বৃহস্পতিবার,২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মন্দ্রসপ্তক’
০৫/১৬/২০১৬

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মন্দ্রসপ্তক’

- মোজাফ্ফর হোসেন

একুশে বইমেলা ২০১৬-তে বেহুলা বাংলা প্রকাশনী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ৭১টি উপন্যাস প্রকাশ করার প্রকল্প হাতে নেই। এই প্রকল্পের অধীনে প্রকাশিত হয়েছে ‘মন্দ্রসপ্তক’ উপন্যাসটি। লেখক মণিকা চক্রবর্তী। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া একটি বাস্তবসত্যকে অবলম্বন করে উপন্যাসটি লিখেছেন লেখক।
উপন্যাসটির গল্প মোটামুটিভাবে দুটি সময়কে নিয়ে। একটি বর্তমান কাল আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকাল। একাল থেকে লেখক তার মূল চরিত্রের স্মৃতি ধরে তিনি সেকালে যাচ্ছেন। সেই যাওয়াটার একটা কারণ আছে। গল্পের প্রধান চরিত্র একজন নারী, মা হোসনে আরা। একাকী স্বাধীন দেশে বাস করছেন। স্বামী মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কিছুকাল আগে তার মৃত্যু হয়েছে। ছেলে থেকেও নেই। সে এখন সংসার নিয়ে কানাডায় আছে। ছেলে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ। বেড়ে ওঠার কালে দেশে নানা অসঙ্গতি দেখে হতাশ হয়ে দেশ ছেড়েছে। তার কাছে মুক্তিযুদ্ধ কোনো অর্থবহ ঘটনা হয়ে উঠতে পারেনি। স্বাধীন দেশের অনেক তরুণের মতোই দেশের পড়াশুনা করে উন্নত জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে বিদেশে চলে গেছে।

স্বামী এবং সন্তান হারানোটা হোসনে আরার মানসিক ক্ষত। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা শারীরিক ক্ষতও তার আছে। যুদ্ধের সময় একটি নির্মম নিষ্ঠুর ঘটনার সাক্ষী হয়ে এখনো প্রতিনিয়ত পীড়া দেয় তার একটি হাত। সেই ক্ষত এখন ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। হাতটা কেটে ফেলতে চাইতেন না হোসনে আরা কারণ তিনি হাতের ক্ষতটাকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভেবে আগলে রাখতে চাইতেন। হাত কেটে ফেলতে হবে ভেবে মাঝে মধ্যে আত্মহত্যার কথাও ভাবতেন। মোটামুটিভাবে এই হলো হোসনে আরার একালের গল্প।

এরপর ফ্ল্যাশব্যাকে জানতে পারা যায়, হোসনে আরার হাত পোড়ার ইতিহাস। পাকসৈন্যরা পাবনায় হোসনে আরাদের বাড়িতে হানা দিল। সকলে যে যার মতো লুকিয়ে পড়লো। নারীরা বেশি দূরে পালাতে না পেরে পাশে কোথাও ওঁত নিলো। হোসনে আরা খড়ের গাদার ভেতর আশ্রয় নেন। বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকে পরিবারের এক শিশু আর ঘরে শাশুড়ি। পাকসৈন্যরা চলে গেলে খড়ের ভেতর থেকে হোসনে আরা বেরিয়ে এসে দেখে শাশুড়ি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে। শিশুটি উঠোনের কোথাও নেই। চুলোতে একহাঁড়ি ভাত ফুটছিল। বাড়িতে কাউকে না পেয়ে ওরা শিশুটিকে ভাতের হাঁড়ির মধ্যে ফেলে চলে যায়। রাহেলা ফুটন্ত পানিতে হাত চুবিয়ে গলে যাওয়া শিশুটিকে তোলে। মোটামুটি এই হলো যুদ্ধদিনের ঘটনা।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে চমৎকারভাবে। শুরুর প্যারাটা পড়ে মনে হয় খুব উপভোগ্য একটা উপন্যাস হবে। কিন্তু একটু পরেই খেই হারিয়ে ফেলেছেন লেখক। উপন্যাসে অপ্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা হচ্ছে কোথাও কোথাও। যেমন উপন্যাসের শুরুর দিকে ১০ পৃষ্ঠায় হোসনে আরা নিজের ভেতর অদ্ভুত এক তাড়না অনুভব করেন ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলবেন বলে। কারণ ছেলে কয়েকদিনের মধ্যে বিদেশ চলে যাবে। ছেলের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। এরপর হোসনে আরা কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বয়ান করেন। পাঠকের এটা জানা ইতিহাস, তাই ক্লান্তিবোধ হওয়া স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে প্রশ্নও জাগবে, মুক্তিযুদ্ধের এই মৌলিক ইতিহাস হোসনে আরার ছেলে সাগর এখনো জানে না কেন? বিশেষ করে তার পরিবার যেখানে মুক্তিযুদ্ধের নির্মম শিকার। তার তো ইতিহাসটা জানা উচিত। না জানলে তার দায় হোসনে আরা এড়াতে পারেন না।

উপন্যাসের শেষ মুহূর্তে অনাকাক্সিক্ষত চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন অমিয়নাথের চরিত্রটি। সবমিলে এই উপন্যাসে কোনো চরিত্রই ঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই উপন্যাসের প্রসঙ্গ ধরে বলি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাসটা লেখা হয়েছে পুরুষদের দৃষ্টিকোণ থেকে। সেটা সাহিত্য বলি আর হিস্ট্রিই বলি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বাংলার নারীদের যে সম্পর্ক সেটি ঠিকভাবে আসেনি। সবাই কেবল ত্যাগের কথা বলেছেন। যুদ্ধে নারীরা নির্যাতিত হয়েছে, এই কথাটাই বারবার বলতে চেয়েছেন। নারীরাও পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে একাত্তর দেখে আসছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের নারীর যে মানসিক ক্ষত সেটি ইতিহাসে আসেনি। লিসিসট্রাট্রা [গ্রীকড্রামা লিসিসট্রাটার নামচরিত্র] যখন বলছেন, ওয়ার ইজ কনসার্নড উইথ উইমেন; তখন কিন্তু যুদ্ধময়দানে নারীদের আক্রান্ত হওয়া বা সংগ্রামের কথা বলছেন না। তিনি বলতে চাইছেন যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে নারীরা যে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত এবং সেটার ইমপ্যাক্ট অনির্দিষ্টকাল ধরে চলমান, তার কথা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আক্রান্ত নারীদের যুদ্ধটা কিন্তু শেষ হয়নি। এখন এই ইতিহাসটা নারীদের লিখতে হবে। কারণ অন্যকেউ লিখলে তা বিকৃত হবেই। যে কারণে মণিকা চক্রবর্তী যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কলম ধরেছেন তার একটা অন্য গুরুত্ব আছে।


মন্দ্রসপ্তক

মণিকা চক্রবর্তী
প্রকাশক : বেহুলা বাংলা
দাম : ১৩৫ টাকা।