বুধবার,২৩ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিবিধ / পুরান ঢাকার ঈদ উৎসব: একাল-সেকাল
০৭/০১/২০১৬

পুরান ঢাকার ঈদ উৎসব: একাল-সেকাল

- মোহাম্মদ ওয়াসিম ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজ: Puran Dhakar Khabar এডমিন: আপনার রান্নাঘর

আমাদের পুরান ঢাকায় শৈশবের ঈদ মানেই ছিল নতুন কাপড় কিনে তা আলমিরাতে রেখে সারাদিনে অনেকবার বের করে দেখা। একসময় অধিকাংশ মানুষ বছরে ঈদেই প্রধানত নতুন জামা-জুতো নিতেন নিজের ও পরিবারের জন্যে। নতুন জামা-জুতো মানেই ঈদ আর তাই ঈদের জামা-কাপড় কেনার আনন্দও ছিল সীমাহীন। বহু কাক্সিক্ষত ঈদের চাঁদ দেখতে আমরা বাড়ির ছাদ বা অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গাতে দাঁড়াতাম কারণ তখন ঢাকাতে বিশাল বিশাল এপার্টমেন্ট আর হাই-রাইজ বিল্ডিং-এর অস্তিত্ব ছিল না। রোজা ২৯টা হবে না কি ৩০ এটা নিয়েও মানুষের আলোচনার সীমা ছিল না রাস্তা-ঘাট আর বাজারে।

পবিত্র রমজানে ঈদের চাঁদ দেখা গেছে এই খবরের সর্বপ্রথম ঘোষণা ধরা হোত চাঁদ দেখা কমিটির চাঁদ দেখার সাথে সাথে জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম রেডিও ও টিভি কর্তৃক ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটির পরিবেশনা। অপূর্ব ওই মধূর গানটি আমাদের সবাইকে কতটা আনন্দে ভাসাত তা এই প্রজন্মের কাউকে বলে বোঝানো কঠিন হবে। নতুন চাঁদ আর ওই গান যেন আমাদের ঈদের আনন্দের সাথে একই সুতোয় গাঁথা ছিল।

ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকায় চাঁদ দেখা যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইরেন বাজত অনেক স্থানে আর মসজিদে মসজিদে চাঁদ দেখার ঘোষণা আসত। রাস্তায় নামত মানুষের ঢল আর সবাই ছুটে যেতেন ঈদের দিনের সদাই আনতে যার মধ্যে অন্যতম ছিল সেমাই আর তা রান্নার জন্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ। পোলাওয়ের চাল, মাংস আর মশলা কেনার হিড়িক পরে যেত বাজার আর মহল্লার দোকানগুলোতে। কেউবা ছুটতেন তখনকার ঢাকার হাতে গোনা বিপনী বিতানগুলোয় জামা-কাপড় কিনতে। বড় মার্কেট ছাড়াও এলাকা গুলোতে অস্থায়ী চুড়ির দোকানে কাঁচের চুড়িসহ আলতা, টিপ, দুল ইত্যাদিও বিক্রি করা হোত।

ঈদের জামাতে যাবার আগে মিষ্টিমুখ করে নেবার রেওয়াজ অনেক আগে থেকেই, কেউ খোরমা অথবা কারো পছন্দ সেমাই। টানা একমাস সিয়াম সাধনার পরে ঈদের দিন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার বাড়িতেই সেমাই ছিল আপ্যায়নে প্রধান মিষ্টান্ন। তখন ঈদ মানেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে নানাপদের রান্না করা সেমাই খাওয়া। জর্দা সেমাই, দুধ সেমাই, নারিকেল সেমাই, চুটকি সেমাই, লাচ্ছা সেমাই ইত্যাদি নানা পদের সেমাই ছিল মানুষের ঈদের দিনের পছন্দের খাবারের তালিকায়। ঈদের প্রধান আকর্ষণ ঈদ জামাত শেষে বাড়ি ফিরে মিষ্টিমুখ করতেন সবাই সেমাই দিয়ে। এরপরে আয়োজনে থাকত প্রিয় খিচুড়ি সাথে ঝাল গরুর মাংস, সাদা পোলাওয়ের সাথে ঝাল মাংস বা খাসি/মুরগির রেজালা, মাংসের কোপতা, মাংস ভুনা, ছেচা মাংস, ফিরনি ইত্যাদি। কেউ কেউ মোরগ পোলাও পছন্দ করতেন, কেউবা মুরগির রোস্ট।

