রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিনোদন / শঙ্খচিল
০৫/১৬/২০১৬

শঙ্খচিল

- তৃষা নাজমুন

সীমান্ত। রেডক্লিফ সাহেব বেশ বড় রকমের মাইন্ড গেইম খেলে অখ- ভারতে এমন একটি রেখা এঁকে দিয়েছিলেন, যা দিয়ে বড় বড় সব অঞ্চল যেমন বাংলা, পাঞ্জাব, কাশ্মীর ভাগ হয়ে গেল কেবলমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে। ভয়াবহ দাঙ্গাতে মারা গেল হাজারে হাজারে মানুষ। দেশভাগের সাথে সাথে মানুষের আবেগটাকেও চিড়ে দেয়া হলো এই সীমান্ত দিয়ে। শঙ্খচিল চলচ্চিত্রের শুরুতে আমরা দেখতে পাই নানান অনুষ্ঠানে, মেলায় দুই বাংলার মানুষের মিলনের আকুতি।
আবার রেডক্লিফের রেখা যে কেবল অপশক্তির হাস্যকর অপপ্রয়োগ তা বুঝতে পারি জোয়ানদের এক সাংবাদিকের বর্ণনায়। যেমন এক বাড়ির রান্নাঘর ভারতে তো শোবারঘর বাংলাদেশে, বাড়ির উঠোনে বাঁধা গরু বাংলাদেশে তো বাঁধা ছাগল ভারতের, এক গাছের গোড়া বাংলাদেশের তো ডালগুলো হয়তো ভারতের।
‘শঙ্খচিল’-এ দেখানো হয়েছে জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ভারতে যাওয়া। কাটাতাঁরের বেড়া পার হবার সময়; কি শিশু, কি কিশোর, কি বৃদ্ধ অকাতরে অমানবিকভাবে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলছে বিএসএফ। আবার তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করা হলে এর কোনো সদুত্তর নাই। কবেকার রেডক্লিফের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যায় সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী।এখানে গৌতম ঘোষ অসাধারণভাবে নিজের দেশের এই দিকটি তুলে ধরেছেন। সীমান্ত আইন যতই কড়া হোক এর অমানবিক দিকটি তুলে ধরা অতি প্রয়োজনীয় ছিল।
চলচ্চিত্রের মধ্যে প্রবলভাবে দাগ কাটে দেশ ভাগের ব্যাপারটি। যদিও চলচ্চিত্রের মূলধারা দেশভাগকে ছাপিয়ে বাংলা ভাগ। একই দেশের সুখে শান্তিতে বসবাস করা মানুষ যারা কিনা এক ভাষাভাষী, যাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-অনুষ্ঠান, বাংলায়। তাদের মাঝে একটি দেয়াল তুলে দেয়া হলো নাম - ‘হিন্দু-মুসলমান’। ধর্মের নাম দিয়ে এত বছরের প্রাচীন বাংলা সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো।
সিনেমার বিষয় বেশ স্পর্শকাতর, বাংলাদেশ ভারতসীমান্ত সমস্যা। এখানে শুধু যে সমস্যাগুলোই দেখানো হয়েছে তা না, এর পিছনের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টাও করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার বাংলাদেশের একটি পরিবার বাদল সাহেবের। পেশায় একজন শিক্ষক। পরিবারে রয়েছে স্ত্রী লায়লা এবং একটি কন্যাসন্তান রূপসা। রূপসা আগাগোড়া মিষ্টি আর পাগলাটে স্বভাবের। সারাদিন আতসীকাচের ভেতর দিয়ে সব দেখে, বাড়িতে রান্না করা জন্য মাছ আনলে সে সুযোগ পেলে মাছ পুকুরে ছেড়ে দেয়। মাংস পাতে দিলে কান্না করে। হঠাৎ এই মেয়ের শরীরের বাসা বাঁধে এক ব্যাধি। যার চিকিৎসার জন্য যেতে হবে ভালো হাসপাতালে। কিন্তু হাতে বেশি সময়ও নেই। দুঃসময়ের হিসেবে কাকের চিৎকার দেখনো হয়।
