মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / অভিমানী নারী ভাস্করের জীবনগাথা ‘নভেরা’
০৮/০১/২০১৬

অভিমানী নারী ভাস্করের জীবনগাথা ‘নভেরা’

- আবু সাঈদ তুলু

সম্প্রতি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অন্যতম ভাস্কর্য শিল্পী নভেরা আহমেদের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে নির্মিত হয়েছে মঞ্চের নতুন নাটক ‘নভেরা’। এতে অভিনয় করেছেন এসময়ের তরুণ প্রতিভাবান মঞ্চনাট্যকর্মী সামিউন জাহান দোলা। ‘ধ্রুপদ অ্যাক্টিং স্পেস’-এর প্রথম প্রযোজনা এ নাটক। সামিউন জাহান দোলার অনবদ্য অভিনয়ে ‘নভেরা’ যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে এ প্রজন্মের দর্শকের কাছে। অভিনয়, আলো, কোরিওগ্রাফি, মিউজিক সব মিলে অত্যন্ত প্রাণবন্ত, উপভোগ্য ও সুখদর্শন হয়ে উঠেছে নাটকটি। এটি হাসনাত আবদুল হাই-এর লেখা ভাস্কর নভেরা আহমেদের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘নভেরা’ অবলম্বনে রচিত।

ভাস্কর নভেরা আজকের নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অপরিচিত। শিল্পী নভেরার জীবন ও শিল্পীমানসকে পরিচিত করার মানসেই এ প্রযোজনা। অত্যন্ত মেধাদীপ্ত শৈল্পিক প্রযোজনা। ভাস্কর নভেরা আহমেদ ১৯৩৯ সালে বৃহত্তর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন। নভেরার পৈতৃক নিবাস ছিল চট্টগ্রামে। বাবা সৈয়দ আহমেদ। বাবার চাকরির কারণে তাঁর শৈশব কাটে কলকাতায়। নভেরা শৈশব থেকেই নাচ, গান, মডেলিং প্রভৃতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। দেশে শিক্ষা গ্রহণ করলেও শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগই বিদেশে কাটিয়েছেন। হামিদুর রাহমান ও নভেরা একসঙ্গে ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ফিরে এসে ভাস্কর হামিদুর রাহমান ও নভেরা আহমেদ যৌথভাবে কাজ করেন। নানা কাজের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজও তাঁরা যৌথভাবে করেন। কিন্তু সরকারি খাতা থেকে শিল্পী নভেরা আহমেদের নাম বাদ পড়ে। হামিদুর রাহমানই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতির কৃতিত্ব লাভ করেন। নানা ঘটনা, নানা প্রতিকূলতায় শিল্পী নভেরা আহমেদ ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান।

নভেরা আহমেদ ১৯৬০ সালের দিকে দেশ ছেড়ে চলে যান। প্রথমে পাকিস্তান এবং পরে প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। এ অভিমানী শিল্পী প্যারিসেই আমৃত্যু বসবাস করেন। বাংলাদেশে আর আসেন নি। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। কিন্তু তিনি পুরস্কার নিতে আসেন নি। তাঁর সবচেয়ে বেশি আলোচিত শিল্পকর্ম হচ্ছে- বুদ্ধ, শান্তি, পরিবার সিরিজ, মা ও শিশু, দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নৃত্যহীন, দ্য জীন, শতমলের ছাগল, শকুন ইত্যাদি। এই অভিমানী নারী ভাস্কর্য শিল্পী ২০১৫ সালের ৬ মে প্যারিসেই মৃত্যুবরণ করেন।
বয়সে তরুণ হলেও সামিউন জাহান দোলা চমৎকার অভিনয় দক্ষতায় শিল্পী নভেরা আহমেদের জীবন, শিল্পসাধনা ও যন্ত্রণাগুলো তুলে ধরেছেন। আবহমান বাংলার বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির ধারায় বর্ণনা, অভিনয়, নৃত্য-গীতের সমন্বিত প্রয়াসে নাট্য উপস্থাপন করেছেন। এক ঘণ্টা দশ মিনিট ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দর্শকরা নভেরা আহমেদের শিল্পী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত হন। অপরিচিতকে জানা এবং নভেরার চিন্তাকে অনুধাবনে পিনপতন নীরবতায় দর্শক নাটকটি উপভোগ করেন। অত্যন্ত প্রাণবন্ত অভিনয়। অসাধারণ বাচনিক দক্ষতা। মড্যুলেশন অসাধারণ। চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আবেগগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন দোলা। নভেরার মাথার উপরদিকে চুল বাঁধা সন্ন্যাসিনী প্রকৃতির সাথে কালো রঙের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে অত্যন্ত নান্দনিক কুশলতায় তুলে ধরেছেন নভেরা চরিত্র। সামিউন জাহান দোলার নৃত্য, কোরিওগ্রাফি ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় প্রশংসনীয়। তবে, শিল্পী চরিত্রে অভিনয়ে আরও সিরিয়াস হওয়ার প্রয়োজন আছে। শেষ দৃশ্যটি নান্দনিক। এটি একক চরিত্রের নাটক। উপস্থাপনে নানা বৈচিত্র্যই সৃষ্টি হয়েছে। নাটকটিতে পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। নাট্যরূপ সামিউন জাহান দোলার। নভেরা চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি নিজেই। আলো- ওয়াসিম আহমেদ, আবহ- কেয়া চৌধুরী জুঁইয়ের। নির্দেশনায় ছিলেন- সাজ্জাদ রাজিব। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর মঞ্চসাফল্য কামনা করি।