মঙ্গলবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর-৬ষ্ঠ পর্ব
০৮/০১/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর-৬ষ্ঠ পর্ব

- রিজিয়া রহমান

শুনে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল ওমরতুনের। পরের দিন জমিজমা বরগা দিয়ে জয়নালকে নিয়ে চলে এল বহুদিন পূর্বে যে বাপের বাড়ি একাবর ছেড়ে গিয়েছিল গাঙের ওপারে সেই বাপের বাড়ির দেশে। বড় হোক, সাবালক হোক জয়নাল। সেও রহমত মাতবরের নাতি। এর সমুচিত প্রত্যুত্তর তাকে দিয়েই দেওয়াবে।

তারপর বড় হলো... সাবালক হলো... জোয়ান হলো জয়নাল খাঁ। আবদার ধরল দেশে যেয়ে পাকাপাকি বাস করবার। জয়নালকে নিয়ে তখন আবার গাঙ পার হয়ে পাকাপাকি দেশে ফিরে এল ওমরতুন। তার জয়নাল মানুষ হয়েছে। এখন তো তার সুখের দিনের শুরু।

এদিকে ওমরতুন যখন জয়নালকে নিয়ে দেশে ফিরল, তখন ভিটাবাড়ি আর মাত্র কয়েক কানি জমি ছাড়া সবই সর্বনাশা নদী পদ্মা গ্রাস করেছে। দু’জন লোকের সংসার চলাই দায় হয়ে উঠল। কিন্তু ওমরতুনের উদ্যমের শেষ নেই। শুনেছে সে, জমি নাকি তাদের চর হয়ে জেগে উঠেছে! এদিকে জয়নালও জোয়ান হয়েছে। তার নিজের জিনিস সে নিজে বুঝে নেবে। রহমত মাতবরের স্ত্রীর কৌলীনত্ব ঘুচিয়ে সে বাড়ি বাড়ি ধানভানা চাল কাড়ার কাজ নিল। দু’জন মানুষ পেটে খেয়েও খরচ বাঁচিয়ে টাকা করতে হবে। জয়নালকে পাঠাতে হবে সদরে। কোর্টে গিয়ে জমির মালিকানার প্রমাণ দেবে। সাক্ষীসাবুদও জোগাড় করেছে। গ্রামের প্রবীণ আর বিচক্ষণদের বাড়ি দু’বেলা হাঁটাহাঁটি করে নানা বুদ্ধিপরামর্শ জোগাড় করতে লাগল ওমরতুন।
এর মধ্যে জয়নাল আবার আর এক কথা পাড়ল। শহরে গিয়ে দোকান দেবে সে। বুড়ো বয়সে দাদীর এই খাটাখাটি তার ভালো লাগছে না। চরের মামলায় অনেক টাকার দরকার। কারবার করে সে আগে কিছু টাকাপয়সা হাতে জমিয়ে নিতে চায়। দু’চারদিন ইতস্তত করে শেষপর্যন্ত রাজি হলো ওমরতুন। বহুদিনের পুরোনো বলতে গেলে ওমরতুনের হাতে করে পেলে তোলা কালো রঙের দুধেল গাইটাকে বেচে টাকা দিল নাতির হাতে।
টাকা গাঁটের গেজেলে ভরে গরম ভাত খেয়ে কারবার করতে ঢাকায় চলে গেল জয়নাল খাঁ। সঙ্গে সঙ্গে যেন ওমরতুনের জীবনটা শূন্য আর অর্থহীন হয়ে গেল।

তবু ধৈর্য আর আশায় বুক বাঁধে ওমরতুন। দিনরাত কোরান শরিফ দোয়া দরুদ পড়ে দোয়া করতে লাগল জয়নালের জন্য।
ধীরে ধীরে চিঠিতে জয়নালের কারবারে উন্নতির খবর আসতে লাগল। শুধু তাই নয়, প্রমাণস্বরূপ দাদীর নামে মাসে মাসে টাকাও পাঠাতে লাগল সে!
ঈদে বাড়ি এল জয়নাল। দাদীর জন্য জামাকাপড় তেল সাবান তসবি, মিঠাই আনল। জয়নালকে দেখেও তাক লাগল ওমরতুনের। চকচকে জুতো পায়, হাতে ঘড়ি, মাথায় তেল চকচকে চুলে ঢেউ তোলা। আঙুলে আংটি! আনন্দে আত্মহারা হলো ওমরতুন।

