মঙ্গলবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ডুমরি
০৬/০১/২০১৬

ডুমরি

- সুমন রহমান

"No one can the name of Pedro
Nobody is Rosa or Maria,
All of us are dust or sand,
All of us are rain under rain,
They have spoken to me of Venezuelas,
Of Chiles and Paraguays;
I have no idea what they are saying
I know only the skin of the earth
And I know it has no name
- PABLO NERUDA

ওরে ডাকি, ডুমরি। গামছার এক মাথা বান্ধি গ্যাস অফিসের লোহার বেড়ার মধ্যে, আরেক মাথা মিউনিসিপ্যালিটির ডাস্টবিনের আঙটায়। সেইখানে শোয়াই ওরে, দোল দেই। ডুমরি কী যে খুশি! দোতলা বাসে যাইতে যাইতে জানালা দিয়া লোকে অবাক দ্যাখে আমার কা-। আমিও খুশি। নিজেরে মনে হয় মহারানি। ডুমরি খিলখিল কৈরা হাসতেই থাকে। আর আমি যখন ফুটপাতে বিড়ি টোকাইতে যাই, বা কোনো ভদ্রলোকের আস্তিন টাইনা ধরি খয়রাতির আশায়-ডুমরি আমারে দ্যাখে ঘাড় ঘুরায়া ঘুরায়া। বয়স এক বছরও হয় নাই, কিন্তু সব বুঝতে পারে সে। এমন পাকনা!
রাইতের বেলায় কনডম বিলাইতে আসে যে আপা, খুব নাকমুখ কুঁচকায়। বলে, দুর, ডুমরি আবার কেমন নাম? ওর ভালো নাম কী রাখছো? আমি কৈ, একটাই। ডুমরি। এই নাম ক্যান, নামের অর্থ কী? ক্যান আবার, আমি কৈলাম, ডাকতে ভালোলাগে। অর্থ কী জানি না। তবে ডাকার সময় মুখটা ভৈরা যায়। দ্যাখেন দ্যাখেন, ডাকলে কেমনে ফিরা-ফিরা চায়... আমি কনডম-আপারে দেখাই। গলা চড়ায়া ডাকি, ডুম্রিইইইই! কাপড়ের পুটলির মধ্যে কিলবিল নড়ে আধাঘুমন্ত এই প্রাণীটা। উপুড় হৈয়া যায় নিজে-নিজে। তারপর ঘাড় তুইল্যা এদিক সেদিক চায়। আমারে দেখতে পায়, আর সাথে-সাথেই কী যে হাসি! এক্কেবারে মাড়ি বাইর কৈরা হাসে আমার পোলা। কনডম-আপাও হাসে। কয়, একটা ভালো নাম রাইখ শেফালী। নাইলে বড় হৈয়া তোমার পোলা মুখ দেখাইতে পারব না।
মুখ না দেখাইবার কী আছে?
আমার অবাক লাগে। জন্ম রেজিস্ট্রি করতে আসল যে আপা, ওই যে পান-খাওয়া, মাথায় রুমাল, মুখে গুটি গুটি দাগÑসেও খুব কৈল। এইটা কোনো নাম হৈল? আসল নাম বল? আমি কৈলাম, এইটাই নাম, আসল নকল আপনেরা বুঝবেন। রেজিস্ট্রি-আপা গম্ভীর হৈয়া যায়, একটা আরবি নাম তো রাখা লাগে। দুনিয়াদারির ব্যাপার আছে, বেহস্ত-দোযখের ব্যাপার আছে। এই নাম দিয়া তো চলে না।
কী চলে না?
আমি তো দেখি সবই চলে। চ্যালচ্যালায়া চলে। সকালবেলা ডুমরিরে কোলে নিয়া রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে যখন রোদ পোয়াই, কানের পাশ দিয়া শোঁ শোঁ নানান কিসিমের গাড়িই তো চলে। আইল্যান্ডে বৈসা ডুমরিরে কোলে নিয়া গাড়ির চাকার যথাসম্ভব কাছে ধরি। ডুমরি খলখল কৈরা হাসে। আমিও হাসি। আনাড়ি ড্রাইভার হৈলে দূর থিকাই হর্ন দিতে থাকে, কাছে আইসা কড়া ব্রেক করে। গাড়ি থামায়া কড়া-কড়া গালি দেয়। বলে, খানকি কোনখানের, জারজ বাচ্চা এতিমখানায় দিতে পারস না? আমার চাক্কার তলে ক্যান? শুইন্যা আমি আরো হাসি। বলি, ভাইসাব, বাচ্চা তো চাক্কার তলে দেই না। এট্টু খেলি!
