বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর-৭ম পর্ব
০৮/১৬/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর-৭ম পর্ব

- রিজিয়া রহমান

হাসেমের চিন্তার সূত্র ছিন্ন হলো। ওয়াক ওয়াক করে বমির শব্দ আসছে বিশা মোল্লার। সেইসঙ্গে জড়িত অশ্লীল কথা! তা ছাপিয়ে ময়নার তীক্ষè কণ্ঠস্বর কাঁসার বাসনের মতো ঝনঝন করে বাজে ‘মর না’। মরবার পার না। ছাই গু খাইয়া জ¦ালাইবার আহ আমারে। কী ঠ্যাহা আমার। বুড়া বাহাত্তুইরা জ¦ালাইয়া খাইল...। প্রতিরাতের নিত্যনৈমিত্তিক অনুষ্ঠান এটা। প্রতিদিন বেশি রাতে দেশি মদ খেয়ে নেশা করে বাড়ি ফেরে বিশা মোল্লা। আর একইভাবে প্রতিদিন কণ্ঠস্বর উচ্চে তুলে স্বামীকে তিরস্কার করে ময়না। এই উচ্চকণ্ঠে তিরস্কারের মধ্যে কেমন এক আত্মগর্বের ঘোষণা আছে। তার স্বামীর মদ খেয়ে বিলাসিতা করবার মতো বাড়তি পয়সা আছে সে কী কম কথা! এছাড়া তিরস্কার অন্তের শেষটুকুও কম প্রচারযোগ্য নয়! ময়নার চেয়ে বয়সে তিন ডবল বড় বিশা মোল্লা ময়নার পা ধরে মাপ চায়। তিন সত্যি কাটে। কিরা কছম খায়। ভবিষ্যতে আর হবে না এ ভুল। তারপর গাঢ় জড়ানো কণ্ঠে সুর টেনে টেনে ময়নাকে মিষ্টি কথা শোনায়- ‘ময়না’, ‘তুই আমার পরান আমার জান। আমার ফুডফুইটা ময়না পাখি। আমি তর পাও ধইর্যা জীবন কাটামু। আমার সোনার বরন পরী।’

আদরের ভাষাগুলোর প্রতিবাদে ময়না হিহি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে অকারণে বিশা মোল্লাও মোটা গলায় হাসে। সেই সময় নিজের সৌভাগ্যসুখে গর্বিত ময়না একবার চোখ বুলিয়ে নেয় সেইসব ঘরের দরজায়, যেসব ঘরের স্বামীরা রাতে বাড়ি না ফিরে কোনো নিষিদ্ধ এলাকায় রাত কাটায়। অথবা যে-ঘরের বউরা প্রতিদিনই প্রায় স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়।
হাসেম কানে হাত চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করল। ঘুম, বিশ্রাম, সে প্রয়োজন অন্তত এই রাতটুকুতে অনেকেরই আছে। কিছুক্ষণেই ঘুমিয়ে গেল হাসেম। দূরে কোথায় একটা কুকুর সুর তুলে মধ্যরাতের স্তব্ধতা চিরে কঁকিয়ে কঁকিয়ে কেঁদে চলল।
পৃথিবীর নিজ কক্ষের একবার আবর্তনে একবার দিন গিয়ে রাত্রি আসে, এমনই প্রতি আবর্তে এক একটি করে দিনের পসরা ঝরে পড়ে।
প্রতিটি সকাল একটা সদ্যাগত নতুন দিন আনে। কিন্তু সেই বাড়িটির জীবনের সকাল একই দৈনন্দিন নিয়মে শুরু হয়। শেষ হয় সেই ছক বাঁধা নাটকের শেষাংশের নিয়মমাফিক।
এরই মধ্যে একদিন কাকডাকা ভোরে সোনাবড়–র চিৎকারে বাড়ির সকলেই সরু উঠোনের মধ্যে জমায়েত হলো। ইতোমধ্যে অবশ্য অনেকেই কাজে বেরিয়ে গেছে। সোনাবড়– চিলের মতো আওয়াজ তুলে সারাটা উঠোনে যেন চরকিপাকে ঘুরছে- কোন হারামীতে কোন নটির ঝি-পুতে আমার টাকা লইছে... বাইর কইরা ফালামু। নাম উঠামু... এত সাহস, এত সোজা!’
ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম। সোনাবড়– নাকি কোথায় চাকরি পেয়েছে। ওর কোনো দেশি ভাই জুটিয়ে দিয়েছে চাকরি। সন্ধ্যার পর পরিপাটি প্রসাধন করে কোমর অবধি একটা রংচটা কালো বোরকা জড়িয়ে রবারের গোলাপি স্যান্ডেল ফটফটিয়ে প্রতিদিন চাকরিতে যায়। ফেরে মাঝরাতে, শেষরাতে অথবা ভোরে। খালেকের বৌ নাকি দেখেছে কীরকম বিশ্রী বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে বাড়ি ফেরে সোনাবড়–। কপালের টিপ ধেবড়ে বেঁকে চোখের কাজল লেপটে, ঠোঁটের রং শুকিয়ে কেমন এক উষ্ক-খুষ্ক চেহারা হয় তার। খালেকের বৌ নাকি প্রশ্ন করেছিল- চাকরি কইরা তোমার চেহারা এমুন ক্যান হইতাছে বু’জান?-
‘নাইট ডিউটির আয়ার কাম শক্ত আছে’ চটপট উত্তর দিয়েছে সোনাবড়–। চাকরিতে যাবার সময় প্রতিদিনের নিয়মানুযায়ী কালও সে তালা দিয়ে গিয়েছিল ঘরে। আর কে যেন কেমন করে তালা খুলে সোনাবড়–র ঘরে ঢুকেছে। ঘরের চালের বাতায় শিকেয় ঝুলানো মাটির হাঁড়ি থেকে পয়সার কৌটাটা বের করে নিয়েছে। আবার যথানিয়মে আগের মতো তালাটিও লাগিয়ে রেখেছে। একি বাইরের লোকের কাজ? এ রীতিমতো জানাশোনা ঘরের মানুষেরই কারো কীর্তি। সোনাবড়–র অন্তত দৃঢ় বিশ্বাস তাই। উহ্্ দু-দুটো দশ টাকার নোট আর খুচরা কয়েকটা টাকা আর রেজকি। এক-একটি টাকার নোট তো নয় যেন সোনাবড়–র-এক-একখানা বুকের পাঁজর। খালেকের মায়ের ঘরের দিকে একবার বক্র দৃষ্টিপাত করে সোনাবড়– চেঁচাতে লাগল- বাসতো এডা না, যত চোর ধাউড়ের আড্ডা। যত সিঁনধালী ছিঁচকা চোর আইয়া বাসায় ঢুকছে। অহন কি আর শান্তিতে থাকন যাইব। আমিও ছাড়তাছি না। নালিশ দিমু বাড়িওয়ালার ঠায়।
চিড়বিড়িয়ে উঠল খালেকের মা। দেশে থাকতে তার পাড়া-কুঁদুলে খ্যাতি ছিল। দুই কোমরে হাত দিয়ে সোনাবড়–র সামনে এসে ভেংচি কেটে উঠল- এঁদো সোনা, আমার ঘরের দিকে চাইয়া ফাল পাড় ক্যান? আমার পোলায় মশা মাইরা হাত কালা করে না।’
তপ্ত এক কড়াই তেলে যেন বেগুন পড়ল। ছুটে খালেকের মায়ের সামনে এসে কণ্ঠস্বর সর্বোচ্চগ্রামে তুলল সোনাবড়–- যার মনে যা ফাল দা উঠে তা। বুড়ি তর পোলায় যে রাত ভইরা মাইনষের বাড়িতে সিং দিয়া চুরি কইর্যা বেড়ায় হেইডা কি মিথ্যা? শাক দিয়া যত মাছ ঢাক না, সবই আমরা জানি। অহন ভালোইতে ট্যাকা ফালাইবার কও, তা না হইলে পুলিশ ডাকুম।