কিছুদিন পরে আবার ঢাকায় ফিরে গেল জয়নাল। এবার যাওয়ার পর একটু পরিবর্তন দেখা দিল। চিঠিপত্র ও টাকা পাঠানোয় ভাটা পড়ল। ক্রমে সব যোগাযোগই ছিন্ন হলো।

এদিকে দেশের অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়। ওমরতুনের একটা পেট চলাই দায় হয়ে দাঁড়াল। গাছের মুলোটা কলাটা কলাটা বেচে একবেলা অন্নসংস্থান যদিও চলছিল, কিন্তু জয়নালের চিন্তায় ক্রমশ উদ্ভ্রান্ত হয়ে উঠল ওমরতুন। চোখে ঘুম নেই। দিন ভরে থাকে চিন্তা। রাতে আসে দুঃস্বপ্ন। গ্রামের দু-চারজন যারা ঢাকা আসা-যাওয়া করে, তারা খবর দেয় জয়নাল ভালোই আছে। কারবার করে বহুত উন্নতি করেছে। জমকালো বড়সড় দোকানে তার কর্মচারী খাটে। শুনে সুখে বুক ভরে ওঠে। জয়নাল-তার পাখার ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা জয়নাল, সত্যি মানুষের মতো মানুষ হয়েছে।
কিন্তু পরক্ষণেই অভিমানে চোখ ভরে পানি আসে ওমরতুনের। এত বড়লোক হয়েছিস তুই। দোকানে তোর কর্মচারী খাটে রেডিওর গান বাজে; এত সুখের দিনে বুড়ো দাদীকে তোর মনে পড়ে না? হায়রে নিঠুর। তুই না হয় ভুলে গেছিস। কিন্তু বুড়ি দাদীর প্রাণটা যে আকুলিবিকুলি করে জয়নালকে একটু শুধু চোখের দেখা দেখবার জন্য।

খবরদাতার সামনে খুশি দেখিয়ে বাড়ি ফেরে ওমরতুন। শূন্য অন্ধকার ঘরে বসে দু’চোখ ছাপিয়ে অজস্র ধারায় পানি পড়ে। বয়স বাড়ছে, চোখে ভালো দেখতে পায় না। কোমরটা ক্রমে বাঁকিয়ে আসছে। দন্তহীন রেখাকুঞ্চিত মুখটাকে ঘিরে তৈলহীন সাদা পাকাচুল এলোমেলো জটা বেঁধেছে। এখন আর সে মানুষের বাড়ি বাড়া ভানার কাজও পায় না। গঞ্জে চালের কল বসেছে। ধান সিদ্ধ করা, পাট বাছা, মরিচ শুকানোর কাজেও তাকে কেউ নেয় না। বুড়োমানুষ দ্রুত হাতে নিখুঁত কাজ সারতে পারে না। বারেবারে ভুল হয়। গৃহস্থ গৃহিণীরা মুখ ভার করে। কাজ ছাড়িয়ে চটপটে কমবয়সী লোক লাগায়।

এদিকে পরনের কাপড় ছিঁড়ে কানিতে পরিণত হয়েছে, গিঁট দিয়ে দিয়েও হাঁটুর কয়েক অংশ বেরিয়ে থাকে। সারাটা শীত গেছে অসম্ভব কষ্টে। গায়ে জামা নেই।

তার পর বর্ষা এসে গেল। ঘরের বেড়া পচে উলু ধরে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। অল্প বৃষ্টিতেই চাল দিয়ে পানি পড়ে ঘর ভেসে যায়।
শেষ পর্যন্ত আর পারল না ওমরতুন। গাঁয়েরই একটা ছেলেকে সঙ্গে করে সামান্য দু’চারটি টুকিটাকি যা ছিল পোঁটলায় বেঁধে ঘরে তালা দিয়ে লঞ্চে উঠে বসল ঢাকায় যাবার জন্যে।

