মঙ্গলবার,২৫ Jun ২০১৯
হোম / ঈদসংখ্যা / বাঙালি মুসলমান সমাজে উৎসবের উদ্ভব ও বিস্তার
০৬/১৬/২০১৬

বাঙালি মুসলমান সমাজে উৎসবের উদ্ভব ও বিস্তার

- শামসুজ্জামান খান

‘মানুষের উৎসব কবে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে সেই দিন। যেদিন আমরা আপনাদিগকে প্রাত্যহিক প্রয়োজনের দ্বারা চালিত করি, সেদিন না; যেদিন আমরা আপনাদিগকে সংসারের সুখদুঃখের দ্বারা ক্ষুদ্র করি, সেদিন না, যেদিন প্রাকৃতিক নিয়মে পরস্পরের হস্তে আপনাদিগকে ক্রীড়াপুত্তলির মতো ক্ষুদ্র ও জড়োভাবে অনুভব করি সেদিন আমাদের উৎসবের দিন নহে- সেদিন তো আমরা জড়ের মতো, উদ্ভিদের মতো, সাধারণ জন্তুর মতো- সেদিন তো আমরা আমাদের নিজের মধ্যে স্বর্গজয়ী মানবশক্তি উপলব্ধি করি না- সেদিন আমাদের আনন্দ কিসের! সেদিন আমরা গৃহে অবরুদ্ধ, সেদিন আমরা কর্মোক্লিষ্ট, সেদিন আমরা উজ্জ্বলভাবে আপনাকে ভূষিত করি না, সেদিন আমরা উদারভাবে কাহাকেও আহ্বান করি না, সেদিন আমাদের ঘরে সংসারচক্রের মর্মরধ্বনি শোনা যায় কিন্তু সংঘাত শোনা যায় না।
প্রতিদিন মানুষ ক্ষদ্র দীন একাকী- কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ; সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একান্ত হইয়া বৃহৎ; সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উপর্যুক্ত বক্তব্যে বিশ্বকবি উৎসবকে দেখেছেন সেই দিনকে, যেদিন মানুষ নিজের মধ্যে সর্বজয়ী মানবশক্তির উদ্বোধন অনুভব করে। সেদিন সে প্রাত্যহিকতার চাপে ক্লিষ্ট নয়, গৃহকোণে আবদ্ধ নয়। উদারতা, উজ্জ্বলতায়, আনন্দময়তায়, সকল মানুষের সঙ্গে একান্ত হয়ে সে যখন মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করে তখনই সে মানুষ মহৎ হয়ে বৃহৎ হয়ে উৎসবের অংশীদার হতে পারে। অতএব, বিকশিত মনুষ্যত্বের, পশুত্বের হিংস্রতাহীন উদার মানসিক আনন্দময় চেতনার উদ্বোধনের দিনই মানুষের উৎসবের দিন। আর এই উৎসবের দিনে এক মানুষ অন্য মানুষ বা বহু মানুষের সঙ্গে যখন মিলিত হয় তখন সে বিশ্বকে নতুন করে উপলব্ধি করে এর গভীরতর সৌন্দর্যে, মানুষে মানুষে নিবিড় সুখানুভূতিতে এবং মানবিক সম্মিলনের অনন্যশক্তিময়তায়। ফলে উৎসব মানুষকে নতুন মানুষে রূপান্তরিত করে, কখনো ক্ষুদ্রতা, হীনতা, ম্লানিমা থেকে মুক্ত করে চিত্তশুদ্ধি ঘটায়, কখনো নতুন তেজ বা প্রাণশক্তিতে ভরপুর করে তোলে। আর তা যদি করে তবেই ব্যক্তির জীবনে উৎসব সার্থকতা বা সফলতা বয়ে আনে। উৎসব শুধু ব্যক্তি বা মানুষকে ভিন্নতর উচ্চতায় তুলে দেয় না- একটা জাতিকেও উদ্ভাবনায়, সৃজনশীলতায়, নব নব প্রতিভাস আবির্ভাবে সমৃদ্ধ করে থাকে। তাই যে কোনো জীবনবাদী মানুষ নব আনন্দে বাঁচার জন্য, জাতীয় সৃষ্টিশীলতার নানা দিগন্ত উন্মোচনের জন্য, নতুন নতুন শক্তির উৎস আবিষ্কারের জন্য নতুন নতুন উৎসব চায়। যে জাতির উৎসব নাই, সে জাতি নিষ্প্রাণ, বন্ধ্যা, নিরক্ত, সম্ভাবনাহীন।

