মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / তরমুজ শিল্পের ইতিহাস
০৮/০১/২০১৬

তরমুজ শিল্পের ইতিহাস

- মোস্তাক আহমদ

[ভূমিকার বদলে: কয়েক বছর আগে চৈত্র মাসে তীব্র তরমুজের মওসুমে তিনি চলে গেলেন, যাবার আগে আমাদের বাঙলা ভাষার পৃথিবীকে উপহার দিয়ে গেছেন অতিপ্রাকৃত নয়নতারা ফুল, জাদুবাস্তব তরমুজ আর ডুমুরের ফল! তিনি চলে যাবার পর থেকে প্রতিবার চৈত্র বৈশাখ মাসে ভরা তরমুজের সিজনে মহল্লার তরমুজওয়ালাদের সাথে দাম-দস্তুর করার সময় তার কথা মনে পড়ে। গেল বছরও ভেবেছিলাম, হয়ে ওঠেনি; এবারে তার মৃত্যুদিবসে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাজারে তরমুজ ফুরানোর আগেই শহীদুল জহিরের ‘আমাদের কুটিরশিল্পের ইতিহাস’ গল্পকে উপজীব্য করে কিছু একটা লিখে তরমুজ সাহিত্যকে চলমান রাখতেই হবে!]

‘হাজী রশিদ সরদার ফুড প্রডাক্টস কোং’-এর দক্ষিণ মৈশুন্ডিস্থ হেড অফিসের প্রাক্তন এসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং চিফ সহিদুল্লা জহির দক্ষিণ বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির বাস স্ট্যান্ডে নেমে বুড়া মিয়ার দোকান থেকে একটা বেনসন সিগারেট নিয়ে দড়ির আগুনে ধরিয়ে নেয়; দড়ির আগুন আশপাশের মহল্লাগুলোতে ইদানীং মিলিয়ে গেলেও এই মহল্লার মোড়ে সকালসন্ধ্যা জ্বলতে দেখা যায়, কিন্তু সে আগুনের কোনও চোখ দেখতে না পেয়ে সহিদুল্লা জহির একটা ফুঁ দিয়ে একচোখা দড়ির আগুনের সাথে চোখাচোখি করে নিয়ে ক্লান্তি উদ্বায়ী একটা সুখটান দিয়ে মোড়ে বসা তরমুজওয়ালার দিকে মনোযোগ দিল : ‘ওই মিয়া, দুই নম্বর তরমুজ ব্যাচো কেলা?’ বলে খাটো চুল আর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট-টাইপ সানগ্লাস পরা চেহারার সুবিধা নিয়ে মান্ডা মেরাদিয়া কিংবা মাদারটেক থেকে আসা তরমুজওয়ালাকে সন্ত্রস্ত কিংবা বিভ্রান্ত করে দিয়ে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাবে কীনা ভাবে, পর মুহূর্তেই সহজ গলায় ; ওই মিয়া, তোমার তরমুজের দাম কত?’ বলে ভোক্তা-বিক্রেতার স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করে নিল। তার মনে পড়ে গেল, হাফ প্যান্ট পরা বয়সে দক্ষিণ মৈশুন্ডিতে লেদ মেশিনে নাট-বল্টু তৈরি করার সময় তরমুজ ছিল ২৫ টাকার দূরত্বে, তা ফ্যাক্টরির সাব এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হতে হতে গিয়ে দাঁড়াল ২৫০ টাকার দূরত্বে! চৈত্র কিংবা বৈশাখ মাসে ঠান্ডা লাল তরমুজের স্বাদে এখনো তাই হয়তোবা তার মিষ্টত্ব, পিপাসাহরণকারিত্ব আর আর্থিক মূল্যমান সম্পৃক্ত হয়ে জান্নাতের বাগানের সরাবন তহুরার মতোই লাগে। হাফ প্যান্ট পরা বয়সে মহল্লার তরমুজওয়ালাদেরকে তার বন্ধুরা বলত,‘ওই মিয়া মাছির দিনে তরমুজ নিয়া আহো কেলা!’ ‘কিংবা তরমুজের ভিতরে সিরিঞ্জ দিয়ে চিনি কিংবা স্যাকারিনের সাথে লাল রঙের সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়ার পাশাপাশি পুলিশ মামাদের প্রতি ভেজাল বিষয়ক ইঙ্গিত ছুঁড়ে দেয়ার কথা মনে পড়ে যাওয়াতে চকিত সন্ত্রস্তকারী চাক্কুর বদলে সন্দেহের ইনজেকশন ব্যবহার করাই শ্রেয় মনে করল; ভুলে যাওয়া বেনসনে শেষ টান দিয়ে থাইল্যান্ডি মোকাসিনো জুতোর নিচে পাটের দড়ি থেকে ধার করা আগুনটুকু নিভাতে নিভাতে তরমুজওয়ালাকে বলল, ‘ওই মিয়া, জাপানি চাইর কুনাইচ্চা তরমুজ আনবার পার না? ভ্যানে কইরা আনতেও সুবিধা, দুকানে সাজায়া রাখতেও ভি সুবিধা! গড়ায়া গড়ায়া ড্রেনের ভিত্রে যাওনের ডরও নাইক্কা; কাইট্যা খাইতেও ভি সুবিধা!’ তরমুজওয়ালা এবার বিভ্রান্ত হয় কীনা বোঝা যায় না, গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়াকে আর উপেক্ষা করতে না পেরে গায়ের জামাটা খুলে রাখে; বলে, ‘ছাব, দুইশ বিশ ট্যাকা হইলে দিয়া পারুম, বাইচ্ছা দিমু, ফাইড়া দেইখ্যা লইবেন; এক্কেরে দানা দানা, মাখম!’

