মঙ্গলবার,২৫ Jun ২০১৯
হোম / ঈদসংখ্যা / মধুবাতা ঝতায়তে
০৬/১৬/২০১৬

মধুবাতা ঝতায়তে

- নবনীতা দেব সেন

পরিবেশ দিবস ৫ই জুন, বিশ্বসুদ্ধু আমরা সবাই সেই বিষয়ে অবগত আছি। কত সভা-সমিতি হয়, কম সেমিনার হয়, কত বই বেরোয়, আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিশারদেরা আসেন, পন্ডিতী বক্তৃতা দেন, খবরের কাগজে তা নিয়ে লেখালিখি হয়। কিন্তু, ঐ, আমাদের মনের বৈঠকখানাঘর পর্যন্তই তাঁদের আনাগোনা। প্রাণের অন্দরমহলে তাঁদের প্রবেশ ঘটে না। আমরা নির্বিকার সিগারেট খাই, আবর্জনা স্তূপাকার করি, যত্রতত্র মলমূত্র ও কফ পরিত্যাগ করি, গঙ্গায় শবদেহ ভাসাই পশু এবং নিঃসম্বল মানুষের, গাছ কেটে জঙ্গল সাফ করে ফেলি, প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করি, তদ্বারা পয়ঃপ্রণালী বুজিয়ে জলনিকাশের পথ বন্ধ করে ফেলি, ও বিবিধ রোগের আঁতড়ঘর বানাই নিজের শহরকে। মাছের ডিম, মাছের বাচ্চা ধরে ধরে খেয়ে ফেলি, জলাজমি, চাষের জমি, অম্লানবদনে সব পরিণত করছি বহুতল বসভূমিতে। যেখানে সোনার ফসল ফলে মানুষের অন্নকষ্ট দূর করত, সেই জমিতে স্বর্গচুম্বী সৌধ তুলে দম্ভ করি। এবার সেখানে সর্বত্র প্রাইভেট ডিপ টিউবওয়েল চাই, অসহায় মাটির নীচের জলস্তর কমতে কমতে এক সময়ে সেখানে জলকষ্ট দেখা দেয়। বিবিধ স্তরের, বিবিধ চরিত্রের আবর্জনা ও পশুর এবং মানুষের মৃতদেহের বিষে গঙ্গার পবিত্র জল পানের অযোগ্য, বহুবিধ রোগের আধার। আমরা বর্তমানের নেশায়, ভবিষ্যতের ক্ষতির দিকে চোখ-কান বুজে থাকি, নেশাতুরা যেমন ভবিষ্যতের ভাবনা করে নেশায় ডুবে থাকেন। আমাদের গোটা মনুষ্যসমাজই তো তাই। বুঝতেও চাই না এর কুফল কতদূর গড়াবে। আমাদের দুই বাংলারই এক দুরবস্থা। একদল মানুষের জীবনযুদ্ধ মরণের আগে শেষ হয় না, আরেকদল এই আমরা, অপ্রয়োজনে কোটি কোটি টাকার অযুত লক্ষ মোটর গাড়ি কিনে অপ্রস্তুত শহরের রাস্তা জ্যাম করি। পথচারীদের সর্বনাশ করি।

আদিগন্তহীন ডিজেল আর পেট্রোলের ধোঁয়ায় শহর অন্ধ, বিষ গ্যাসে শ্বাসের রোগী হয়ে পড়ছেন আবাল বৃদ্ধ শহরবাসী। আর শব্দদূষণের তো কোনো ওষুধই নেই। ২৪ ঘণ্টা শহরের মানুষের কানের কাছে স্বাভাবিক সহন শক্তির চেয়ে অনেক গুণ বেশি শব্দ গর্জাচ্ছে, বিভিন্ন যন্ত্রপাতির, আর বিচিত্র যানবাহনের শব্দে যখন তখন চমক লেগে কান্না উথলে উঠছে সদ্যোজাত শিশুর, কেঁপে উঠছি আমরা, ঘরে, বাইরে শব্দে জব্দ। বোমার আওয়াজও আর চেনা যায় না বোমা বলে। মানুষের শ্রবণশক্তি ক্রমশ ক্ষীণতর হয়ে চলেছে। আর মানুষের সহন শক্তিও। স্নায়ুরোগে বিবশ শহরের অজ¯্র মানুষ। প্রচ- ক্ষতিকর পরিবেশ মানুষের এই অবস্থার জন্য অনেকটাই দায়ী। ঘরে আশ্রয় না খুঁজে বাইরে আশ্রয় খুঁজতে বেরোয় শহরের মানুষ। কিন্তু বাইরের প্রতি কোনো দায়িত্ব বোধ করে না তারা। পরোক্ষে ক্ষয়-ক্ষতি হয় ঘরে বাইরে সমান। পাখিদেরই কি রক্ষে আছে? আমাদের বিনা তারের টেলিফোনের বৈদ্যুতিক ধাক্কায় তারা প্রাণ হরাচ্ছে। মরে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির কীতপতঙ্গ। ক্ষতি হচ্ছে প্রকৃতির সামঞ্জস্যের। সবই সভ্যতার অবদান। ‘পরশ’ এবং তারই মতো অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশকর্মীরা পরিশ্রম করেন, কিন্তু আমাদের অন্তর্জগৎ পরশ করে উঠতে পারেন কি? আমরা তাঁদের আলোচনা পড়ি, তাই নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু সচেতনতার শিক্ষাটুকু যত্ন করে জীবনের মধ্যে গ্রহণ করি না। তাদের চেষ্টা সব বিফলে যায়। আত্মহননকারী ‘সভ্যতা’ তার মোহিনী মায়ার ঊর্ণজালে আমাদের জড়িয়ে রাখছে, ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে। জেনেশুনে বিষ পান করলে কে তাকে বাঁচাবে।
কিন্তু মাঝে মঝে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে দেন একমাত্র আমাদের ধাত্রী, আমাদের জননী, এই ধরিত্রী। কখনো সুনামি, কখনো উষ্ণতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, মানুষের অশেষ দুর্গতি, আবার তার বিপরীত যন্ত্রণাও আছে, প্রবল ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে দুই বাংলার দরিদ্র অপ্রস্তুত মানুষ। কখনো বান ডাকছে, ফসল আর গ্রাম ভাসিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো খরায় ফেটে যাচ্ছে বসুমতীর বুক। অনবরত, ঘন ঘন, একের পর এক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। একটা সামাল দিতে-না দিতে অন্যটা আক্রমণ করছে আমাদের। অসময়ের প্রস্তুতি সেইভাবে কি নিতে পেরেছি আমরা? আমাদের একমাত্র আশ্রয় এই মাটির বাসটিকে কি আমরা যত্ন করে ধুয়েমুছে রেখেছি? সবাই মিলে জ্যোৎস্নারাতের পিকনিকে বেরিয়ে পড়েছি, ঘরের ঠিকানাও মনে নেই। জীবনের মূল উৎপাটিত করে আগায় জলসেচনের নামই বর্তমান শহুরে সভ্যতা, যে সভ্যতা নিয়ে আধুনিকতার গর্ব করি আমরা এপার বাংলা, ওপার বাংলায়। পদে পদে আমাদের আকাক্সক্ষা ধনী পাশ্চাত্যেও দেশগুলিকে হুবহু অনুকরণ করা, সেই স্পৃহা আপাতত মেটানো হচ্ছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পশ্চিমি জীবনযাত্রার ও সামাজিক অভ্যাসের অনুকরণ করে। কিন্তু ঐ বহিরঙ্গেরই অনুকরণ, বুকের ভিতরে অবধি পৌঁছোয়নি তার মন্ত্র। সাহেব তো বনিনি, ভিতরে আমরা সেই কাঠ-বাঙালিই রয়ে গিয়েছি, আলস্যেই খরচ করে ফেলি অধিকাংশ বোধ ও বুদ্ধি। এবং অমূল্য সময়। বাকিটুকু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে উড়ে যায়। পরিচিতিরি হাত ধরে, ঈর্ষায় ও পরশ্রীকাতরতায়। এখন বাঙালির চরিত্রে নতুন এক শত্রু এসে জুটেছে। হিংস্রতা। তার সঙ্গে বাইরে কিংবা ভিতরে, কিভাবে যে লড়তে হয় বাঙালি কোনো কালেই শিখল না। এই ব্যাপারে মোটামুটি বাংলার পূর্বে পশ্চিমে খুব একটা দূরত্ব নেই, যে নদীর পারেই থাকি না কেন, গঙ্গা হোক পদ্মা, আমরা তো বাঙালিই! অমনির রঙ্গেও ফারাক হবে না। পরিবেশের ভয়াবহতা নিয়ে আমরা সেমিনারে যতই দুর্ভাবিত হই না কেন, দুর্ভাগ্য এসে