দুই
পূর্ব-বাংলার বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস ঘাঁটলে তাদের উৎসব-আনন্দের তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তাদের গৃহ তাই ছিল আনন্দবিহীন, নিষ্প্রভ, সৃষ্টিশীল জীবনধারাও জীবনবৈচিত্র্যমুক্ত। এর মানে এটা নয় যে, পূর্ব-বাংলার বাঙালি মুসলমান উৎসবে আনন্দে অনীহ ছিল। তা নয় মোটেই। তারা নিজেরা নিজেদের উৎসব খুঁজে পায়নি, ধর্মীয় উৎসবে সাংস্কৃতিক উৎসব খুলে দিতে সাহস করেনি, নতুন ইহজাগতিক উৎসব সৃষ্টি করে নেবার মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সৃষ্টি করে নিতে পারেনি। আর তাই উৎসবে স্বাধিকার প্রমত্ততা সৃষ্টি করাও সম্ভব হয়নি। ধর্মীয় বাধা বা বিধিনিষেধ-সংস্কারে সংগীত বা নৃত্যকলা মুসলমান গৃহে ঢুকতে পারেনি। আর যে সমাজে গান নিষিদ্ধ, নাচ হারাম, সে সমাজে উৎসব অভাবনীয়। তাই বাঙালি মুসলমান সমাজে উৎসব ছিল না। তারা পার্শ্ববর্তী হিন্দুসম্প্রদায়ের উৎসবে যোগ দিয়ে তাদের বিনোদন পিপাসা নিবৃত্ত করেছে।
বিংশ শতকের প্রথম দিকেও উৎসবের উপযোগী বড়ো আকারের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, আর্থিকভাবে সচ্ছল একটি শ্রেণি সাধারণ মানুষের উৎসবে যোগ দেয়ার আর্থিক ভিত্তি এবং উৎসব আয়োজনে সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় উৎসবের বিস্তার লক্ষ করা যায়নি।
বাঙালি মুসলমানের উৎসব-বিকাশে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সংগীতশিল্পী কে মল্লিক, আব্বাসউদ্দীন, কবি জসীমউদ্দীন, নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী এবং সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের বিশেষ অবদান রয়েছে। শেরেবাংলা রাজনীতিতে আসেন বাঙালি মুসলমান কৃষক সমাজের অবস্থাপন্ন ও নব্যশিক্ষিতদের সহযোগিতা ও সমর্থনে। এঁরা যেমন স্বার্থের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করতে চাননি আগের প্রজন্মের নবাব-নাইট-জমিদার নেতাদের মতো, তেমনি মোল্লা-মৌলানা-কাঠমোল্লাদের মতো ধর্মীয় অন্ধতায় আচ্ছন্নও ছিলেন না। মোটামুটি ভালো আর্থিক অবস্থা এবং শিক্ষার কারণে উদারতা এই দুইয়ে মিলে এদের যে মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভাবাকাশ তৈরি হয়েছিল, তা আনন্দ-উৎসবের জন্য উপযোগী। এই পটভূমিকায় নজরুলের আবির্ভাব বাঙালি মুসলমান সমাজের শহরবাসী এবং শিক্ষিত গ্রামীণ অধিবাসী অংশকে নব-ভাব-উন্মাদনায় আপ্লুত করে তোলে। এদের সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে ও বিনোদন তৃষ্ণার জোগান দেন কাজী নজরুল ইসলাম তার অতুলনীয় শত শত গানের নিরন্তর সৃজন প্রয়াসে। আব্বাসউদ্দীন সেই সব গান, বিশেষ করে ইসলামি গানগুলো রেকর্ডে গেয়ে এক নবজাগরণের সৃষ্টি করেন। এই রেকর্ডের গানের মধ্যে দিয়ে বাঙালি মুসলমানগৃহে ঢুকে যায় আনন্দ আর উৎসবের উপকরণ। কিছু আগে থেকে কে মল্লিকের গান এবং পরে আব্বাসের ইসলামি গানের সঙ্গে ভাওয়াইয়া ও পল্লিগীতি ভাটিয়ালি বাঙালি মুসলমানকে নব চেতনায় উদ্দীপ্ত করে। বুলবুল চৌধুরী নৃত্যকলার প্রচলন ঘটানোয় উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে আর একটি বড় বাধা অপসারিত হয়।
১৯৩৭ সালে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাংলা সরকার গঠিত হওয়ার ফলে ধীরে ধীরে নতুন শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠতে থাকে। এই নতুন নাগরিক ও আধানাগরিক এমনকি গ্রামীণ অবস্থাপন্ন পরিবারেও ‘কলের গান’ (গ্রামোফোন), দৈনিক মাসিক পত্রিকার ঈদ সংখ্যা, নতুন কাপড়-চোপড় কেনার প্রচলন লক্ষ করা যায়। সেই থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজে ঈদোৎসবের সূচনা। সেই ধারা পাকিস্তান আমলে আরো বিস্তৃত হয়েছে।

