রবিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মঞ্চ: ‘গহর বাদশা ও বানেছা পরী’
০৫/১৬/২০১৬

মঞ্চ: ‘গহর বাদশা ও বানেছা পরী’

- আবু সাঈদ তুলু

আবহমান বাংলার গ্রামীণ সমাজে বহুল প্রচলিত গাথা অবলম্বনে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নতুন নাটক ‘গহর বাদশা ও বানেছা পরী’। নির্দেশনা দিয়েছেন দলের কর্মী হৃদি হক। নাটকটির গল্প উপস্থাপন, অভিনয়, আবহসংগীত, কোরিওগ্রাফি সবমিলিয়ে উচ্ছসিত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি হাজার বছরের প্রাচীন হলেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এ দেশীয় নিজস্ব সংস্কৃতির ভিতকে চ্যুত করতেই তৎপর ছিল। ‘ফোক’ তত্ত্বের আড়ালে দেশীয় শিল্প আজ বন্দি। নাগরিক নাট্যাঙ্গনের বাংলার প্রচলিত এ গাথা উপস্থাপনে বৈশ্বিক শিল্পচেতনায় নাটকটিকে পৌঁছে দিয়েছে শিল্প সৌন্দর্যের অনন্যতায়। একজন নারী নির্দেশকের প্রথম কাজ হিসেবে এত বহুমাত্রিক সমন্বয় অত্যন্ত দুরূহ ছিল।

নাটকটির কাহিনীতে দেখা যায়- বাদশা বিশ্বিং এসেছিলেন শিকার করতে। সারা বন খুঁজে শিকার না পেয়ে পরিশ্রান্ত বাদশা দোষ দিচ্ছিলেন নিজের ভাগ্যকে। ঠিক তখনই অদূর জলাশয়ে হরিণশাবকের আগমন অনুমান করে তীর ছোড়েন। পরক্ষণেই মানবসন্তানের কান্না বুঝিয়ে দেয় তিনি হরিণ শাবক নয়; মনুষ্য সন্তানকে হত্যা করেছেন। অন্ধমুনি অভিশাপ দেন-সন্তান হারানোর কষ্ট তাকেও বইতে হবে। সেই অভিশাপের পর দুই পুত্রের মুখ দেখার সৌভাগ্য হয় বাদশার। প্রথম সন্তানের নাম রাখেন গহর ও দ্বিতীয় সন্তানের নাম সনাতন। রাজ্যজুড়ে যখন আনন্দের বন্যা বাদশার মনে সন্তান হারানোর ভয়। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সন্তানদ্বয়। কিন্তু বাদশা তার নিয়তিকে আটকে রাখতে পারেন না। বার বছর বয়সে বিশ্বিং যখন বড় ছেলে গহরকে রাজ্যের অধিপতি করে, তখন উজিরের চক্রান্তে গহর বনে শিকার করতে যায়। বনে গিয়ে গহর বন্দি হয় বিশ্বিং দানবের হাতে। উজির প্রচার রাজপ্রসাদে প্রচার করে গহরকে বাঘে খেয়েছে। রাজা বিশ্বিং শোকে আত্মহত্যা করে। রানী ও ছোটসন্তান সনাতনকে বন্দি করে রাজক্ষমতা দখল করে উজিত। দানবের হাত থেকে রেহাই পেলেও বানেছা পরীর প্রেমবাণে উন্মাদ হয়ে ওঠেন গহর। অনেক কৌশল, ত্যাগ, বাধা বিপত্তি পেরিয়ে পরীস্থানে পৌঁছায় গহর। অনেক কৌশলে লাভ করে বানেছাকে। বহু যুদ্ধ ও সংগ্রাম পেরিয়ে বানেছাকে নিয়ে রাজ্যে ফিরে গহর। কিন্তু ততদিনে রাজ্য উজিরের দখলে। অবশেষে নানা দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বুদ্ধি, মেধা ও কৌশলে জয় করে তার রাজ্য। এভাবেই কাহিনী এগিয়ে চলে।

নাটকটি উপস্থাপন করা হয়েছে প্রসেনিয়াম মঞ্চধারায়। যদিও বিষয়বস্তুটি পালা উপস্থাপনের মতো চারদিকে দর্শকবেষ্টিত মঞ্চে উপস্থাপনের দাবী রাখে।
উপস্থাপনায় নির্দেশকের বিস্তৃত কল্পনা, নাটকীয়তা, নৈর্ব্যক্তিক নানা শৈল্পিক মাত্রা লক্ষ্য করা যায়।

সাধারণত গাথাগুলোর কাহিনি পরম্পরায় যুক্তিহীনতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু নাগরিক নাট্যাঙ্গনের এ প্রযোজনায় গল্পের উপস্থাপনে তেমন কোনো হালকাবোধ কিংবা হেঁয়ালি মনে হয় নি। কাহিনি উপস্থাপন পরম্পরা অত্যন্ত টানটান ও চমৎকার। উক্তি-প্রত্যুক্তি বা সংলাপগুলোও অত্যন্ত পরিমিত। নির্দেশক শুধু অধিক প্রয়োজনীয় সংলাপগুলোই ব্যবহার করেছেন। প্রায় প্রত্যেকের অভিনয়ই অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং শৈল্পিক। অধিকাংশ চরিত্রের মধ্যে বাচিক প্রক্ষেপণ ও মুড্যুলেশনও ছিল চমৎকার। মঞ্চে বিভিন্ন দৃশ্য উপস্থাপনে পর্দা, সাজেশন ও আলোর ব্যবহারে অনবদ্য ভালোলাগা করেছে। কোরিওগ্রাফিও পরিমিতিবোধসম্পন্ন। রেকর্ডকৃত ডিজিটাল মিউজিক সিনেমাটিক একটি ফ্রেভার তৈরি করেছে। সাথে লাইভ কণ্ঠসংগীতের ব্যবহারও হয়েছে। পোশাক পরিকল্পনাও অসাধারণ। নাটকটিতে রঙের ব্যবহার অত্যন্ত ভালোলাগা তৈরি করেছে। টিমওয়ার্ক অসাধারণ। নাচ-গান-অভিনয় সবমিলে অত্যন্ত শৈল্পিক প্রযোজনা। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।