একমাস সিয়াম সাধনার শেষে ঈদের আগে চাঁদ রাতের আনন্দের অনেকটাই ছিল ছোট-বড় সবার হাতে মেহেদির লাগানোর মধ্যে দিয়ে। তখনকার সময়ে টিউব মেহেদির প্রচলন ছিল না একেবারেই। বাজার থেকে মেহেদির ডাল কিনে এনে তার পাতা বেঁটে মেহেদি প্রস্তুত করা হত। বড়রা ছোটদের হাতের মেহেদি পরিয়ে দিতেন। সেই বাটা মেহেদি অনেক সময় ধরে তা হাতে রেখে দিত সবাই এমনকি রাতভর আর তা শুকালে কতটা লাল হবে তাই নিয়ে আগ্রহের সীমা থাকত না ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত। বাটা মেহেদির রং দীর্ঘদিন স্থায়ী হতো বলে ঈদের রেশও যেন তার সাথে থেকে যেত।
পুরান ঢাকায় ঈদের জামাতের প্রস্তুতি শুরু হতো আগে থেকেই যার মধ্যে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা, লুঙ্গি কেনা ছাড়াও নানা ধরনের সুগন্ধি আতর, সুরমা ব্যবহার ছিল সর্বাধিক প্রিয় বিষয়। ঈদের দিন সকালে তুলোতে আতর দিয়ে তা কানের উপরের ভাজে গুঁজে মসজিদে রওনা হতেন সবাই নতুন জামা-জুতো পরে। ঈদের দিনে নতুন সুগন্ধি সাবান ব্যবহার ছিল এক সময়ের প্রিয় বিষয় যখন এত এত ব্যান্ডের সাবান সহজলভ্য ছিল না মোটেই। ঈদ জামাতের পরেই দিনভর মানুষের কোলাকুলি আর কুশলাদি বিনিময় সারা বছরের মুসলিমদের সম্প্রীতির সেরা দিন বলা যায়।

পুরান ঢাকায় ধনী-গরিব নির্বিশেষে অনেককেই সেই দিন ভালো কিছু রান্নার আয়োজন করতে দেখা যায়। সচ্ছল পরিবার আর ধনীদের মধ্যে নানা খাবারের আয়োজন থাকলেও অসচ্ছল পরিবারেও বছরের সেরা এই আনন্দের দিনে অতিথিকে অন্তত সেমাই দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয় প্রতিটি বাড়িতে। তাই ঈদে প্রিয় সেমাই না খেলে ঈদ এর প্রকৃত অনুভূতি আসত না করোরই। পুরান ঢাকার নানা স্থানে ঈদ মেলার প্রচলন আছে বহু আগে থেকে। পাড়ায় আর মহল্লাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বের হত বাড়ি বাড়ি ঘুরতে আর তাদের কাক্সিক্ষত সালামির জন্যে। বড়রাও কড়কড়ে নতুন টাকা নিয়ে ছোটদের ঈদি দেবার জন্যে প্রস্তুত থাকতেন। ঈদের দিনে পাওয়া সেলামির টাকা দিয়ে মেলাতে পছন্দের খেলনা কিনতে দেখা যায় ছোট বয়েসিদের।

ঈদ ধনী-গরিবের ব্যবধান ঘুচানোর দিন। সব ভেদাভেদ ভুলে প্রতিবেশী আর সব মানুষের কাছে ছুটে যাবার দিন। ঈদের দিন শত্রুও হেসে দু'হাত বাড়ায় কোলাকুলির জন্যে। ঈদের দিন অলি-গলি আর রাস্তায় রাস্তায় মানুষের আনন্দ, চারিদিকে গানের আওয়াজ, হৈচৈ আর সারাদিন একে অন্যের বাড়িতে বেড়ানো শত শত বছরের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের চিত্র। তাইতো ঈদ মানেই সকল অভাব-অনটন আর বেদনা ভুলে গিয়ে একচিলতে মিষ্টি মধুর হাসি।