ধাক্কা দিয়ে আছাড় মেরে উলটেপালটে মৃত্যুর আঙিনায় না ছুঁড়ে ফেললে আমাদের চেতনা জাগ্রত হয় না। পি-প-ফি-শো আদর্শ বঙ্গচরিত্রের চিত্র। বড় দুর্যোগ এড়াতে হলে তা ঘটবার আগেই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয়। আমরা কি তা থাকি? আর কেমন করেই বা থাকব? আমাদের অত হিসেব চরিত্রে নেই। গণতান্ত্রিক দেশ মুক্তবাক হওয়া যদি প্রাণহানি ঘটায়, তবে তো খোলাখুলি বাক্যালাপ চলবে না কারুরই। কে বন্ধ, কে বন্ধু নয়, তুমি কেমন করে বুঝতে পারবে? তাহলে জীবনযাপনের কোনো বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে আমাদের। সব ক্ষেত্রেই সুবুদ্ধির পরাজয় ঘটেছে, আর হিংসার পসার বাড়ছে। নিরপরাধের শাস্তি আর অপরাধীর মুক্তি আমাদের চোখে, মনে সয়ে গিয়েছে। এই অসার বিচারব্যবস্থার জন্যে কিছুটা দায়িত্ব কি আমাদের নয়? শুধু তো শরীরের নয়, মনের পরিবেশও আমাদের বিষে জরজর।
কিছু সদর্থক কথা ভাবা যাক। সম্প্রতি দেখলুম, বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগের বদলে কাগজের ব্যবহার শুরু হয়েছে। কাগজ তৈরি মানে শত সহস্র গাছের মৃত্যু, তাই টাটকা কাগজ ব্যবহারের বদলে ব্যাগ তৈরি হচ্ছে সেই আগেরকার দিনের ঠোঙ্গা-তৈরির প্রণালীতে, পুরোনো খবরের কাগজ জুড়ে জুড়ে। তারই ওপরে রঙিন কালিতে দোকানের নাম, লোগো। কী ফ্যাশনেবল দেখতে সেই ব্যাগগুলো! এত কাছ ঢাকাতে যেটা সম্ভব হয়েছে, কলকাতা শহরে কিন্তু অদ্যাপি তার চল হলো না, একমাত্র ‘শ্রাবন্তী’ বুটিকের এই খাম দেখেছি। আমাদের বিবেক বড্ড অলস। আগুন ধরে গেলেও উঠে বসে না।

ফিরে শোয়। মানুষেরা কলকাতাতে আসেন প্রধানত তিনটি কাজে। এক. সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে, সংগীত, নাটক, সাহিত্যচর্চার কারণে। দুই. কলকাতার বাজারগুলিতে ঘুরে ঘুরে ছেলেমেয়ের বিবাহের বাজার করতে। তিন. এখানে চিকিৎসা করাতে আসছেন তাঁরা অনেক দিনই হলো। এঁরা সব সাময়িক উড়োপাখি, এমন যেন ভাববেন না। গানে, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে এবং থিয়েটারে আমাদের দুই বাংলার অটুট সখ্য, দেওয়ানেওয়ার পারস্পরিক ঋণ। বাকি দুই ক্ষেত্রে সেটা খাটে না। (বিয়ের বাজার, আর ডাক্তার দেখানো, এগুলো এদেশের মানুষ এদেশেই করেন।) আমরা ভাবতে ভালোবাসি, যে আমরা তেমন বিশ্ব-সচেতন না হলেও, বর্তমান প্রজন্ম সব জানে। (এদের মা সব জানেন না।) সময় দ্রুতগতিতে পালটাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েগুলো ইন্টারনেটে বিশ্ববিজয় করছে, ওরা পুঙ্খানুপুঙ্খ সব জেনে ফেলেছে, কিসে কিসে এই গ্রহের ক্ষতি হবে। গ্রহের বাসিন্দাদের ক্ষতি হয়। কিন্তু, সব মন্দ খবর জেনেও, ওরা আমাদের পুরোনো অভ্যেস শুধরে দিতে চেষ্টা করেছে কি? নিজেরা সচেতন আচরণ করছে কি? ধূমপান কি ওদের প্রজন্মে বন্ধ হলো? থুথু ফেলা, পানের পিক ফেলাও বন্ধ হলো কোথায়? উচ্চগ্রামে সংগীত প্রচার? রাস্তায় হর্ন বাজানো। শব্দদূষণে সবাই