মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / জেমস টড ও তাঁর ‘রাজস্থান’
০৮/০১/২০১৬

জেমস টড ও তাঁর ‘রাজস্থান’

- সাযযাদ কাদির

‘রাজসিংহ’ (১৮৮২) উপন্যাসের ভূমিকায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, “... রূপনগরের রাজকন্যা সম্বন্ধে যে স্থ’ূল ঘটনা বিবৃত হইয়াছে, তাহা টডের গ্রন্থে আছে, কিন্তু অর্মের গ্রন্থে নাই। আমি উভয় ঘটনাই সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছি। রন্ধ্র মধ্যে ঔরঙ্গজেব যে অবস্থায় পতিত হওয়ার কথা লিখিয়াছি, অর্ম এরূপ লেখেন। কিন্তু টডের গ্রন্থে শাহজাদা সম্বন্ধে ঐ ঘটনা ঘটিয়াছিল বলিয়া লিখিত হইয়াছে।...”

‘টড’ কে, তাঁর কি গ্রন্থ, ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর একালের অনেক পাঠকেরই জানা নেই হয়তো, কিন্তু উনিশ শতকের পাঠক ‘টড’ বলতেই চিনতেন লেফটেনান্ট-করনেল জেমস টড (১৭৮২-১৮৩৫)-কে, জানতেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম ‘অ্যানালস্ অ্যান্ড অ্যানটিকোইটিস্ অভ রাজস্থান, অর দ্য সেনট্রাল অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন রাজপুত স্টেটস অভ ইনডিয়া’ (তিন খ- : ১৮২৯, ১৮৩২, ১৯২০)। আসলে কলকাতা-কেন্দ্রিক মেধাজীবীমহলে এবং অন্যত্রও যে ‘রোমান্টিক’ জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ও বিকাশ দেখা যায়, তাতে বিশেষ ভূমিকা ছিল ওই গ্রন্থটির। এতে রাজপুত জাতির যে গর্বিত ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন টড, তা-ই আরও মহিমান্বিত রূপে দেখা যায় গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২)-এর ‘আনন্দ রহো’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫)-এর ‘সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ’ (১৮৭৫) প্রভৃতি নাটকে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)-এর নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৭১), রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭)-এর কাব্য ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এর আখ্যানবস্তুও সংগ্রহ করা হয়েছে ওই গ্রন্থ থেকে। সেই থেকে এখনও রাজপুত জাতির কীর্তিগাথা এক উল্লেখযোগ্য ধারা হয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে। আর রাজপুত জাতির মধ্যে তো বটেই। ‘রাজস্থান’ নামে কোনও দেশ বা রাজ্য ছিল না ভারতে, ছিল রাজপুতানা। ‘রাজ-রাজড়ার দেশ’ অর্থে ‘রাজস্থান’ নামকরণ টডেরই। পরে এ নামেই স্বাধীন ভারতে আত্মপ্রকাশ করে রাজপুতানা ও সংলগ্ন দেশীয় রাজ্যগুলি।

যাঁদের পূর্বপুরুষদের গৌরবগাথা লিখেছেন টড-তাঁদের কাছে তিনি এক পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। এজন্যই ১৯৯৭ সালে তাঁর নামে এক পুরস্কার প্রবর্তন করেছে মহারানা মেবার চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন। এ পুরস্কার দেয়া হয় অভারতীয় লেখকদের-যাঁরা টডের চিন্তাচেতনায় আলোকিত হয়ে বই লেখেন রাজপুত জন ও জীবন সম্পর্কে। এছাড়া তাঁকে স্মরণীয় করে রাখতে মেবার অঞ্চলে এক গ্রামের নাম রাখা হয়েছে ‘টডগড়’। বলা হয় ‘কর্ম’ ও ‘পুনর্জন্মে’র প্রক্রিয়ায় টড প্রকৃতপক্ষে একজন রাজপুত। মারকিন গবেষক জেসন ফ্রাইটাগ লিখেছেন, সেখানে ইতিহাসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অহঙ্কার। তাই টডের লেখার কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না সেখানে। আর এখন অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে টড হয়ে উঠেছেন রাজস্থান তথা শৌর্যশালী ভারতের মুখপাত্র-পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটে, প্রচারপুস্তিকা, পোসটারে তাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয় তাঁর লেখা থেকে উদ্ধৃতি।
তবে ‘রাজস্থান’ প্রকাশের পরই প্রশ্ন উঠেছিল এর ঐতিহাসিকতা নিয়ে। বলা হয়েছিল-লোকরচনা, কিংবদন্তি, জনশ্রুতি, দোহা, গাথা, চারণ-গান, ভাটের প্রশস্তি ইত্যাদি নির্ভর করে লেখা হয়েছে এ গ্রন্থ। অভিযোগ করা হয়েছিল, টডের এ লেখা উদ্দেশ্যমূলক ও পক্ষপাতমূলক। রাজপুতানার বাইরে এ সব অভিযোগ সত্য হিসেবেই স্বীকৃত, বস্তুত ভারতের আর কোথাও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই গ্রন্থটির।