তিন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের ক্ষেত্রে এক বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। স্বাধীনতা যে সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে এক মুক্তধারার সৃষ্টি করে বাংলাদেশে উৎসবের নানামাত্রিক বিস্তার তার চমৎকার নজির। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ ইতোমধ্যে প্রধান জাতীয় ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবে পরিণত হয়েছে। অনুষ্ঠানটি দেশের সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে বিরাট তাৎপর্যবাহী হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে এই উৎসবে চারুকলার ছাত্রদের আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিছিলের সংযোজন এবং নানা মুখোশের ব্যবহার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আবিলতা ও ভন্ডামীকে ব্যঙ্গবিদ্রƒপে ছিন্নছিন্ন করে দেয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাঙালির জাতীয় শোকের দিন। অবশ্য বাঙালি তরুণ রক্তের বিসর্জনে এই ঘটনায় বাঙালির জাতিসত্তারও প্রকাশ ঘটে। শেষপর্যন্ত শোক নয়, জাতীয় জাগৃতির দিন হিসাবে একুশে ফেব্রুয়ারি এক উৎসবের দিনেই এখন রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই দিনকে ঘিরে এখন গোটা মাসব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব, বইমেলা ও আরো কত রাজনৈতিক কর্মকা- চালু হয়েছে যা জাতির প্রাণশক্তি ও প্রাণবন্ততারই পরিচায়ক।

চার
আমরা ঈদোৎসব নিয়ে বিস্তৃতভাবে কাজ করেছি। সে কাজটি গবেষণামূলক। তাতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঈদোৎসবের রূপান্তরের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আমরা ওই লেখায় বলেছি : ‘ঈদ এখন বাংলাদেশের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। মূলত মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও ধীরে ধীরে এ উৎসব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাপ্রবাহ ঈদোৎসবের চারিত্রে এনেছে নানা পরিবর্তন। নগরায়ণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং বিপুল মধ্যবিত্তের বিকাশের ফলে ঈদোৎসব একটি জাতীয় ও আধুনিক সামাজিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে বিন্যস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এতে আরও পরিবর্তন আসবে এবং এর পরিসর বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।’ (ঈদোৎসব ও তার রূপান্তর : আধুনিক ফোকলোর চিন্তা, পৃ. ৩৪)।

বাংলাদেশের ঈদোৎসব এখন আর নিছক একটি ধর্মীয় উৎসব বা পবিত্রতার আবরণে মোড়া রিচুয়াল নয়। এ উৎসব এখন একটি বড়ো রকমের সাংবাৎসরিক বহুমাত্রিক ধর্মীয় এবং আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ও। শুধু ধর্মেমতি মুসলমান নয়- ধর্ম গোত্র নিরপেক্ষভাবে কোটি কোটি মানুষের রুটিরুজি, সংগঠন, সংযোগ, বিনোদন, পেশা বহু কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গেছে। ঈদ অন্তঃসারে ধর্মীয় সত্তা এবং শাস্ত্রী অনুশাসনের অংশ হলেও অর্থনীতির আওতায় ঢুকে যাওয়ায় এবং ব্যাপক মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এতে সামাজিকতা ও বিনোদন চাহিদা অনিবার্য হয়ে পড়েছে এবং সেই সুবাদে ঈদনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতিশিল্প বিকশিত হচ্ছে। ফ্যাশন ডিজাইন, ফ্যাশন প্যারেড, পোশাক-আশাকের নানা উদ্ভাবনা, সংবাদপত্রের বিপুল কলেবর ঈদসংখ্যা, গানের ক্যাসেট, সিডির প্রকাশ, টেলিভিশনের নানা ঈদ অনুষ্ঠানমালা, নানা সংস্থার নাচগানের অনুষ্ঠান ও ঈদমেলা ঈদকে করে তুলেছে এক সর্বজনীন জাতীয় আনন্দোৎসবে।