বুধবার,২১ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর- পঞ্চম পর্ব
০৬/০১/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর- পঞ্চম পর্ব

- রিজিয়া রহমান

ঝাপ ঠেলে ঘরে ঢুকল গেদী : মাগো, গণির দোকানে সাগু নাই, বার্লি আনছি। আর...
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে, আশঙ্কায় নীল হয়ে গেল সে। বাবার শিয়রে বসে তার মা কাঁদছে। তবে বাবা কী সত্যিই মরে যাবে? মরে যাবে মানে... আর কোনোদিন আসবে না, আর কোনোদিন বাবা বলে তারা কাউকে ডাকতে পারবে না! বার্লির মোড়কটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে ভীষণ একটা কষ্টে তার ছোট বুকটা দুমড়ে কান্না এল।
সম্বিত ফিরল ফুলজানের। মেয়েকে আলতো ধমক দিল : ফ্যালাইলা ক্যান ওডা? যা ভাত ফুটছে, ফ্যান গাইলা তরা ভাত খা।
ঝাপ ঠেলে টিনের একটা পেয়ালা হাতে মাথা কাঁপাতে কাঁপাতে ঘরে ঢুকল ওমরতুন : ও ফুলজান বু! তর ভাতের ফ্যানডা আমারে দিবি? নুন দিয়া খাইয়া কোনোমতে রাইতটা কাডাইমু।’
অন্যদিন হলে ফুলজান মুখিয়ে উঠতো এই বাড়ির পুরোনো বাসিন্দাসুলভ স্বভাবে। এখন কেরোসিনের কুপির কাঁপা আলোয় ওমরতুনের রেখা-জটিল ক্ষুধার্ত মুখটাকে দেখে দুঃখী মনে হলো ফুলজানের। তার মতোই দুঃখী। সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ির সবাইকেই ফুলজানের মনে হলো দুঃখী, ক্ষুধার্ত আর অসহায়। কিন্তু কেন? কেন তার মতো এ বাড়ির মানুষেরাই কেবল দুঃখী! দুঃখী তারা, যারা সারাদিন রোদ-ঝড়-জলে রিকশা-স্কুটার বায়, ঠেলাগাড়ি টানে, পঙ্গু হয়ে ফুটপাথে পড়ে থাকে, পায়ের তলা পুড়িয়ে ফেরি করে বেড়ায়, পথে ভিক্ষে করে ফেরে, ঘাড় টাটিয়ে দেড়মণী বোঝা টানে... তবু পেট ভরে দুবেলা খেতে পায় না! কেন সব দুঃখের বোঝা কোন্্ অনির্দিষ্ট কারণে, ফুলজান জানে না, শুধু তাদেরই বইতে হয়?
এই শহরেই কত সুখী মানুষ তো আছে। এই পৃথিবীতে কত পরিতৃপ্ত মানুষ চার বেলা পেট পুরে নানা সুস্বাদু খাবার খায়, বেড়ায়, ঘুমোয়, ফুর্তির জন্য দুহাতে পয়সা ওড়ায়। জীবনকে তাদের পরিশ্রম করে টেনে নিতে হয় না। জীবনই তাদেরকে ¯্রােতের ফুলের মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলে। তা না হলে?
হ্যাঁ, তা-না হলে এত রঙ বেরঙের শৌখিন সুবেশধারী নারী-পুরুষ আর অগণিত আলো-ঝলকানো গাড়ির ভিড় জমে কেন সাগরপারের আবেদনময়ী চিত্রাভিনেত্রীর নবতম অবদান দেখবার জন্য শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত আয়েশের আবেশে ভরপুর প্রমোদভবনগুলোতে? কেন ফুলজানের মতো লোকেরা এক বছরে যা রোজগার করতে পারে না, তা এক সন্ধ্যায় বিলিয়ে দেয় তারা কোনো অভিজাততম রেস্তোরাঁর বারে, মিউজিক ফ্লোরে সাগরপাড় হতে আগত বিখ্যাত অর্কেস্ট্রা পার্টির উচ্চাঙ্গ বাজনা অথবা মধ্যপ্রাচ্য হতে আগত নৃত্যপটিয়সীর শারীরিক কলানৃত্য দেখবার জন্য। কিংবা শহরের চালু সংবাদপত্রগুলোর মারফত বহুল প্রচারিত কোনো অভূতপূর্ব বৈচিত্র্যেময় ‘ডিনার’ ও ‘ডান্সে’র জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত দামী পোশাক ও দুর্মূল্য প্রবেশপত্রের মহিমায় হোটেলের সামনে সারি সারি গাড়ির লাইন দেয় সেসব সুখী মানুষরা। কিন্তু তারা কি চেয়ে দেখে? তারা কি জানতে পারে যে, চাঁদনরি মতো মার্কার আলোর ¯িœগ্ধতায় যখন হোটেল বা রেস্তোরাঁর লনে ফাঁকা ফাঁকা নিরিবিলি যে টেবিল পাতা হয়, আর সেই টেবিল ঘিরে খাওয়াটাকে নিতান্ত একটা আর্ট, কথাকে ভাঙা সঙ্গীত এবং হাসিকে পিয়ানোর সুরের রূপ দিতে ব্যস্ত যখন তারা, আর শাদা উর্দিপরা বেয়ারারা ছায়ার মতো নিঃশব্দে হাওয়ার মতো বেগে অত্যাশ্চর্য বিনয়ে যখন ট্রে নিয়ে যাওয়া আসা করে, টিপসের বিনিময়ে যখন শরীরটাকে অর্ধচন্দ্রাকৃতি প্রায় করে সালাম জানায় তখন; অথবা হঠাৎ হাওয়ায় ঝিরঝিরিয়ে ওঠে যখন ইউক্যালিপ্টাসের সারি আর লবি থেকে ভেসে আসে রেকর্ডবন্দি সাউথ পেসিফিকের বন্য সুরের গীটার বা ম্যান্ডোলিনের বিচিত্র সঙ্গীত...
রাস্তার ওপারে ল্যাম্পপোস্টের আলো আর পথিপার্শ্বের বৃক্ষছায়ার যে আলো আঁধারির লুকোচুরি, সেখান থেকে সুখী মানুষদের উচ্ছিষ্ট মাংসশূন্য ভাজা মুরগির হাড়গোড়, রুটির টুকরো আর অর্ধভুক্ত খাদ্যকণা নিয়ে পথের কুকুরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে সেগুলো লেহন করছে, দাঁত দিয়ে ভাঙছে, রস নিংড়ে বার করতে চেষ্টা করছে, অর্ধউলঙ্গ উপবাসী মানব-শিশুরা তাদের কাঠির মতো হাত-পা হাড়সর্বস্ব বক্ষপঞ্জর আর লাল রুক্ষ চুলে ভরা বেমানান মাথা নিয়ে। কিন্তু কেন একই আকাশের নিচে একজন চর্ব্যচোষ্যের আস্বাদন করবে ইচ্ছাকৃত অবহেলায়, আর তার উচ্ছিষ্টের লোভে ডাস্টবিন ঘিরে কুকুরের সঙ্গে লোভী চোখে অপেক্ষা করবে নামমাত্র মানুষেরা? দুঃখী মানুষের উপবাসী সন্তানেরা।