সময়টা মেয়েটার জীবন বাঁচানোর জন্য মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার তুলনায় কলকাতার দূরত্ব কম হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বাবার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতায়
অবৈধভাবে কলকাতায় পাড়ি জমায়, প্রধান শিক্ষকের পরিচিত কলকাতার এক গণ্যমান্য ব্যাক্তির বাসায়। সেখানে চিকিৎসা করাতে গিয়ে নাম, ধর্ম, ঠিকানা ইত্যাদি সবই পরিবর্তন করতে হয়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়ের সুস্থতার জন্য সবই করে বাবা মা। কলকাতা শহর, যেখানে শুকনো গাছে উড়ে বেড়ায় অজগ্র কাক। শহরের রুক্ষ, রূঢ় পরিবেশে হারিয়ে যায় বাবার আর্তি, মায়ের কান্না। তাদের হাহাকার মিশে যায় কাকেদের কর্কশ চিৎকারে। রাস্তায় পড়ে থাকা নিকাশি পাইপের অতলান্ত গভীরে যেন ঢুকে যায় বাদলের জীবন। তার পরেও বাদল স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু চিকিৎসা সফল না হওয়ায় মেয়েটি মারা যায় এবং ঘটনাক্রমে তাদের পরিচয় বেরিয়ে আসে। মেয়েটির বাবা মাকে গ্রেপ্তার করা হয় তবে তাদের অনুরোধে মেয়েটির লাশ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। বাবা-মা ছাড়াই এলাকার লোকজন মেয়েটির দাফন সম্পন্ন করে আর ও দিকে বাবা-মা কে কলকাতার জেলে পাঠানো হয়। এমনই একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার মাধ্যমে শেষ হয় ছবিটির গল্প।
সীমানা পেরিয়ে শঙ্খচিল উড়তে উড়তে চলে যায় অনেক দূরে। আর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে সীমান্তের কাঁটাতার। এই ছবিতে রূপসার চরিত্রটা তো মুক্ত শঙ্খচিলের মতোই। যে কিনা সব সীমানা পার হয়ে মুক্ত আকাশে উড়ে যেতে চায়, রূপসার মধ্যে একটা উচ্ছ্বাস আছে, যেটা শঙ্খচিলের উড়ানের মতোই দুরন্ত।
ছবির জনপ্রিয়তার একটা বড় কারণ প্রসেনজিৎ-র হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া অভিনয়, অসাধারণ গল্প, অনবদ্য পরিচালনা। সাঁঝবাতি আর কুশুম শিকদারের অভিনয় মনে রাখার মতো।
সিনেমা ভালো লাগার বড় কারণ সিনেমাটোগ্রাফি। অসাধারণ ভাবে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের প্রকৃতি। নদী, কুয়াশাভরা আকাশ, মেঠোপথ, জলজঙ্গল, পাখ-পাখালি, অসাধারণ বজ্রপাত, নদীর উত্তালতা, দুঃসময়ের হিসেবে কাকের চিৎকার দেখানো সবই যেন জলছবির মতো ফুটে উঠেছে গৌতম ঘোষের ক্যামেরায়।
কোনো এক রেডক্লিফ সাহেব দুই বাংলার ক্ষেত, নদী, গ্রামের মধ্যে দিয়ে টেনে দিল রাজনৈতিক এক সীমারেখা আর আলাদা হয়ে গেল দুটি দেশ। কিন্তু আলাদা করা গেল না মাটির টান, সেই ক্ষতর জ্বালা যা আজও দগদগ করে বিরাজ করে দুই বাংলার মানুষের মনের চোরাকুঠুরিতে... ছবির সঙ্গে মিশে গিয়েছে সেই সব হারানোর বেদনা -- এই বেদনা বাঙালির খুব চেনা।

শঙ্খচিল
পরিচালক : গৌতম ঘোষ
প্রযোজক : মৌ রায় চৌধুরী, হাবিবুর রহমান খান, প্রসেনজিৎ, ফরিদুর রেজা সাগর
কাহিনী : সায়ন্তনী পুততুণ্ড
অভিনয় : প্রসেনজিৎ, কুসুম সিকদার, অনুম রহমান খান (সাঁঝবাতি), মামুনুর রশিদ, দীপঙ্কর দে, প্রবীর মিত্র, শাহেদ আলী, রিয়াজ মাহমুদ জুয়েল, রোজী সিদ্দিকী, অরিন্দম শীল এবং আরো অনেকে।
ব্যাপ্তি : ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট