মঙ্গলবার,২৫ Jun ২০১৯
হোম / ঈদসংখ্যা / আমার ভাই
০৬/১৬/২০১৬

আমার ভাই

- আকিমুন রহমান

দুপুর থেকে আজকের দিনটা আমার জন্য খুব অস্থির একটা দিন হয়ে উঠেছে! জোর তুফান চলতে থাকার মতো অস্থির!
এখন প্রায় মধ্য রাত। এখনও আমার অস্থির অস্থির, দম বন্ধ দম বন্ধ লাগাটা থামছে না। কী যে একটা তুলকালাম- ভেঙেচুরে ছত্রখান হওয়ার- দিন গেল আজকে!
এমন দিনও মানুষের জীবনে আসে! এমন ভয়ানক ধাক্কা খাওয়া আর থেঁতলে যাওয়ার দিন!
বলছি তো আজকে দুপুর থেকে অস্থির লাগছে! তবে আজকে দুপুরের আগে কী আমি স্থির-সুস্থির কেউ ছিলাম? থাকার উপায় ছিল?
গত কয়দিন থেকেই আমি কি আর আমার মধ্যে আছি!
না, আমি আর আমার ভিতরে নাই! গত দুই সপ্তাহ ধরে আমি আর আমার মধ্যে নাই! আমার বিদ্যা আমার ডিগ্রি আমার এই যে পানপাতা মুখ, আমার জন্য বাড়ির সকলের এই যে এত বেশিরকমের মায়া-এই সকল কিছুকে একটা ফালতু, একটা নিরর্থক বিষয় বলে ক্ষণে ক্ষণে মনে আসছিল আমার। গত দুইটা সপ্তাহ ধরে।
আর; কেমন একরকমের লজ্জা, কেমন একরকমের হেরে যাওয়ার জন্য গোপন কান্না- কেমন একরকমের অপদস্ত হওয়ার শরম ও অপমান আমার ভিতরের আমারে পুরা স্তব্ধ, পুরা বোবা, পুরা হিম আর অচল করে রাখছিল। সর্বক্ষণ রাখছিল।
আজকে কয়দিন হয় এইই চলছে আমার মনের দুনিয়ায়!
বাইরে আমি নড়ছি-চড়ছি স্বাভাবিক থাকার ভঙ্গিতে। বাড়ির সকলের চোখে নিজেকে ঠিক দেখানোর জন্য যথানিয়মে রেওয়াজে বসছি, ভোরবেলা করে করে। বসছি, কিন্তু বেশিক্ষণ হারমোনিয়ামে হাত রাখতে পারছি না। মনে হচ্ছে গলা ফেটে রক্ত বের হয়ে আসবে!
এমন হেরে যাওয়ার পরে লোকে গলায় সুর তুলতে পারে? কোনোদিন পারে না!
একেকবার ভীষণ চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে আমার- একটু পরপরই হচ্ছে। অমন হেরে যাওয়ার পরে মাটিতে লুটিয়ে বিলাপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে লোকের?
থাকে না থাকে না।
আমি হেরে গেছি। আমি হেরে গেছি।
কোন মুখে ওই হেরে যাওয়ার বিষয়টা ঘরের সকলকে জানানি দেব আমি! কোন মুখে জানানি দেব যে, জীবনের কড়া থাবড়াটা আমার পাওয়া হয়ে গেছে! কেমনে জানাব যে, চরম লজ্জাটা পাওয়া হয়ে গেছে?
সেই কথা পলকে পলকে মনে আসছিল,পলকে পলকে ঠান্ডা হিম হয়ে যাচ্ছিল আমার হাত-পা আর অন্তর। তারপর আচমকা করে করে রাগ হচ্ছিল। খুব রাগ।
ভিতরে ভিতরে নিজের উপরে রাগে, বাড়ির সকলের উপরে রাগে একেকবার ধকধকায়ে উঠছিলাম আমি; আবার একেকবার পুরা রাগটা গিয়ে পড়ছিল বড়ো ভাইয়ার ওপর! গত দুই সপ্তাহ ধরে।
অর কারণে-এই অর লেইগাই না আমারও এমুন সর্বনাশটা হইয়া গেল! অর কারণেই তো!
ক্যান! ওর জন্মানের কী দরকার পড়ছিল সংসারে? দুনিয়ায় আর বাড়ি আছিল না? উয়ে সেইসব বাড়িত জন্মাইতে পারে নাই? সব থুইয়া অরে আমাগো বাড়িতেই জন্ম নিতে হইবো ক্যান! আর আমাগো কপালে এত গরদিশ ভোগ করতে হইবো ক্যান! অর লেইগা এত জ্বালা ভোগ করোন লাগবো ক্যান সকলতেরে!
ক্ষণে ক্ষণে এই এক চেত আমার ভিতরে খুব শক্ত রকম ঝটকা দিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল গত দুইটা সপ্তাহ ধরে। খালি ঝটকা বাড়ি মেরে মেরে যাচ্ছিল, আমি থেঁতা-ভোঁতা হয়ে যাচ্ছিলাম; কিন্তু চোখ দিয়ে একটা ফোঁটা পানি বের হচ্ছিল না আমার! একফোঁটা পানি বের হয় নাই আমার। একটা ফোঁটা না!
এই যে আমার ভিতরে এমন যে গোস্বা এমন যে ঘৃণা বলক দিয়ে দিয়ে চলছিল, সেই বলকের চোটে আমি যে কেমন স্তব্ধ, কেমন বোবা হয়ে গেছিলাম; সেই খবর আমার বাড়ির কেউ কি রাখে? রেখেছে?
কী জানি!
কারো ভাবে-ভঙ্গিতে তো বোঝাই যায় নাই যে,আমার অন্তরের কষ্ট, আগুন-জ্বালা কারো নজরে এসেছে! সকলে আমারে নিয়েই উতলা হয়ে আছে এই গত একমাস ধরে। তবে সেটা আমার অন্তর-যন্ত্রণা নিয়ে নয়। অধীর হয়ে আছে আমার মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির চূড়ান্ত চিঠিটা পাবার জন্য।
এই যে আমি এমবিবিএস শেষ করেছি দারুণ রেজাল্ট করে, ইন্টার্ন শিপও শেষ করে এলাম এই তো একমাস হয়; এইটা তাদের কাছে খুব গর্বে ঝলক-বলক দিয়ে ওঠার কোনো ব্যাপারই না!
ব্যাপার তবে কী?
