বৃহস্পতিবার,১৫ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মঞ্চ: ‘মেটামরফোসিস’ - বাস্তবতার অন্যপাঠ
০৬/০১/২০১৬

মঞ্চ: ‘মেটামরফোসিস’ - বাস্তবতার অন্যপাঠ

- আবু সাঈদ তুলু

সম্প্রতি ভারতের বিহারের বেগুসরাইতে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ২০১৬’ এ বাংলাদেশের সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) ‘মেটামরফোসিস’ নাটকটি প্রদর্শন করে। চেক প্রজাতন্ত্রের লেখক ফ্রানৎস কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ গল্প অবলম্বনে সিএটির পরিবেশনা এটি। ‘মেটামরফোসিস’- বাংলায় রূপান্তর, মূলত জীববৈজ্ঞানিক দর্শন। রূপান্তর দর্শনে কাফকার গল্পটি শুধুই বলেনি সিএটি; সঙ্গে গ্রেগরের মধ্য দিয়ে মানুষ, জীবন ও জগতের নতুন এক বিশ্লেষণী মাত্রা তৈরি করেছে। সিএটির ‘মেটারমরফোসিস’ মূলত প্রাণীর চিন্তা, কথন ও অন্তর্দহনের চিত্র। গ্রেগর একজন ভ্রাম্যমান বিক্রেতা। সমাজের আত্মবিক্ষুব্ধ চেতনার প্রতিনিধি। অমানবিক পরিশ্রম করে বাবা-মা, বোনের সংসার চালানো গ্রেগর একদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে অনুভব করে- সে এক বিশালাকার পোকায় পরিণত হয়ে গেছে। স্বপ্ন দেখছে বলে প্রথমে মনে হলেও এক সময় নিশ্চিত হয়, সে পোকায় পরিণত হয়ে গেছে। বাবা এটাকে পাপের পরিণাম হিসেবেই দেখে। একদিকে জীবনের যন্ত্রণায় নিজে অতিষ্ঠ, অন্যদিকে পরিবারের সবার কাছেও ভয় কিংবা তাচ্ছিল্যের হয়ে ওঠে। সোফার নিচে লুকিয়ে থাকে। পরিবারের সবাই চরম বিরক্ত হয়ে ওঠে গ্রেগরের প্রতি। বিরক্তি আর অবহেলার মধ্যে কাটতে থাকে গ্রেগরের পোকাজীবন। ধীরে ধীরে তার ঘরটা পরিণত হয়ে ওঠে স্টোর রুমে। গ্রেগরের যন্ত্রণা থেকে রেহায় পেতে পরিবারের সবাই তার মৃত্যু কামনায় অধীর হয়ে ওঠে। অতীষ্ঠ বাবা একদিন তাকে লাঠি দিয়ে আঘাতও করে। অবশেষ এক রাত্রে মারা যায় গ্রেগর। সবাই যেন ঝামেলা থেকে মুক্তির আনন্দ পায়। জীবনযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে রূপকাশ্রিত ভাবে জীবন, সমাজ ও বাস্তবতার গভীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে নাটকটিতে।
মূল গল্প বলার চেয়ে এ পরিবেশনায় মূখ্য হয়ে ওঠেছে গ্রেগরের জীবন যন্ত্রণার প্রতীকে পৃথিবীর তাবৎ জীবনবাস্তবতার নববিশ্লেষণ। এ নাটকে লেখক স্বয়ং উপস্থিত। মঞ্চের অভ্যন্তরে ছাদ থেকে নিচ পর্যন্ত একটি কালো পর্দা বুঝানো। পর্দার দুপাশে একটু পেছনে দু জন মিউজিক্যাল ইন্সুমেন্ট নিয়ে বসা। চরিত্রের পোশাক পরিবর্তনে বাঁ দিকে একটি আলনা। মোহাচ্ছন্ন পরিবেশে বর্ণনার মধ্যে দিয়ে নাটকটি শুরু। ঝুলানো বিশাল পর্দাটি গ্রেগরের পোকায় রূপান্তরিত অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। পর্দাটির নানা স্থানে অসংখ্য পকেট। গ্রেগর যখন হাঁটতে চেষ্টা করে তখন ঐ পকেটগুলো নড়তে থাকে। মনে হয় পা নড়ছে। একধরনের মঞ্চমায়া তৈরি হয়েছে উপস্থাপনায়। মাঝেমধ্যে নাট্যবস্তুকে ঘিরে অভিনেতা ও দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগে চিন্তার পরিধি প্রসারণের তৎপরতা ছিল।

বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সেতু আজাদ। অসাধারণ প্রাণবন্ত অভিনয়। চরিত্রায়নগুলোও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম। পোকারূপে আটকে থাকা গ্রেগর চরিত্রে রহমতুল্লাহ বাসু। গ্রেগরের অসহায়ত্বে কষ্ট না লেগে পারে না। কেরানি ও গ্রেগরের কথোপকথনে ভ্রাম্যমান বিক্রেতার অমানবিক শ্রম, যন্ত্রনা ও বুর্জোয়া সমাজের নানা চিত্র প্রকাশিত হয়ে ওঠে। নাটকে ভাষা ব্যবহারে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিও ব্যবহার হয়েছে। নাটকটিতে মূল গল্পের বোনের অংশটুকু রাখা হয় নি।
নাটকের শেষে বিশালাকার পোকার ভেতর থেকে লালপর্দা প্যাঁচানো গ্রেগরের আত্মা বের হয়ে চলে যায়। এ দৃশ্যটিতে রঙের অত্যন্ত চমৎকার কম্পোজিশন ঘটেছে। লাল পর্দা ছিড়ে গ্রেগরের আত্মা আবার নতুন ভাবে উঠে দাঁড়ায়। এ যেন পুনর্জন্ম। ডিজিটাল মিউজিক বাজতে থাকে। গ্রেগর জীবন পরিক্রমণে রূপান্তরের নব দার্শনিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন নির্দেশক। অসাধারণ প্রাণবন্ত অভিনয়। অত্যন্ত শৈল্পিক পরিবেশনা। নাটকে অভিনয় করেছেন- সেতু আজাদ, রহমতুল্লাহ বাসু, মেজবাউল করিম, ইসমাইল হোসেন স্বপন, মিউজিক-আহসান রেজা খান, মিঠু বর্মন, মঞ্চ ও আলো-আনিতি তার ম্যূলিন, মূল গল্প- ফ্রানৎস কাফকা, রূপান্তর- আনিসুর রহমান, নির্দেশনা- কামালউদ্দিন নীলু।