শামিল। আমাদের ঐকান্তিক উদ্দেশ্য পরিবেশের ক্ষতিসাধন কীভাবে রোধ করা যেতে পারে, সেই নিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করা। কিন্তু আমরা, মানে জনসাধারণ, কী সেই জিনিস তুমি যা বোঝাবে, আমরা তাই বুঝব? আইজ্ঞা না! আমাদের নিজেদের জীবনে কোনো ভীষণ পরীক্ষার মুহূর্ত না এসে পড়া অবধি আমরা পরিবেশ-বিষয়ক উদ্বেগকে নিয়ে রঙ্গরস করে থাকি। সেটা বন্ধ হয় তখনই যখন কোনো মর্মান্তিক ঘটনা আবার প্রমাণ করে দেয় আমাদের সর্বনেশে বিভ্রান্তি। কে তোমাকে বোঝাবে, এই ধরিত্রী মায়ের ধন তো ‘অন্যের ধন নয়’, তোমারি। তাকে ধ্বংস করে তুমি তোমারই সন্তানদের বিপন্ন করছ। পরবর্তী প্রজন্ম কে শুধু গাড়ি বাড়ি ব্যাংক ব্যালান্স হীরেমুক্তো দিয়ে গেলেই চলবে? তারা বাঁচবে কিসে? কোন জল পান করবে, কোন বাতাসে শ্বাস নেবে, কোন নির্বিষ শস্য, নির্বিষ ফল খাবে তারা? যেদিকে তাকাও, মৃত্যুবাণ। আকাশে, বাতাসে, জলে, মাটিতে, সর্বত্র আমরা ছড়িয়ে দিয়েছি আমাদের রসায়ন, আমাদের বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের প্রতিফল, প্রকৃতি নিধনের অপকীর্তি। যে বিষয়ে নিজেরা যে অচেতন আছি আর, তাও নয়। সব বিভীষিকা জেনে, বুঝে, সিগারেট টানছি। শিশু কোলে নিয়ে সাঁতরগ্স্ছির পেট্রল-ডিজেলের ধোঁয়া ছাড়ছি বাতাসে। তীব্র কীটনাশক ব্যবহার করে বিষাক্ত করছি প্রথমে শাকসবজিকে এবং পরের ধাপে তার খাদকদের, অর্থাৎ নিজেদের ও সন্তানদের। বিষ ঢুকিয়ে যাচ্ছি অজাতদের মধ্যেও। কালো ফুসফুস নিয়ে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে স্বর্গের শিশুরা। যেন কতদিনের ধূমপায়ী। আমরা অরগ্যানিক ফুড, অরগ্যানিক ফুড বলে চেঁচাই বিদেশিদের দেখাদেখি, আকাশ ছোঁয়া দাম দিয়ে ব্রাউন রাইস কিনে অন্ন গ্রহণ করি। অথচ, অন্তত পশ্চিমবাংলার কথা বলতে পারি, ঘরে ঘরে যে ঢেঁকি ছাঁটা চাল হতো, সেটি মুছে গেছে, সারি সারি ধানকলের ধোঁয়ায়। পাতলা লালচে খোসাওলা মিষ্টি, স্বাদু লাল চালের ভাত এখন অন্তত শহরে দুষ্প্রাপ্য। স্বপ্ন বেচার নামে বিশাল বিশাল সৌধ মেদিনীর বোঝা বাড়াচ্ছে, মাটির নীচের পানীয়জলের স্তর কমাচ্ছে, উষ্ণতা বাড়াতে সাহায্য করছে। মৃত্যুর বিষ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। হায়, আমাদের সৃষ্টি নিজের নাকের ডগার বাইরে যায় না। আমরা একবারও কি ভেবে দেখি, খেটেখুটে, চুরি-চামারি করে, সন্তানদের জন্য বাস্তু গড়ে দিয়ে যাচ্ছি? না জলহীন, পত্রপুষ্পহীন, ক্রমোত্তপ্ত এক বিষাক্ত, অভিশপ্ত ভূখন্ডে জীবনযুদ্ধ চালানোর জন্য তাদের চিরনির্বাসন দিয়ে যাচ্ছি? পৃথিবীর বিষাক্ত বাতাসে আমাদের ঘিরে রাখা ওজোনের স্তর কমে যেতে যেতে সূর্যের আর আমাদের মাঝখানে আড়াল ক্রমেই ঘুচে যাচ্ছে। বেড়ে চলেছে উষ্ণতা। আকাশ মাটির তো সর্বনাশ হয়েই চলছে, আয়তনে বেড়ে যেতে থাকা মহাসমুদ্রেরই কি রেহাই আছে? রত্ন গর্ভার গভীরে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যু