টডের জন্ম লন্ডনের ইসলিংটন-এ, ১৭৮২ সালের ২০শে মার্চ। পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান তিনি, পড়াশোনা করেছেন পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবাহী স্কটল্যান্ডে। বড় হয়ে যোগ দেন ব্রিটিশ ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি (১৬০০-১৮৭৪)-তে, তখন প্রথমে প্রশিক্ষণ নেন লন্ডনের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি (১৭৪১-১৯৩৯), তারপর ১৭৯৯ সালে রওনা হন ভারতের পথে। তাঁর পিতা ছিলেন উত্তর প্রদেশের মিরজাপুরে এক প্রতিষ্ঠিত নীলকর, কাজেই পূর্বসূরিদের পথ ধরেই তিনি আসেন ভারতে। টডের যাত্রা শুরু বেঙ্গল আরমি-তে ক্যাডার হিসেবে, ১৮০০ সালের মে মাসে নিয়োগ পান লেফটেন্যান্ট হিসেবে, ১৮০৫ সালে মারাঠা সা¤্রাজ্যের অন্তর্গত সিন্দিয়া রাজসভায় কোম্পানির দূত ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এক পারিবারিক বন্ধুর প্রতিরক্ষা-সহচর দলের সদস্য হন জোর তদবির চালিয়ে। ১৮১৩ সালে পদোন্নতি পেয়ে ক্যাপটেন হন টড, সেই সঙ্গে হন প্রতিরক্ষা-সহচর দলের প্রধান।
সিন্দিয়া রাজসভা তখন ছিল অনেকটা ভ্রাম্যমাণ। রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে-ঘুরে চলতো এর রাজকার্য। নিয়মিত ভ্রমণের সুযোগে ওই অঞ্চলে নানাধরনের প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা চালান টড। এ ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল তাঁর প্রকৌশল বিদ্যা এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মী নিয়োগের সুযোগ। ওই সব সমীক্ষার সূত্রে এক মানচিত্র এঁকে তিনি উপহার দেন গভর্নর-জেনারেল মারকুইস অভ হেসটিংস (শাসনকাল: ১৮১৩-১৮২৩)-কে। মানচিত্রটির নাম তিনি দেন ‘সেন্ট্রাল ইনডিয়া’। মারাঠা শক্তির বিরুদ্ধে তখন তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্রিটিশরাজ। কাজেই মানচিত্রটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। যুদ্ধকালে (১৮১৭-১৮) গোয়েন্দা বিভাগের অধীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন টড। সিন্দিয়া রাজসভার সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে ওই অঞ্চল সম্পর্কে যত জ্ঞান তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, সেসব তখন কাজে লাগান পুরোপুরি। ওই সময় সামরিক অভিযানের জন্য নানারকম কৌশলী পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি।

১৮১৮ সালে পশ্চিম রাজপুতানার বিভিন্ন রাজ্যে ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান টড। ওই অঞ্চলে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতলবে রাজপুত রাজাদের সঙ্গে এক ধরনের লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি। কাজেই ঔপনিবেশিক শক্তির দিক দিয়ে টডের ওই নিয়োগ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের পর নতুন উদ্যমে রাজপুতানার দুর্গম অঞ্চলে সমীক্ষা চালিয়ে যান তিনি। শুরুতে তাঁর দায়িত্ব সীমাবদ্ধ ছিল মেবার, কোটা, সিরোহি ও বুনদি রাজ্য; কিছুদিন পরেই মারবাড় রাজ্যকে তিনি অন্তর্ভুক্ত করে নেন নিজ দায়িত্বের মধ্যে। ১৮২১ সালে জয়সলমের রাজ্যের দায়িত্বও দেয়া হয় তাঁকে।