খালেকের মা ছুটে যেয়ে সোনাবড়–র চুলের মুঠি ধরল। রঙিন ফিতে আর জরি জড়ানো ট্যাসলে বাঁধা সোনাবড়–র শৌখিন খোঁপা খুলে এলিয়ে পড়ল। খোলা চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টান দিল খালেকের মা- পুলিশের ভয় দেহাও সোনা কারে? ডুইব্যা ডুইব্যা পানি খায় সবটিতে। আমার পোলা যদি চুরি কইরাও থাকে, তয় তর মতো খানকি মাগীর পয়সা নিয়া হাত কালা করব না। ছেনাল কসবী... রাইত ভইরে খইদ্দার খোঁজবার যাস...।
খালেকের মার কথা অসমাপ্ত রইল। এক হ্যাঁচকায় নিজের চুল ছাড়িয়ে নিল সোনাবড়–। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল খালেকের মার ওপর। আঁচড়ে কামড়ে চুল ছিঁড়ে রক্তারক্তি করল।
এতক্ষণ যারা ঘিরে ঝগড়ার বীররস উপভোগ করছিল, কর্তব্যজ্ঞানে সচেতন হলো তারা। গেছে গেছে দশ-বিশটা টাকা। তাই বলে খুনোখুনি হবে নাকি! যুদ্ধলিপ্তা দুই অসমবয়সী নারীকে ছাড়িয়ে দু’দিকে টেনে নিল তারা। ইতোমধ্যে কে একজন ছুটে বাড়িওয়ালার বউকে খবর দিয়ে এল। যা হয়েছে খালেকের মা-ই বেশি। নাকের পাশটা ফুলে উঠেছে। নখের আঁচড়ে ঠোঁট চিরে রক্ত পড়ছে। কাঁচাপাকা চুল উষ্কখুষ্ক পাগলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সারামুখে। অজিফা আঁচলের কোণা দিয়ে শাশুড়ির ঠোঁটের রক্ত মুছিয়ে দিল। বুড়োমানুষটার নির্যাতনে চারিদিকে আহা উহুর ধুম ছুটল। ওদিকে সোনাবড়–ও বিধ্বস্ত। তার পুরনো রংচটা জ্যালজেলে হাওয়াই শাড়ি ছিঁড়ে দু’ফালি হয়ে হাঁটু অবধি ঝুলের লালশালু কাপড়ের পেটিকোট বেরিয়ে পড়েছে। বুকের ওপর থেকে আঁচল গড়িয়ে পায়ের কাছে ধুলো কাদা মেখে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। প্রবল উত্তেজনায় রংদার শৌখিন আঙিয়া আঁটা বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।

এই চরমক্ষণে বাড়িওয়ালী এসে পড়ল। সকলে সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দাঁড়াল। যেন প্রজাদের অবস্থা দেখতে এল জমিদার গৃহিণী! এমনি স্বতন্ত্র গৌরবে দুই শত্রুর মাঝখানে দাঁড়াল। বাড়িওয়ালীকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল খালেকের মা- দ্যাহেন গো দ্যাহেন গো দ্যাহেন। আমি বুড়া মানুষ, মাইরা আমাকে কী করছে ওই হারামী ছেনালনী।
জবাবে সোনাবড়– জ্বলন্ত দুই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাটি থেকে আঁচল কুড়িয়ে নিয়ে দুম দাম পা ফেলে ঘরের দিকে চলে গেল- ‘মারছি তো বেশ করছি। চোরের মারে মারুম না তো কী করুম। এইয়া তো আর চুরির পয়সা না কামাইর পয়সা...।
গর্জে উঠল খালেকের মা আবার... চুপ থাক, চুপ থাক বেবুশ্যা মাগী। গতর বেচা পয়সার গরম দেহাইছ না!’