এসব কথা সম্পূর্ণ ফুলজানের অবিদিত। সে শুধু জানে, পৃথিবীতে একদল লোক আছে যারা সুখী, তারা পরিতৃপ্তÑ কারণ তারা পেট ভরে খায়। অসুখ হলে ডাক্তার ডাকে। পথ্য আর ওষুধ আনে। রোগীর জন্য সেবা আর যথাযোগ্য আরামের ব্যবস্থা করতে পারে।
: ও বু’ দিবিনি? চক্ষু আন্ধার দেহি। আর পারি না... দে আমারে এটটু ফ্যান।
করুণ আকুতিতে ফুলজান সহজ হলো। ধাতস্থ হলো। ওমরতুনের অপেক্ষমাণ নিষ্প্রভ চোখের দিকে তাকিয়ে বলল : যাও। ভাত হইলে গেদী দিয়ে আসবানে। বাটিডে থুইয়ে যাও।
উঠে বেড়া হাতড়ে হাতড়ে নিজের আস্তানার দিকে যেতে যেতে মাথাটা ঘুরে উঠল ওমরতুনের। সারাটা শরীর ঝিমঝম করে, চোখের সামনের অন্ধকারটা যেন আরো আঁধার হয়ে গেল। টলে উঠল পায়ের তলার মাটি। কিন্তু আসন্ন পতন থেকে রক্ষা করল দুটি হাত। হাসেম পাগলার হাত।
: কি দাদী! মাথা ঘুরান দিয়া অহনই তো পড়ছিলা। কী কাম রাইত-বিরাইতে গুটগুটাইয়া ঘোরনের।
হাসেম পাগলা এ বাড়িরই আর এক বাসিন্দা। এক চোখ কানা। আশ্চর্য ভালো গানের গলা। ঢাকা জেলারই নুরুল্লাপুরে তার বাড়ি। আগে গ্রামে সে যাত্রাদলে পালা গাইত। তাছাড়া বছরে দুএকবার পীর মুর্শিদের সিন্নির সময় হাসেমের মারফতী গানে লোকের অন্তর গলে যেন জল হয়ে যেত। বিশ বাইশ বছরের ছেলে। একটা পা জন্মাবধি খোঁড়া। তারপর মারীগুটিতে একটা চোখও গেছে। তাতে বোধহয় হাসেমের সুবিধেই হয়েছে। শহরের পথে পথে ফিরে গান গেয়ে সে রোজগার করে। কিন্তু ছোঁড়াটা কেমন একটু পাগলাটে ছাটের। এ বাড়ির স্বার্থসচেতন কলহপটু বাসিন্দাদের সঙ্গে হাসেমের কোথায় একটু অমিল আছে। আর সেইজন্যই বোধহয় ওর পাগল নামকরণ হয়েছে। হাসেমের হাতে দুঃখ নাই। ‘হাইসমা পাগলা’ বলে ডাকলেই সে হেসে সাড়া দেয়। বসন্তের ধারালো নখরে খুবলে নেওয়া মাংসহীন ক্ষতবিক্ষত মুখটিতে সর্বদা হাসিঠাট্টা লেগেই আছে? বাড়িতে চালচুলোর পাট নেই। কোথায় খায় রোজ অথবা আদৌ সবদিন খাওয়া জোটে কিনা, সে খবর কেউ রাখে না। সম্পত্তির মধ্যে আছে ওর চটে-মোড়া ছেঁড়া একটি মলিন কাঁথা আর বহু পুরোনো একটি দোতারা। এক টাকা ভাড়ায় বাড়িলার কাঠকুটো রাখার চালার একধারে শুতে পায়।
ওমরতুনকে ধরে ধরে তার চটে-ঘেরা ঘরটিতে পৌঁছে দিয়ে বলল : একি! আন্্ধার কইরা থুইছ ক্যান? কপি জ্বালাও নাই?