টড বিশ্বাস করতেন, মুগল ও মারাঠা শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে কোম্পানি রাজের উচিত রাজপুতদের মিত্রশক্তি হিসেবে গ্রহণ করা। তাই রাজপুতানায় ঐক্য-সমন্বয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ওই বিশ্বাস থেকে রাজপুত রাজ্যগুলোতে কেবল রাজপুত প্রজা থাকবে, মারাঠা পি-ারি ও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দিতে হবে-এই নীতি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যান তিনি। এই পরিকল্পনা সাফল্য পায় অনেকখানি। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেকেই সমালোচনা করতেন টডের কার্যক্রমের। তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিরূপ ছিলেন অব্যবহিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দিল্লি ও রাজপুতানার রাজনৈতিক প্রতিনিধি ডেভিড অকটারলোনি (কার্যকাল ১৭৭৭-১৮২৫)। টডের দ্রুত পদোন্নতি, জরুরি বিষয়ে আলোচনা-পরামর্শ এড়িয়ে কাজ করা ইত্যাদি নাখোশ করেছিল তাঁকে। মারবাড়ের রাজা অভিযোগ করেন টডের বিরুদ্ধে। বলেন, রাজ্যের কাজে বেশি-বেশি হস্তক্ষেপ করছেন তিনি। শীর্ষ পর্যায়ে তদবির করে সফল হন রাজা, টডকে অপসারণ করা হয় ওই রাজ্যের দায়িত্ব থেকে। ১৮২১ সালে কোটা রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নীতি ভঙ্গ করে একপক্ষকে সমর্থন করায় তিরস্কার করা হয় তাঁকে। ওই রাজ্যের দায়িত্ব থেকেও অপসারিত হন তিনি। অকটারলোনি’র সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ না করে কোনো কিছু করার ক্ষমতাও রহিত করা হয় তাঁর। রাজপুত রাজাদের সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলায়ও টডের প্রতি সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে কোম্পানি রাজ। ১৮২২ সালে তাঁকে অব্যাহতি দেয়া হয় জয়সলমের রাজ্যের দায়িত্ব থেকে। তাঁর প্রতিরক্ষা-সহচর দলের সদস্য সংখ্যাও হ্রাস করা হয় এ-সময়। শেষপর্যন্ত একমাত্র মেবার থাকে টডের দায়িত্বে, কিন্তু সেখানেও তাঁর ক্ষমতা সীমিত করা হয় ন্যূনতম মাত্রায়। এমন অপমানজনক পরিস্থিতিতে ওই বছরের শেষদিকে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন মেবারের রাজনৈতিক প্রতিনিধির দায়িত্ব থেকে।

১৮২৩ সালে ঘুরপথে মুম্বই গিয়ে, কিছুদিন সেখানে থেকে ও কাটিয়ে, ইংল্যান্ডে চলে যান টড। ১৮২৬ সালে লেফটেন্যান্ট-করনেল হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। ওই বছরই বিয়ে করেন খ্যাতনামা চিকিৎসক-লেখক হেনরি কাটারবাক (১৭৬৭-১৮৫৬)-এর কন্যা জুলিয়া-কে। তাঁদের দুই পুত্র ও এক কন্যা।

ঘরে ও বাইরে অতিরিক্ত খাটুনির কারণে ১৮২৫ সালে সন্ন্যাস রোগে আক্রান্ত হন টড। এরপর থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে দ্রুত। এ রোগেই শেষপর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮৩৫ সালের ১৮ই নভেম্বর।

জীবনের শেষ দিকে প্যারিস ও অন্যান্য ইউরোপীয় শহরে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভারতবর্ষ সম্পর্কে বক্তব্য রাখতেন টড। ওই সময়ে, ১৮২৪ সালের ১১ই আগস্টে প্রতিষ্ঠিত ‘রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অভ গ্রেট বৃটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড’-এর সদস্য হন তিনি। কিছু কাল এর গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

রচনাবলি
*Translation of a Sanscrit Inscription, Relative to the Last Hindu King of Delhi, with Comments Thereon.. 1824
* Comments on an Inscription upon Marble, at Madhucarghar; And Three Grants Inscribed on Copper,Found at Ujjayani. 1826
* On the Religious Establishments of Mewar. 1829
* Remarks on Certain Sculptures in the Cave Temples of Ellora. 1829
*Annals and Antiquities of Rajast’han or the Central and Western Rajpoot States of India, Volume 1. 1829
*l Observations on a Gold Ring of Hindu Fabrication found at Montrose in Scotland. 1830
*Comparison of the Hindu and Theban Hercules, illustrated by an ancient Hindu Intaglio. 1831
*Annals and Antiquities of Rajast’han or the Central and Western Rajpoot States of India, Volume 2. 1832
*Travels in Western India. 1839
*“Annals and Antiquities of Rajast’han or the Central and Western Rajpoot States of India” পরে উইলিয়াম ক্রুক কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। প্রকাশক অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস।