জটলাটা বেশ অনেকক্ষণ চলল। সোনাবড়–কে উঠিয়ে দেওয়া হবে এমন একটা কথাও উঠল। অবশ্য মনে মনে কথাটা কতখানি সমর্থন করল বাড়িওয়ালী বলা দুষ্কর। কারণ, মাসের প্রথমদিকে যারা নিয়মিত ভাড়া দেয়, সোনাবড়– তাদের মধ্যে একজন।
ধীরে ধীরে গোলমাল কমল। ভিড় পাতলা হয়ে গেল। যে যার কাজে ছুটল। পরের কেচ্ছা নিয়ে দিন কাটালে তো আর নিজের রুজি জুটবে না। বাড়িওয়ালী ফিরে গেল। ঝপাঝপ ঝাঁপ বন্ধ হলো সব ঘরের। কেবল সোনাবড়– ও অন্য কয়েকজন রইল মাত্র।
হাসেম পাগলা বেরোবার উদ্যোগ করছে, এমন সময় ফুলজান এসে ডাকল- হাসেম ভাই। ফুলজান তাহলে কাজে যায়নি! কী ব্যাপার! একটা চোখেই সপ্রশ্ন দৃষ্টি ফুটাল হাসেম। একটু ইতস্তত করে একটু যেন ভয়ে ভয়ে কেমন কাঠ কাঠ গলায় বলল ফুলজান- ‘আমারে একটু মেডিকলে লইয়ে যাইবের পারবে নি?’
-মেডিকেলে... হাসপাতালে? ক্যান কার কী অইল। খালেকের মায়েরই তো ঠোঁট কাটছে।
- গেদীর বাপের অবস্থা আজ কয়দিন যাবৎ খুব খারাপ। মনে হয় মানুষটেরে আর বাঁচাতি পারব না।’
উদ্যত কান্নায় ফুলজানের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। হাসেম এবার সত্যি উদ্বিগ্ন আর ব্যস্ত হলো- আরে কী বিপদ। আগে কও নাই ক্যান এতদিন ছাপাইয়া রাখছ...।’
বাঁধ না মানা অশ্রুকে আর বাধা দিল না ফুলজান। দু’গাল বেয়ে ঝরঝরিয়ে ঝরে পড়ল- ‘ছাপাইছি কী আর সাধে, তুমি ঘরে আইসে দেখো। কারোঠে কইও না। বাড়িওয়ালী শোনলে আমাদের খেদাবে নে।’
হাসেমকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে এল ফুলজান। আধ-অন্ধকার চারহাতি ছোট ঘরটায় ঢুকে চমকে উঠল হাসেম। এ কী! চটের ওপর প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থায় পড়ে আছে, ওটা কী আকবর শেখ? না তার কঙ্কাল? গালের দু-কস বেয়ে গড়িয়ে শুকিয়ে রয়েছে কাল রক্তের রেখা। ক্ষণিকের জন্য বুকে কেমন একটু দংশন অনুভব করল। তাদেরই বাড়িতে এত মানুষের মধ্যে একটা লোক তিলতিল করে মরে যাচ্ছে, অথচ সে খবর জানার বা রাখার কারো সময় নেই। আকবর শেখের প্রায় অচেতন দেহটার মাথার কাছে বসে পড়ল হাসেম। আর শিউরে উঠে দেখল বিছানার চারপাশে কেবল রক্তের দাগ। কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠল- ইশ! জ¦র যে অনেক। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলল ম্লান বিবর্ণ মুখ ফুলজানের দিকে- কত দিন হইছে এই ব্যারাম?’
মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নিল ফুলজান।
- ‘অনেক দিন। দ্যাশে থাকতি। সবতে কইছে ঢাকাত লইয়ে আলি সারবে। কিন্তু এই শহরে পেট চালামু চাইরজনের, না চিকিৎসার পয়সা জোটামু। আমি একলা ম্যায়া মানুষ।’
হাসেম একটু ঝিম ধরে থেকে বলল- ‘ট্যাহা আছে?’