আবার কোনো কোনো দিন রাগও হয়। চিল্লাই। হওরের পুত, জারজ বাচ্চা তরে কৈছে কেডা? আমার পেট কি তুই বান্ধাইছিলি?
ড্রাইভার তখন ভাগে। সে বান্ধায় নাই। কিন্তু জানতে চায় কে বান্ধাইছিল। সবাই জানতে চায়।
রেজিস্ট্রি-আপাও জানতে চাইছিল। গলা নামায়া আমারে কৈল, শেফালী বেগম, পোলার বাপের নাম যে লাগে! বাপের নাম ছাড়া জন্ম রেজিস্ট্রি হয় না।
এইটা কোনো সমস্যা? আমি হাসি।
ওই যে জুতা সেলাই করে ল্যাংড়া ফরু, তখন আমার পোলার সাথে খেলতেছিল। সেইদিকে তাকায়া কৈলাম, লেখেন ফরু, ফরিদ মিয়া। দূর থিকা শুইন্যা ফরু চমকায়া ওঠে। আমার দিকে তাকায়, কয় না কিছু। আপা চইল্যা গেলে ল্যাংড়াইতে ল্যাংড়াইতে আসে। জিগায়, শেফু কার নাম কৈলি তুই? অয় কি আমার পোলা?
আমি হো হো হা হা কৈরা হাসি। দেখাদেখি আমার পোলাও। ফরুরে তখন এমন বোকাচুদা লাগে!
কামাইল্যাও কি বোকাচুদা কম? হারামির পোলা আমারে শাদী করছিল একবার, কৈরা কি কম চুদুরভুদুর করছে? আগে রিকশা চালাইত, হেরোইনের নেশা ধরার পর এখন পান্থপথের মোড়ে খাড়ায়া মাইনষের ঘড়ি গয়না থাপা দেয়। শাদী কৈরা আমারে কয়, কত ট্যাকা আছে বাইর কর। হালিমার বস্তিতে ঘর ভাড়া লৈয়া থাকুম। হালার পুত, আমারে ভোদাই পাইছিল। আমি সাফ সাফ কৈয়া দিছি, ট্যাকা নাই। কুত্তাবিলাই খাওয়াইবার লাইগ্যা ট্যাকা জমাইবার বেটি আমি না। দুইদিন পর মুখের ওপর তালাক দিল আমারে। কী ভাবসাব, যেন তালাক হুনলেই আমার মাথায় আসমান ভাঙ্গব! আমি কৈলাম, যাঃ ফুট! ফুটল না জাউরার পুতে, মাথা ঘুইরা পইড়া গেল। ব্যাড়া ওঠছিল। কিন্তু সপ্তা পরেই আবার আইসা শুইল আমার সাথে। আগের নিয়মে। বিশ ট্যাকার একখান নোট দেখাইল সোয়ামি, শরীল চায়। এখন তো প্রায়ই আসে, আগে ট্যাকা দেয়।
কামাইল্যার বোকাচুদা হওনের কথা কৈতেছিলাম। ভোটার লিস্টিতে নাম উঠাইতে যেদিন লোক আসল, আমি ডুমরিরে লৈয়া আইল্যান্ডে শাড়ি শুকাইতেছিলাম। ওরা আমার নামঠিকানা লেখল, স্বামীর নাম জিগাইল। একজন আবার মুচকি হাসি দিয়া কৈল, স্বামী পাইব কৈ, বাপের নামই কও। আমি স্বামীর নামই কৈলাম।
: লেখেন, কামালউদ্দীন।
: বাপ?
: পোলার বাপ।
ডুমরিরে দেখাই আমি। রাইতের বেলা কামাইল্যা আসল হাঁপাইতে হাঁপাইতে। হাতে ট্যাকা নাই। আন্ডারপাসের গোড়ার মধ্যে মায়ে-পোলায় ঘুমাইতেছিলাম। আমার কাঁচা ঘুম ভাঙায়া বোকাচুদায় জিগায়, শেফু, সত্যি ক’, অয় কি আমার পোলা? উত্তেজনায় ওর নিচের ঠোঁট ঝুইল্যা পড়ছে।
সেই থিকা ফরু আর কামাইল্যার কী যে হৈল! ডুম্রিরে দোলনায় শোয়াইয়া এদিক সেদিক গেলে আইসা দেখি, হয় ফরু-হাতে বনরুটি, না-হয় কামাইল্যা-হাতে ঝুনঝুনি। বনরুটি হাতে ফরু থতমত হৈয়া কয়, তর পোলার ক্ষিধা লাগছিল মনে হয়, কানতেছিল। আমি হাসি। পোলা আমার ক্ষিধা লাগলেও কান্দে না। আবার কামাইল্যা আমার পোলার লাইগ্যা ঝুনঝুনি কিন্যা আনে। আইন্যা কয়, টোকায়া পাইলাম, তর পোলার লাইগ্যা রাইখ্যা দে। দ্যাখ দ্যাখ, ঝুনঝুনি বাজাইলে তোর পোলা কত্ত খুশি!