ব্যাপার হলো- যাও এখন ক্যারোলিনস্কা থেকে মেডিক্যাল বায়োলজিতে মাস্টার্স করে আসো গা! তারপর তো এফআরসিএস, এমআরসিপি করা তোমারে লাগবেই। পিএইচডিও করতে পার। তবে সেইটা পরের ব্যাপার। এখন যাও তুমি সুইডেনে। মাস্টার্স তো কর আগে।
অথচ আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। কোনো ইচ্ছা ছিল না। অন্তত গত দুই সপ্তাহ আগে তো ছিল নাই-ই।
দুই সপ্তাহ আগে, তখন, আমার অন্তরে অন্তরে অন্য কিছুরে পাওয়ার ইচ্ছা! গহিন ইচ্ছা। ইচ্ছা যে- সেটা পাই আগে; তারপর মাস্টার্স বল, বা অন্য যা করতে বল-করব!
কিন্তু সে কথা তখন কাকে বলব আর কে শুনবে! বাড়ির কেউ কি আমার সাধ-বাসনার কথা শোনার গরজ রাখে? কোনোদিন রাখে না।
ওই যে দূরের আমেরিকায়- ওই যে ক্যানসাস সেইখানে পিএইচিডি করছে মেজো ভাইয়া। বাড়ির সেই গোঁয়ার বান্দরটার যেই বিষয়ে যেই সাধ হবে সেই সাধ পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য আন্ধা উতলা হয়ে উঠবে এই বাড়ির আরেকজন। সে এই বাড়ির বড়োটা- বড়ো বুবু। দুনিয়ার নাদান, দুনিয়ার ঠেঁটা সে! মেজো ভাইয়ার সাধ তারে পূরণ করা লাগবেই। লাগবেই লাগবে ।
আব্বা চলে যাওয়ার পর থেকে এই-ই তো চলে আসছে বাড়িতে।
আজ দুপুরে ওই দুইজনের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। ভারী সাদা খামটা এসেছে সুইডেন থেকে। এসেছে আমার ভর্তি চূড়ান্ত হওয়া ও সেমিস্টার শুরুর দিনক্ষণ জানান দেওয়ার বার্তা নিয়ে। ওহ আল্লা!
আজকে একমাস হয়- প্রতিটা দিন গেছে ঠিক, কিন্তু গেছে যেন বাড়ির সকলের ধৈর্যের ওপর আর আশার ওপর একটা করে হাতুড়ি-পিটানি দিয়ে! ক্যানসাসের মাথা-উতলাটা, আমার টুটুল ভাইয়া, রোজ প্রতিটা দিন ফোন দিতে দিতে দিতে নার্ভাস হয়ে শেষ! আমাদের সকাল তো ক্যানসাসে সন্ধ্যা। আমাদের বিকাল তো- ক্যানসাসে ভোররাত।
আমেরিকার সেই ভোররাতে কি একটুখানি সকাল করে, এই একটা মাস ভরে টুটুল ভাইয়া আগে বাড়িতে ফোন করেছে; তবে নিজের কাজে হাত দিয়েছে। ল্যান্ড ফোনে লাইন পাওয়া কী যাহা-তাহা বিষয়! কত বুঝ দেওয়া হলো- ওই যে বাড়ির বড়োজন- আস্ত ডাকাতটা- সেও তো কত শক্ত করে বলল- চিঠি আসলে আগে তরে খবর দিমু,তার বাদে খুলমু। তুই এমুন উতালা হইস না!
কিন্তু সে কোনো কথা কানে নেয় নাই। খালি ফোন খালি ফোন। ‘আইছে রে কোনো চিঠি? আইছে?’
এই দিগদারি দেখতে দেখতে আমারই তো শেষে লজ্জায় বেদিশা অবস্থা! চিঠি আসে না কেন!
সেই চিঠি শেষতক এল! এল কি না আজকে দুপুরে! যখন আমার অন্তরটা বিষের জ্বালায় আর অপমানের আগুনে থকথকাচ্ছে, যখন ভালো কোনো কিছুরে আর শান্তিহালে খুশিমনে নেওয়ার কোনো অবস্থা নাই আমার অন্তরে, তখন কি না এসেছে চিঠি!
আমারে দ্রুত যাওয়ার সুশীল তাগাদা ভরা চিঠি! সেই চিঠি হাতে নিয়ে বাড়ির সবাই, ক্যানসাসে থাকা আমার অধীর ভাইটা-সকলে মুহূর্তে ঠান্ডা, সয়সুস্থির, ফুরফুরা!
আর আমার কী কারবার! যদিও চিঠিটা হাতে পাওয়ার পর মনটা বলে উঠলো যে, বাঁচলাম! বেদম অপমানটারে সামাল দেওয়ার এই যে সুযোগটা পেলাম! ইস! আমি বাঁচলাম!
কিন্তু তারপর দেখ, আমার ভিতর-বাহির আবার অন্ধকার হয়ে এল। যা চাইলাম, তা তো আসে নাই জীবনে! তাইলে এই পড়তে যাওয়া দিয়ে আর কোন সুখ আসবে!
ফুল স্কলারশিপে পড়তে যাওয়ার ভাগ্য পাওয়া আমি এক রত্তি ছলকে উঠতেও কি পারলাম! কটু সুখী হওয়া, একটু লাফিয়ে ওঠার কিছুমাত্র সাড়া কি জাগল আমার ভিতরে! জাগলো না তো! আমি কী করব!
বরং বিকালটা ভরে, নতুন করে করে বারবার অন্তরে ঘাই দিয়ে উঠতে থাকল কড়া রকমের রাগটা! এই বাড়িটার সবকয়টা ভাইবোনের মাথা একইরকম নষ্ট ক্যান! অরা প্রতিটা জনে আমার এত ভালো করতে চায় ক্যান! ক্যান! আমার ভালো আমি এট্টু করি? করি?
না! সেইটা করার কোনো অধিকার আমার নাই! বাড়ির বিষয়ে একটা কোনো কথা বলার কোনো চান্স আমার নাই।
আর, যদি বলেও ফেলি, সেই কথা খুব মন দিয়ে শুনে-তারে তুড়ি দিয়ে ভ্যানিস করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নাই- এই বাড়ির বড়োগুলার!
তিন বোন আর তিন ভাইয়ের সবচেয়ে ছোটোজন আমি। আমার কথা শোনে তারা, কিন্তু কখনো পাত্তা দেয় না।
অই বড়োগুলা হচ্ছে বুদ্ধিনাশার বুদ্ধিনাশা! সবকয়টাই মাথা-গরম, বুদ্ধিছাড়া ইমোশনাল গাধা! আমার কথাটা যদি একটু কানে নিত, তাইলে বাড়ির দুই দুইটা মেয়ের ভাগ্যে এমন করে জুতার-বাড়ি পড়ে! এমন করে হার খায়, মন সোনার টুকরা দুই দুইটা মেয়ে!
