মঙ্গলবার,২৫ Jun ২০১৯
হোম / ঈদসংখ্যা / বেগম মুশতারী শফির সঙ্গে আলাপচারিতা
০৬/১৬/২০১৬

বেগম মুশতারী শফির সঙ্গে আলাপচারিতা

-

বেগম মুশতারী শফি একাধারে সাহিত্যিক, সম্পাদক, বেতার ব্যক্তিত্ব, উদ্যোক্তা, নারীনেত্রী, সমাজসংগঠক এবং সর্বোপরি সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সেই ষাট দশকের শুরুতেই মফস্বল চট্টগ্রামে নারীদের সংগঠন ‘বা›ধবী সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন, সেখান থেকে প্রকাশ করেন নারীদের নিয়মিত পত্রিকা ‘বান্ধবী’, এমনকি চালু করেন নারী পরিচালিত ছাপাখানা, ‘মেয়েদের প্রেস’, যা আজকের দিনের বিবেচনাতেও ছিল একটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক কাজ। মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’র সূত্রপাত হয়েছিল তাঁর ঐতিহাসিক বাড়ি ‘মুশতারী লজ’ থেকেই। এই অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর সেই সফল সংগ্রামী জীবনের কথা জানব।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিসংগঠক আলম খোরশেদ

আলম খোরশেদ : আপনার শৈশব-কৈশোরের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। ব্যক্তি-মানুষ হিসাবে আপনাকে আরো ভালো করে জানতে চাই আমরা।
মুশতারী শফি : আমার জন্ম বর্তমান ভারতের মালদহ জেলার কালিয়াচক থানায়, ১৯৩৯ সালে। জন্মের তিন মাস পরেই মা মারা যান। একই বছরে আমার নানাও মারা যান। তাঁর নাম কাজী আজিজুল হক, খান বাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন। উনি ছিলেন পুলিশের আইজি। আমার বাবার বাড়ি ফরিদপুর, নানাবাড়ি খুলনায়। উনি ফিংগার প্রিন্ট সিস্টেম আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সে-জন্য নগদ অর্থ দেয়। আমার ভাইও অল্পবয়সে মারা যায়। তিন বোন এক ভাই ছিলাম আমরা। আমার দাদি একরকম জোর করেই আমার আব্বাকে দ্বিতীয় বিয়ে করান। আমার এই মায়ের বাড়ি বরিশাল। উনি যে ‘সৎমা’ সেটা কখনো আমাদের মনেই আসেনি। নিজের মায়ের মতোই ছিলেন। আমার আব্বার শেষ কর্মস্থল ছিল ঢাকায়। উনার অবসরগ্রহণের পর আমরা ফরিদপুরে ফিরে যাই। আমার বড় ও মেজো দুই বোনকেই তখন বিয়ে দেন বাবা। বড় দুলাভাই ছিলেন ঢাকা সি কাস্টমস্-এ। উনি আমাকে ঢাকায় এনে ভর্তি করিয়ে দেন পুরনো ঢাকার নারীশিক্ষা মন্দিরে, যেটা এখন শেরেবাংলা স্কুল। আমার আব্বা খুব সংস্কৃতিমনা ছিলেন। শিশির ভাদুড়িদের সঙ্গে নাটক করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। আমার মনে আছে, হিন্দুদের হোলি খেলার সময় আব্বা একটা চেয়ারে বসতেন। ওরা আব্বার পায়ে প্রণাম করে আবির দিয়ে তারপর হোলি খেলা শুরু করত। কামরুন্নেসা স্কুলে টেনে ওঠার পরপরই আমার বিয়ে হয়। ১৯৫৩ সালের শেষের দিকে।

আ. খোরশেদ : এরপরই তো আপনি চট্টগ্রামে চলে এলেন, তাই না?
মু. শফি : হ্যাঁ। বিয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে আছি। আমার স্বামী ডা. শফি অত্যন্ত উদার ও প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন। বিয়ের পর আমার স্বামীর উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় আমার পড়াশোনা ও সংস্কৃতিচর্চা চলতে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অবশ্য খুব বেশি হয়নি। প্রাইভেটে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বাড়িতে সংস্কৃতিচর্চার উদার পরিবেশ ছিল। চট্টগ্রামের প্রগতিশীল মানুষদের প্রায় সবাই ছিলেন ডা. শফির বন্ধুস্থানীয়। তাঁরা এ-বাড়িতে নিয়মিত আসতেন। আমার স্বামী বাড়িতে ওস্তাদ রেখে আমাকে গান শেখানোর ব্যবস্থা করেন।

