মঙ্গলবার,২৫ Jun ২০১৯
হোম / ঈদসংখ্যা / সাহিত্যের শক্তি এবং উৎসবের সাঁকো
০৬/১৬/২০১৬

সাহিত্যের শক্তি এবং উৎসবের সাঁকো

- তাসমিমা হোসেন

কবি হচ্ছে মিথ্যুক প্রজাতি, অকাজের ঢেঁকি। এমন ভয়ঙ্কর মতামত দিয়েছেন মহামতি প্লেটো। তাঁর মতে, কবি বা শিল্পস্রষ্ঠারা ইমোশনকে উগড়ে দেয়, যা মানুষের যুক্তিকে অন্ধ করতে যথেষ্ট। কবি বা লেখকরা কেবল অনুকরণ করে, যা রচনা করে তা নতুন কিছু নয়, একটি সৃষ্ট জিনিসকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্যভাবে উপস্থাপন করে মাত্র।

সাহিত্যের ব্যাপারে মহামতি প্লেটোর এ-বড়ো গুরুতর অভিযোগ। তাঁর এই বাণী দিয়েই বহু ক্ষেত্রে কবি বা সাহিত্যিকদের একহাত নেওয়া হয়। কিন্তু আমরা সাধারণ বোধ দিয়েই এ কথার মধ্যে কিছু গুরুতর অসঙ্গতি খুঁজে পাই। কথা হলো- মিথ্যুক প্রজাতি বলা হয়েছে শিল্পসৃষ্টিকারীদের। অর্থাৎ তাঁরা সত্যপ্রকাশ করেন না। কিন্তু ‘সত্য’ জিনিসটাই এ-জগতে সবচেয়ে বড়ো ধোঁয়াশাময়। সবচেয়ে বড়ো কথা তা সম্পূর্ণই আপেক্ষিক। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সত্য নানারূপ ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে বিশুদ্ধ সত্য বলে কিছু হয় না। তার মধ্যে মিথ্যার মিশ্রণ থাকতেই হবে। একইভাবে যেমন অ্যাবসুলেট সাদা বা কালো বলেও কিছু হয় না। সুতরাং আমরা যা কিছু কল্পনা করি না কেন, তার মধ্যে কিছু সত্য বা মিথ্যার মিশ্রণ থাকবেই। সেটার অনুপাতে রকমফের হতে পারে, এই যা।

প্লেটোর কথা ধরে এভাবে পালটা যুক্তির অবতারণার কারণ হলো সাহিত্যের পরোক্ষ শক্তির ইঙ্গিত দেওয়া। জগতের প্রথম কবিতা সৃষ্টির কথাই চিন্তা করা যাক। মিথুনতর দুটি বকের একটিকে হত্যা করে এক ব্যাধ। আর সাথিহারা বকের বেদনা সঞ্চারিত আদিকবি বাল্মিকীর হৃদয়ে। তাঁর মুখে উচ্চারিত হয় ছন্দোবদ্ধ দুটি বাক্য-‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমঃ। যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনদেকমবধীঃ কামমোহিতম।’ অর্থাৎ হে ব্যাধ, তুমি যে কামমোহিত ক্রৌঞ্চমিথুনকে (বকযুগলকে) বধ করলে, তার ফলস্বরূপ জীবনে কখনো শান্তি পাবে না। শরবিদ্ধ পাখির বেদনা দেখেই মহাকবি বাল্মিকীর ভেতর থেকে উৎসারিত হয়ে ওঠে প্রথম ছন্দময় আকুতি, হাহাকার। প্রকৃতপক্ষে, কবিতা বা শিল্পসাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ নিজের মস্তিষ্কে খেলাতে পারে কোটি কোটি বিকল্প ভাবনা। সেই অতি জটিল কল্পজালের মধ্যেই তো ধরা দেয় নিগূঢ় সত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান। বলা যায়, কল্পশক্তির বাইপ্রডাক্ট হিসেবে সাহিত্য সৃষ্টি হলেও তার গুরুত্ব সীমাহীন। এ-কারণেই কবিতা বা সাহিত্য মানুষের কল্পনাশক্তির টনিক হিসেবে কাজ করে।

বরাবরের মতো এবারও অনন্যা ঈদসংখ্যাও সাজানো হয়েছে পাঠককে নিরন্তর সৃজনধারায় স্নাত করার তাগিদে। আমরা চেষ্টা করেছি সেইসব সাহিত্যসম্ভারে অনন্যাকে ঋদ্ধ করতে, যা রুচিবোধ ও নৈতিকতাবোধে উত্তীর্ণ।

লেখক, পাঠক, হকার ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। সবার শ্রমঋদ্ধ সহযোগিতাতেই সম্ভব এমন শিল্পসুষমাঋদ্ধ সাহিত্যসংখ্যা নির্মাণ করা।

উৎসবের সাঁকোয় মিলিত হোক সবাই।
সবার জন্য রইল ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।