ফুলজান আবছা একটু মাথা নাড়ল- ‘আছে কিছু।
- ‘তয় সবুর কর আমি একটা বেবিট্যাক্সি ডাইকা আনি।’
হাসেম চলে গেল বেবিট্যাক্সি ডাকতে। অল্পক্ষণেই ফিরে এল ব্যস্তসমস্ত হয়ে- ‘কুই ফুলজান বু জলদি কর, গাড়ি আনছি। ভিতরের গলিতে আইল না এইটুক ধরাধরি কইর্যা কোনোরকমে নেওয়া লাগব।
ছেলেমেয়ে তিনটে শুকনো মুখে দরজার সামনে বসেছিল। ফুলজান গেদীকে বলল- অগো দেইখা রাখবি। আমি তর বাপেরে ডাক্তারের কাছে লইয়ে যাবার নাগছি।’

সাত বছরের গেদী ওর ছোট্ট কল্পনায় কী বুঝল। হঠাৎ দু’হাতে চোখ চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফুলজান ধমক দিল। আকবরের দেহটা দু’হাতে পাঁজা করে তুলে নিল হাসেম। ফুলজান তাড়াতাড়ি একটা সবুজ রঙের পুরনো কাপড় চাদরের মতো দু’ভাঁজ করে জড়িয়ে দিল স্বামীর গায়।
স্কুটারে উঠে বসে সহসা শাড়ির আঁচলের খুঁট থেকে দুটো ভাঁজ-করা টাকার নোট সঙ্গে খুচরো কয়েকটা টাকা ও কিছু রেজকি হাসেমের হাতে একটু ঘর্মাক্ত কম্পিত হাতে তুলে দিল ফুলজান। টাকাটা হাতে নিয়ে সকালবেলার গোলমালের দৃশ্যটা কেন যেন হঠাৎ বিদ্যুৎচমকের মতো হাসেমের মনে ঝলকে উঠল। একবার হাতের টাকাগুলোর দিকে আর একবার ফুলজানের বিবর্ণ মুখের দিকে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকালো হাসেম। ফুলজানের বিবর্ণ মুখটা সহসা রক্তশূন্য হয়ে গেল। ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো একটু নড়ল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নত করল। যেন নেশাগ্রস্তের মতো ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল- ‘হ’ আমিই নিছি সোনাবড়–র ট্যাকা। তা নাইলে কী করুম। চাইলে কেউ দিব না। আর... আর চক্ষের সামনে এক ফোঁটা ওষুধ মানুষডের মুখে না দিয়ে মইরে যাওয়া...; উচ্ছ্বসিত কান্নায় ফুলজানের কথা অস্পষ্ট হয়ে গেল। ফুলজানের চোখের পানি ঝরে পড়ল কোলের ওপর মাথা রাখা আকবরের জ¦রতপ্ত কপালে।
সারাদিন ঘুরে পড়ন্ত বেলায় মুমূর্ষু আকবরকে নিয়ে বাড়ি ফিরল ফুলজান আর হাসেম। ঘোরাঘুরিতে টাকার সবটাই প্রায় খরচ হয়ে গেছে। একবার মেডিকেল হাসপাতাল, সেখান থেকে আবার টিভি ক্লিনিক। এমনকি মহাখালী হাসপাতাল পর্যন্ত ঘুরেছে তারা। অবশ্য সেই হাসপাতালের গেট অবধি। তার ভিতরে ঢোকার অধিকার বা সাহস কোনোটাই হয়নি। টিবি ক্লিনিক থেকে ডাক্তাররা স্ক্যানিং করে বলে দিয়েছে দুটো ফুসফুসই খেয়ে গেছে। এত শেষ অবস্থায় বিশেষ আশা নেই। তবে মহাখালী হাসপাতালে একবার নেওয়া যায়। ডাক্তারের পায়ের ওপর পড়ে কেঁদে ফেলেছে ফুলজান- ‘বাবা’, আপনে যে আমার বাপ। একটা চিড লেইখে দেন। আমরা গরিব মানুষ, পথের ফকির। আমাগোর কথা কিডা শুনবে।’ ডাক্তার মহাবিরক্ত হয়েছে। এরকম ঘটনা হামেশাই হচ্ছে। শেষ অবস্থায় নিয়ে আসে।... কোথাও সুবিধে হয়নি। শুধু এইটুকু জেনেই ফিরতে হয়েছে যে- বাঁচবে না। এ রোগীকে বাঁচানো যাবে না।
এদিকে কী করে খবরটা সারাবাড়ি চাউর হয়ে গেছে। ফুলজান যেন একটা খুনের আসামি। যেন পরিচয় গোপন করে এতদিন এ বাড়িতে বাস করেছে। বিশেষ কেউ এল না। কিন্তু সবার ঘরেই উত্তপ্ত আলোচনা চলল সন্ধ্যারাত পর্যন্ত। যেই কাজ থেকে ঘরে ফিরল, সেই গরম একটা খবর শুনল যে, এই বাড়িতে একটা মরণাপন্ন যক্ষ্মারোগী রয়েছে। কী ভয়ঙ্কর! একটা যক্ষ্মারোগীর সঙ্গে এতদিন তারা পাশাপাশি বাস করে এসেছে! যেন এ-বাড়িতে সিঁধেল চোর, দুর্ধর্ষ গু-া, পকেটমার অথবা দেহোপাজীবিনীর সঙ্গে বাস করা স্বাভাবিক! কিন্তু একটা যক্ষ্মারোগী? না না! মনে মুখে কেউই তা সমর্থন করল না।
খবর শুনে বাড়িওয়ালী এল। ফুলজানের ঘর থেকে সাত হাত দূরে দাঁড়িয়ে বাড়ির মালিকসুলভ অধিকারবোধ ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে ফুলজানকে রাতের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার আদেশ দিয়ে গেল। কেবলমাত্র জোলেখার মা-ই এল ফুলজানের কাছে- ‘এতবড় অসুখটা এতদিন চাপা দিয়া রাখলি ক্যান! আগের থেইক্যা চেষ্টা করলে হয়ত ভালো হইতো।’
উদাস নির্বাক মূর্তি হয়ে বসেছিল ফুলজান। জোলেখার মা আবার অকৃত্রিম সহৃদয়তায় বলল- ‘আর আমাগো গরিব গরবার এই রাজরোগ! ইয়ার চেষ্টা কি আমাগো সাইধ্যে কুলায়।’
এবারে হঠাৎ কান্নায় ফেটে পড়ল ফুলজান- ‘বুয়া গো মানুষটা মইরেও দ্যাশের মাটি পাইবে না। কী করতি আইছিলেম ঢাকার বাড়ি...’
জোলেখার মা সান্ত¡না দেবার চেষ্টা করল না।
সেইদিন ভোররাতে মারা গেল ফুলজানের স্বামী ভেদরগঞ্জের আকবর শেখ। বাড়িওয়ালীর কিন্তু কথার নড়চড় হলো না। যক্ষ্মারোগী মরেছে। তাই কী! তার পরিবারেরও তো ওই রোগ থাকতে পারে। অতএব বাড়ি ছাড়তে হলো ফুলজানকে। অবশ্য আরো চারদিন থাকার মঞ্জুরি পুরো করে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেমেয়েদের হাত ধরে স্বল্পবিস্তর সংসারের জিনিসপত্র পোঁটলা বেঁধে মাথায় নিয়ে বাড়ি ছাড়ল ফুলজান। মালীবাগ না মগবাজার ওদিকে একজন জানা লোক আছে, আপাতত তার ওখানেই জায়গা মিলবে।

(চলবে......)