কোন সোনার টুকরা মেয়েদুটার কথা বলছি? একটা হচ্ছে আমার মেজো বুবু, অন্যটা এই আমি। বাড়ির ছোটোজন।
গত দুই সপ্তাহ ধরে একবার আমাদের দুইবোনের কপাল পুড়ে যাওয়ার রাগে আমি একদিকে দাপিয়েছি, একবার বাড়ির বড়োদের বেকুব চলা-চলতি আর আহাম্মকি কীর্তিকে ঘৃণা করে করে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে পেরেশান হয়েছি!
আমাদের দুইবোনের কপাল পুড়েছে যার কারণে, সে আমাদের বড়ো ভাইয়া। পাড়ায়, লোকসমাজে, বড়োলোক-গরিব- সব আত্মীয়কুটুমদের কাছে আমাদের যে মুখ উঁচিয়ে চলার অবস্থাটা নাই- তার কারণ এই বড়োভাইয়া। আরেক কারণ- এই বাড়ির মুরুব্বিদের ঠেঁটামি। সবাই হাসে আমাদের নিয়ে। সেই হাসি দেখতে দেখতে, নিজেদের নিয়ে শরম পেতে পেতে, সেই ছোটোকাল থেকে আমার খালি মনে হয়েছে,বড়ো ভাইয়া মইরা যায় না ক্যান! উয়ে মরুক! মরুক!
কিন্তু ওর মরার কোনো নমুনা দেখা যায় নাই কোনো সময়।
তখন বারে বারে খালি মনে হয়েছে,ওরে তবে আমরা লুকায়ে রাখি! মানুষেরা যেন ওরে দেখতে না পায়! তাইলেই তো আর ঝামেলা থাকে না!
সেই চিন্তা নিয়ে আমি কোন ছোটোকাল থেকে কত কত কতবার বলেছি, কত কতবার আমি বলে আসছি যে, বড়ো ভাইয়ারে লুকায়ে রাখি আমরা? একটা কোনো ঘরে, নাইলে একটা কোনো ফ্লোরে লুকায়ে রাখি?
অনেক যত্ন করব ওরে- অনেক অনেক যত্ন করব- কিন্তু এই এখনকার মতো এমন খোলা চলাচলতি না করুক সে?
আমাদের পাঁচতলা বাড়ি। মস্ত এক ইউনিটের এই বাড়ি। তার পাঁচতলা ভাড়া না দেই আমরা? ওইখানে বড়ো ভাইয়ারে বসত করাই? তারপর মেইন দরোজাটা বাইরে থেকে তালা দিয়ে রাখি? ওরে সামাল দেওয়ার জন্য তো কাজের লোক আছে। সেও থাকুক ওর সাথে ওই ফ্লোরে।
আর, বড়ো বুবু তো আছেই তার চোখের মণি, কলজার টুকরা ভাইয়ের দেখভাল করার জন্য। সঙ্গে নাইলে আমিও থাকলাম- টুটকা-ছাটকা। থাকুক বড়োভাইয়া লোকের চোখের আড়ালে। তাইলেই তো আর লোকে কিছু দেখতে পারছে না- ওর ব্যাপারগুলা।
ওইটাই করি না কেন আমরা?
কত যে বললাম আমি, কত যে চেঁচালাম; কিন্তু কে শোনে কার কথা! উপরন্তু হলো এই ব্যাপার যে, বুবু বেদম কান্দন শুরু করল সেই কথা শুনে।
কান্দে আর হিক্কা তুলে তুলে আমারে জিজ্ঞেস করে; আধা মরাটারে আরো বেদনা দিতে হইবো! এইটা কী কলি তুই,ছন্দা? উয়ে আমাগো ভাই না? অরে বন্দি কইরা থুইয়া আমরা কোন পরানে বাঁচমু?
বাপ রে বাপ! একটা বুদ্ধি দিছি না যেন কোন কুকর্ম করে ফেলেছি আমি! যেন আমি খুব একটা খুনি বদমাশ! আরে আমি তো সকলের ভালাইয়ের জন্যই বলছি।
‘না না না! এমুন কয় না! এমুন কতা কয় না! আল্লায় নারাজ হইবো! এইটা তোমার ভাই! ভাই রে এমুন কইলে আল্লায় গজব দিবো আমাগো! খবরদার! আর কোনো সোম এটি য্যান না হুনি, মাইয়া!’ আম্মা এই প্রকারে নরমে-গরমে কত ওয়াজ যে করতে থাকল তখন!
আর আব্বা! আমার কথাটা বারেবারে এমন হেসে উড়ায়ে দিতে থাকল- যেন আমি একটা চরম না-বুঝ পোলাপান। আগুন-পানি কিচ্ছু বুঝি না কি না, তাই এমন বেআন্দাজের কথাটা বলে ফেলেছি!
এই বাড়ির মানুষগুলা কী বেকুব রে আল্লা! বুড়া-বাচ্চা সকলে এমন আক্কলছাড়া ক্যান! আল্লা!
বোঝ এখন নিজেদের পাগল রে আজাইরা দরদ দেখানোর ফল কী হয়!
আমরা আমাদের ভাইকে বলি অ্যাবনরমাল। কিন্তু লোকে বলে যে, পাগল। একডাকে বলে যে, ইনজিনিয়ার সাবের বড়ো পোলাটা পাগল।
সেই এবনরমাল ছেলেটা আমার আব্বার জানের জান, প্রাণভোমরা, বেঁচে থাকার একমাত্র লাঠি। আশ্চর্য আমার আব্বা! আশ্চর্য আমার বড়ো বুবু! তারও প্রাণের প্রাণ, রাতের ঘুম-তার পিঠাপিঠির এই ভাই। তারে সে মুখে তুলে খাওয়ায়। গোসল করায় নিজ হাতে। ঘুমানোর সময় পাশে বসে থাকে। আর, মার খায়।
আম্মা আব্বা তো নিত্যিই মার খায় ওর হাতে। আমরাও খাই। ওরে যে দেখশোন করে, সে খায়। আর বুবু! সে তো বেদম খায়। বুবুর লম্বা চুল ধরে হ্যাঁচকা টান দিতে দিতে ওরে মাটিতে ফেলে দিয়ে, তবে শান্তি আসে এই বদমাশটার মাথায়।
এই মারধরের কারবারটা যে কখন ও শুরু করবে, সে কথা কেউ বলতে পারে না। যখন-তখন তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, যখন তখন ঘরের সকলরে তার মার দেওয়ার ইচ্ছা দেখা দেয়। মার তো দেয়ই দেয়,সঙ্গে আবার জোরে জোরে চিৎকারও দিতে থাকে। খুব বাঘা গঙগঙ চিৎকার। কানের পর্দা ফাটায়ে দেওয়ার মতো ধারালো চিৎকার!