‘রাজস্থান কাহিনী’
টডের ‘রাজস্থান’ সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সহকারে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা কালিকারঞ্জন কানুনগো (১৮৯৫-১৯৭২) তাঁর ‘রাজস্থান কাহিনী’ (১৯৬৫) গ্রহে। কৌতূহলী পাঠকদের জন্য সেখান থেকে কিছু মন্তব্য উদ্ধৃত করছি:

“আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণায় মহামতি টডের ‘রাজস্থান’-যাহা এত দিন আমরা প্রকৃত ইতিহাস বলিয়া মনে করিয়াছি - উহার অধিকাংশ মিথ্যা বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে।... মহামতি টডের ‘রাজস্থান’ ভ্রমপূর্ণ হইতে পারে; কিন্তু মহারাণা প্রতাপের বীরত্ব, স্বদেশাভিমান ও স্বাধীনতার উপাসনা সীমাহীন কল্পনাপ্রান্তরের সুদূর আলেয়া-ভ্রান্তি নহে।” (পৃষ্ঠা ২)

“কুমার মানসিংহ ডুঙ্গরপুর (টড কথিত দাক্ষিণাত্যের শোলাপুর নয়) বিজয় করিয়া ঐ বৎসর (১৫৭৩ খ্রি.) আষাঢ় মাসে উদয়পুরে যাত্রা করিলেন।” (পৃষ্ঠা ৬)

“দুঃখের বিষয়, টড ও ‘বীর-বিনোদ’ প্রণেতা শ্যামলদাসজীর ন্যায় মহামহোপাধ্যায় গৌরীশঙ্করজীর মতো ঐতিহাসিকও প্রতাপ ও মানসিংহ সম্বন্ধীয় অনৈতিহাসিক গল্পটি মানসিংহের মেবার অভিযানের কারণ নির্দেশ করিয়াছেন, অথচ এই ব্যাপার ও হলদীঘাটের যুদ্ধের মধ্যে পূর্ণ তিন বৎসরের ব্যবধান।” (পৃষ্ঠা ১২)

“টডের ‘রাজস্থানে’ হলদীঘাটের যুদ্ধবর্ণনা এবং এ সম্বন্ধে রাজপুত পক্ষের জনশ্রুতিমূলক কথাগুলি প্রায় সাড়ে পনেরো আনা মিথ্যা।” (পৃষ্ঠা ১৭)
“হলদীঘাটের যুদ্ধ বর্ণনায় টড “Sukhta whose personal enmity to Pertap had made him a traitor to Mewar, beheld from the ranks of Akbar yhe blue horse flying unattended,… He joined in the pursuit, but only to slay the pursuers
[Khorasani and Multani] who fell beneath his lance.” (Rajasthan, i.314),মহারাণা জয়সিংহের সময় রচিত রাজপ্রশস্তি কাব্যের দ্বারা সমর্থিত হইলেও প-িত গৌরীশঙ্কর (হীরাচাঁদ ওঝা)-জী (১৮৬৩-১৯৪৭) ইহা সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলিয়া ত্যাগ করিয়াছেন।” (পৃষ্ঠা ১৯)

“টড সাহেব অন্যত্র লিখিয়াছেন, প্রতাপ শপথ করিয়াছিলেন যতদিন পর্যন্ত চিতোর উদ্ধার না হয়, ততদিন তিনি ও তাঁহার বংশধরেরা সোনা ও রূপার থালায় ভোজন করিবেন না, ঘাসের বিছানায় শুইবেন, দাড়ি কামাইবেন না এবং নাকাড়া বাদ্য মেবার বাহিনীর সম্মুখে না বাজিয়া পিছনেই বাজিবে। প-িত গৌরীশঙ্করজী বলেন, এই সমস্ত শুধু মনগড়া কথা।” (পৃষ্ঠা ২৪)