ওমরতুন বসে পড়ে দম টেনে বলল : কুপিতে ত্যাল নাইরে ভাই।
আগে কও নাই ক্যা? দেও বোতল ত্যাল আনি।
ক্লান্তস্বরে জবাব দিল ওমরতুন : ত্যালের পয়সা যে নাই।
ঠিক আছে সেই চিন্তা তোমার করণ লাগব না। শিশি দাও আমারে।
অন্ধকার থেকে নিজেই বোতল খুঁজে নিয়ে চলে গেল হাসেম। কিছুক্ষণ বাদে তেল নিয়ে এল। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে কুপি ধরাল। তারপর একমুখ হাসি নিয়ে যবতুনের মুখের সামনে হাত নেড়ে বলতে লাগল : হাঁটবার পারে না বুড়ি ছ্যাঁচা গুয়া খায়, নিয়ার নামেতে বুড়ি গুড়গুড়াইয়া যায়।
ওমরতুনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসেমের মুখে অসহায় ভাব ফুটে উঠল : ‘এই দেহ, কী মুশকিল, ঠাট্টাও বুঝ না! কান্দ ক্যান দাদী? আর কমু না। এই যে তওবা করলাম। নাকে খত দিলাম।
হাসেম সত্যি সত্যিই তিনবার করে নাক-কান মলে ওমরতুনের সামনে মাটিতে আধ হাত নাকে খত দিয়ে উঠল : নেও, হইছে তো! ধর রুডি খাও। উঠে বসে আধ খাওয়া একটা বাসি ঝুরঝুরে পাউরুটি বের করে দিল ওমরতুনকে। বোধহয় কোনো দোকান থেকে গানের বিনিময়ে পাওয়া।
রুটিটার দিকে চেয়ে ওমরতুন সহসা এক নতুন আবেগে আবার উচ্ছ্বসিত হয়ে কেঁদে উঠল।
: আবার দেহি কান্দে!
ওমরতুন কাপড়ের খুটে চোখ মুছে নিল। বলল : আগে কানছি দুঃখে। অহন কান্দি সুখে। দাদারে, তুই আমার আসল নাতি, তরে পালি নাই লালি নাই। চিনি নাই। তর যে দরদ আমার লিগ্যা, তার তো এককণাও নাই হেই নিমকহারাম জয়নাইলার। পািিখর ছার মতো বুকের তলে রাইখা বড় করছি... মা আছিল না। বাপ আছিল না... এই দাদীই আছিল সব। ঘাটে গেলেও আঁছল ছাড়ে নাই...। আহারে! এমন নিঠুর জয়নাল খাঁ, ক্যামনে তুই ভুললি...
ওমরতুনের একমাত্র নাতি জয়নাল খাঁর হৃদয়হীনতার কাহিনী এ বাড়ির সকলেরই প্রায় পঞ্চাশবার শোনা হয়ে গেছে। হাসেমও শুনেছে। তবে একমাত্র হৃদয়গ্রাহী শ্রোতা বোধ হয সে-ই। হাসেমই তাকে আশ্বাস দেয় : চর তো আবার জাগছে। এইবার কোর্টে মামলা দাখিল করুম। দেহি তোমার দুআনি অংশ ক্যামনে ঠেকায় জয়নাল খাঁ।
শাড়ির আঁচলের ওপর একবাটি গরম ফ্যান বসিয়ে হাতে করে নিয়ে এল গেদী : এই যে নানী, ফ্যান।
হাত বাড়িয়ে গরম ফ্যানের বাটিটা প্রায় লুফে নিল ওমরতুন। গেদী ফিরে চলে যেতে ফ্যানের পেয়ালায় একটু লবণ ছড়িয়ে হাসেমকে বলল : তর রুডিহান তুই-ই খা দাদা। ক্যান খামখা আমারে খাওয়াইয়া নিজে উপাস দিবি? আমি এই ফ্যানটুক খাইয়া সারুম। ফ্যান খাইলে শইলে বল বাড়ে।
হাসেম চোখ পিটপিট করে তাকাল : ও, শইলে বল তুমি একলাই করবা? দেও তয়। আমি ফ্যান খাই, তুমি রুডি খাও।
ফ্যানের বাটি টেনে নিল হাসেম। হা হা করে বাধা দিল ওমরতুন : দেহ দেহি পাগলে করে কি। তুই যোয়ান মানুষ। এইটুক ফ্যানে তোর পেট ভরব না। আমারে খাওয়াইয়া তুই ক্যান না-খাইয়া থাকবি?
বুকে টোকা দিয়ে মুখে একটা চেষ্টাকৃত বেপরোয়াভাব ফুটিয়ে তুলল হাসেম : হুঃ উপাস দেওয়ার বান্দা এই হাইসমা পাগলা না। জাননি কত খাতির তার হাটেবাজারে?
শেষপর্যন্ত মিটমাট হলো। আধখানা ঝুরঝুরে রুটি আর একবাটি ফ্যান ভাগ করে খেল দুজনে। খেতে খেতে অনবরত বকরবকর করে গল্প করতে লাগল হাসেম। মাঝে মাঝে কী রসিকতার গল্পে হো হো করে প্রচ- শব্দে হেসে উঠতে লাগল। সে হাসির শব্দে ময়নার ঘরের অতিথিরা মাঝে মাঝে চমকে উঠতে লাগল। আর বিরক্তিতে সুশোভিত ভ্রƒজোড়া বাঁকিয়ে বাইরের দিকে তীব্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করল ময়না। অন্যান্য ঘরের কর্মব্যস্ত বাসিন্দারা বুঝল, হাইসমা পাগলা ফিরেছে।
খাওয়ার পর নামাজ সেরে শুয়ে পড়ল ওমরতুন নিজের চটঘেরা খুপরিটিতে। হাসেম উঠে গেল। কিন্তু একটু পরেই ফিরে এল গজগজ করতে করতে : নাহ, হালার এই বাড়িতে আর থাকন যাইব না।
ছাওনারার খালা এক পাঁজা বাসন নিয়ে কুয়োতলায় যাচ্ছিল। হাসেমের আক্ষেপ শুনে মযনার ঘরের দিকে বাঁকা কটাক্ষ হেনে বলল : হাছই! বাইত বইয়া এইয়া কি? বাজারে গেলেই পারে। বিশা মোল্লাডা মানু নি!
হাসেম এ কথার ধার দিয়েও গেল না। প্রবল আক্ষেপে মাথা নেড়ে কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রামে তুলল : কওছেন খালা, একটা ট্যাহা ভাড়া দই আমি। আর হালার যত কুত্তা আইয়া বিনাভাড়ায় থাহনের জায়গা পাইছে। বাচ্চাকাচ্চা লইয়া আরামে শুইছে। খেদাইবার গ্যালে ভেংচি কাটে। কও দেহি, তোমরাই ইয়ার বিচার কর।
ছাওনারার খালায় তখন আর পাগলের প্রলাপ শুনবার তাড়া দেখা গেল না। পিছন থেকে হাসেমের নালিশ শুনে হিহি করে হেসে উঠল নবছরের ছাওনারা। ওর খালা পিছন ফিরে ধমক দিল : হিটকায় ক্যা এইডা? বাতি ধর। জলদি কইরা থাল কয়ডা মোড় দিবি।
হাসেম ওর দোতারাটা নিয়ে ওমরতুনর মাথায় কাছে দাওয়ার বেড়ায় হেলান দিয়ে চুপ করে বসে রইল।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যারাতের আবছায়া মিলিয়ে রাত আরও কালো হলো। সারাটা আকাশ জুড়ে আলোক-বিচ্ছুরিত মণিমুক্তার মতো জ্বলতে লাগল অসংখ্য নক্ষত্রের সারি। একে একে আরো অনেকে বাড়ি ফিরল। অনেক ঘরের কোলাহল স্তিমিত হলো। কোনো ঘরে মুখরতা বাড়ল। রান্না, খাওয়া-ধোওয়া, ঝগড়, টাকা পয়সার হিসাব-নিকাশ, স্বামী-স্ত্রীর কলহ, শিশুদের চিৎকার আর কান্না, ঘরের পিছনের পচা ড্রেন থেকে আর দরমা-ঘেরা পায়খানার দুর্গন্ধ মিলে বাড়িটাকে শব্দ আর গন্ধের জগৎ করে তুলল।
একসময় ময়নার ঘরের অতিথিরা বিদায় নিল। এতক্ষণে একটা বালতি নিয়ে হেলেদুলে কুয়োর ধারে গেল সে। থালা-হাঁড়ি এটা ওটা নিয়ে আরও কয়েকবার ঘর আর কুয়োতলায় আসা-যাওয়া করল ময়না। তারপর উঠো-চুলোয় ভাত বসিয়ে ঘরের খোলা ঝাঁপের সামনে বসে বাঁধা বিনুনি আবার খুলে দীর্ঘ ঘন চুল রঙিন একটা চিরুনি দিয়ে টেনে টেনে আঁচড়াতে লাগল! দুএকবার ক্ষিপ্র দৃকপাত করল ওধারে বেড়ায় হেলান দিয়ে বসে-থাকা নিথর নিস্পন্দ হাসেমের দিকে। অদ্ভুত ছোঁড়াটা। মনে মনে মন্তব্য করল ময়না।
রাত আরও বাড়ল। ওদিকে মিরকাদিমের খালেকের মার ঘর থেকে ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না ভেসে এল খালেকের বউয়ের। সেইসঙ্গে তম্বি ভেসে এল শাশুড়ির-‘হইছে হইছে চুপ। অহন আর ভঙ্গি কইরা কান্দন লাগব না। যেমুন কাম তেমুন আক্কল দিছে! ক্যা বাবা! বউ তুই পুরুষপোলার কাম লইয়া তর এত মাথা ঘামে ক্যান?
তুই... খাবি দাবি চুপ থাকবি। তা না সব তাতে সর্দারি করবার যায়। অহন হইছে? মুখে মুখে নিয়াই করবার যাইয়া লাথথি খাইছ... হইছে।’
খালেকের বউয়ের কান্না ছাপিয়ে খালেকের মায়ের শাসন শোনা গেল সব ঘর থেকে। আলোচনার গুঞ্জনও উঠল সব ঘরে। খালেকের বউয়ের মতো খালেকের গতিবিধি নিয়ে এ বড়ির অনেকেরই সন্দেহ ও আপত্তি আছে।
আবার প্রায় সব চুপ। অনেক ঘরের ঝাঁপ বন্ধ হলো। কুপি নিভল।
হাসেম একটু নড়েচড়ে দোতারাটার ওপর আলগোছে একবার আঙুল বোলাল। আস্তে ডাকল-দাদী, ঘুমাইলা?
ওমরতুনের জবাব এলÑ না রে ভাই : এই পোড়া চোখে সহজে কি ঘুম আহে?
: তয় শুইয়া শুইয়া কী ভাব?
দীর্ঘনিঃশ্বাস ভেসে এলÑ ‘ভাবি আমায় কপালের দুঃখুর কথা। কী আছিলাম কী হইলাম। কোথায় থনে কোথায় আইলাম। আহা রে নিদয়াল বিধি।’
হাসেমের দোতারা থেকে আবার আলগা কয়েকটা টুংটাং মৃদু শব্দ উঠল।
Ñ আইচ্ছা দাদী নুরুল্লাপুরের ধামাইলের কথা তোমার মনে আছে?
Ñ থাকব না ক্যান? নুরুল্লাপুরের ফকির বাড়ি মুরিদ না আমরা! পদ্মার এইপার আর হেইপার। এমনে তো অসুখে-বিসুখে কতবার গেছি। ছইয়ালা নায়ে গাঙ পার হইয়া নায়ে থনে ডুলিতে উইঠা ফহিরর থানে গেছি। এমুন কী আর আছিলাম রে ভাই... কত ইজ্জত কতো মান... পরপুরুষে হাতের আঙুলও দ্যাহে নাই। ঘাটে থনে পানি তুইলা দিছে মাইনষে, সুবারি ডাউগা ঘিরা গোছলখানায় নাইছি...। জয়নাইলার দাদায় আছিল মাতবর। কত ধান, পাট সরিষা আইছে বাড়িতে। আমি বড় কোনো কাম করছি নি? মানুষ দিয়া করাইছি সব কাম। আহারে...
একটা বড় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল ওমরতুন। তারপর আপন মনেই যেন বলে চলল- যে বছর বড় তুফান হইল... হেই যে ছাব্বিশ সনের তুফান, তার আগের বছর হইল জয়নাইলার বাপ। সেই পোলা সেয়ানা হইল, বিয়া দিলাম। তারপরে দ্যাশে আইল আকাল। জয়নাইলা তখন ছোডি ঘরে। হেই ছোডি ঘরের পোলা থুইয়া মরল মায়। পরের বছর হাপে থাইল জয়নাইলার বাপেরে। আহা...
একটু নীরব হলো ওমরতুন।
বাড়িটা প্রায় নিঃশব্দ হয়ে এসেছে। ময়না চুল বেঁধে টুকটাক কী কাজ সারছে। সোনাবড়–র দরজায় এখনো তালা। খালেকের বউয়ের বিনিয়ে বিনিয়ে কান্না নীরব হয়েছে। মাঝে মাঝে কাশর শব্দ আসছে ফুলজানের ঘর থেকে। কাশছে আকবর শেখ। হাইসমা তারের ওপর মৃদু টুংটাং শব্দ করতে করতে বলল. হেই পদ্মা। হেই গাঙ। ঢেউয়ে এ পার ভাইঙ্গা ওই পারে নেয়... তবুও কতো ভালো লাগছে হেই গাঙ। আমাগো হেই গাঙ।
মনের ওপর দিয়ে যেন ছবি ভেসে যেতে লাগল হাসেমের। পাঙপারের সেই নরম নরম কালো বালি। তার পায়ে এসে ঢেউয়ের পরে ঢেউ আছাড়ি পিছাড়ি খায়। আর সারাটা গাঙের বুকে অসংখ্য নৌকা নানা রঙের বাদাম উড়িয়ে উজানে ভাইটালে যাওয়া আসা করে। হুইসেলের ভোঁ বাজিয়ে জেলে-নৌকাগুলোকে হুঁসিয়ার করে দিতে দিতে নদীর জলে প্রবল আলোড়ন তুলে চলে গোয়ালন্দ, চাঁদপুর নারায়ণগঞ্জগামী স্টিমার। চলে যাওয়া স্টিমারের চাকায় কখনো কচুরিপানা পিষ্ট হয়। আর পিছনের আলোড়িত ঢেউয়ের মাথা থেকে প্রবল আছাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে ডিঙিনৌকাগুলো আরেক ঢেউয়ের মাথায়। এই নদীকে ঘিরেই যত কোলাহল, যত ব্যস্ততা। বর্ষার সে নদী কালনাগিনীর মতো ফুলে ওঠে। ওপারে ফরিদপুর জেলার চরের রেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। কেবল অসীম জল দুরন্ত মাতামাতিতে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তারিত হয়। বর্ষায় পদ্মার কী ভীষণ রূপ ছিল। ভাঙাগড়ার খেলার সে তখন সর্বনাশী। সেই নদীই আবার হেমন্তে হয়ে আসে ¯িœগ্ধা। আকাশের নীলের মতো তার শরীরটা নীলাম্বরী শাড়ি হয়ে এঁকেবেঁকে সঙ্কুচিত হয়। নবজাতকের মতো নরম জল টলমল বুক নিয়ে এখানে ওখানে ওঠে নতুন চর।