সারাদিন যেমন-তেমন প্রতিদিন সকালে আব্বার অফিস যাওয়ার সময়েই মারামারি শুরু করার দিকে ওর ঝোঁকটা ওঠে বেশিরকম! যেই দেখে গেটের বাইরে আব্বার জিপ হর্ন দিয়ে উঠেছে,ওর গোঙানি শুরু হয়ে যায়। যেই দেখে আব্বার বাইরে যাওয়ার শার্ট পরে নিয়েছে, অমনি একটা ছুঁতা ধরে আব্বা শার্টটা পিছন থেকে মুচড়ে ধরে, তারপর চিল্লানি শুরু করে। না না না না না! থা থা থা!
আরে! আব্বা অফিস ফেলে বাসায় বসে থাকবে কেমনে! দুনিয়া কি ওর ইচ্ছায় চলবে নাকি!
সেই না না না-থা থা থা-চিৎকারের সকালে, রোজ, যে-ই কি না ওকে সরাতে আসুক; তারেই ধাক্কা-গুঁতা মেরে ফেলে দিয়ে আবার আব্বার শার্ট মুচড়ে ধরে চিল্লানি শুরু করে সে।
নিত্য কর্মদিবসের সকাল এইভাবে যায় আমাদের।
কোনো কোনো দিন আমাদের কপাল ভালো হলে, ওরে কোনো একটা ঘরে আটকে ফেলতে পারে কাজের ছেলেটা। তখন আব্বা হয়তো সুস্থির হালে রওনা দিতে পারে। কিন্তু তখন অন্য শরমের ব্যাপারটা ঘটে! তখন বন্ধ দরোজার পাল্লায় ঘুষির ওপরে ঘুষি দিয়ে, লাত্থি আর ধাক্কা দিয়ে দিয়ে পুরা পাড়াকে কাঁপায়ে শেষ করে সে। কী শরম!
তার বাদে দরোজা খুলে দাও,আর গুষ্টির সব কয়জন ধুম মার খাও। হায় হায়!
উঠান পার হয়ে তবে আমাদের বাড়ির বাউন্ডারি। সেইখানে গেট। রোজ ওর চিৎকার আর গোঙানি শুরু হলেই, পাড়ার চ্যাংড়ারা-এমনকী বুইড়া বুইড়া বেটাগুলা সুদ্ধা, গেটের নানা ফাঁক-ফোকড় দিয়ে ফুচকি দেওয়া শুরু করে।
আরে, একটা বাড়ির অ্যাবনরমাল পোলাটা বাড়ির মানুষদের জ্বালা-যাতনা দিচ্ছে, সেইটা দেখার জন্য তোরা এমন কুত্তা খাইয়া পাগল হস ক্যান রে খারাপের গুষ্টিরা?
এই কারণেই না আমি এত বলি যে, বড়ো ভাইয়ারে পাঁচতলায় আটক রাখা হোক? কে কানে নেয় সেই কথা!
এই যে কানে নেয় না কথাটা, তার ফল কিন্তু হাতে হাতে পায় এই বাড়ির মাথারা।
অনেক রকমেই পায়, তবে সেইবার পায় খুব জোররকমে। ওই যে, যেইবার আমি ক্লাস টেনে পড়ি, ওই যে আব্বা যখন বেঁচে; তখন।
মেজোবুবু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ইকনমিক্স। বেশ পোক্ত রেজাল্ট করার বাই আছে কি না এই বাড়ির মাথা-নষ্ট বাচ্চাগুলার, মেজো বুবুও খুব তেজি রেজাল্ট করে অনার্সে।
মেজোবুবুর মুখ কচি নিমপাতার মতন ঢলঢল শ্রীমাখা। ওর সেই তেজালো রেজাল্ট আর সেই নিমপাতা বরন মুখের মায়ায় পড়ে যায় বুলা আপার বড়ো ভাইয়ের বন্ধু।
তো সম্বন্ধ হতে তো কোনো সমস্যা দেখে না কেউ! বুলা আপাই ঘটকালি চালায়। দিনতারিখ ধার্য করার একটু আগে পাত্রের ময়মুরুব্বিদের মনে হয় যে, অড়শিপড়শির কাছ থেকেও মেয়ের বাড়ির বিষয়ে খোঁজ-খবরটা নেওয়া ভালো।
তারা খোঁজ নিতে যায়, আর পাড়া-পড়শিরাও নিজদের দিল উজাড় করে- আমাদের খবর তন্ন তন্ন করে জানায়ে দিতে কোনো সংকোচ করে না।
তারা বলে যে, কে কয় অই বাড়ির বড়ো পোলাটাই একলা পাগল? পাগল সবকয়টাই! তবে তফা এই, বড়ো পোলাটা পুরা বচ্ছরই পাগল থাকে। আর বাড়ির অন্য বোন-ভাইগুলা পাগল থাকে বচ্ছরে তিনমাস করে। অন্যগুলা পাগল থাকে খালি শীতের দিনে।
অমন মওসুমি পাগল মেয়েরে বউ করে কেমনে ঘরে নেবে মেরিন ইনজিনিয়ার ছেলের মায়ে-বাপে! তারা আর আগায় না।
বিষয়টা গোপন থাকে না। আমাদের বাড়ি পর্যন্ত ধমাধম পৌঁছে যায়। বুলা আপা লজ্জায় আমাদের বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেয়।
‘আল্লায় বাছাইছে যে এমুন ছোটোলোকেগো লগে সম্বন্ধ অয় নাই! পিছা মারি এমুন কুস্বভাবের মাইনষের গুষ্টিরে!’ আম্মা গজগজাতে থাকে।
মেজো বুবু জোর গলা করে বলতে থাকে, এমুন ছোটোলোকের কপালে মুইড়া পিছা!
আমি কিন্তু ওর চোখের কোণে এক ছলক- এই সামান্য এক ছলক-পানি ছল্লাত করে কেঁপে যেতে দেখি।
দেখে,অপমানে কষ্টে আমার গলার ভিতরে-আমার মাথার ভিতরের কোন গহিনে- কেমন আগুন যে জ্ব্লে ওঠে! উফর! ভয়ঙ্কর দগদগা আগুন!
আমার তখন কী যে হয়! আব্বার ঘরে পরার স্যান্ডেলের একপাটি হাতে নিয়ে আমি দৌড়ে গিয়ে বড়ো ভাইয়াকে মারা শুরু করি। মরস না ক্যান তুই! মরস না ক্যান! মর মর! তুই আমাগো কেউইরে শান্তিতে থাকতে দিবি না তো! মর মর!
আর সেইসময় দেখ কী আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে! অন্য সময়ে বড়ো ভাইয়ার সঙ্গে শক্তিতে আমরা কেউ পারি না; কিন্তু আমি যখন মারতে থাকি তখন বড়োভাইয়া ঠায় দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে আমার হাতে মার খেতে থাকে।
আমাকে পালটা মারতে পারে না ও। মার খেতে থাকে ও, আর কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে থাকে- আব্বা আব্বা আব্বা!
মারতে মারতে আমার হাতেরা বলতে থাকে, কাকে মারি আমি! কাকে! যার মানসিক বয়স দেড় বছরের বেশি কোনোদিন হবে না, তাকে মারি আমি!
কাকে মারি!
ও নিজে থেকে মারতে পারে, সেই বুদ্ধিটুক ওর আছে। কিন্তু পালটা মার যে দেওয়া যায়, সেটা বোঝার বুদ্ধি যার কখনো হবে না-তাকে মারি!
রাগ থেমে গিয়ে তারপর আমার কী কান্দন যে পায়! আহা রে আমাদের কপাল! আমাদের জন্যই খালি এত এমন যন্ত্রণা লিখলা ক্যান!
সেইবারের সেই বিষয় তো গেল এমনে সেমনে, কিন্তু আমার অন্তর সেই যে কেমন একটা চিপা খেলো সেই চিপা আর ছুটল না! গোষ্ঠীতে কোনো মেয়ের কোনোকালে মেরিন ইনজিনিয়ারের সাথে বিয়ে হয় নাই! আমাদের বাড়িতে হতে পারত!
হলো না যে, সে তো আমাদের খুঁতের কারণে! তাহলে এই যে আমার পাগল ভাই- সে আমাদের মস্ত এক খুঁত তো? সেই খুঁতরে যে ঢেকেঢুকে রাখবে- তেমন বুঝদার যে আমার বাড়ির বড়োরা নয়! নয়।
ঠিক আছে-আমিই তাইলে সমঝে চলব!
আনব না বাসায় কোনো বন্ধু-বান্ধব! কাউরে না! যা কাজ সব বাইরে বাইরে সেরে আসব! তাতে যে যা খুশি ভাবুক গা,আমার কী! আমার ইজ্জত তো বাঁচবে!
ইজ্জত বাঁচাবার কায়দা ঠিক করে সারি নাই, তার মধ্যেই বাড়িতে কঠিন কঠিন ঝড় কঠিন কঠিন যন্ত্রণার ঝাপটা বাড়ি এসে পড়া শুরু হয়। আব্বা চলে যান হঠাৎ ।
বড়ো বুবু শক্ত হাতে সবটা সামলে নেয় ঠিক, কিন্তু বড়ো ভাইয়ার জটিলতাটা তো রয়ে যায়ই সংসারে।
কিন্তু আমি তার কী করব! আমারে আমার ভালোমন্দ সামলাতে হবে না?
এসএসসি-তে এই যে আমার দুর্দান্ত রেজাল্ট্- পাঁচটা লেটারসহ স্টার মার্ক্স, আর গণিতে দেখ ৯৮! বড়ো বুবু একদিকে কাঁদে তো টুটুল ভাইয়ার মুখ আরেকদিকে কালোকুষ্টি ঘুটঘুটা আন্ধা হয়ে যেতে থাকে! আহা! আব্বা দেখে যেতে পারত তো!
আমার কিন্তু আর তখন বুবুর মুখ কী টুটুল ভাইয়ার চোখের দিকে তাকাবার ফুরসত নেই! কিছুমাত্র নেই।
এসএসসি-র আগে ম্যাথের কোচিং করতে গিয়ে- আমার না মাথা ও চোখ- পুরো উতলা,সুখ-ফুরফুরা,উড়াধুরা- কেমনজানি কিছু একটা হয়ে গেছে! কেমন যেন পাগল পাগল সুখ সুখ দশা হয়ে গেছে আমার!
আমার দেখা হয়েছে আবির জুবায়ের হাসানের সঙ্গে!
এমন জটিল রকমের সুন্দর আর স্মার্ট একটা নাম- কেমনে হতে পারে আমার বয়সি একজনের! তাহলে তার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড্ না জানি কেমন স্মাট্র্ !
এই যে আমার নাম ইশরাত জাহান। এইটা একটা সাদামাটা নাম। ডাকনাম কি না ছন্দা। ওই যে আমার বান্ধবী শাহনাজ পারভীন পলি- সেইটাও তো একটা কোনোরকম নাম।
আরো আরো যত চেনাশোনা- আমাদের ব্যাচের যত ছেলে- তাদের নাম দেখ- মোহাম্মদ রশিদ উদ্দিন বা নোমান আহমেদ; নাইলে মো. ইকবাল হোসেন, নাইলে গোলাম ফারুক নাইলে আমিরুল ইসলাম। এই তো এমন সব নাম! একজনের শুধু ভিন্ন রকম নাম- অসাধারণ নাম- আবির জুবায়ের হাসান।
আমার ভালো লাগে সেই নাম। খুব খুব ভালো। আমার ভালো লাগে তাকে। খুব খুব ভালো। গভর্মেন্ট ল্যাব থেকে এসএসসি তার। যাচ্ছে ঢাকা কলেজে। সেও স্টার মার্ক্স পাওয়া, সেও তুখোড়। সকলে আমাকেও তুখোড় বলে। কিন্তু আমার কেমন জানি কাঁচুমাচু লাগে! আমার বড়োভাই যে এবনরমাল, আমার কি তা মনে নাই?
তখন মনে হতে থাকে যেন আবির জুবায়ের হাসানের কাছে আমি কেউ নই! কিছু নই! কিছু না!
আবির জুবায়ের হাসান তো ঢাকা কলেজে যাচ্ছে! আমাকে তো তার কাছাকাছি কোনো একটা কলেজে থাকতে হবে, তাই না? যাতে যখন-তখন নিউ মার্কেটে ঢুঁ দেয়ার ছুঁতো করে করে, তার সাথে দেখা করে নিতে পারি!
রোজ দেখা আমাকে করতে হবেই! নইলে দিনগুলা আর রাতগুলা পানসা পানসা লাগবে! ভালো লাগবে না ভালো লাগবে না- এই পড়ালেখা ! এই জীবনটা একটুও ভালো থাকবে না!
