শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিনোদন / ‘শিকারি’ ও ‘সম্রাট’: দুই আলোচিত ছবি
০৮/০১/২০১৬

‘শিকারি’ ও ‘সম্রাট’: দুই আলোচিত ছবি

- নাবীল অনুসূর্য

এবারের ঈদের সিনেবাজারে শেষপর্যন্ত মুক্তি পেয়েছিল চারটি সিনেমা। যৌথ প্রযোজনার দু’টি - ‘শিকারি’ ও ‘বাদশা’, দেশীয় প্রযোজনার দু’টি - ‘রানা পাগলা: দ্য মেন্টাল’ ও ‘সম্রাট’। ব্যবসার হিসেবে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা দু’টির মধ্যেই। তাতে আবার শাকিবের ‘শিকারি’ হারিয়ে দিয়েছে কোলকাতার জিতের ‘বাদশা’কে। আইনি মারপ্যাঁচে পরে ‘মেন্টাল’ পিছিয়ে পড়লে, হল দখলের কৌশলে এগিয়ে যায় ‘সম্রাট’। আর সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৃতীয় অবস্থানে থেকেছে সিনেমাটি। আপাতত তাই ঈদের সিনেবাজারের আলোচনা করা যাক ‘শিকারি’ আর ‘সম্রাট’কে নিয়েই।

এবারের ঈদের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা ‘শিকারি’। শাকিব খানের প্রথম যৌথ প্রযোজনার এই সিনেমাটা শাকিব খানের নতুন ‘লুক’ ইত্যাদি নানা কারণেই মুক্তির আগে থেকে একটা ‘হাইপ’ তৈরি করতে সক্ষম হয়। সেই আগ্রহের বিপরীতে দর্শকদের প্রত্যাশার অনেকখানিই পূরণ করতে পেরেছে ‘শিকারি’। অন্যদিকে সুন্দর পোস্টার আর টাইটেল, সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রচারণা আর ট্রেইলার মিলিয়ে ‘সম্রাট’ নিয়েও এক ধরনের আগ্রহ গড়ে উঠেছিল। বিপরীতে আবারও দর্শকদের ভীষণই হতাশ করেছেন পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ। আর এই সিনেমা দ’ুটির পার্থক্যগুলোই দুই বাংলার সিনেমা শিল্পের পেশাদারিত্বের পার্থক্যটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

শিকারি-র কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছেন দুই বাংলার দুইজন-পেলে চ্যাটার্জি এবং আব্দুল্লাহ জহির বাবু। কাহিনিটা প্রথাগত, এবং ব্যবসায়িক সাফল্যে পরীক্ষিত ফরম্যাটে বয়ানকৃত। উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার, বড়লোক নায়িকা-গরিব নায়ক, নায়কের জীবনের ট্র্যাজেডি, সৎ সরকারি চাকুরে ইত্যাদি প্রথাগত উপাদানের মিশেলে সিনেমাটির প্রথাগত ও পরীক্ষিত কাহিনিটির নির্মিতি। তাতে বেশ কয়েকটি ভালো টুইস্টও আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রথাগত কাহিনিটাই বেশ আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেবল সমস্যা হলো, সিনেমার কাহিনিটাকে কখনোই বাংলাদেশের সিনেমার কাহিনি বলে মনে হয় না। আখ্যানটা আপাদমস্তক কোলকাতার সিনেমার আখ্যান। এমনকি কোলকাতার সিনেমায় এপার বাংলার লোক বোঝাতে ফরিদপুরের ভাষার মতো যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, যে ভাষা আসলে বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলের মানুষই ঠিক ব্যবহার করে না, সেই ভাষাও সিনেমাটাতে ব্যবহার করা হয়েছে।

তারচেয়েও ভয়ংকর বিষয়, এবারের ঈদের সবচেয়ে ব্যবসা-সফল এই সিনেমায় এক শাকিব খান ছাড়া বাংলাদেশের আর তেমন কিছুই নেই। আরো বেশ কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন- অমিত হাসান, শিবা সানু, সুব্রত বড়–য়া; কিন্তু মোটা দাগে শাকিব ছাড়া আর কারো উপস্থিতিতেই বাংলাদেশের উপস্থাপন নেই। নেই কাহিনিতেও। কোলকাতার এক ছেলে পালিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে বাংলাদেশের সুলতান হয়ে ওঠে। তারপর আবার কিলিং মিশন নিয়ে কোলকাতায় ফিরে আসে। মাঝে সে বাংলাদেশের সুলতান কীভাবে হয়ে উঠলো, তার একটাও দৃশ্য নেই। এই কাহিনি কোলকাতার সিনেমার জন্য যুৎসই হতে পারে, যৌথ প্রযোজনার জন্য একটু অস্বস্তিকরই বটে।

