রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / ঘুরে আসুন প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও
০৮/০১/২০১৬

ঘুরে আসুন প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও

- কাজী মাহদী আমিন

মধ্যযুগে বাংলার মানুষের এবং বাণিজ্যের রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। এই অঞ্চলের উর্বর জমিতে উৎপন্ন নানা ধরনের সম্পদ কেনাবেচার মূলকেন্দ্র ছিল এই প্রাচীন শহর। কালক্রমে বাংলার রাজধানীর স্থান পরিবর্তন ঘটলেও, এখনো মানুষ সোনারগাঁয়ে গিয়ে মুগ্ধ হন সমৃদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য দেখে। রাজা-মহারাজারা যেখানে বিচরণ ও রাজত্ব করেছেন এককালে। সেই জায়গায় আপনি বেড়াতে গেলে সমৃদ্ধ সেই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আস্বাদ পাবেন।

ঢাকা থেকে সোনারগাঁও যেতে হলে আপনাকে বাস ধরতে হবে গুলিস্তান থেকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে নামতে হবে। সময় লাগবে এক ঘণ্টার একটু বেশি। সেখান থেকে রিকশায় সোনারগাঁও মিউজিয়ামের সামনে গেলেই হবে। পিকনিক বাস, গাড়ি ইত্যাদি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা আছে আশেপাশেই।

কি দেখবেন?

সোনারগাঁও লোকশিল্প ও কারুশিল্প জাদুঘর এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট আকর্ষণ। সেখানে গেলে দেখতে পাবেন দুইটি জাদুঘর। এর মধ্যে প্রাচীন কলাকৌশলে তৈরি জাদুঘরটি নির্মিত হয়েছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে, ১৯৭৫ সালে। ‘বড়সদর’ নামে ১৯০১ সালে নির্মিত একটি ভবনে জায়গা করে নিয়েছে সেই শৈল্পিক ছোঁয়ার জাদুঘরটি। ভবনটির টেরাকোটা প্রাচীরঘেঁষে সারি করে সাজানো আছে প্রাচীনবাংলার ঐতিহ্য। রাজরাজড়াদের নিত্যদিনের ব্যবহৃত সরঞ্জাম, গয়না, ফার্নিচার, সিন্দুক, গোলা-বারুদ, নৌকা, বাদ্যযন্ত্র এমনকি শো-পিস সংরক্ষণ করে রাখা আছে জাদুঘরটিতে। ইতিহাসের গৌরবময় অংশ ও বাংলার মানুষদের জীবনযাত্রা আচার ঐতিহ্য জেনে বুঝে নেওয়ার জন্য এই মিউজিয়াম আপনাকে অবশ্যই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার সোনারগাঁও-এ নির্মাণ করেছেন আরেকটি জাদুঘর। যেখানে ট্যুরিস্টরা নিজ চোখে দেখতে পাবেন বাংলার ঐতিহ্যের সবচাইতে আকর্ষণীয় সম্পদ মসলিন কাপড়। সে সময় সুদূর পশ্চিম কিংবা পূর্বের চীন, সব জায়গা থেকে মানুষ বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ে এসে জড়ো হতেন মসলিনের ব্যবসা করতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মসলিনের সেই মহান ঐতিহ্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে মসলিনের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে। সেই উদ্দেশ্যেই এই জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। মসলিন শাড়ি, নকশিকাঁথা, চাদর এবং মসলিন বুননের আদিযন্ত্র প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে মিউজিয়ামটিতে।

জাদুঘর পরিদর্শন ছাড়াও সোনারগাঁও-এ রয়েছে আরো নানারকম আকর্ষণ। আপনি লেকে নৌকা চড়তে পারবেন পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের সাথে। এর পাশাপাশি, ১৫০০ টাকা দিয়ে সারাদিনের জন্য মাছ ধরতে পারবেন। তবে মাছ শিকারের ছিপ আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ পিকনিকের জন্য বেশ ভালো ব্যবস্থা করেছেন সোনারগাঁও-এ।

০১৭২২-৩৮৭০৪২ এই নম্বরে যোগাযোগ করে জেনে নিতে পারবেন দরকারি সব তথ্য। জাদুঘর দু’টি বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে।

পানামনগর ও গোয়ালদি মসজিদ

ব্রিটিশ শাসনের সময় সোনারগাঁও থেকে ১০ মিনিট হাঁটার দূরত্বে গড়ে ওঠে পানামনগর। ৫২টি বাড়ি, রাস্তার দুইপাশে দাঁড়িয়ে আছে একদম জনমানবহীন অবস্থায়। কারণ, এই সব স্থাপনা ব্যবসায়ীরা নির্মাণ করেছিল সেই সময় তুলা বাণিজ্যের কারণে। ব্রিটিশ আমলের শেষে, হিন্দু ব্যবসায়ীরা এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলে পানামনগর হয়ে পড়ে একদম নির্জন। আধুনিক ডিজাইনের সাথে প্রাচীন বাংলার কলাকৌশলসংবলিত এইসব স্থাপনা এখনো দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। এটি সোনারগাঁয়ের অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ।

পানামনগর পার হয়ে এক কিলোমিটার সামনে গেলেই দেখতে পাবেন গোয়ালদি মসজিদ। ১৫১৯ সালে, মোল্লাহ হিজবার আকবরখান এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট আলাউদ্দিন হসেইন শাহ-এর শাসনামলে। ৫০০ বছরের পুরনো এই স্থাপনা প্রায় মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগ এই মসজিদকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। সোনারগাঁও গেলে দেখে আসতে হবে এই প্রাচীন মসজিদটি।

বাংলার ইতিহাস সোনারগাঁও-এর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য বাংলার পরিচিতি ঘটিয়ে দিয়েছিল বহির্র্বিশ্বের সাথে। সন্তানকে ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে, পরিবার-বন্ধুবান্ধবের সাথে ছুটির দিনে সুন্দর সময় কাটাতে সোনারগাঁও হতেই পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের গন্তব্য।