আমি তাহলে বদরুননেসায় ভর্তি হব। ওইখানেই পড়ব। তবেই কাছাকাছি থাকাটা হবে। এই কথা মাথায় রেখে হলিক্রসর ভর্তি পরীক্ষা আমি এমন বাজে, এমন যা-তা করে দিয়ে আসি যে, আমি ডাহা ফেল।
বাড়ির সকলে পুরা ফিট-লাগা হয়ে পড়ে থাকে দেড়-দুইদিন।
‘ওরা ফেল করাইলো ক্যান-তার আমি কি জানি? অগো ভর্তি নেওনের বিশেষ কোনো গোলমাইল্যা নিয়ম থাকতে পারে!’ আমি ধুম গলাবাজি করতে থাকি; ‘ঠিক আছে, কালকা গিয়া বদরুননেসার ফরম লইয়া আমু নে। বদরুননেসায় আমার হইবোই।’
‘এমন দুর্দান্ত, যার রেজাল্ট, সে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে না ক্যামনে!’ আম্মা কেমনে জানি আমার শয়তানিটারে আন্দাজ করে ফেলে। ‘খবরদার কইলাম- অরে অর অই পরানের কলেজে যাইতে দিস না! কিছু গ্যানজাম আছে- লাগতাছে!’
হলো আমার আবির জুবায়ের হাসানের সঙ্গে নিত্য দেখা হওয়ার কপাল? হলো না! ভিখারুননেসা থেকে কি আর প্রতিটা দিন অত দূর নিউমার্কেটে যাওয়ার সুবিধা হয়!
এই একটু খানিক দেখা, এই একটু খানিক ফোনে কথা, এমনে এমনে এইচএসসি শেষ। আর ওদিকে দেখ-আবির জুবায়ের হাসানের জন্য আমার কলজের ভেতরের ছলকানি একটু যদি কমে! দিনে দিনে সেটা কেবল বেড়ে উঠছে বেড়ে উঠছে!
তো,ও তো বুয়েটে ঢুকল- আমি তবে এইবার তার কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থাটা পোক্ত্ করি? ওটা করবই আমি!
তখন আমি করি কী- আব্বার শেষ সাধটা পূরণের জন্য আমার ভেতরে থাকা তাগাদাটাকে আমি মন থেকে ধাক্কায়ে বার করে দেই। আব্বা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তারি পড়ি। কিন্তু ওটা পড়তে কেমনে যাব?
কোন মেডিক্যাল কলেজে চান্স পাব, কে জানে! তাইলে ঢাকার বাইরে তো যেতে হবেই তখন নির্ঘাত! তাইলে কেমনে হবে?
না না এখন তো বড়ো হয়েছি দুইজন! এখন নিবিড় রকম দেখা হওয়া লাগবেই- চা খাওয়া লাগবেই, বেইলি রোডে ঘোরা লাগবেই!
ওহ! আবির জুবায়ের হাসান! তুমি যদি জানতে- যদি জানতে প্রিয়-আমি কতটা পাগলরকম তোমাকে চাই! কতটা বিপুলরকম!
কী জানি সে বোঝে কি না! এই তো নিত্য-টিএসসিতে দেখা হচ্ছে- নাইলে আমি যাচ্ছি বুয়েটে-চা খাচ্ছি-কথা হচ্ছে-কাটছে দারুণ দারুণ সময়! এই তো বছর পেরুচ্ছে প্রায়!
কিন্তু একটা বিষয় দেখে আজকাল আমার মন- থেকে থেকে কেবল - বিষ জরজর হয়ে যেতে থাকে! খুব তেতো খুব বিশ্রী লাগতে থাকে আমার! রাতদিন ভরে খারাপ লাগতে থাকে!
আমার ভালো লাগে না কিছু! কিচ্ছু ভালো লাগে না।
কাজর্ন হলরে ভালো লাগে না। মাইক্রোবায়োলজির বিষয়-আশয় ভালো লাগে না-পড়া ভালো লাগে না-বাড়িতে ফিরতে ভালো লাগে না।
ভালো লাগে না তোমার কারণে-আবীর জুবায়ের হাসান! এ তোমার কেমন চলন-বলন! যেমন প্রাণখুলে হেসে আমার সঙ্গে কথা বল তুমি, যেমন আন্তরিক মনে আমাকে বাসার কাছাকাছি এগিয়ে দিয়ে আস; ঠিক একইরকম উষ্ণ দরাজ প্রাণে তুমি পলিকেও বাসায় পৌঁছে দিতে যাও।
তবে কি আমি তোমার জন্য স্পেশাল কেউ নই? তবে কি পলি স্পেশাল কেউ? আমি কেবল ভালো এক বন্ধু! ওহ খোদা! আমি মরে যাব! আমি মরে যাব! আবির জুবায়ের হাসান! আমি মরে যাব!
তবে এই মরে যাওয়া-যাওয়ির বেদনা ও অসুখটা নিয়ে বেশিক্ষণ আর পড়ে থাকতে পারি কই! আবার আমাকে মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হয়।
তবে এইবার পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে শুনে যেতে হয় যে, এইবারও যদি কোনোরকম শয়তানি করে আসি-যদি চান্স না পাওয়ার ব্যাপারটা আবার ঘটে-তবে বড়োভাইয়াকে মেরে, তারপর বাড়ির প্রতিজনে মরবে! এবং মরবে বটি দিয়ে গলা কেটে কেটে।
কথাটা বিশ্বাস করতাম না,কিন্তু আচমকা কেমনে জানি বড়ো বুবুর চোখে আমার নজর গিয়ে পড়ে। সেই চাউনিতে কেমন একরকম অন্ধকার, কেমন একরকম ধারালো দাও-য়ের মতন ঝিলিক-দেওয়া কীসব জানি একদম নিঃশব্দে গর্জে উঠতে দেখি আমি।
না না! ভুল দেখি নাই! ঠিক দেখেছি। একদম ঠিক দেখেছি! ভয়ে তখন আমার কলজায় এমন ধাক্কা লাগে যে, আর কোনোরকম বাঁদরামি করার সাহসে কুলায় না আমার!
ব্যস! যাও এখন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে পড়া করতে। পলি থাকল ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, বুয়েটের কোল ঘেঁষে; আর আমি কোথায়?
বহু বহু দূরে!
জানি আমি আবির জুবায়ের হাসান- আমাকে তোমার মনেও পড়বে না!
কিন্তু মনে পড়ে তার! পলি ও বুয়েটের আমাদের কমন সব বন্ধুদের নিয়ে প্রায় প্রায় আবির জুবায়ের হাসান ময়মনসিংহে চলে আসতে ভোলে না। কখনো কখনো একাও আসে।
আমার মন আশায় ও সুখে ও আহ্লাদে ছটফটাতে থাকে। কেবল ছটফটাতে থাকে। আমি তার চোখে দেখি মুগ্ধতা! আমার জন্য মুগ্ধতা! কিন্তু মুখে তো কিছুই বলে না সে। কিচ্ছু তো বলে না! কেন বলে না? কবে বলবে? আর কবে বলবে!