আ. খোরশেদ : সাংগঠনিক কর্মকান্ডে যুক্ত হলেন কখন, কীভাবে?
ম. শফি : চট্টগ্রামে এসে আমি দেখলাম, যে চট্টগ্রাম অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে চট্টগ্রামের মেয়েরা সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছে, সেই চট্টগ্রামের মেয়েরা, বিশেষত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েরা খুবই পশ্চাদ্পদ। মেয়েদের একমাত্র সংগঠন ছিল আপওয়া-‘অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’। আমি ওখানকার সদস্য হলাম। কিন্তু আপওয়া ছিল মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ী ও আমলার স্ত্রীদের সংগঠন। চট্টগ্রামে তখন একটা বিরাট সাংস্কৃতিক কর্মকা- গড়ে উঠেছিল রেলওয়েকে কেন্দ্র করে। সেই সময় রেলওয়ের চেয়ারম্যান ছিলেন আর. এন. বাগচি। উনি খুব প্রগতিশীল ছিলেন। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে শিল্পী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হলো, পাইওনিয়ার ক্লাবটাও ছিল। অন্যদিকে গড়ে উঠেছিল মাহবুবুল আলম চৌধুরীর সীমান্ত পত্রিকা ও নবনাট্য সংঘ। তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলো। এসব সাংস্কৃতিক সংগঠনই কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব করত। মাহবুবুল আলম চৌধুরী, সুচরিত চৌধুরী এঁরা ডাক্তার শফির বন্ধু হয়েছিলেন। তো আপওয়াতে বাঙালিদের কথার তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। পহেলা বৈশাখও পালিত হতো না। আমরা ধীরে ধীরে কৌশলে পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রজয়ন্তী এসব দিবস পালন করতে লাগলাম। একসময় ওদের সঙ্গে আমাদের বিরোধ এতটাই বেড়ে গেল যে, আমরা আপওয়া থেকে বেরিয়ে আসলাম। বেরিয়ে এসে আমরা ‘বান্ধবী সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করলাম।

আ. খোরশেদ : এটা কত সালের ঘটনা?
মু. শফি : ৬৩ সালের। সেই সময়কার অ্যান্টি করাপশন ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ডাইরেক্টর আর. আই. চৌধুরীর স্ত্রী মিসেস চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট আর আমাকে প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি করা হলো। প্রথমে প্রতি রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আসর হতো। এই আড্ডায় পুরুষদেরও আসতে বাধা ছিল না। কখনো মাহবুবুল আলম এসে বসতেন, কখনো সবিহ্উল আলম। পরে একসময় বান্ধবী নামে পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিলাম। মেয়েদেরকে গান, গিটার, তবলা, সেলাই, এমনকি চামড়া কেটে ডাইস করে ব্যাগ তৈরি করাসহ নানারকমের কুটিরশিল্পের কাজ শেখানো হলো। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্য এ-চারজনের জন্মবার্ষিকী আমরা নিয়মিত পালন করতাম। ’৬৩ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর আমরা ‘বান্ধবী সংঘের’ পক্ষ থেকে ‘ভিক্ষা মিছিল’ করে সমস্ত শহর ঘুরে ঘুরে সাহায্য সংগ্রহ করি। আমার মনে আছে, সেই সময় আমরা নগদ সাত হাজার টাকা সংগ্রহ করি। ‘বান্ধবী পুরস্কারও’ প্রবর্তন করেছিলাম। পর পর তিন বছর আমরা এ-পুরস্কার দিয়েছি। দর্শনীর বিনিময়ে নাটকের আয়োজনও প্রথম ‘বান্ধবী’ই করে।