আরেকদিন কামাইল্যা আইসা কয়, শেফু চল ঘুইরা আসি। চিড়িয়াখানায়। একলা একলা চিড়িয়াখানা দেখতে মজা নাই। বাঘভালোলাক দেখতে হয় দল বাইন্ধা। আমার হাত ধৈরা কয়, চল তোর পোলারে পশুপাখি দেখাইবি। অমনি কৈত্থিকা ফরু আইসা হাজির। আমারে কয়, খবর্দার যাবি না তুই হেরোইন্চির লগে। হালার মতিগতি ভালো না। চান্স পাইলে তোর পোলারে বেইচ্যা দিব।
এত্ত সহজ! হাসি আমি।

ওরা কিন্তু মারামারি লাগাইল। শেষে আমি রফা করলাম। কৈলাম, আমার পোলায় তো বাঘভালোলুক দেখবার চায়। ঝগড়া কৈরা লাভ নাই, দুইজনেই চল! কামাইল্যা কয়, ল্যাংড়ার খরচ আমি দিতে পারুম না। ফরু কৈল, সে নিজেই দিবে।
একদিন ফরু আইসা বসল আমার পাশে। চেহারা গম্ভীর। কৈল, আইচ্ছা, পোলার নামের কথা কিছু ভাবছস শেফু?
: ভাবার কী আছে? নাম তো আছেই। ডুমরি।
: সেইটা না। আসল নাম।
আমার খুব মজা লাগে। মুখটা ভ্যাদা মাছের মতো কৈরা জিগাই, আসল নাম কী রাখন যায় ফরু?
ফরুরে তখন উত্তেজনায় পাইয়া বসে। বলে, এমন নাম রাখা লাগব যেইটা দিয়া তোর পোলা ভদ্রসমাজে মিশতে পারে। হামিদ রাখতে পারস। হামিদ অনেক ভালো নাম। খোদার নিরানব্বই নামের একটা।
ফরিদ মিয়ার পোলা হামিদ মিয়া। বোকাচুদা!
কামাইল্যাও একদিন এইকথা কয়। শেফু, পোলার নামটা ঠিক করবি না? রেজিস্ট্রি অফিসে আমার পরিচিত লোক আছে, তুই কৈয়া দিলে আমি গিয়া ঠিক কৈরা আনুম।
: কী কৈয়া দিম?
আমি আবার ভ্যাদা মাছ।
: একটা সুন্দর নামটাম রাখ।
: তুই দিয়া দে একটা সুন্দর নাম।
: জামাল নামটা কেমন লাগে তোর? ঠোঁট ঝুলে কামাইল্যার।
রাইতে, ডুমরি যখন ঘুমায়া পড়ে, আমার পেটের খিদা চাগা দিয়া ওঠে। হাতে পয়সা নাই, খানকির ছাওয়াল হৈয়া গেলে ওরে দেইখ্যা পুরুষ মাইনষের চ্যাং নাকি খাড়ায় না! তবু ঘুমের মধ্যে কি কম জ্বালায় টহলপুলিশগুলা? বিনা পয়সায় হাতায়, আর জিগায়, কনডম নাই কনডম? আমি লুকায়া রাখি। কনডম না পাইয়া হারামির পোলারা হাতেই সুখ মিটায়। কিন্তু তাতে আমার পেটের খিদা তো মিটে না। আর এদিকে পোলায় সারাক্ষণ শনশন কৈরা দুধ টানে। দিনের বেলা শরীল টলমল করে আমার।
কোনো কোনো রাইতে কনডম-আপা আসে। আমি কৈ, আপা, লাগব না। আগেরগুলাই রৈয়া গেছে। আমার কাছে লোক আসে না গো। বিয়াইছি যে!