‘নিউ হাজী রশিদ সরদার ফুড প্রডাক্টস কোং’-এর দক্ষিণ বাসাবোস্থ হেড অফিসের বর্তমান সিইও সহিদুল্লা জহির দুপুর রৌদ্রে হেঁটে হেঁটে ধূমপান করতে পছন্দ করে না বলে এক-বেনসন-টাইম বেচারা তরমুজওয়ালার সাথে ইয়ার্কি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা শেষ করল; প্রথম যৌবনের কথা ভাবল যখন কীনা হাজি রশিদ সরদারের ছেলে হাজি বাসেদের সাথে গাদ্দারি করে পাল্টাপাল্টি ফুড কোম্পানি খুলে বসেছিল; এই দক্ষিণ বাসাবো বালুর মাঠেই একবার ইন্টার স্কুল ফুটবল খেলতে এসেছিল হক ব্রাদার্স আমিনুল- আজিজুলের সাথে; তখন থেকেই ফুটবলের চাইতে তরমুজের গোলাকৃতির প্রতিই বেশি আকর্ষণ আর নির্ভরতা তার, কেননা আমরাতো জানি দক্ষিণ মৈশুন্ডির হাজী রশিদ সরদার তরমুজের পিপাসায় কিংবা তরমুজের বিচির বিষক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করার সময় পুত্র বাসেদ মিয়া যখন বাপের মৃত্যুশয্যায় শপথ করেছিল যে মহল্লাবাসীকে সারা বৎসর কৌটাজাত তরমুজ ফল ভক্ষণ নিশ্চিত করবে তখন থেকেই ঐ পরিবারের সাথে সহিদুল্লার উঠাবসা; আর তরমুজ ফ্যাক্টরির ছোকরা শ্রমিক সেই সহিদুল্লার যুবা বয়সে যখন বাসেদ মিয়াকে তার ব্যবসা দঃ মৈশুন্ডির একটা মাত্র মহল্লা থেকে পুরান ঢাকার ৫২ মহল্লায় ছড়িয়ে দিয়েও প্রাপ্য বেতন-সুবিধা- মর্যাদা কিছুই পেল না, তখন নতুন ঢাকায় ৫২ঢ ২ = ১০৪ টা মহল্লার জন্য নতুন ফ্যাক্টরির পত্তন করা ছাড়া তার আর কোনোই উপায় ছিল না; তাছাড়া ধবধবে শাদা দাঁতের সহিদুল্লার পক্ষে সারাদিনে কমপক্ষে ৫ বিড়া সমান সমান সমান ৪০০ পিস পান-চিবানো বাসেদ মিয়ার তরমুজের বিচির মতো কালো কালো দাঁতগুলোও আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরিণতিতে এই দক্ষিণ বাসাবো বালুর মাঠের তরমুজ ফ্যাক্টরির সূত্রপাত; এই হল ইতিহাস!