আ. খোরশেদ : পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনাটা কীভাবে আসে? কারা কারা যুক্ত হলেন এর সঙ্গে?
মু. শফি : ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়িতে নিয়মিত বেগম পত্রিকা আসত, শিশু সওগাত আসত। ওগুলো পড়তে পড়তেই সেই ছোটবেলাতেই আমারও ইচ্ছে হয় আমি একটা পত্রিকা বের করব। আমি কিন্তু ক্লাস ফাইভে থাকতেই বঙ্কিমচন্দ্র বুঝে হোক না বুঝে হোক পড়ে ফেলেছি। সম্ভবত ’৬১ সালে ঢাকায় বেগম ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাই। সেখানে নূরজাহান বেগম, নাসিরউদ্দিন সাহেবসহ আরো অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। আমাদের সাহিত্য আড্ডায় যে লেখাগুলো আসত সেগুলো দিয়েই পত্রিকা করার কথা আমার মাথায় আসে। পূর্ণেন্দু দস্তিদার, বেলাল মোহাম্মদ এঁদেরকে আমার পরিকল্পনা জানাই। ওঁরা খুব উৎসাহের সঙ্গে রাজি হলেন। সবাই মিলে আমাকে পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব দিলেন। লেখা সংগ্রহ থেকে সব কাজেই এঁরা যুক্ত ছিলেন। আবুল ফজল সাহেবও আমাদেরকে খুব সহযোগিতা করলেন। সবিহ্উল আলম, আবুল মনসুর প্রচ্ছদ এঁকে দিতেন। শামসুন নাহার, আইনুন নাহার কবিতা লিখতেন। উমরতুল ফজল ধারাবাহিক উপন্যাস লিখলেন। এর মধ্যে আমরা কবি জসীমউদ্দীন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্- এঁদের শুভেচ্ছা বাণী নিয়েছি। একসময় বেগম সুফিয়া কামাল, মকবুলা মনজুর, জোবেদা খানম, রিজিয়া রহমান, রাবেয়া খাতুন এঁরা নিয়মিত লেখা দিতে লাগলেন।

আ. খোরশেদ : অর্থায়নের ব্যাপারটা কীভাবে হলো?
মু. শফি : আমরা হিসাব করে দেখলাম পাঁচ হাজার টাকা হলে আমরা শুরু করতে পারি। ডা. শফি আমাদেরকে দশ হাজার টাকা দিলেন। সিগনেট প্রেস বাকিতে পত্রিকা ছেপে দিতে সানন্দে রাজি হলো। একসময় সিগনেট প্রেসে বাকি বেড়ে যাচ্ছে দেখে একসংখ্যা সিগনেট প্রেস আরেক সংখ্যা কোহিনুর প্রেস এভাবে ছাপাতে লাগলাম। বিজ্ঞাপনের জন্য আমরা কলেজের ছাত্রীদেরকে কমিশনের ভিত্তিতে কাজে লাগালাম। বাঙালিদের মধ্যে এ. কে. খান, নাসিরউদ্দিন সাহেব আর অবাঙালিদের মধ্যে ইস্পাহানিসহ অনেকেই আমাদেরকে মোটা অঙ্কের টাকা সাহায্য করলেন। একসময় আমরা লেখদেরকে সম্মানীও দিয়েছি।

আ. খোরশেদ : এটাই তো একসময় ‘মেয়েদের প্রেস’-এ রূপ লাভ করল, তাই না?
মু. শফি : হ্যাঁ, এভাবে পত্রিকা চালাতে চালাতে একসময় আমার মনে হলো, মেয়েরাই যদি পত্রিকা ছাপানোর কাজ নিজের হাতে করতে পারে, তা হলে ভালো হয়। খাতুনগঞ্জ থেকে খুব বুড়ো একজন কম্পোজিটর নিয়ে আসলাম, নামটা ভুলে গেছি। ওনাকে বললাম, শুধু কম্পোজ করে দিলেই হবে না, আমাদের মেয়েদেরকে শিখিয়েও দিতে হবে। উনি আমাদের মেয়েদেরকে তিন মাস ট্রেনিং দিলেন। কম্পোজ করা থেকে শুরু করে, মেশিন চালানো, বাঁধাই সব কাজই একসময় ‘বান্ধবী’রাই করতে লাগল। আমিও এসব কাজ করতে শিখলাম। আমার বাড়ির নিচের গ্যারাজের জায়গাতেই ছাপাখানা বসানো হলো। শুধু আমাদের পত্রিকা বের করলে তো প্রেস চালানো যাবে না, তাই আমরা বাইরের কাজ নিতে লাগলাম। আমি নিজেও গিয়ে অনেক অর্ডার নিয়ে এসেছি।

আ. খোরশেদ : প্রেসটার কাজ শুরু হলো কখন? কতদিন চলল?
মু. শফি : ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে। ৬৮, ৬৯-এ রাজনৈতিক ঘনঘটার সময় পোস্টার, লিফলেট এসব ছাপানোর হিড়িক। এদিকে প্রেস চালাচ্ছি, ওদিকে রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করছি। ছাত্র ইউনিয়নের মেয়েরাই কাজ করত আমাদের সঙ্গে। ’৭১ সালের মার্চ সংখ্যা পর্যন্ত আমরা ছেপেছি। এরপর তো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তখন আমার বাড়ি, বান্ধবীর অফিসসহ সবকিছু লুট হয়ে গেল।

আ. খোরশেদ : আমরা একাত্তরে চলে আসলাম। আমরা জানি, এটা আপনার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই পর্বটা সম্পর্কে বলুন।
মু. শফি : একাত্তরে বান্ধবী সংঘের পক্ষ থেকে আমরা বড় বড় তিনটা নারী সম্মেলন করেছি। সেই সময় গ্রাম থেকে পর্যন্ত বোরখা পরে মহিলারা এসে যোগ দেন সমাবেশে। সোয়াত জাহাজ এল। শ্রমিকরা অস্ত্রখালাস করতে অস্বীকার করায় শুরু হলো সংঘর্ষ। পুরো শহরজুড়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি। রাজনৈতিক নেতারা ঐদিকে মিটিং চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষেরা বুঝে গেলাম যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। সবকিছু অচল হয়ে গেছে। ২৫ শে মার্চ বিকেলে আমরা খবর পেলাম, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে কিডন্যাপ করা হয়েছে এবং এম. আর. চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সৈনিকদের সঙ্গে বাঙালি সৈন্যদের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তখন তো আমাদের প্রেস বন্ধ। আমরা মেয়েদেরকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলাম। মেয়েরা আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নিল, অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিল। মেয়েরা যোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য দলে দলে রুটি, খাবার তৈরি করতে লাগল। ২৫ শে মার্চ বিকালে আমার কাছে একটা উড়ো ফোন আসল, ‘আপনারা কি শুনেছেন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন! যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, আপনারা প্রস্তুত হন।’ আমার বাসায় তখন আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ আল ফারুক আছেন। আমরা আজাদীর খালেদ সাহেবকে ফোন করলাম। উনি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারলেন না। এম. আর. সিদ্দিকীকে ফোন করলাম। সাড়ে সাতটা-আটটার দিকে। উনি বললেন, ‘কথাটা মিথ্যে নয়। এখন যার যার মতো প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হয়ে গেছে।’ রাতে দশটা-সাড়ে দশটার সময় ফোন করে জানলাম উনি বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন। রাত বারোটার সময় শেলিং শুরু হলো। জাহাজ থেকে ক্যান্টনমেন্টকে টার্গেট করে শেলিং হচ্ছে। এদিকে মেজর রফিক সিআরবি থেকে সেটার জবাব দিচ্ছে। আমি বর্ণনা করতে পারব না সেই ভয়ংকর রাতের কথা। আকাশ ফর্সা হতেই সমস্ত শহরের মানুষ বেরিয়ে এল। রাইফেল ক্লাব আর সিআরবি-র অস্ত্র গোডাউন ভেঙে অস্ত্র বের করে নিয়ে আসছে। এটা শুনে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, আমার ছেলে আর তার বন্ধুও ছুটে গেল। যে-যার মতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুপুরের দিকে বেলাল মোহাম্মদ বলল, ‘এসময় রেডিওটাকে যদি কাজে লাগানো যায়।’ শুনে আমি তো চিৎকার করে উঠলাম। বললাম, ‘কিন্তু তা কী করে সম্ভব?’ বেলাল মোহাম্মদ তখন রেডিওর স্ক্রিপ্ট রাইটার। আমিও ৬৪ সাল থেকেই রেডিওর সঙ্গে যুক্ত। নাজমুল আলম সাহেব, আবদুল কাহার সাহেব এঁদেরকে ফোন করলাম। কাহার সাহেব ডিনাই করলেন। বললেন, ‘এসব রিস্ক নিতে যাবেন না।’ নাজমুল সাহেব বললেন, ‘করতে পারেন। তবে আগ্রাবাদ সেন্টার থেকে করা যাবে না। কারণ এটা পোর্টের কাছাকাছি।’ এর মধ্যে আবদুল্লাহ ফারুকও চলে এল। সবাই মিলে রেডিওতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। ওরা আমাকে বাসায় থাকতে বলল। এর মধ্যে রেডিও অন করে আকাশবাণী শুনলাম। ওখানে বলছিল, ‘পূর্ববাংলায় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক জনগণের প্রচ- লড়াই চলছে।’ ওরা আমাকে খবরগুলো নোট করার দায়িত্ব দিয়ে চলে গেল। সেই সকাল নয়টায় তারা যাওয়ার পর সারাদিন কোনো খবর পাচ্ছি না। বিকেল পাঁচটায় বেলাল মোহাম্মদের ফোন পেলাম। ও শুধু বলল রেডিও অন রাখতে। আমি যথারীতি রেডিও অন করে অপেক্ষা করছি। রেডিওতে কখনো গান, কখনো বিজ্ঞাপন এসব হচ্ছে। সাতটা চল্লিশে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ রেডিও টিউন হিসেবে বাজতে লাগল। তারপরেই থেমে গিয়ে আবুল কাশেম সন্দ্বীপের কণ্ঠস্বরে পরপর দুইবার শুনতে পাই ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি’। কবি আবদুস্ সালাম আরবিতে কোরানের একটা আয়াত পাঠ করলেন। এর পরেই আবদুল্লাহ ফারুকের কণ্ঠে প্রথমে বাংলা ও পরে ইংরেজি বুলেটিন শুনতে পাই। আরেকজন কবিতা আবৃত্তি করে শোনাল। এরপরেই কোনো নাম প্রচার না করেই ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করা হয়। এর আগের দিনই বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা লিফলেটাকারে বের হয়ে গিয়েছে এবং সারা শহরে সেটা মাইকিং করে প্রচার করা হয়েছে। জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে লিফলেটটা এসেছিল। এরই এক কপি হান্নান সাহেব নিয়ে রেডিওতে পাঠ করেন। এইভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মকা- শুরু হয়ে যায়। বেলাল, কাশেম এরা রাতে হেঁটে বাসায় চলে আসে। আমরা পরের দিনের অনুষ্ঠান তৈরি করতে বসে যাই। বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠলে পটিয়ার ওসির পরামর্শমতো বেলাল মোহাম্মদরা মেজর জিয়ার সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি উৎসাহের সঙ্গে রাজি হয়ে সদলবলে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে আসলেন। সেইদিন সন্ধ্যায় মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এটা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে, তারা জানতে পারে তাদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীও আছে। এখানে জিয়া না হয়েও অন্য কোনো আর্মি অফিসার হলেও সাধারণ মানুষ একই প্রতিক্রিয়া দেখাত।