কনডম-আপা ক্ষেইপ্যা যায়, বলে, শেফু তুমি আমার চাকরি খাইবা! কনডম বিলি বাড়াইতে না-পারলে আমার চাকরি খতম হৈয়া যাইব। দেশে এইডস আসতেছে শেফালী। এই রোগ হৈলে রক্ষা নাই।
: এই রোগের আর কোনো ওষুধ নাই? খাওনের ওষুধ?
খিদাপেটে জিগাই।
: নাহ।
: কারে কনডম পরামু আমি? আমার কাছে কেউ আসে নাতো!
: মিছা কথা!
: সত্য আপা। কামাইল্যা আর ফরু আসে, নিজের মানুষ, হেগো রে কনডম পরতে কই কেমনে?
: তোমারে মরণে টানতেছে, শেফালী!
: টানতেছে তো কবে থিকাই। নেয় না তো!
ঘুমের মধ্যে ডুমরি খিলখিলায়া হাসে। দাঁত কটকট করে। একটু পরে আবার বিনবিনায়া কান্ধেও। মাঝরাইতের ফাঁকা রাস্তা দিয়া শনশন কৈরা ট্রাক যায়। বড় বড় বিলবোর্ডে মিষ্টি মিষ্টি সব মাইয়া মানুষ, সাবান লৈয়া খাড়ায়া থাকে। তাদের ঘুম নাই। ডুমরি না ঘুমাইলে উনাদের দেখায়া দেখায়া ঘুম পাড়াই। কত্ত সুন্দর অরা? দূরে পুলিশের বাঁশি শোনা যায়। কনডম-আপা আর খাড়ায় না। তারে দেইখ্যা খুব মায়া হয় আমার। এতদিন ধৈরা চিনি, কোনোদিন তার নামটা জিজ্ঞাস করা হয় নাই।
নাম ছাড়াও তো চলল। চলল না?
এই যে ট্রাকটা আইসা খাড়াইল, এর ড্রাইভার আমারে কতদিন ধৈরা ফুসলাইতেছে! ওরেও অনেক আপন লাগে আমার। কিন্তু তার নামও তো জানি না। জানার ইচ্ছাও হয় না। কনডম-আপা মোড় ঘুরলেই আমি এই ট্রাকে উইঠা পরুম। যামু আমিন বাজার। ওইখানে নিশ্চয় নতুন নাম দিবে আমার, সালেহা কি মর্জিনা। ছাওয়াল-ছাড়া মাইয়া, পুরুষ মাইনষের চ্যাং তখন সকাল বিকাল খাড়াইব। পেটের খিদা চাগা দিব না আর। তখন কাওরান বাজারের কেউ যদি আমারে দেইখ্যা ফালায়, ‘শেফু’ কৈয়া ডাক দেয়, আমি হয়ত চিনুম-ই না। এখন যেমন মাইজদীর কেউ আমারে ‘আমিনা’ কৈয়া ডাকলে ফিরা তাকাই না। আমি কি কোনোদিন আমিনা ছিলাম? নাম তো এমনই।
আর ডুমরি? কাপড়ের পোঁটলার ভিতর আমার কলিজাটা কী সুন্দর ঘুমাইতেছে! সাহেবালির গ্যারেজের চালার নিচে ল্যাংড়া ফরু যেখানে ঘুমায়, সেইখানে আমার কলিজাটারে এই জীবনের জন্য রাইখ্যা যামু। ঘুমন্ত ফরুর পাশে। ঘুমের মধ্যে কলিজা আমার খিলখিলায়া হাসব, বিনবিনায়া কান্দব। সকালবেলা ফরু ওরে বনরুটি কিন্যা খাওয়াইব, কামাইল্যা আইসা ঝুনঝুনি বাজাইব ওর কানের পাশে। দুই-দুইখান বাপ, পোলা আমার থাকব শাহানশা’র মতো। কোনোদিন, যদি বাঁইচ্যা থাকি, পেট যদি খুব পোড়ায়, না-হয় দোতলা বাসের জানালা দিয়া দেইখ্যা যামু আমার ডুমরিরে। আর যদি মইরা যাই, বিলবোর্ডগুলার মাইয়া মানুষগুলারে এট্টু জায়গা ছাইড়া দিতে কমু। ওইখানে খাড়ায়া খাড়ায়া সারারাইত পাহারা দিমু তোরে। তোর তখন অন্য নাম হৈয়া যাইব। বাপসোহাগী নাম। তাতেই বা কী? নাম দিয়া কী হয়? নাম ছাড়াই তো জগতে কতকিছু চইল্যা যায়?
চলে না?