ঢাকায় এসে জয়নাল খাঁর দোকানের চাকচিক্য দেখে বিহ্বল হয়ে গেল ওমরতুন। তারপর ক্ষণিকেই ঘোর কাটিয়ে জয়নালের বুকের ওপর পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। জয়নাল দাদীকে ধরল। পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত¡না দিল। নিজের সম্পদের বিবরণী দ্বারা নিরাপত্তার আশ^াসে দিল। তবু চোখ মুছতে মুছতে ওমরতুন যেন অনুভর করতে পারল, কোথায় একটা কী যেন গরমিল হয়েছে। এ যেন তার সে জয়নাল নয়, যে সেই ছোটবেলা থেকে দাদী বলে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আর সঙ্গে সঙ্গে কী এক অনুভূতি দু-জনকে তৃপ্ত করত। না! সেই ¯েœহডোরের পরিচিত সুরটি যেন বাজল না।
কর্মচারীকে কাজ বুঝিয়ে দাদীকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় এল জয়নাল। বেশ বাসা। পাকা মেঝে ঝকঝকে টিনের বেড়া। কাঠের দরজা জানালা। বিজলি বাতি।
দাদীকে চৌকির উপর বসিয়ে পাশের ঘরে গেল জয়নাল। ঘরের চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত লাগল ওমরতুন। ঘরে কাচের আলমারিতে কাচের থালা বাসন। টেবিলে ঘড়ি, রেডিও। আলনায় লুঙ্গি শার্টের সঙ্গে রঙিন শাড়ি জামা... তবে কি?...

ঘরে ঢুকল জয়নালের সঙ্গে সতেরো আঠারো বছরের একটি মেয়ে। রঙিন শাড়ি গয়নায় ঝলমল। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে যেন অনেকটা অবহেলায় ওমরতুনকে সালাম করল মেয়েটি। নোংরা কাপড় পরা মাথায় জটা, ধুলোভর্তি ফাটা পা নিয়ে কেমন যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেল ওমরতুন। বলল- ‘থাক! থাক! আল্লাহ বাঁচায়ে রাখুক।’ তারপর জয়নালের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফেলতে জয়নাল উত্তর দিল- তোমার নাতি বৌ।

নাতি বৌ! জয়নালের বৌ! কিছুক্ষণের জন্য ওমরতুনের চোখের সামনে সব যেন ঝাপসা হয়ে গেল। একটা বহুলালিত কল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবার পূর্বমুহূর্তে একবার ওমরতুনর মনের দৃষ্টিতে ভাস্বর হয়ে উঠল। কত সাধ ছিল কমবয়সী টুকটুকে একটা বউ আনবে। ধুমধাম করে বিয়ে দেবে জয়নালের। শাড়ি গয়না পরে পায়ের মল বাজিয়ে সারা বাড়ি ঝলমলিয়ে রঙিন পাখির ছায়ের মতো বউ টুকটুক করে ঢেঁকির ঘর রান্নাঘর আর শোবার ঘরে ঘুরবে। মেহেদি মাখা পায়ে উঠোনে ধান নেড়ে দেবে। বাতানা পরা হাতে যাঁতা ঘুরিয়ে ডাল ভাঙবে... চমক ভাঙল যখন ওমরতুনের তখন দেখল দু’গাল বেয়ে তার দু’টি অশ্রুর ধারা নেমেছে। লজ্জা নয়, কেমন তীক্ষè ধারালো দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে জয়নালের বৌ মাথার ঘোমটা ফেলে। তাড়াতাড়ি চোখদুটো মুছে নিয়ে অপ্রস্তুতভাবে জবাবদিহি করল যেন ওমরতুন- ‘চক্ষু দুইডা এহাবারে গ্যাছে। রাস্তায় আইছি ধুলা ময়লা পড়ছে, অহন করকর করবার নাগছে... তারপর অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠল- ‘ভালো বউ হইছে। সুন্দর হইছে। আমারে একটু খাইবার পানি দিবা বউ।’

বৌয়ের মুখের ভাবের বিশেষ পরিবর্তন হলো না। পানি আনতে গেল সে। জয়নাল পকেট থেকে সিগারেট বের করে দেশলাই জ¦ালিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর কেমন ইতস্তত করে বলল আইচ্ছা আমি কামে যাই। আইছ যহন থাহ কদ্দিন।’ তারপর বউয়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল- দাদীরে হাতমুখ ধুইবার জায়গা দেহাইয়া দেও। আর পরিষ্কার ধোয়া একখান কাপড় দিও।