বিষ। রাতের তারাগুলি ঘুমিয়ে পড়লে মানুষ পারমাণবিক মরণবোমা ফাটানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে হয় সমুদ্রের অতলে, নয়তো মরুভূমির গভীরে। সেই বিষও কি ফিরে আসবে না একদিন? সম্প্রতি দেখছি মরে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে নিরপরাধ অহিংস সামুদ্রিক প্রাণী, তিমিমাছ, শুশুক, এমনকি পেঙ্গুইনও। উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু দুই অঞ্চলেই মানুষ পৌঁছোনোর আগেই সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে ভেসে পৌঁছে গিয়েছে মানবসভ্যতার বিষাক্ত জঞ্জাল। এত পাপের বোঝা সইবেন কেমন করে মা ধরণী? চুপ করে বসে একটিবার ভাব তো, কোন জগতে জšে§ছিলে, আর কোন নরকে মরছ? আর এ তোমার স্বহস্ত নির্মিত নরক। ভূমিকম্প কি শুধু ভূমি কাঁপলেই হয়? ভূমিই সব চেয়ে স্থির নিশ্চিত জায়গা। আমরা জন্মগ্রহণ করি, অর্থাৎ আমরা মৃত্তিকাতে ভূমিষ্ঠ হই। যে ধরিত্রী আমাদের ধারণ করে আছেন, মানুষের সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ আশ্রয়, মাটি, তিনি কি পায়ের নীচে কেঁপে ওঠেন না কখনো কখনো, মেদিনীতে ভূমিকম্প ছাড়াই? আর তখন আকাশও কি ভেঙে পড়ে না আমাদের মাথার ওপরে? যে দুটি নিশ্চিত রেখার মধ্যে আমাদের নশ্বর অস্তিত্ব নির্ধারিত, আকাশ আর মাটি, দুটোকেই কাঁপিয়ে দিতে পারে, অস্তিত্বকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিতে পারে আমাদের অবুঝ মানুষী নির্মমতা। আমাদের পরিবেশদূষণ কি কেবল জলবায়ুতেই বন্দি? না তো। পশুপাখির বেলাতে ঐটোই সব, কিন্তু মানুষের বেড়ে ওঠার জন্য আরেকটাও পরিবেশ আছে, খুব জরুরি। সেটা আকাশমাটির বাইরে, তার নিজের তৈরি করা সম্পদ, তার নাম সমাজ। সেখানকার পরিবেশের স্বচ্ছতার ওপরে আমাদের জীবনের স্বচ্ছতা নির্ভর করে অনেকটাই। সমাজে মাঝে মাঝে ভূমিকম্প হয়, মাথায় মাঝে মাঝে আকাশ ভেঙে পড়ে, সুনামিতে মুছে যায় সত্যিমিথ্যে, আমরা মাঝে মাঝে নিজেদের নাম ঠিকানা বিস্মৃত হই।

নাম : মানুষ ঠিকানা : মৃত্তিকা। সেখান থেকে এসেছি, সেখানেই ফিরব। জন্মথেকে মৃত্যু, আমাদের একটাই জীবন, মাদুরের মতো খুলে যাচ্ছে। আমাদের চোখ বন্ধ, হƒদয় বন্ধ, বৃদ্ধি বিপথগামী। সত্যিকথা বলতে মানুষের ভয় করে, মুক্তচিন্তা রীতিমতো মহার্ঘ্য, তার বিনিময় মূল্য হতে পারে তোমার প্রাণ। কে কার বন্ধু? কে কার শক্রু? এই অপবিত্র চিন্তা আমাদের ভিতরের পরিবেশ, দূষিত চিন্তায় কলুষিত হয়ে বাঁচা। নশ্বর মানুষের তো ফল্ট লাইনের ওপরে বাসা, আমাদের অভ্যন্তরে এদিকে সেদিকে নিয়ত ভূমিকম্প হচ্ছে, বুকের মধ্যে ধস নামছে, চোখে নিশুতি আধাঁর, মস্তিষ্কের দিক ভুল হচ্ছে। কোথায় ভালোবাসা? কোথায় শ্রদ্ধা? কোথায় বিশ্বাস? দূষণ তো ভিতরে। এ দূষণ আমাদের অন্তরাত্মা দূষণ। কী দিয়ে যাব আমরা আমাদের সন্তানের হাতে, কোন পুণ্য মাটি, কোন পবিত্র আকাশ, কোন স্বচ্ছ সলিল, কোন শুচি বাতাস কোন অপাপবিদ্ধ ভাবনা?