আর এই নতুন চর কি কম ভয়ঙ্কর! চরের অধিকার নিয়ে দাঙ্গা ফৌজদারি... অধিকারের উন্মত্ত নেশায় প্রতিবছর ভয়াল হয়ে ওঠে এর দুই পারের বাসিন্দারা। উঃ সে কী কম উত্তেজনার।
ওমরতুন আবার ভাঙা গলায় কথা কয়ে উঠলÑ গাঙে আমার সব মিছিল তাতে আমি দুঃখিত আছিলাম নারে ভাই। মাইনষেরে কইছি পদ্মায় আমার জমিজিরাত খাইছে। কিন্তু আমার সাতরাজার ধন মানিক আমার জয়নাইলারে আল্লাহ বাঁচাইয়া রাখুক, আমার সব হইব আবার। আহা একলা ঘরে থুইয়া রান্ধবার যাই নাই। পাছে শিয়ালে খাটাশে মুখে কইরা লইয়া যায়। কোলে নিয়া রান্ধছি। বুকে বুকে চোখে চোখে রাখছি।
আবার থামল ওমরতুন।
হ্যাঁ। বুক দিয়েই তো আগলে রেখেছিল। এদিকে নদীতে ভেঙে নিয়েও জমিজমা যা ছিল তার ওয়ারিশ জয়নালের দাদা নাতিকেই করে গিয়েছিল। চাচাতো দেওর, ভাসুর, ভাসুর-পুতেরা বিষনজরে দেখত জয়নালকে। ওমরতুনের ভয়ের অন্ত ছিল না। কী জানি কখন ছেলেটাকে পথেঘাটে একা পেয়ে ধরে খুন করে গাঙে ভাসিয়ে দেয়। একবার নুরুল্লাপুরে ধামাইলে গিয়েছিল জয়নাল। ফিরতে সন্ধ্যা উতরে গেল। ওমরতুন ভয়ে কাঠ। আর বুঝি জয়নাল জীবন্ত ফিরে আসতে পারবে না। বারবার নিষেধ করেছিল ওমরতুন একা যেতে। তবু শোনেনি ছেলে কথা। এদিকে মগরেবের নামাজে বসে কেঁদে খুন হলো ওমরতুন। মোনাজাত শেষ করে দুহাত তুলে রইল একইভাবে। দুচোখ বেয়ে পানি পড়ে জায়নামাজ ভিজে গেল। এমন সময় বাইর বাড়ির পুকুরপাড় থেকে জয়নালের ভয়ার্ত চিৎকার ভেসে এল : দাদী লো আমারে মাইর্যা ফালাইল।...
ও... দা... দী।’
চিলের মতো চিৎকার করে পাড়া জাগিয়ে ছুটে গেল ওমরতুন। ততক্ষণ আরো আশপাশের বাড়ি থেকে হ্যারিকেন, লুণ্ঠন, কুপি হাতে অনেকেই বেরিয়ে এসেছে। ছুটে গিয়ে দু’হাত দিয়ে জয়নালকে বুকে জাপটে ধরল ওমরতুন। মৃগী রুগীর মতো তখন ওমরতুনের বুকের ভিতর ঠকঠক করে কাঁপছে জয়নাল, কথা বলতে গিয়ে দাঁতের কম্পে জড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ বলল দানোয় পেয়েছে। কেউবা মত দিল জ্বিনপরীর বাতাস লেগেছে। তিন কুল পড়ে আয়াতুন কুরসী, দরুদ শরীফ পড়ে নাতিকে ফুঁ দিয়ে বুকে জড়িয়ে ঘরে নিয়ে এল ওমরতুন। একটু ধাতস্থ হতে ভীতকণ্ঠে জয়নাল নিজেই বললÑ ছোটদাদাভাই আর সমশের কাকা রামদাও আর ছ্যানি নিয়া আইসা ধরছিল আমারে।...’

(চলবে)