আ. খোরশেদ : আপনার স্বামী ডা. শফি কীভাবে নিহত হলেন?
মু. শফি : ২৭ মার্চের রাতের বেলায় ন্যাপ-এর চৌধুরী হারুনুর রশিদ আমাদের বাসায় এক ট্রাক অস্ত্র নিয়ে এলেন। আমার ইতস্তত ভাব দেখে ডা. শফি বললেন, ‘আরে এত ভয় করলে চলে? দেশের জন্য কাজ করতে গেলে সাহস লাগে।’ এই বলে সবাই মিলে অস্ত্রের ট্রাঙ্কগুলো দোতলায় তোলে। এইভাবে ২৭ মার্চ চলে গেল, ২৮ মার্চ এলো। সময় বাড়ার সাথে সাথে অস্থিরতাও পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। কারণ আমাদের এলাকা প্রায় বাঙালিশূন্য হয়ে পড়েছিল, অবাঙালিদের দাপুটে আচরণ মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। আমি পালিয়ে যাওয়ার কথা বললে ডা. শফি রাজি হলেন না। এরপর ২৯ তারিখ রাতে বেলাল যখন ফিরে এল তখন সে ডা. শফিকে অস্ত্রগুলো দেখিয়ে বলল, ‘এগুলো এখানে নিরাপদ নয়, পাকিস্তান আর্মি যে কোনো সময় এসে তল্লাশি চালাতে পারে।’ বেলাল প্রস্তাব করল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অস্ত্রগুলো তাঁকে দিয়ে দিতে। ডা. শফি বললেন, ‘না, না আগে হারুনকে জিজ্ঞেস করি, দেখি ও কী বলে।’ উনি বলেছিলেন বিপদের সম্ভাবনা দেখলে উনিই জানাবেন।
২৯ মার্চ হারুন ভাইকে শেষবারের মতো ফোন করে বললাম, ‘হারুন ভাই, পাড়া তো এখন শূন্য; আপনি যদি অস্ত্রগুলো নিয়ে যান তাহলে ভালো হয়, আর যদি ব্যস্ত থাকেন তো জিয়াউর রহমানকে বললে উনি নিয়ে যাবেন।’ তখন অপরপ্রান্ত থেকে হারুন ভাই রাগতস্বরে বললেন, ‘এগুলো তো আমাদের ছেলেদের। ওরা ব্যবহার করবে।’ আমি অবাক হয়ে গেলাম- এরকম সময়ে ‘আমাদের ছেলে’ আর ‘তোমাদের ছেলে’ কী! মুক্তিযুদ্ধ তো আমাদের সবারই। ডা. শফি আমাকে বললেন, ‘হারুন যখন বলছে, কিছুই হবে না।’ পরে শুনলাম হারুন ভাই নিজেই ইন্ডিয়া চলে গেছেন। ৩০ মার্চ দুইটা-আড়াইটার দিকে পাকিস্তানি আর্মি রেডিও স্টেশনে হামলা চালায়, আর বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দেয়। আখতারুজ্জামান বাবুর ভাইকে আমার বাসা থেকে বের হবার পথেই মেরে ফেলল। গোয়ালপাড়া বস্তি জ্বালিয়ে দিল। কারো সঙ্গে যোগাযোগ থাকল না। সন্ধ্যার দিকে আবুল কাশেম সন্দ্বীপের ফোন পেলাম, ‘আপা, আমি বলছি, পালিয়ে এসেছি, বেলাল ভাই কোথায় জানি না।’ কিছুক্ষণ পরে বেলাল ভাই ফোন করে ‘ভাবী, আমি বেঁচে আছি’ বলে রেখে দিল। আমরা মাথার ওপরে হারুন ভাইয়ের আমানত নিয়ে বসে রইলাম। এপ্রিলের ৭ তারিখ সকাল ১০ টায় দুটো আর্মি ট্রাক আমার বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। পুরো বাড়ি তল্লাশি করে কিছুই পেল না। যাবার সময় ডা. শফিকে তাদের সাথে নিয়ে গেল। আমরা তো ভাবলাম তার বুঝি আর দেখা পাব না। আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে সেইদিন দুপুর ১২টা নাগাদ ডা. শফিকে তারা সসম্মানে বাসায় পৌঁছে দিল। কারণ এরিয়া কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আসলাম তাঁর পেশেন্ট ছিলেন। তিনি বললেন ভুল মানুষকে ধরে আনা হয়েছে। সে-যাত্রা রেহাই