আমি তো বছর নষ্ট করে ওদের সকলের জুনিয়র হয়ে গেছি। পলি সেশনজটে আটকা। কিন্তু আবির জুবায়ের হাসান পুরাদস্তুর আর্কিটেক্ট।
দুর্দান্ত সেলারির এক কাজে ঢুকে দেশ মাতিয়ে ফেলছে প্রায় সে! আর, কী চৌকস যে তাকে দেখতে লাগে- পাস করে বেরুবার পর! এখন তাকে শুধু একনজর দেখতে পেলেই আমার পৃথিবীটা কেঁপে ওঠে। সেই দেখে-ওঠার সুখ আর শেষ হতে চায় না-চায় না! কী কা- এটা!
আমি কি আরো বেশি করে তার প্রেমে পড়ে গেছি! হায় রে! সে তো চেয়েও দেখে না আমাকে!
এইভাবে চলছিল- এই তো একই রকম চলছিল!
সেই ১৯৯২ থেকে এই যে এখন এটা ২০০০ সাল! এই এতকাল ধরে-এই যে আমি বিভোর হয়ে আছি তাকে দিয়ে। তাকে ভেবে ভেবে আর কারো দিকে তাকাবার ফুরসতসুদ্ধ হলো না আমার! অথচ দেখ, সে আমাকে যেন দেখেও দেখল না!
আমাকে নিবিড়রকম করে চেয়ে দেখার ফুরসতও হলো না তার। এ কেমন বিষয়! এটা কী!
এদিকে বাড়িতে যদি একজনও কেউ আমার বিয়ের বিষয়ে কোনো একটা কথা বলে! কেউ বলে না! বললে না হয় তখন আমি ওদের ঠেলতে পারতাম- যাও তোমরা! আবির জুবায়ের হাসানদের বাড়িতে কোনো ছুতায় প্রস্তাব পাঠাও!
এই কথাটা বলার তো সুযোগটা পেতাম! কোনো সুযোগ পাই না।
এখনো কি মেয়ের বাড়ি থেকে পাত্রের বাড়িতে প্রস্তাব পাঠানোর দিন আসে নাই? না যদি এসে থাকে তো অসুবিধা কী! আমরা শুরু করি। আস্তে আস্তে না হয় আর সকলে শুরু করবে!
কিন্তু কোথায় বিয়ে কোথায় কী! আমাকে বাইরে পড়তে পাঠানোর জন্যই এরা লাফিয়ে বাঁচে না! বিয়ের কথা মনে করার সময় কই এদের! মায়া-দরদ বলতে আছে নাকি এইগুলার? না জানে প্রেমের কাকুতি ও বাসনার কথা?
ইন্টার্ন শিপ শেষ করে বাসায় এসে সারি নাই,তার মধ্যে এক দুপুরে ল্যান্ড ফোনে আবির জুবায়ের হাসান! আমাদের আগামীকালই তো দেখা হওয়ার কথা-এই তো সকাল করেই সেটা ঠিক করলাম দুজনে।
আজ তবে এই বিকালেই দেখা করার কোন দরকার পড়ল! আবির জুবায়ের হাসান সেটা ভেঙে বলে না।
বলে, ‘ওহ! ছন্দা! এতো ক্রিটিক্যাল হয়ো না তো প্লিজ! আমি তোমার বাসায় আসতে চাই! আসতে তো পারি? ছন্দা! প্লিজ, অ্যালাও মি! এতগুলা বছরে ইউ নেভার ইনভাইট মি টু কাম! এটা হইলো কিছু?’
আমাদের বাড়িতে! আমাদের বাড়িতে কেমনে কাউরে আনব! আমার একটা অ্যাবনরমাল ভাই আছে না? সে কার সঙ্গে কখন কেমন আচরণ করবে- কেউ কি বলতে পারে? না না! বাসায় আসার কোনো দরকার নাই তোমার! আবির জুবায়ের হাসান-আইসো না তুমি-আমাগো বাড়িত! আইসো না! আমি চাই না! চাই না!
এই কথা আমার ভিতরে বলক দিয়ে উঠতে থাকে ঠিকই, কিন্তু আমি সেইটা মুখে বলতে পারি না। আমি আবির জুবায়ের হাসানরে আসতে মানা করতে পারি না।
আসে সে। আমি কাজের ছেলেটাকে খুব করে বুঝায়ে রাখি যে, সে যেন কোনোমতেই বড়ো ভাইয়ারে বসার ঘরে যেতে না দেয়। কিছুতেই যেন না দেয়।
একবার ইচ্ছা হয় যে বলি, আজকার বিকালটার জন্য বড়ো ভাইয়ারে পাঁচতলায় বন্দি করে রাখলে হয় না? শুধু এই বিকালটা?
পরে মনে হয়, থাক। কাজের ছেলেটাই পারবে ওরে আটকানি দিয়ে রাখতে! আর আম্মা তো আছে। বড়ো বুবু তো ভাইয়ার কদমে কদমেই আছে। কাজেই সামলানো যাবে ওরে।
হায় হায়! কিসের কী! আবির জুবায়ের হাসান কেবল সিঙ্গাড়ার প্লেটটা হাতে নিয়েছে, তখন হুমদাম পায়ে বসার ঘরে ঢোকে বড়ো ভাইয়া। তারপর একঝটকা দিয়ে সিঙ্গাড়ার প্লেটটা কেড়ে নেয় মেহমানের হাত থেকে। তারপর সিঙ্গাড়াগুলাকে বুকের সঙ্গে লেপটে নিয়ে চিল্লাতে থাকে-আমা আমা আমা আমা-যা যা যা যা-আমা!
সেই বিকালের ঠিক দুদিন পরের সন্ধ্যায়, আমার খুব বান্ধবী পলির-খুশিী আর উল্লাসের ধাক্কায়, আমাদের ফোনটা ঝনঝনাতে থাকে ঝনঝনাতে থাকে!
আবির জুবায়ের হাসানের সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছে যে শাহনাজ পারভীন পলির! এমন তুমুল খুশির কালে এমন জোরেই তো বেজে উঠতে হয়-সকল কিছুকে! দুই সপ্তাহ পরে পানচিনির দিন ঠিক করা হয়েছে। পান-চিনির পরদিনই হবে আকদ! সবকিছুতেই ছন্দা যদি পাশে না থাকে, পলির একটুও ভালো লাগবে না! একটুও না।
ছন্দা কলকলিয়ে ওঠে! খুব কলকলিয়ে ওঠে। কিভাবে অমন কলকলিয়ে উঠতে পারে ও? ‘কনগ্রাটস দোস্ত! কনগ্রাটস! থাকমু না মানে? থাকমুই! চিন্তা করিস না! আছি।’
তার বাদে একটু রাত করে আরেকটা ফোন আসে। আমার আরেক বন্ধু গোলাম সারোয়ার সবুজের ফোন।
‘কী রে?’
