রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ
০৮/০১/২০১৬

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ

- তাসমিমা হোসেন

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই, পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।- এই সত্য উচ্চারণ করেছেন জীবনানন্দ দাশ, আজ থেকে পৌনে একশ’ বছর আগে। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পার করে পৃথিবীর উপর শকুনের ছায়া ফেলেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেই সময় কবি সুকান্তও ব্যক্ত করেছেন ক্ষুব্ধ পৃথিবীর প্রতি বিস্ময়- অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি / জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।

আজ, নতুন এক শতকে এসেও আমরা দেখছি যুদ্ধের নতুন রূপান্তর। সেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানাপ্রান্তে। বিনিসুতার মালার মতো আমরা সবাই যেন যুদ্ধের তোড়ায় গেঁথে আছি। প্রতিবেশির আঙিনায় মগডালে দশটি শকুন ডানা মেলে বসলে আমাদের উঠোনেও কয়েকটি শকুন শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নবমাত্রায় বিশ্বব্যাপী যে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে, তার জন্য কে দায়ী? সিরিয়া ইরাক লিবিয়ার লাখ লাখ মানুষ এখন যে শরণার্থী জীবনযাপন করছে, ভিখারির মতো মানবেতর জীবনে দীর্ণ হচ্ছে, তাদের জন্য কে দায়ী? তারা তো কেউ ভিখারি ছিল না। তাদের শিশুদের ছিল সুন্দর নির্মল শৈশব, প্রাণবন্ত কৈশোর। সেই জীবনে খেলা করে বেড়াতো প্রাচুর্য, সচ্ছলতা, আভিজাত্য। এখন তার কিছুই নেই। কেন?

আঘাতের বিপরীতে প্রত্যাঘাত আসবেই। তাই এই কেন’র উত্তরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে নৃশংসতার বীভৎস ক্ষত। সুতরাং যারা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলল, যারা এর কারণে অস্ত্রব্যবসা বৃদ্ধি করতে পারল, এর দায় তাদের নিতে হবে। আর, বিপদের কথা হলো, বৈশ্বিক এই সমস্যার ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় অনেক দেশীয় সুযোগসন্ধানী। তারই চিত্র আমরা দেখতে পেলাম গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ভেতরে। বৈশ্বিক জিহাদি চেতনা ও স্থানীয় বিষয়াদি একাকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে কিছু মগজধোলাই হওয়া তরুণকে এ-রকম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় উৎসাহিত করা সম্ভব। এটাকে তারা ‘এক্সাইটিং’ এবং ‘ব্রেভারি’ শো হিসেবেও নিতে পারে। সুতরাং হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় যারা হানা দিয়েছে, তাদের আমরা কী বলব? বিপথগামী তরুণ? তারা তো সবাই ঘর পালানো উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। কী করে তারা সুইসাইড স্কোয়াডে নিজেদের নাম যুক্ত করল? কী করে তারা এভাবে বিপথগামী হলো? যেই প্রক্রিয়ায় হলো, সেই প্রক্রিয়া তো এখনও অব্যাহত। এখন পরিবারের কেউ কারো প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে না। এমন পরিবেশ একটি সন্তানের নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতাকে বাড়িয়ে তোলে। আর, এর সুযোগ নিতেই পারে জঙ্গি তৈরির চ্যানেল। তাই, প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকেই। জঙ্গি তৈরির পরিবেশ যাতে টিকে না থাকে, তা দেখার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের।

সবার সচেতনতা ও সম্মিলিত চেষ্টায় যেকোনো সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা জাতি, সুতরাং এই সংকট থেকেও আমাদের নিশ্চয়ই উত্তরণ ঘটবে।