সহিদুল্লা জহির মাঝে মাঝে পূর্ণিমা রাতে বালুর মাঠের ফ্যাক্টরির কোনায় কোনো একটা ফুলের তীব্র গন্ধ ভেসে আসে টের পায়, কিন্তু কী ফুল তা সহসা বুঝতে পারে না কিংবা গন্ধের উৎস হাসনাহেনা অথবা শেফালির যে কোনোটা হোক সেটা তার ঘ্রাণশক্তির ইতিহাস সাক্ষ্য দিতে বা স্বীকার করতে চাইলেও সে বরং প্রত্যাখ্যান করতেই চায়, কেননা হাসনাহেনা সুবাস ছড়ালে সাপের ছদ্মবেশে মৃত্যুর ছোবল আসতে পারে, আর শেফালি সুবাস ছড়ালে শেফালি বেগম কিংবা শেফালিকা ঘোষের স্মৃতিপথেও আসতে পারে মৃত্যুবৎ শেলবর্ষী কোনো ঢেউ। কোনো কোনো তারায় ভরা চৈত্র মাসের রাতে সহিদুল্লার কত কথাই না মনে পড়তে চায়! ভাবতে ভাবতে প্রথমবারের মতো এই মহল্লায় পথ ভুল করে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা ইচ্ছে করেই প্রায় আঠারো বছর না-হাঁটা পথে হাঁটতে হাঁটতে ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরির চিপা দিয়ে, প্রিয়া ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরির গলি দিয়ে বরাবর বের হয়ে কদমতলা স্কুলের পিছনের গেটে শেফালি গাছতলায় এসে পৌঁছাতে অবাক হয়ে দেখল দেয়ালের গায়ে লাল ইটের খোয়ার পেনসিলে লেখা ‘শেফালি + সহিদুল’। আচানক সন্ধ্যা নেমে এল, হক ব্রাদার্সের বাঁশিতে সিন্ধু বারোয়াঁয় লাগল তান, সহিদুল্লার নেশা লেগে গেল, স্কুলের দেয়ালে দুলছে যেনবা কবেকার শেফালিকা ঘোষ কিংবা শেফালি বেগমের মুখ, মনে পড়ে যাচ্ছে আমিনুল হকের অপ্রকৃৃতিস্থ ও দ্রুতই শ্মশ্রুমন্ডিত জটাজটধারী হয়ে যাওয়া ভাই, অচিরেই পুতুল নাম্নী বালিকার নাজুক সৌন্দর্যে বিপন্ন বিস্ময়ে ক্লান্ত, ক্লান্ত হয়ে মরিবার সাধ হওয়া কবি আজিজুল হকের কবিতা “দুঃখগুলো গোল গোল/ কতিপয় বিন্দু/ ডান থেকে ডানে,/ এ হৃদয় ফালি ফালি কতিপয় রেখা/ বামে শুধু বামে,/ স্বপ্নগুলো ছেঁড়া খোঁড়া / ঘুমের আকাশে মেঘ।” জীবনে কখনোই কবিতার স্বাদ না পাওয়া সহিদুল্লা জহির নিজের বালুর মাঠের কৌটাজাত তরমুজের ফ্যাক্টরিতে বসে এক তুঙ্গ মুহূর্তে কবিতাটি জুড়ে একটি বিষাদগ্রস্ত গাঢ় সবুজ তরমুজ গড়িয়ে চলেছে দেখতে পেলেও হাসনাহেনার গন্ধে কিংবা হক ব্রাদার্সের বাঁশির সুরে আমন্ত্রিত ততোধিক সবুজ সাপের ক্যামোফ্লেজটি আর দেখতে পায়নি।