বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / নারীচরিতের করুণগাথা
০৮/১৬/২০১৬

নারীচরিতের করুণগাথা

- আবু সাঈদ তুলু

সম্প্রতি ঢাকা পদাতিক প্রযোজনা করেছে ‘হেফাজত’ নাটক। সেফ কাস্টডিতে থাকা চারজন অসহায় নারীর দুর্দশা ও করুণ পরিণতিকে কেন্দ্র করে নারী জীবনের অসহায়ত্বগুলো চিহ্নিত করেছেন নির্দেশক। গল্প, অভিনয়, সেট, আলো ও সংগীত সবকিছু মিলে এটি অসাধারণ এক নাটক। নাটকটি রচনা করেছেন হারুনুর রশিদ এবং নির্দেশনা নাদের চৌধুরীর। গত ৩১ মার্চ উদ্বোধনী প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে নাটকটি যাত্রা শুরু হয়।

শুরুতে দেখা যায়-পুলিশের হেফাজতে আনা হচ্ছে বিদেশে পাচার হওয়া উদ্ধারকৃত চারজন নারীকে। হাবিলদার ও পুুলিশ কনস্টেবলের হাস্যরসাত্মক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে পুলিশসহ সমাজের নানা বিষয়ের অসঙ্গতিগুলো কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপিত হতে থাকে। উদ্ধারকৃত এ চার নারীর অসহায়ত্ব ও জীবনযন্ত্রণার চিত্রই এ নাটকের উপজীব্য। পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের জীবনের নানা সুখ-দুঃখ ও নানা সমস্যা চিত্রিত করেছেন নির্দেশক। এ চিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে তাবৎ নারী চরিত্রের অসহায়ত্বের রূপকেই বিধৃত করেছেন। নাটকে গল্পের পরম্পরায় ধীরে ধীরে হেফাজতকারীও অলক্ষ্যে জড়িত হয়ে পড়ে। অত্যন্ত মানবিক স্পর্শকাতর আলোড়ন সৃষ্টি করে এ নাটক।

নাটকের চরিত্রায়ণ খুবই চমৎকার। একটি মেয়ে সারাক্ষণ উর্দু হিন্দি গান গাইতে থাকে মঞ্চে। ও জানে না তার বাবা-মার পরিচয়। শৈশবে চুরি হয়ে যাওয়া এ মেয়েটি পাকিস্তানের করাচির এক পতিতালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। চরিত্রের মধ্য দিয়ে নারীর সামগ্রিক অসহায়ত্ব ও পরিণতিকে ইঙ্গিত করা হয়। এই ‘সালমা’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন শুভ্রা গোস্বামী। অত্যন্ত প্রাণবন্ত অভিনয়। চরিত্রের যন্ত্রণাগুলো চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। বাচিক প্রক্ষেপণ অসাধারণ। আরেকটি নারী চরিত্র কোনো কথা বলে না। সারাক্ষণ শিশু কোলে বসে বসে আনমনে কিসব যেন ভাবে। অনাকাক্সিক্ষত জীবনের করুণ পরিণতিতে যেন পৃথিবীর তাবৎ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সে। আরেকজন দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত। গৃহকর্মীর কাজে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে বেশ্যাবৃত্তি করতে করতে জীবন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরে এলেও স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়। আরেকজন প্রেমের ফাঁদে পড়ে বিক্রি হয়ে যায় কলকাতার পতিতালয়ে। এই বিউটি, মেহের ও শুভ্রা চরিত্রে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে নাজমুন রশিদ শিল্পী, নিপা সরকার, মীর ফারজানা আক্তার নিপা। চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে পাচার হয়ে যাওয়া অসহায় অভিশপ্ত জীবনের করুণগাথা ফুটে উঠেছে।

কনস্টেবল রব্বানী চরিত্রের হাস্যকৌতুক এক শ্রেণির পুলিশের লোলুপতার চিত্রই তুলে ধরে। হাবিলদার গফুর চরিত্র ঘটনাক্রমে নাটকের কাহিনির ¯্রােতের সঙ্গে মিশে যায়। শৈশবে হারিয়ে যাওয়া সালমার বাবা সে। কিন্তু পরিচয়হীন মেয়েকে কোনোভাবে চিনতে পারে না। এক মানবিক টানাপড়েন চলে নাটকের কাহিনি ঘিরে। চারটি নারী চরিত্রের জীবনের অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে সামগ্রিক চিরন্তন নারী অসহায়ত্বের চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে এই নাটকে।

নাটকটিতে অভিনয় করেছেন
ফিরোজ হোসাইন, শ্যামল হাসান, কাজী শিলা, মঞ্জুরুল ইসলাম নান্টু, মোতালেব হোসেন, নিপা, শিল্পী, শুভ্রা, নিপা, বৎস প্রমুখ। সেট পরিকল্পনায় কিরিটি রঞ্জন বিশ্বাস, আলো-আমিনুর রহমান আযম, সংগীত- শিশির রহমান, পোশাক পরিকল্পনায় নাদের চৌধুরী এবং মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় মনিরুজ্জামান মনির।