পাওয়া গেল। কিন্তু আড়াইটার দিকে আরেক ট্রাক আর্মি এল। একজন অফিসার জিজ্ঞেস করল ওপরে কে থাকে। আমরা হারুন ভাই যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে সেভাবেই বললাম, ওপরে অবাঙালি ভাড়াটিয়া ছিল, ওরা গত মাসে চলে গেছে। যাই হোক, তারা ওপরের ঘর সার্চ করবার জন্যে দরজা ভাঙল। একপর্যায়ে তারা অস্ত্রের ট্রাঙ্কগুলো খুঁজে পেল। ওগুলোতে লাল মার্কার দিয়ে লেখা ছিল ২৭-৩-১৯৭১। তারিখটা আগে আমাদের কারো চোখে পড়েনি। তারিখ দেখে ওরা যা বোঝার বুঝে গেল। ওরা ডা. শফিকে আর আমার ছোটভাই এহসানকে ধরে নিয়ে গেল। আমাদের বাড়ির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে লাগল। সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার সময় বিহারিদের একটা গ্রুপ এসে আমার কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবি করল আমার স্বামী আর ভাইয়ের মুক্তিপণ হিসাবে। আমার হাতে ছিল মাত্র পঁচাত্তর টাকা। তাদেরকে আমি বললাম আমার গহনাগাটি যা আছে নিয়ে যেতে। ওরা রাজি না হয়ে নগদ টাকাই চাইল। পরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত সময় দিল। এর মধ্যে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরদিন সকাল ছয়টা পর্যন্ত কার্ফ্যু জারি করল। প্রতিবেশী নবী সাহেবের ছোট ভাই পিছনের দরজা দিয়ে এসে বলল, ‘আপা, আপনি সময় থাকতে পালিয়ে যান। পাঞ্জাবিরা আপনাকে হয়রানি করে টাকা আদায় করতে চায়। ডা. শফির হায়াত থাকলে তিনি অবশ্যই ফিরে আসবেন।’ শেষরাতের দিকে বৃষ্টি নামলে আর্মিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে আমি বাচ্চাদেরকে নিয়ে বেরিয়ে যাই। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আগরতলায় গিয়ে নার্সিংয়ের ট্রেনিং নিলাম, যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারি। এই ক্যাম্পে মতিয়া চৌধুরী, মালেকা বেগম, জ্ঞান চক্রবর্তী, আয়েশা খানম আর চট্টগ্রামের রেবাদি, চৌধুরী হারুন উর রশিদ এবং কমরেড অমলেশ বড়–য়াসহ অনেককে পেয়েছিলাম। এটা ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাম্প ছিল। আওয়ামী লীগের ক্যাম্প আলাদা ছিল। ততদিনে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছে। ভারত সরকারের সহযোগিতায় পুরোদমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হলো। আমি বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ শুরু করলাম। ছদ্মনামে আকাশবাণীতে ছোটগল্প পড়তাম আর যুগান্তর পত্রিকায় লিখতাম। প্রতিটা ক্যাম্পে, প্রতিটা সমাবেশে আমি আমার স্বামী আর ভাইকে খুঁজে বেড়িয়েছি। মনে হতো, ওরা কাছেই কোথাও আছে, দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু তাদেরকে আর খুঁজে পাইনি। দেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালে জানুয়ারি মাসের বিশ তারিখে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কামাল লোহানীসহ আরো অনেকের সঙ্গে আমিও দেশে ফিরে আসি।

