহিমাময় রাত্রিতে। যার যার রুজি-কিসমত চেয়ে নিতে হবে আল্লাহর কাছ থেকে। একমাত্র সেই অন্তর্যামীই জানলেন, কী কিসমত চেয়ে এরা দু’চোখে আসুর দরিয়া বহাল। দু’হাত তুলে কাঁদল ওমরতুন- ‘ফিরিয়ে দাও আল্লাহ ফিরিয়ে দাও জয়নালকে আমার বুকে। ওর হাতের মাটি নিয়ে যেন আমি গোরে নামি। আর মাফ করে দিও সেই বেবুঝ বেদিলকে। কাঁদল জোলেখার মা, খালেকের বউ, ছাওনারার খালা, কাত্তিকার নানি কানিবিবি। সবাইর মনের বাসনা যেন একসূত্রে গাঁথা।
ফিরিয়ে দাও খোদা আমাদের সেই গাঁয়ের কুঁড়ে, ক্ষেতের ধান, আলুক্ষেতের পরে সবুজ মাঠের শেষে বালুকাময় তটে ঢেউ ভেঙে ভেঙে বয়ে যাওয়া নীল নদী! এই শহরের কুশ্রিতা, পাপ আর বেইজ্জতির কলঙ্ক থেকে রক্ষা কর আমাদের সন্তানদের।

পরদিন অনেকের ঘরেই চুলো জ¦ললো না। ছোটরা থালা, হাঁড়ি, ওড়া, চটের থলে, টিনের গামলা নিয়ে সকাল থেকেই বেরিয়ে পড়ল হালুয়া রুটি সংগ্রহে। অবস্থাপন্নদের আজ পুণ্যি কেনার দিন। অকাতরে বিলি হতে লাগল রুটি, ফিরনি, জরদা, হালুয়া। এক-একজন বোঝা-বোঝা রুটি, হালুয়া নিয়ে বাড়ি ফিরল। পরক্ষণেই হয়তো বেরিয়ে গেল একদল মগবাজার, হাতিরপুলের দিকে; আর একদল খিলগাঁও, শাহজাহানপুরে; আর একদল হয়তো গেল পুরানাপল্টন, শান্তিনগর, মালীবাগের দিকে। হেঁটে হেঁটে পায়ে ফোস্কা পড়ল, ‘রুটি দিবেননি আম্মা’ এই একঘেয়ে বুলির পুনরাবৃত্তি করতে করতে গলা ভেঙে গেল, তবু ওদের উৎসাহ উদ্যমের বিরাম নেই। রাতে গেল সব দল বেঁধে ফকির মিসকিন খাওনোর দাওয়াতে। বেদাওয়াতেই সুবিধেমতো দলে বসে পড়ে পেট পুরে খেল গোশত আলুর খিচুড়ি। উপরন্তু উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে থালা ভরে বাড়ি ফিরল।

আল্লাহ এই দিনটিতে সত্যি ওদের নেয়ামতের দ্বার খুলে দেন। একটি বছরের মধ্যে ওরা এত নানা স্বাদের মিষ্টান্ন আর মাংস খিচুড়ি পেটভরে খাওয়াকে একটা স্বপ্ন বলেই মনে করে। রুটিগুলো শুকিয়ে টিন আর মাটির হাঁড়ি বোঝাই করে রাখল মায়েরা। আর হালুয়া মিঠাই দু’দিন যখন-তখন খেল ওরা।
তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এল প্রতিটি বৎসরে ওদের কিসমতে যে রুজি থাকে সেই রুজি- একবেলা খাওয়া, উপবাস নয়তো অর্ধাহার।
শবেবরাতের মাসের শেষের দিকে আলেকজানের বিয়ে ঠিক করে ফেলল ফকিরচাঁদ।