“টড সাহেব লিখিয়া গিয়াছেন, রাজসিংহ শিশোদিয়া বংশের লুপ্ত প্রথা ‘টিকা-দেয়ার’ (অভিষেকের পর পররাজ্য আক্রমণ) পুনঃপ্রবর্তিত করিয়া মোগল সা¤্রাজ্যের অধীন আজমীর প্রান্তস্থিত মালপুরা নামক জনপদ লুট করেন। এ সংবাদ শাহজাহানের কানে পৌঁছিলেও তিনি রাণার কোনও শাস্তি বিধান না করিয়া বলিলেন, ‘এটা ভাইপোর (নাতি?) দুর্বুদ্ধি।’ ওয়ারিসের পাদশানামায় মালপুরা লুটের কোনো উল্লেখ নাই;... সত্যই যদি এ রকম কোনও ব্যাপার ঘটিত সম্রাট শাহজাহান কখনও রাণাকে এত সহজে অব্যাহতি দিতেন না। টড সাহেব (জৈন সাধু মান কবি কর্তৃক ১৬৭৭-৮০ সালে রচিত) ‘রাজবিলাস’ হইতে নিশ্চয়ই মালপুরা লুটের কথা গ্রহণ করিয়াছেন। ‘রাজবিলাসে’ মালপুরা লুটের কথা আছে; শাহজাহানের সদাশয়তা কিংবা মোগলের সহিত সংঘর্ষের কোনো উল্লেখ নাই। রাজ্যারোহণ অধ্যায়ের অব্যবহিত পরেই মালপুরা লুটের বর্ণনা থাকায় টড বোধ হয় এই ভ্রমে পড়িয়াছেন।... মালপুরা লুট সত্য বলিয়া গৃহীত হইতে পারে; কিন্তু টড কথিত টিকা-দেয়ার প্রথার পুনঃপ্রবর্তন এবং শাহজাহানের ভাইপোর উৎপাত নীরবে সহ্য করা ইত্যাদি ভিত্তিহীন জনশ্রুতি মাত্র।” (পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭)

“ঔরঙ্গজীব রূপকুমারীকে আনিবার জন্য দুই সহস্র অশ্বারোহী প্রেরণ করিয়াছিলেন; রাজসিংহ তাহাদিগকে পরাজিত করিয়া রাঠোর কুমারীকে উদ্ধার করিলেন-এ সমস্ত কথা ‘রাজবিলাসে’ নাই, অথচ টডের ‘রাজস্থানে’ আছে।...রূপনগরে কোনও মোগল সৈন্যের উপস্থিতি কিংবা তাহাদের সহিত মহারাণার সংঘর্ষের কথা ‘রাজবিলাসে’র এ অধ্যায়ে নাই। নবপরিণীতা রাণীর রক্ষার্থ মিবারের রক্তপতাকাতলে শিশোদিয়া সামন্তম-লীর যুদ্ধোদ্যম ইত্যাদি যাহা আমরা টডের ‘রাজস্থানে’ পড়িয়াছি তাহা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। এই বিবাহের অন্তত আঠার-উনিশ বৎসর পরে ঔরঙ্গজেবের সহিত মহারাণার বিবাদের সূচনা হইয়াছিল।” (পৃষ্ঠা ৬৮-৬৯)

“রাজসিংহ হতভাগ্য দারার পূর্ব উপকারের কোনো প্রতিদান দেন নাই; আন্তরিক সহানুভূতি থাকিলেও প্রকাশ্যে ঔরঙ্গজীবের সহিত বিবাদ করিতে তিনি সাহসী হন নাই। তাঁহার এ রূপ দুর্বলতা ও অকৃতজ্ঞতা শিশোদিয়া কুলের দুরপনেয় কলঙ্ক। তিনি চতুর রাজনৈতিক বা দূরদর্শী নেতা ছিলেন না; তাঁহার স্বধর্মপ্রীতি ও স্বদেশানুরাগ ক্ষুদ্র মিবার রাজ্যেই আবদ্ধ ছিল। মহারাণা সমস্ত হিন্দু সমাজের মুখপাত্র হইয়া ‘জিজিয়া’ বা অমুসলমানের মু--করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন নাই। এ সম্বন্ধে যে চিঠি টড রাজসিংহের নামে চালাইয়াছিলেন, স্যার যদুনাথ (সরকার, ১৮৭০-১৯৫৮) তাহা শিবাজী কর্তৃক লিখিত বলিয়া প্রমাণ করিয়াছেন। তাঁহাকে অব্যাহতি দিয়া বাকি সমস্ত হিন্দুকে নিষ্পেষিত করিলেও তিনি ঔরঙ্গজীবের ব্যাপারে অস্ত্র ধারণ করিতেন কিনা সন্দেহ। হিন্দুর মূর্তি এবং মন্দির ধ্বংসের ব্যাপারেও মহারাণার ভাব এ রূপই ছিল।” (পৃষ্ঠা ৭০)

এমন অনৈতিহাসিকতার দৃষ্টান্ত রয়েছে আরও। এ জন্যই বৃটিশ ভারতে ঔপনিবেশিকতাবাদী মেধাজীবীদের ইতিহাসচর্চার এক নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ‘রাজস্থান’ বইটি পড়ার আগে বা পরে কালিকারঞ্জন কানুনগো’র “রাজস্থান কাহিনী” পড়ে নিতে হবে বিভ্রান্তি এড়াতে।