জয়নাল চলে গেল। আর কেমন আন্তরিকতাহীন আড়ষ্টতায় নিজেকে বড় অনাহূত মনে হতে লাগল ওমরতুনের।
কয়েকটা দিন নাতি বাড়িতে ভালোই কাটল ওমরতুনের। তবে একরকম কেমন নতুন নতুন। অতিথি মেহমানদের মতো। সে নিজে এ বাড়িতে ঠিক খাপ খাচ্ছে না। তার আগমনটা এখানে যেন কীরকম বেসুরো। ওমরতুনের কাছেই মনে হয় বউ যেন কেমন একটা অবহেলার ভাব দেখায়। প্রায়ই বাপের বাড়ির আত্মীয়স্বজন আসে। ওমরতুনকে দেখে তারা তার সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে বউ মুখ ভার করে জবাব দেয়- ‘কী জানি উনার কোন দাদী বলে। বলা কওয়া নাই একদিন আইয়া হাজির। উনারও যেমুন কাম, দশটা-পাঁচটা ট্যাকা দিয়া বিদায় কইরা দিব তা না একেবারে বাসায় আইনা উঠাইছে। যতো আজাইরা আপদ।’

আড়াল থেকে শুনে লজ্জায় বেদনায় শরমে মরে নীল হয়ে গেছে ওমরতুন। জয়নালের কাছে কদিন জমিজমার মামলা-মোকদ্দমার কথা তুলতে চেয়েছে। কিন্তু জয়নাল অতি ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে দোকানের কাজের দোহাইতে কেটে পড়েছে। ওমরতুন বুঝতে পেরে নতুন করে দুঃখ পেয়েছে। বুঝেছে যে জয়নাল তাকে এড়িয়ে চলে।

ওমরতুনের মনে হলো এর চেয়ে সেই ভাঙা ঘরদোর পাড়ার লোকের থেকে চেয়েচিন্তে খাওয়াই ভালো ছিল। না এলেই হতো নাতির সুখের সংসার দেখতে।
ইতোমধ্যে ওমরতুন খেয়াল করল ওরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ঘন ঘন কিসের যেন গোপন শলাপরামর্শ করছে। এর কয়েকদিন পরেই কথা পাড়ল জয়নাল খাঁ।
- ‘দাদী অনেকদিন তো ঢাকা বেড়াইলা, এইবার তোমার দ্যাশে যাওনের ব্যবস্থা করি।’
বুকটা ধক করে উঠল ওমরতুনের। তবু নীরব রইল সে। জয়নাল একটু কেশে নিয়ে বলল : কিন্তু দ্যাশে যে যাইবা ঘর দুয়ার ঠিক করন লাগব। তোমার বছরের খাওন খোরাকিরও একটা বিলিব্যবস্থা করতে হইব। ভাবতাছি সামনের শুক্কুরবারে লঞ্চে গিয়া কয়দিন থাইক্যা তোমার ঘর দুয়ার নতুন কইরা উঠাইয়া দিয়া আমু। পরে তোমারে পাঠাইয়া দিমু।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন ওমরতুন। আর সঙ্গে সঙ্গে ¯েœহের একটা ঢেউ বুকের মধ্যে উথলে উঠল। জয়নাল! তার আঁচলের তলে বেড়ে ওঠা জয়নাল। তার কি দাদীর ওপর টান না-থেকে পারে?
পরের শুক্রবারের জয়নাল সত্যি দেশে গেল। যে ক’দিন জয়নাল দেশে থাকল, অতিরিক্ত রকমের আদরযত্ন করল বউ। ক্ষার দিয়ে মাথা ঘষে দিল। চুল শুকোলে মাথায় তেল চাপড়ে চাপড়ে বসাল। চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে জট ভাঙল। কাঁথা কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে দিল। খুশিতে ভরপুর ওমরতুনের মন। জয়নালের স্বেচ্ছায় বিয়ে করার দোষ মনে মনে ক্ষমা করে ফেলল একরকম। বউ আসলে মানুষ ভালোই। জয়নাল তার জন্য টিনের ঘর তুলে দিয়ে আসতে গেছে। বছরের খোরাকির ধানচাল কিনে রেখে আসবে। তার ওপর বউ বলেছে এখান থেকে দাদীশাশুড়ির নামে টাকা পাঠাবে সে। যেন নতুন সংসার গড়ার উদ্দীপনার নেশা ঘনিয়ে থাকল ওমরতুনের মনে। ঝকঝকে নতুন ঢেউটিনের ঘর। বেড়া ঘেরা উঠান। হাঁসমুরগি পালবে সে। মিষ্টিকুমড়া আর বোম্বাই মরিচের চারা লাগাবে উঠানের এককোণে। চালের ওপর লতিয়ে দেবে চালকুমড়োর লতা। টাকা-পয়সা কিছু হাতে জমলে একটা গাইও কিনবে। পাশের বাড়ির বউর কাছ থেকে কিছু ঢাকাই সীম আর কাটোয়ার ডাটার বীজ সংগ্রহ করে পুঁটুলি করে রাখবে ওমরতুন। দেশে তাদের এই জাতের সীম কারো বাড়ি নেই।