বেশ ভালো পাত্রই জুটিয়েছে বলতে হবে। ছেলের নিজেদের পান বিড়ি মনোহারীর ছোটখাটো একটা দোকান আছে চাঁনখার পুলের কাছে। রায় সাহেবের বাজারে একটা ভাঙা কোঠা ভাড়া নিয়ে থাকে। মা ভাই কেউ নেই। নির্ঝঞ্ঝাট। নিজের কেনা দুটো রিকশা আছে। ভাড়া খাটায়। এমন ছেলে! ফকিরচাঁদের কৃতিত্বে জোলেখার মা বাপের তাক লেগে গেল। তাদের মতো দিন আনা দিন খাওয়া ফকিরের কাছে এ পাত্র তো হীরের টুকরো। যদিও ছেলের বয়স বারো বছরের আলেকজানের তুলনায় একটু বেশিই। তবু এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল মন থেকে তার সে দ্বিধা। একি আর ভদ্দরলোকের মেয়ের বিয়ে নাকি যে, মেয়েকে আধবুড়ো করে সমান বয়সী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে। এক কথায় রাজি হয়ে গেল জোলেখার মা বাপ।

ছেলেও একদিন এল। চাঁছা ঘাড়ের উপরে বাবু ছাঁটের চুলে বাস তেলের গন্ধ। গায়ে রঙিন গেঞ্জির ওপর ফিনফিনে পাঞ্জাবি। ঝকঝকে চেক লুঙ্গি আর পাম্পসু পায়। স্বাস্থ্য সুন্দর। দশজনকে ডেকে দেখাবার মতো জামাই হবে। মনে মনে গর্বে বুক ফুলে উঠল জোলেখার মার! সঙ্গে সঙ্গে জোলেখার কথা মনে হয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। যদিও জোলেখার জামাই দেখতে শুনতে ভালো, বয়সও কম। কিন্তু রোজগেরে নয়। তার ওপর দজ্জাল শাশুড়ির জ¦ালা। বড় কষ্টে আছে। দেখা যাক, যদি সম্ভব হয় তাহলে ওকে না হয় ছাড়ান নিয়ে আবার জামালের কাছেই বিয়ে দেওয়া যাবে।
ফকিরচাঁদের সঙ্গে বাড়িওয়ালী ও আরো দু-পাঁচজন মুরুব্বি গোছের লোক সঙ্গে নিয়ে বসে বিয়ের দিন ঠিক করে ফেলল জোলেখার বাপ। বারোই ফাল্গুন। দিনটা ভালোই আছে। দেনাপাওনার তেমন কিছু কথা হলো না। কারণ ওদিকে ছেলের মুরব্বিও ফকিরচাঁদ।

কয়েকদিন থেকে বাড়িতে খুশির ধুম লাগল। জোলেখা এল দু-দিন আগেই তার শাশুড়ি ননদ জায়েদের নিয়ে। এ কটা দিন রাঁধা বাড়া খাওয়ারও কোনো বাছবিচার রইল না। ঠোঁটকাটা মেয়ে সমীরন নিজের মাইটের জমা চাল থেকে উঠোনের কোণে চুলোয় ভাত চড়াল মেহমানদের জন্য। ময়না আর সোনাবড়– ডাল তেল দিল। খালেকের মা নিজের ঘরটায় ঢালা চাটাই পেতে সবার শোবার জায়গা করল। ঝগড়া নেই। গালাগালি নেই। আলেকজানের বিয়েটাকে কেন্দ্র করে দু’দিনে সবাই এমন মিলেমিশে গেল যেন কোনো কালে এ বাসার কারো সঙ্গে কারো ঝগড়া ফ্যাসাদ দূরে থাক, একটা কথা কাটাকাটিও হয়নি।

ওমরতুন লাফিয়ে ছুটে বেড়ানো আলেকজানের হাত চেপে ধরে ফেলে কৃত্রিম ধমক দিল- ‘আইজ বাদ কাইল বিয়া ছেমড়ির। অহনতরি ফালাফালি কমে না।’ ‘তারপর খালেকের বৌকে ডেকে বলল- ‘ও বউ এইডারে লইয়া ঘরে বন্ধ কইরা বহাও তো।’ কপট ভেংচি কাটল আলেকজান ওমরতুনের দিকে। দম-দেওয়া পুতুলের মতো সদাকম্পমান মাথা আরো কাঁপিয়ে ওমরতুন আলেকজানের মুখের কাছে মুখ এনে একটা গ্রাম্য ঠাট্টা করল।
আলেকজান ওমরতুনের হাত ছাড়িয়ে দে ছুট। যেতে যেতে বলল ‘তুমি বহ গা কইন্যা হইয়া নানি।’
উঠোন সুদ্ধু সবাই হেসে উঠল। ওমরতুনও হাসল- ‘আইজকালকার ছেড়িগুলা কেমুন বেশরম। আমাগো কালে বিয়ার পনর দিন আগে থেইকা হুজরাখানায় ভইরা থুইছে। ভাউজ-বইনেরা ছাড়া কাক চিলেও মুখ দ্যাহে নাই।