আ. খোরশেদ : এরপর তো আপনার জীবনে শুরু হলো আরেক লড়াই, এক অন্যরকম ব্যক্তিগত মুক্তিযুদ্ধ।
মু. শফি : হ্যাঁ, আমাদের বাড়িটা ওরা এমনভাবে নষ্ট করেছিল যে বলতে গেলে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এটাকে তারা আল বদর বাহিনীর ক্যাম্প বানিয়েছিল। ফজলুল কাদের চৌধুরীর কোঠা ছিল নির্যাতন কেন্দ্র আর এটা ছিল তাদের অফিস। আশপাশের মানুষদের কাছে জানতে পারি, দেশ স্বাধীনের আগমুহূর্তে তারা যতটা পেরেছে বাড়িটাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। আমি আমার বোনের বাসায় টানা তিন মাস থেকে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাড়িটা ঠিকঠাক করলাম। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। চোখে অন্ধকার দেখছি। এমন কোনো উচ্চশিক্ষাও আমার ছিল না যা দিয়ে ভালো একটা চাকরি জোটাতে পারব। আবুল ফজল সাহেব আমাকে একটা চিঠি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বললেন। তখন ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। ব্রিজ-কালভার্ট সব ভাঙা। তখনকার মিনহার পেট্রোল পাম্পের মালিক হাবিবুল্লাহ খান আমাকে তাঁর অয়েল ট্যাঙ্কারে করে ঢাকায় যেতে বললেন। আমি আমার ভাগ্নেকে নিয়ে সেই অয়েল ট্যাঙ্কারে চড়ে বঙ্গোপসাগর ঘুরে অবশেষে ঢাকায় পৌঁছলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে আগে থেকে চিনতেন, আমাকে ‘চট্টলার বান্ধবী’ বলে সম্বোধন করতেন। ৩২ নম্বর রোডের বাড়ির সামনের সেই প্রচ- ভিড়ের মধ্যে উনি আমাকে চিনতে পারলেন এবং সেই সম্বোধনটা আবার করে কুশল জানতে চাইলেন। আমি তাঁকে চিঠিটা দিলাম। তিনি আমাকে সেক্রেটারিয়েটে জনৈকা মাহমুদার কাছে পাঠালেন। তিনি আমাকে একটা ফরম পূরণ করতে দিলেন। একটু পর আমাকে দুই হাজার টাকার একটা চেক দিলেন। আমি খুব অপমানিত বোধ করলাম। সেই ফরম ও চেক ছিঁড়ে সেই মুহূর্তে আমি চলে আসি। মাসতিনেক পরে ডিসি সাহেব আমার বাড়িতে এসে আবার সেই চেকটা অফার করলেন। আমি বললাম, ‘আপনারা আমাকে আর অপমান করবেন না।’ পরে বাণিজ্য মন্ত্রী এম. আর. সিদ্দিকী আমাকে লাইসেন্স পারমিট অফার করলেন, ঢেউটিনের পারমিট, বেবি ফুডের পারমিট এবং আমার বাড়ির কাছেই যে অ্যাপোলো পেট্রোল পাম্পটা আছে সেটার পারমিটও অফার করলেন। কিন্তু এগুলো দিয়ে আমি কী করব! আমার তো এসব বিষয়ে কোনো ধারণা নাই। বেলাল মোহাম্মদ আমাকে রেডিওতে ঢুকতে বললেন। মূলত স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে ওখানে আমার চাকরি হয়। এর পাশাপাশি আমি আজাদী, নয়া বাংলা পত্রিকাতেও কাজ করেছি। এভাবে আমার নতুন জীবন শুরু হলো। পরে আবার সাংগঠনিক কর্মকান্ডে যুক্ত হলাম। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সবসময় শরিক থাকার চেষ্টা করেছি।