যথাসময়ে জয়নাল ফিরল। কেমন বাড়ি তৈরি হলো। পুরানো ঘর কী দরে বিক্রি হলো ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করল ওমরতুন। কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পেল না। জয়নাল হু-হা করে কোনোরকমে জবাব সেরে উঠল। বউ বলল, এত ব্যস্ততার কিছু নেই। দেশে গেলে ওমরতুন নিজ চোখেই দেখবে। পরের দিন দশটা টাকা হাতে দিয়ে লঞ্চে উঠিয়ে দিল দাদীকে জয়নাল।

দেশে যে ওমরতুনের জন্য এতবড় একটা প্রহসনের ব্যবস্থা করে রেখে গিয়েছিল জয়নাল খাঁ, তা ওমরতুন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ভিটে-বাড়ি ঘর জয়নাল খাঁ ঠিকই বিক্রি করে টাকা নিয়ে গেছে। কিন্তু দাদীর জন্য কোনো টিনের ঘর বা বছরের খোরাকির কিছুই করেনি।
পাশের বাড়িতে বসে কোনোরকমে দম নিয়ে বাক্যহারা হয়ে রইল নিরাশ্রয়া ওমরতুন। পাড়ার লোকজন পরামর্শ দিল আবার তুমি ঢাকায় যাও, জয়নাইলারে ধরে আনো। বিচার করবে গাঁয়ের মাতব্বররা। যদিও ওমরতুনের ভিটে কিনেছিল গাঁয়েরই এক মাতব্বর, তবু ঢাকায় গেল আবার ওমরতুন।

এবারে একেবারে অন্য মূর্তি জয়নাল খাঁর। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল দাদীকে। বলে দিল তার কোনো ব্যবস্থা সে করতে পারবে না। আর যেন জয়নালের বাসায় পা পর্যন্ত না দেয় সে। ওমরতুন বুঝি একবার জিজ্ঞাসা করেছিল- ‘ঘর বাড়ি বেইচ্যা এই বুড়া বয়সে আমারে যে নিরাশ্রয় করলি এখন ক আমারে কোথায় যামু কী খামু?’ ঝাঁঝিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছে জয়নাল- ক্যামনে খাইবা তা আমি কি জানি! গতর খাটাইয়া খাও গা। তা নইলে পথে পথে হাইটা ভিক্ষা কর গা।

আর ভাবতে পারে না ওমরতুন। এত প্রবঞ্চক এত নিষ্ঠুর হতে পারে ¯েœহের দাবিদার! ওহো আল্লারে। বড় নিশ^াস ফেলল ওমরতুন।
চমকে উঠল হাসেম। বলল- ‘দাদী তোমার ঘুম ধরে না? তয় আমি আর কী করি। আমারও যে ঘুম ধরে না ছাতা। ঘুইরা ফিইরা খালি দ্যাশের কথা মনে আহে। এইবার ফকিরবাড়ির ধামাইলে তোমারে দ্যাশে নিমু দাদী। অহন তো আগের মতো জাঁকজমক নাই। আগে এই মেলায় কত সার্কাস গান হইত।’ হঠাৎ দোতারায় আঙুল বুলিয়ে গান ধরল হাসেম পাগলা।
ওরে আগে জানলে...
আগে জানলে
তর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না।