জোলেখার মার ঘরের ঝাঁপের কাছে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা জোলেখার নানি দন্তহীন মুখে ফাঁকা আওয়াজ করে শ্লেষ্মা টেনে টেনে হেসে উঠল। একদলা থুতু ছিটিয়ে পড়ল মাটিতে। গায়েহলুদের দিন উৎসব আরো জমল। হাসেম পাগলা কোথা থেকে চারটে কলাগাছ এনে উঠোনের এককোণে পুঁতে কোনে বসবার জায়গা করল। সবাই ব্যস্ত উত্তেজিত। কাজে অকাজে ডাকাডাকি চেঁচামেচি করে অস্থির হলো সবাই।

কনের গায়েহলুদ পরাবার সময় আরো জমা হলো। এয়োর সম্মান ও সম্ভ্রম অনুসারে আলেকজানের কপালে প্রথম হলুƒদ ছোঁয়াল বাড়িওয়ালী। তারপরে একে একে অন্য সব এয়োরা। শেষে ময়না আর খালেকের বউ আলেকজানকে তুলে নিয়ে গেল নাওয়াতে। এদিকে হলুদ ছোড়াছুড়ি আর রং খেলার ধুম লাগল। ছাওনারার খালার মুখে এক খাবলা হলুদ মাখিয়ে দিল জোলেখা। কার্ত্তিকার নানির মাথায় এক বদনা হলুদ গোলা পানি এনে ঢেলে দিল বাতাসীর মা। ওদিকে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ক্ষীরের গামলা নিয়ে জোলেখার মার ঘরের দিকে যাচ্ছিল খালেকের মা। সোনাবড়– ছুটে এসে পিছন থেকে জাপটে ধরে রং মাখিয়ে দিল তার সারামুখে। ক্ষীরের গামলা রেখে এসে কোমরে আঁচল কষতে কষতে ভারী শরীর দুলিয়ে সোনাবড়–কে তাড়া করল খালেকের মা। সোনাবড়– হাসতে হাসতে ছুটে গিয়ে নিজের ঘরের ঝাঁপ বন্ধ করে পালিয়ে বাঁচল। বাইরে থেকে হাসিমুখে শাসাল খালেকের মা- রাহো সুন্দরী ঘরের বাইরে আইবা না? আইজ তরে ক্যাদা দিয়া নাওয়ামু।

অনুষ্ঠানটা সম্পূর্ণরূপে মেয়েলি। পুরুষের এতে ভাগ নেবার অধিকার নেই। আলেকজানকে নাইয়ে মিহি চিকন সুরে বিয়ের গীত গাইতে গাইতে ঘরের দিকে চলল মেয়েরা। এমন সময় চোখে পড়ল ময়নার- ‘আলো ওডা ক্যান ওহানে? দেখছ কারবার! পুরুষপোলা ক্যা আইছে?’ ‘ময়নার দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই তাকাল। বাড়িওয়ালার কাঠকুটোর ঘরের চালের উপর বসে আকর্ণ দন্তবিস্তারিত করে হাসছে হাইসমা পাগলা। সোনাবড়– বলল- ‘আহ্্ মরা! ওইডা আবার পুরুষপোলা অইল কবেগন?’ তবু হৈ হৈ করে ছোটবড় মেয়ের দল তেড়ে গেল হাসেম পাগলার দিকে। হাসেম এক লাফে আরো উঁচু নিরাপদ স্থানে উঠে তার খঞ্জ পাটা দুলিয়ে হাসতে লাগল। হাসেমের কা- দেখে মেয়েরাও হেসে এ ওর গায় গড়িয়ে পড়ল। মেয়েদের চিকন পাঁচমিশেলি সুরের বিয়ের গীত চাপা দিয়ে হাসেমের কণ্ঠের সুর ছড়িয়ে পড়ল আনন্দমুখর বাড়িটাতে। হাসেম চালের উপর বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে গাইতে লাগল :
প্রাণের সখীরে
ওই শোন কদম্ব তলে
বংশী বাজায় কে
বংশী বাজায় কে রে সখী
বংশী বাজায় কে... এ... এ...এ...
বিয়েতে ধুমধামও কম হলো না। ফকিরচাঁদ কোথা থেকে একটা মাইক গ্রামোফোন আর একপাঁজা পুরোনো রেকর্ড ভাড়া করে আনল। এই বাড়ির লোকদের মনে মহা-আনন্দের রোল তুলে ও আশপাশের কিছু নি¤œ ও মধ্যবিত্ত নামধারী ভদ্রপাড়ার কর্ণপটহের ওপর প্রবল অত্যাচার করে ঘষা পিনে স্থানে স্থানে কেটে-যাওয়া রেকর্ড প্রবল সুরে বাজতে লাগল বিয়ের দিন সকাল থেকে।

খরচখরচাও কম হলো না। বেশকিছু টাকা হাওলাত হয়ে গেল জোলেখার মার। তবে মোটা খরচ ফকিরচাঁদই করল। জোলেখার মা-বাপের স্বল্প মানা শুনল না। ফকিরচাঁদ দরাজ গলায় জানিয়ে দিল যে টাকা হলো হাতের জঞ্জাল। খরচ হয়ে গেলেই ঝামেলা মিটল। কেউ আর প্রতিবাদ করল না। ফরিকচাঁদের ক্ষেত্রে উক্তিটি হয়তো কিছু সত্য। অনেকেই জানে জুয়ার আড্ডা থেকে ফকিরচাঁদ একদিন যেমন দু’পকেট ভর্তি করে অনেকগুলো দশ-পাঁচ টাকার নোট নিয়ে বাসায় ফেরে, তেমনি অনেকদিন পকেট শূন্য করে হাতের একটি আংটিও খুইয়ে দিয়ে আসে।

তবে ফকিরচাঁদের এই পক্ষপাতিত্ব অর্থাৎ অগুনতি টাকা পরের মেয়ের বিয়েতে ঢালায় মনে মনে একটু ঈর্ষান্বিত হলো একজন। সে সোনাবড়–। গোড়ার দিকে সোনাবড়–র প্রতি কেমন একটা আকর্ষণ বা মনোযোগ দেখা দিয়েছিল ফকিরচাঁদের। আর সেই মনোযোগটাকে আর একটু ঘনীভূত করে ফকিরচাঁদকে খেলিয়ে তুলবে ভেবেছিল ঘর ভাঙা কুলনাশা মেয়ে সোনাবড়ু। কিন্তু চালে ভুল হয়েছিল তার। টোপটা একটু গভীর করে বেশি খেলিয়ে তুলতে গিয়ে শিকারই ফসকে গেল। ক্রমে সোনাবড়–র প্রতি মনোযোগ বিলীন হলো তার। এই এক আশ্চর্য! এমন দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিল যে, এই শহরের সেরা গু-াদের মধ্যে যে একজন, মেয়েমানুষের প্রতি তার কেন এমন উদাসীনতা! সোনাবড়– এখনো আশা ছাড়েনি। আবার হয়তো কোনো একদিন একটি বিশেষ দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকাবে ফকিরচাঁদ। কিন্তু এদিকে পেটের তাগিদে যৌবন বেচতে বেচতে লাবণ্যের পুঁজিও যে তার কমে আসছে! তবু মুহূর্তের ঈর্ষা, ক্ষণিকের উন্মাদনা ঝেড়ে ফেলে কোমর বেঁধে বিয়েবাড়ির কাজে লেগে গেল সে।

বিয়েতে অনেকই নিমন্ত্রিত হয়েছিল। জোলেখার মা কী এক মনোবৃত্তির কৌশল আয়ত্তের জন্য জোলেখার পূর্বস্বামী জামালকেও দাওয়াত দিয়েছিল। কিন্তু জোলেখা অন্তত ভাবেনি জামালকে এ উৎসবে ডাকা হবে আর সে আসবে। টিয়ারঙের জরিদার পাড় বসানো শাড়ি পরে আঁটসাঁট খোঁপায় নানা রঙের সুই কাঁটা গুঁজে গলায় রুপার হাঁসুলি পরে ঝলমলিয়ে ঘুরছিল পনেরো বছরের জোলেখা। বয়স আন্দাজে তাকে একটু বড়ই লাগে। হাতে পান-সুপারির থালাটা নিয়ে বাবাকে কী একটা জরুরি কাজে ডাকবার জন্য বাইরে যেখানে ছেলেদের বসার জায়গা করা হয়েছে ব্যস্তসমস্ত হয়ে সেদিকে যাচ্ছিল জোলেখা। বাড়িওয়ালীর কাঠের ঘরের গলিটায় ভিড় কম এবং সংক্ষিপ্ত। আগে জানলে কি জোলেখা আসত এ পথে! মনে হয় জামাল যেন জোলেখার অপেক্ষাতেই এ পথে দাঁড়িয়েছিল।

-‘শোন জোলেখা’!
চমকে ফিরে তাকাল জোলেখা। ধম করে উঠল বুকের মধ্যে। হাত ফসকে ডালা থেকে কটা পান গড়িয়ে মাটিতে পড়ে গেল। জামাল পান কটা কুড়িয়ে ডালায় তুলে দিল। একটু থমথমে ভারি গলায় বলল- তোমারে দেখনের লিগাই খালি আইছি।
জোলেখা নিথর। যেন পাথরের মূর্তি!
জামাল আবার বলল- ‘তুমি তো অনেক ডাঙ্গর হইছ। সোন্দর হইছ ভারি। মুখখানা যেন ফুলের নাহাল।’ ‘শোনলাম তোমারে নাকি ওরা খুব কষ্ট দেয়! তোমার স্বামী নাকি মারে?’
জোলেখার মাথা নুয়ে নিচে নামল। দু-কানের পাশে যেন ঝড়ের শোঁ শোঁ আওয়াজ।
জামাল কণ্ঠস্বর আরো একটু নামাল। অন্তরঙ্গ আর গভীর করল- ‘ফির্যা আইবা জোলেখা? ফিরা আইবা আমার ঘরে? আমার বুকে? আমি তো কোনোদিন মারি নাই জোলেখা তোমারে। আমি গরিব আছিলাম এই আছিল আমার দোষ। তখন তুমি ছোট আছিলা- অহন... অহন খালি একবার মুখ ফুইটা কও, আমি সব ব্যবস্থা কইরা ফালামু।’

থরথর করে কাঁপতে লাগল জোলেখার সর্বশরীর। বুকের মধ্যে কালবৈশাখীর উদ্দামতা। পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষে ঘষে মাটিতে গর্ত করে ফেলল সে। জামাল মুখ নিচু করে জোলেখার একটা হাত ধরল। করুণ আকুতি ফুটল তার কণ্ঠে- ‘জোলেখা একদিন তোমারে দুইবেলা প্যাট ভইরা ভাত দিবার পারি নাই। হেই দোষে তোমার বাপ-মায়ে তোমারে ছাড়ায়ে আনল। আইজ আমার সোনার সংসার। খালি তুমি গেলেই হয়। কও... তুমি কও জোলেখা’ এতক্ষণ প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে সংযত রেখেছিল। ভেবেছিল তাকাবে না সে কপালের ওপর ঝুঁকে পড়া কোঁকড়া কালো চুলে-ভরা মাথাটি আর সেই লাবণ্য-ভরা মুখের দিকে, চৌদ্দ বছর বয়সে প্রথম সে মুখটাকে ভালো লাগতে আরম্ভ করেছিল তার। তবু তাকাল প্রতীক্ষারত কালো সেই দু’টি চোখের দিকে, আর সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সে- ‘না না, তা আমি পারুম না। সেই পথ আমার আর নাই।... আপনে...’ আরো কান্নায় উচ্ছ্বসিত হলো জোলেখা।
জামালের কণ্ঠ ভেঙে পড়ল- ‘ক্যান... ক্যান... পারবা না?
জোলেখা নিজেকে সামলে নিল। ওদিকে দুমদাম শব্দে বোমা ফুটছে। সেইসঙ্গে একটা হুল্লোড় আর কোলাহলের ঢেউ উঠল, ‘জামাই- আইছে- জামাই আইছে।’