‘আবিররা না আমাদের দুনিয়ার মানুষ না রে ছন্দা!’
‘ক্যান? কী হইছে?’
‘বড়ো ভাইয়া অসুস্থ্ দেখে আবিরের আব্বা আম্মা তোর সঙ্গে সম্বন্ধ করতে কড়া নিষেধ দিছে! আবির সেইটা মানছেও। সেই কারণে পলি। বুঝলি?’
বোঝে নাই নাকি ছন্দা? বুঝেছে তো! সবুজ ভেঙে না জানালেও বুঝতে পারত সে! ওটা বোঝা যায়-বোঝা যায়!
আহ বড়ো ভাইয়া! তুই মর তুই মর! মর! আমার জীবনটাও তুই মিসমার কইরা দিলি! তুই মরস না ক্যান! মর! আবির জুবায়ের হাসান-এইভাবে আমাকে শাস্তিটা দিয়ো না! দিয়ো না!
এই বিলাপ দন্ডে দন্ডে অন্তরে আছড়ে পড়েছে একদিকে; আরেকদিকে চলেছি নড়েছি, স্বাভাবিক দেখানোর বেদিশা চেষ্টা করে চলেছি- এই তো আজকে দুই সপ্তাহ ধরে!
তারপর, এই তো সেই পানচিনির সন্ধ্যাটা এল। এই তো আজকে।
বিকালে আবির জুবায়ের হাসানদের বাড়ি থেকে লোকজন এসে পলিকে নাকফুল, কানফুল পরিয়ে রেখে গেছে। পানচিনিতে কনেকে এমনই করার বিধি!
আমার জন্য এলে-নাকফুলটা কোনো কাজেই লাগত না! আমার নাক-বেঁধানোই তো হয় নাই কোনোকালে! পলির নাকে দারুণ মানাল তো জিনিসটা! নাকফুলটার নকশাটা কী দারুণ!
সন্ধ্যাভরে, পলিদের বাড়িতে, সকল কিছুর মধ্যে থেকেও কেবল আমার মাথার ভিতরে আর আমার চোখের সামনে ওই নাকফুলের নকশাটা ঘুরেফিরে আসতে থাকে। নড়তে চড়তে থাকে, তারপর ভ্যানিস হয়ে যেতে থাকে। আবার আসতে থাকে। আমি কেবল ওইটাকেই দেখতে পেতে থাকি! ওইটাকেই দেখতে পেতে থাকি!
আর কিছু শুনতে পাই না, আর কোনো কিছু দেখতেও পাই না। আশ্চর্য তো!
ওইটাকে দেখতে দেখতেই একসময় সকলের সঙ্গে পাত্রপক্ষের বাসায় পৌঁছাই। একটুখানি মজাও করি আবির জুবায়ের হাসানের সঙ্গে। তারপর থির হয়ে বসেও যাই একটা কোণে! আর চোখের সামনে দেখতে পেতে থাকি-একটা অচিন নাকফুলের নকশাকে। ওইই দেখতে থাকি একা একা একা!
সেই নকশা-বিভোর থাকার কারণেই-আমি আর খেয়াল করে উঠতে পারি না যে, পাত্র্ পক্ষের বাসার পানচিনির আসরে কখন, কোন কারণে কনের বাড়ির মেয়েদের হাসি-হুল্লোড় আচমকা বন্ধ হয়ে গেছে!
ঠাহর করে উঠতে পারি না যে, কোন কারণে কেমন একটা হিম পিচ্ছিল স্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়ে কনেপক্ষের সকলের মুখে ও অন্তরে বিস্ফারিত চোখে তারা কী দেখে অমন শিউরে উঠছে?
তারা শিউরে উঠছে-একটা ন্যাংটো জোয়ান বেটাছেলেকে দেখে! আসরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেই ন্যাংটো জোয়ানটা। দাঁড়িয়ে তো আছেই, সেইসঙ্গে সকলকে জিজ্ঞেসও করছে- পেন কো? পেন কো? আমালতা? কো?
কে ওটা? এই পাগলটা কে!
আবির জুবায়ের হাসানের বড়োভাই ওটা। কল্লোল জুবায়েদ হাসান।
এমন পাগল-জন্মানোর বংশে পলির আব্বা মেয়ে দেবে? জীবনেও না! আর, কী খারাপ লোক এরা!
পলির আব্বার ব্লাডপ্রেসার নাকি রাগ-সীমা ছাড়া হয়ে যেতে থাকে দফায় দফায়!
কেমন খারাপ মানুষ! বড়ো ছেলেটা পাগল! কা- দেখ! সেই কথাটা বাপে-মায়ে ডাহা গোপন করে গেছে! কেমন ফ্রড হলে এমনটা করতে পারে লোকে! ছিঃ ছিঃ! ভীষণ ডেনজারাস তো এরা! এইসব চোট্টাদের সঙ্গে কিছুতেই সম্পর্ক করা যায় না। না! না!
পানচিনির আসরেই আবির জুবায়ের হাসান ও শাহনাজ পারভীন পলির বিয়ে ভেঙে যায়। এই তো আজকে সন্ধ্যায়।
এই যে এখন ক্রমশ রাত ঘন হচ্ছে। বাসার সবাই ঘুমে। আমারও তো ঘুমানো দরকার। ঘুমালেই ওই অস্থির দশাটা ধীরে থিতু হয়ে আসবে। আমি জানি তো!
তবে ঘুমানোর আগে আমার যে অনেকখানি কেঁদে নেয়াও দরকার। অনেক কান্না!
তারও আগে আমার যে ওই অবুঝ-নাবুঝ ভাইটাকে জানানো দরকার-আমিও ওরে ভালোবাসি! বাসার সকলের মতো আমিও ওরে ভালোবাসি!
এই যে, এই যে, এই নিরালা মধ্যরাত থেকে-এই যে জীবনে প্রথম-ওর জন্য আমার অন্তর দরদে কেঁপে উঠছে!।
বড়ো ভাইয়া, আমি তোরে মায়া করার শক্তিটা পাইছি রে! পাইছি ভাইয়া।
কিন্তু কেমন করে তোরে সেই কথাটা বোঝাব? কেমন করে? তোর ভাষা যে আমি শিখি নাই! বড়ো ভাইয়া!