সব ঘরই প্রায় নীরব। আলো জ¦লে কেবল ময়নার ঘরে। ময়না ভাতের ফ্যান ঝরিয়ে চুলোয় তাওয়া বসিয়ে কী যেন ভাজা করে। ভাজার ছ্যাঁকচোক শব্দ আর গন্ধে বাতাস ভরে ওঠে। ঘুম নেই খালেকের মার ঘরে খালেকের বউয়ের চোখে। যদিও ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে শাশুড়ি অনেক আগেই খেজুরপাতার চাটাই পেতে শুয়ে পড়েছে এবং এখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। অন্ধকার ঘরে তার প্রবল নাসিকাগর্জন খালেকের বউয়ের কানের কাছে একঘেয়ে ব্যাঙের মতো ডেকে চলেছে। অস্বস্তিতে আর অজানা ভয়ে খালেকের বউয়ের সারা ইন্দ্রিয় যেন উৎচকিত হয়ে রয়েছে। ভালো লাগে না তার। খালেকের রোজগারের যে পথ, তা মোটেই সমর্থন করতে পারে না খালেকের বউ অজিফা। এ বাড়িতে উঠতে-বসতে-চলতে-ফিরতে সবসময় তার মনে হয় তাকে ঘিরে সবার চোখের নীরব তীক্ষè ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছে। চোরের বউ সে। রাতে তার স্বামী ঘরে থাকে না। গায়ে তেল মেখে গামছা পরে সবার অলক্ষ্যে বেরিয়ে যায় কোথায় তাদের গোপন শলার আড্ডা আছে সেখানে। বাড়িও নিয়মিত ফেরে না। কখনো দু’চার পাঁচ দিন বাইরে কোথায় কাটিয়ে আসে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম ধাঁধা লেগেছিল অজিফার। জিঞ্জিরার ওদিকে তার বাপের বাড়ি। স্বামীর দুর্বোধ্য গতিবিধি, প্রায় রাতেই অনুপস্থিতি এবং মাঝে মাঝে ঘরে দুর্মূল্য দ্রব্যাদির আবির্ভাব এসব ঠিক বুঝে উঠছিল না। অথচ সংসার ঠিকই চলছে। খুব যে একটা প্রাচুর্য, তা নয়। তবে মাঝে মাঝে তারা বাজারের সেরা মাছ-মাংস খায়, আবার তিন-চারদিন হয়তো একেবারেই উপবাস। স্বামীর জীবিকাটা যে কী ধরনের, সে সম্বন্ধে প্রশ্ন না করে পারেনি অজিফা। ফলে খালেকের চোখরাঙানি ধমক খেয়েছে- তুই ম্যায়া মানুষ, তর অতো খবরের কাম কী। খাবিদাবি চুপচাপ থাকবি। আর ভালো না লাগলে যাবি গা হাইটা বাপের বাড়ি।

পরে ক্রমশ জেনে গেছে অজিফা, তার স্বামী চোর। যাকে বলে সিঁধেল চোর। স্বামীকে একান্তে পেয়ে অনেক সময় সৎবুদ্ধি দিতে চেষ্টা করেছে- দ্যাহেনই, ছাড়ান দেন ওই কাম। তার চাইয়া রিকশা চালাইয়া কাঁচামাল ফেরি কইরা নাইলে কুলীর কাম কইরাও খাওন চলে।
ধমকে উঠেছে খালেক- আরে থো থো! ওই মাইগা কাম আমি করি না।

অজিফা অবশ্য চুরি করে খাওয়ার মধ্যে কোনো বিরাট পুরুষত্বের মহিমা উপলব্ধি করতে পারল না। তবু মিনমিন করে বলল- ‘যদি কোনোদিন ধরা পইড়্যা যান। তাইলে তো হাড্ডি চুরা হইয়া যাইব।’
মাছি তাাড়বার মতো করে হাত নেড়ে কথাটা উড়িয়ে দিল খালেক- ‘আরে হাড্ডি চুরা অইলে সবডাতে অইবার পারে। রিকশা, বেবি ঠেলায়ালারা বাস চাপা পইড়া মরে না? তখন কী হাড্ডি আনাম থাকে?’
অজিফা মুখ ফুটে বলতে সাহস পায়নি যে তবু সে মৃত্যু অগৌরবের নয়। কিন্তু চুপ করেই থাকতে হয়েছে অজিফাকে। চোরের বাড়ি নাকি দালান ওঠে না! অজিফাদেরও চুরির আয়ের সংসারে তেমন শ্রী নেই উপরন্তু আছে এক একটি দিনের শেষে উদ্বেগ ভয়সঙ্কুল রাত।
এখন এই অন্ধকার রাতে ঘরের বেড়ায় হেলান দিয়ে নিঝুমভাবে বসে রইল অজিফা। ওদিকে ময়নার রান্না শেষ। ভাত বেড়ে একাই সে খেতে বসেছে। বিশা মোল্লা এখনও ফেরেনি।