জোলেখা ঘুরে দাঁড়াল- ‘আপনে রাস্তা ছাড়েন। আমার কাম আছে।’
জোলেখার ভাবলেশহীন আদেশে মাথা নিচু করে পথ ছেড়ে দাঁড়াল জামাল। আর একরকম যেন ছুটে পালিয়ে গেল জোলেখা। উঠোনে এসে দাঁড়াতেই দেখা বর্তমান স্বামী ইদ্রিসের সঙ্গে। জোলেখাকে দেখে চিড়বিড়িয়ে উঠল সে। বিশ্রী মেজাজ দেখিয়ে খেঁকিয়ে বলল- এই যে আছিলেন কই বিবিজান? নিজে তো খুব পটের বিবি সাইজা ঘুরতাছস, আমার পিরান-লুঙ্গি থুইছস কই?
জোলেখাও খারাপ মেজাজে জবাব দিল- ‘লুঙ্গি পিরান দিনে কয়শো বার খুঁইজ্যা দিমু? আমার আর কাম নাই?’
- ওরে আমার দুলালী! বাপের বাড়ি আইয়া হারামজাদীর ল্যাজে পারা দেওয়া যায় না দেখি?
কে একজন এসে থামাল। একটা খুশির কাজে কী দরকার খামখা কথা কাটাকাটির। বর এল বেশ জাঁকজমকের সঙ্গেই। দু’তিনটে স্কুটার, রিকশা, কাগজের রঙবেরঙের শিঁকল দিয়ে সাজিয়ে। বর ঢাকা শহরের বাসিন্দা। তাই রেওয়াজ অনুযায়ী বরের মুখ ফুলের শেয়ারায় ঢাকা।
মাঝরাতে মেয়ে-জামাই বিদেয় হলো। শেষরাতের দিকে যে যেখানে পারল গড়িয়ে নিল। তখন মোরগ বাঙ দিতে শুরু করছে। আকাশে অন্ধকার ফিকে হয়েছে। দুই একটি তারা তবু-যাই যাই করেও মিটমিট করে দুষ্টু হাসছে।

ধড়মড় করে উঠে বসল সোনাবড়–। ঝাঁপে ধাক্কা দিচ্ছে হাবুর মা। ‘ও বুজান জলদি উঠ বাড়িতে পুলিশ আইছে।’ উত্তেজনায় ঠক ঠক করে কাঁপছিল হাবুর মা- তার কণ্ঠের কাঁপুনিতে ভালো করে আর কিছু শোনা গেল না। সোনাবড়– শুধু ‘পুলিশ’ কথাটা শুনতে পেয়ে উঠে বসে ভয়ে যেন দিশেহারা হয়ে গেল। এ বাড়িতে পুলিশ এল কাকে ধরতে! দুষ্কৃতি হিসেবে ধরতে গেলে সেও একজন। কারণ জীবিকা আহরণ করে সে নিষিদ্ধ জগৎ থেকে। কিন্তু তাই বলে এখানে কেন? পুলিশ তো সেই হোটেল থেকেই তাকে হাতেনাতে ধরতে পারে। উঠে বসে বিমূঢ় হয়ে রইল সোনাবড়–।
খালেকের বউ ধাক্কা দিল শাশুড়িকে- ‘ওমা, মা। জলদি উঠেন পুলিশ আইছে বাড়িতে।’ আচমকা ঘুম ভেঙে উদভ্রান্ত হয়ে গেল বুড়ি। বউকে দু’হাতে জাপটে ধরে ডুকরে উঠল- ‘হায় আমার খালেইকারে বুঝি...।’

হাত দিয়ে শাশুড়ির মুখ চেপে ধরে ভয়ে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল অজিফা। বুকে তার ঢেঁকির পাড় পাড়তে লাগল।
একে একে উঠে পড়ল সবাই। ময়না ঠেলে তুলল স্বামীকে- ‘এই যে উঠ না। বাড়িতে ডাকাইত পড়ল নাকি? এত সোরশার... পুলিশ দারোগা।’

(চলবে)