আ. খোরশেদ : এরই মধ্যে আপনি লেখালেখিটা চালিয়ে গেলেন, লেখক হয়ে উঠলেন?
মু. শফি : হ্যাঁ, জীবনধারণের পাশাপাশি লেখালেখিটাও চালিয়ে গেছি। জীবিকাসূত্রে বেতার কথিকা, নিবন্ধ ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত কলামধর্মী লেখা লিখতাম। গল্প, উপন্যাস ও ছোটদের জন্যও লিখেছি। তবে সবচেয়ে বেশি লিখতে ভালো লাগত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। কেননা মুক্তিযুদ্ধকে আমি একবারে ভেতর থেকে দেখেছি, আর এটা আমার জীবনকেই তো একেবারে পালটে দিয়েছিল। আমি আমার সেইসব রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলাম মুক্তিযুদ্ধর স্মৃতিচারণ, ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’। বইটি প্রকাশিত হয় অনুপম প্রকাশনী থেকে। অনেকগুলো সংস্করণ হয়েছে। পরে এর ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার আরেকটি গবেষণাধর্মী বই, ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’। এতে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের খ্যাত, অখ্যাত নারীদের বীরোচিত ভূমিকার কথা আলোচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়টায় আমি কিছু ছোটগল্প লিখেছিলাম আকাশবাণী বেতারকেন্দ্রের জন্য। সেগুলোও একপর্যায়ে ‘দুটি নারী ও একটি মুক্তিযুদ্ধ’ নামে বই হয়ে বেরোয়। এছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ ও ‘একুশের গল্প’ নামে আমার আরো দুটো ছোটগল্পের সংকলন রয়েছে। ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র আন্দোলনের সঙ্গে আমার ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে একসময় ‘চিঠি, জাহানারা ইমামকে’ নামে দীর্ঘ একটি গ্রন্থও রচনা করি। এছাড়া আমার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ওপর লিখেছিলাম ‘আমি সুদূরের পিয়াসী’ আর বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে আমার স্মৃতি নিয়ে লিখিত হয়েছে ‘স্মৃতিতে অমলিন যারা’ গ্রন্থটি। আমি লিখে আনন্দ পাই, তাই সময় পেলেই নিজের তাগিদেই লিখি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন উপলক্ষে ফরমায়েশি লেখাও লিখতে হয় প্রচুর। সব মিলিয়ে আমার বইয়ের সংখ্যা গোটা বিশেক হবে। এর বাইরে প্রচুর লেখা রয়ে গেছে যা এখনও বই আকারে প্রকাশ পায়নি।

আ খোরশেদ : আপনি মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত প্রায় সব কর্মকান্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করলেন, স্বামী ও ভাইকে হারালেন। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
মু. শফি : মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যতক্ষণ না শেষ হবে ততক্ষণ আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের নৈতিক দায় থেকে মুক্ত হতে পারব না। আর মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনার সার্বিক পুনরুজ্জীবন ও প্রতিষ্ঠা ঘটাতে না পারলে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম জাতি হিসাবেও আমরা বেশিদূর এগোতে পারব না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটাই আমার শেষ কথা।