হাসেম দোতারা বাজিয়ে গুনগুনিয়ে গেয়ে চলেছে একটার পর একটা গান।
নীল দরিয়ার মাঝিরে
কূল ঘেঁষিয়ে যাইও রে।
ময়না ভাত খেতে খেতে গলা বাড়িয়ে বলে- ‘ও হাসেম মিয়া! একখান ফিলিমের গান শুনাও না।’
হাসেম থেমে গেল। তার দাঁতে যেন কাঁকর পড়েছে অথবা পায়ে যেন একটা পেরেক ফুটেছে, এমনি এক বিশ্রী অস্বস্তির শিরশিরানি তার মেরুদ- বেয়ে উঠল। ফিলিমের গান! সারাদিন তো ওইসব গান গেয়েই পথে ঘাটে বাসে ট্রেনে রুজি জোগাড় করতে হয়। চটুল হালকা উর্দু গান শুনতেই লোকে পছন্দ করে। সেইজন্য শহরের প্রিয় সিনেমাগুলোর গানের কথা সুর রপ্ত করতে হয়। সে গান যেন এক সুরে ভিক্ষে চাওয়ার মতো, একই ডাক হেঁকে হেঁকে ফেরি করার মতো যান্ত্রিক অভ্যস্ততায় বাঁধা। সেখানে হাসেম প্রাণ ঢালতে পারে কোথায়! বাড়ি ফিরে তাই সে সেই গানগুলোই গায়... যে গানের সুর জাদুমন্ত্রের মতো তার চোখের সামনে জাগিয়ে তোলে দেশের নদী, মাঠ, গঞ্জ ও সবুজ ধানক্ষেতের ছবি।
ময়না একটু কৃত্রিম কোপের সুরে আবার বলল- ‘কি মিয়া ভার আইল নিহি? থাইমা গ্যালা যে?’

-‘ভালো লাগে না। ঘুম ধরছে।’ দোতারাটা হাতে নিয়ে হাসেম ধীরে ধীরে উঠে চলে গেল নিজের আস্তানার দিকে। কুকুর পরিবারকে বিরক্ত না করে নিজের কাঁথাটা নিয়ে কাঠকুটোর ওপর বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। কোনোরকমে হাত পা গুটিয়ে কুকুরকু-লী পাকিয়ে। পরম মমতা আর যত্নে দোতারাটিকে জড়িয়ে রাখল এক হাত দিয়ে বুকের মধ্যে। ভাঙাচালার উন্মুক্ত অংশ দিয়ে তাকিয়ে দেখল আকাশে জ¦লজ¦ল করে জ¦লছে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। হাসেম ভাবল, এই তারাটা জ¦লছে তার দেশে গ্রামের আকাশেও।

না, ভালো লাগে না। এই শহর ভালো লাগে না। তার মন প্রাণকে হাতছানি দিয়ে নিরন্তর ডাকে সেই ফকিরবাড়ির সামনের মাঠ আর সেই বকুলতলা। মাঠের ধার দিয়ে ছোট একটু চরের বাঁক ফেলে বয়ে যাওয়া হেমন্তের নীল নদী- পদ্মা। সেখানে সেই নদীর ধারে কত ফকির বাউল আসে। সারারাত গান হয়। শাহলাল ফকিরের ভাবশিষ্য সব। কী সে গান! গান নয় যেন আত্মার এক উদ্দাম করুণ আকুতি সুর হয়ে স্পর্শ করতে চায় সেই অদেখা মহান আলো, যে অদৃশ্য আলোর ¯্রােত মানুষের অগোচরে আসমান জমিনে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। তার অন্তরালে রয়েছেন তিনি, সেই মহামহিমাময় প্রভু। আত্মার পবিত্র ক্রন্দন, বাঞ্ছা, আহুতি তার কাছেই পৌঁছে দেবার জন্য সারেঙ্গী দোতারার সাতটি সুর কণ্ঠনিঃসৃত সুধাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে চলে। সেই তো হলো গান।
-(চলবে)