তবে সিনেমাটিতে একমাত্র যে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশি উপাদান-শাকিব খান, তিনি বেশ ভালোই গুরুত্ব পেয়েছেন। সিনেমাটি একেবারেই নায়ক-প্রধান। এমনকি সিনেমার শেষে নায়ক-নায়িকার মিলনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে তার বাবা সব্যসাচীর মিলন; সিনেমার প্রথাগত রীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অসুস্থ নায়কের জ্ঞান ফেরে বাবার ডাকে, যদিও নায়িকা পাশেই দাঁড়িয়েছিল। এর বাইরেও পুরো সিনেমাতেই নায়ক চরিত্রই কাহিনির কেন্দ্রে ছিল।

তবে যৌথ প্রযোজনা-কোলকাতা ইত্যাদি ভুলে গেলে সিনেমাটি আসলেই বেশ ভালো হয়েছে। বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহারের ব্যাপারটা বেশ ভালো ছিল। কাহিনির বয়ান, ধারাবাহিকতা রক্ষা, সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, গান, কোরিওগ্রাফি, কস্টিউম ডিজাইন, সেট, লোকেশন ইত্যাদি বেশ ভালোই হয়েছে। তবে মাঝে মধ্যে কাহিনির কার্যকারণ সূত্রে খানিকটা শৈথিল্য দেখা গেছে।

এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ‘সম্রাট’। ঈদে মুক্তি দেয়ার তাড়াহুড়ায় সিনেমাটির পোস্ট-প্রোডাকশনের সবগুলো কাজ আদৌ করা হয়েছে কিনা, সন্দেহ আছে তা নিয়েই। কিছু কিছু জায়গায় এডিটিংয়ের অবস্থা ভয়াবহ। অনেক জায়গাতে কালার কারেকশন করাই হয়নি। শুরুর খানিকটা অংশকে সিনেমার অংশ বলেই মনে হয়নি, মনে হয়েছে ট্রেইলার চলছে; এতটা বিচ্ছিন্নভাবে একটার পর একটা অহেতুক দৃশ্য আসছিল। ভয়ংকর অবস্থা সিনেমাটির কাহিনির বয়ান আর কন্টিনিউয়িটিতে। এক শাকিব খানের চুলই সিনেমায় কতবার যে বদলে গেছে, তার হিসেব রাখাটাও বেশ শক্ত।

তবে বাংলাদেশের আর সব সিনেমার মতোই, আর কিছু ভালো না হলেও, সিনেমার গান আর কোরিওগ্রাফি বেশ ভালো হয়েছে। তাড়াহুড়া, অযত্ন, সিনেমাটোগ্রাফি আর সম্পাদনার দুর্বলতায় শেষপর্যন্ত কাহিনির বয়ান ভীষণ দুর্বল হয়ে গেলেও, আদতে কাহিনিটা একদমই খারাপ ছিল না- বিদেশে রাজত্ব করা আন্ডারওয়ার্ল্ড গডফাদার শাকিব খান দেশে ফিরছে। আর তাতে মাথা খারাপ হয়ে যায় দেশের বাজারে রাজত্ব করা গডফাদার মিশা সওদাগরের। তাদের দ’ুজনের এই লড়াইয়ে গোপনে ঢুকে পড়ে পুলিশ অফিসার ইন্দ্রনীল। আবার ইন্দ্রনীলের বস সুব্রতের মেয়ে অপু বিশ্বাসের সঙ্গে তার বাগদান হয়ে আছে। অপুর সঙ্গে শাকিবের প্রেম হয়ে গেলে, শাকিব-ইন্দ্রনীলের ব্যক্তিগত দ্বৈরথ সৃষ্টি হয়। সেটা আবার ব্যবহার করে মিশা।
সব মিলিয়ে জমজমাট একটা আখ্যানভাগের সব সম্ভাবনাই ছিল গল্পটার। কিন্তু সম্ভবত ঈদে মুক্তি দেয়ার তাড়াহুড়ায় সিনেমাটিকে একেবারে জঘন্য বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে দুই বাংলার শিল্পীদের একত্র করে, দুই বাংলার প্রোডাকশন টিম নিয়ে শুটিং করেও ‘শিকারি’ অনেক বেশি গোছানো ও পেশাদার একটা কাজ হয়েছে। আর দিনশেষে হলগুলোতে, মানে বক্সঅফিসে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। শাকিবের বিপরীতে বাংলাদেশে অপরিচিত শ্রাবন্তীকে নিয়েও ‘শিকারি’ ঈদে মারমার-কাটকাট ব্যবসা করেছে। আর বাংলাদেশের সিনেমার সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে ব্যবসা-সফল জুটি শাকিব-অপুর সঙ্গে কোলকাতার চেনা মুখ ইন্দ্রনীলকে নিয়েও, সঙ্গে ‘মেন্টাল’-এর জটিলতা মিলিয়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি ‘সম্রাট’।