রবিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর-(চতুর্থ-পর্ব)
০৫/১৬/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর-(চতুর্থ-পর্ব)

- রিজিয়া রহমান

খাটালে চাটাই পেতে দুজন অচেনা পুরুষ চা খাচ্ছিল। ময়না নিজেও একটা গ্লাসে চা খেতে-খেতে হাসি-গল্পে মেতে ছিল। তবু এর মধ্যে থেকেই গলা উঁচিয়ে ঝকঝকে একসারি দাঁতের হাসি দেখিয়ে উত্তর দিল : ‘আমরার দ্যাশের মানুষ। হেইথনের তালতোভাই লাগে।’ ক্ষিপ্র জবাব সেরে ময়না আবার গল্পে মাতল।
‘হেইথন অর্থাৎ বিশা মোল্লা! হুঃ তালতো ভাই না ছাই! কোনো পেয়ারের লোক হবে হয়তো। ঘরে ফিরতে ফিরতে মনে মনে গজগজ করল ফুলজান। ময়নার হাতের ঝকঝকে করে মাজা হ্যারিকেনের চিমনির আলোয় ময়নার আঁট করে বাঁধা বড়সড় খোঁপা, গলায় রুপোর হাঁসুলী, কানের চাঁদ মাকড়ি আর ডাঁশা ফলের মতো সুডৌল মুখটি মনে হতে ফুলজানের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
ঘরে ফিরে মেজাজ আরো সপ্তমে উঠল। জোলেখার মার ঘরে গোলমালের শব্দ পেয়ে ছুটে যাবার সময় ভাতের হাঁড়ির মুখ থেকে সরাটা নামিয়ে দিয়ে যায়নি। ইতিমধ্যে ভাত উথলে চুলো গেছে নিভে। ওদিকে ভাতের ফ্যান পড়ে চারহাতি ঘরের আধখানা ভিজে চুলোর জ্বালানি কাঠকুটো পাতাগুলও প্রায় ভিজে গেছে। ফুলজানের সাত বছরের মেয়েটা নিভন্ত চুলোয় উবু হয়ে ফুঁ দিয়ে দিয়ে দুচোখ লাল করেছে। ছোট ছেলেদুটো দরজার পাশে বসে একঘেয়ে নাকিকান্না কেঁদে চলেছে। তদের বাপ চট বিছিয়ে শুয়ে বিড়ি টানছে আর কাশছে অনরবত। সহ্য হলো না ফুলজানের আর। ছুটে স্বামীর সামনে গিয়ে অসহ্য ক্রোধে চেঁচিয়ে উঠল : চক্ষু দুইডা কী আল্লাহতালায় আন্ধা কইরে দেছে? চুলোয় ফ্যান পইড়ে আগুন নেভছে। একটু উইঠে দেখতি পার নাই? অহন ভাত খাবে নে কোনথে?
কাশতে কাশতে জ¦লন্ত বিড়ির শেষাংশটুকু বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠে বসল ফুলজানের স্বামী আকবর শেখ।
: চোপ মাগী! কথা কতি আসবি নে। চুলোয় রাইঙ বসায়ে নিজি গেছো নাঙ খোঁজবার। বোজঝাস আমি কিছু খবর রাহি না। রাখ, ভালো হইয়ে তরে রাম দাও দে কুচি কুচি করব নে।
ফুলজানের দু-চোখে যেন আগুন ছিটকে উঠল : ‘খবরদার, কথা কবি নে। মাগীর রোজগার খাইতি শরম নাগে না। উহ্্, রামদাও দে কাটবে? পাইছ কী? বইসে বইসে খাবে আর আমার কলিজা জ্বালাইবে। তা হবিনানে। কিনা কয়, ভাত দেবার ভাতার না কিল মারার গোসাই। উহ্ চোট কত?
উদ্যত একটা কাশির বেগ চেপে উঠে দাঁড়াল আকবর শেখ। আচমকা চুলের মুঠি চেপে ধরে গুমগুম কয়েকটা কিলচড় বসাল ফুলজানের পিঠে। এক ঝাপটায় নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ফুঁসল কতোক্ষণ। আকবর আবার এসে লাথি ছুড়ল ফুলজানের তলপেট লক্ষ্য করে। কিন্তু তার আগেই সামলে নিল ফুলজান। দুহাত দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিল আকবরকে। রুগ্ণ উপবাসী আকবর পারল না অপরপক্ষের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে। টলে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ফ্যানে ভেজা কাদা হওয়া মাটির ওপর। সেইসঙ্গে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে গেল প্রচ- কাশির দমকে তার বক্ষপঞ্জরসর্বস্ব দেহটা। সাত বছরের মেয়ে গেদীই প্রথম ভীত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল : রক্ত! মা! বাবার গাল বাইয়া রক্ত পইড়বার নাগছে। ইশ কত রক্ত!
ছোট ছেলে দুটির একঘেয়ে কান্না মা-বাবার পরস্পর আক্রমণের তা-বে থেমে গিয়েছিল। গেদীর চিৎকারে ভয় পেয়ে আবার কেঁদে উঠল তারা। আর ফুলজানের ক্রোধ-জ্বলন্ত শরীরটা নিমেষে যেন হিম হয়ে গেল। মুহূর্তে সে কর্তব্য স্থির করে নিল। এক ঝটকায় ঘরের ঝাপ টেনে বন্ধ করে দিয়ে মেয়ের দিকে ইঙ্গিতসূচক আঙুলি হেনে চুপ করতে বলল। ঠোঁঠের ওপর আঙুল রাখা মায়ের নিষেধাজ্ঞা বিজ্ঞতার সঙ্গে মেনে নিল গেদী। এই বয়সেই সে জানে, তার বাবার এমন কেটা রাগ আছে, যে রোগটা জানাজানি হয়ে গেলে এ বাড়িতে তাদের আর ঠাঁই হবে না। বাড়িয়ালা সেদিনই তাদের পথে বের করবে। তার বাবার দেশে থাকতে কাশির সঙ্গে যে রক্ত পড়ত, সে কথা সে মায়ের নির্দেশানুযায়ী যথাসম্ভব গোপন রেখেছে। তার খেলার সঙ্গিনী, এমনকি প্রাণের বন্ধু বাতাসীকেও বলেনি। অবশ্য শুনেছে, বাতাসীর বাবাও এরকম কী একটা রোগে মুখ দিয়ে রক্ত তুলতে তুলতে মারা গেছে। ওরা নাকি অনেক চিকিৎসা করেছিল। বাতাসীর মা নাকি হাতের বাতানা আর গলার সোনার মাদুলি হার বেঁচে দাউদকান্দি থেকে বড় ডাক্তার এনেছিল। সে বড় ডাক্তারও বাতাসীর বাপকে ভালো করতে পারেনি। বলেছিল ঢাকায় নিয়ে আসতে। ঢাকায় আনতে পারার ব্যবস্থা করে উঠবার আগেই বাতাসীর বাবা একদিন কাশির সঙ্গে লাল টকটকে তাজা রক্ত তুলে মারা গিয়েছে।
গেদীর ছোট্ট শরীরটাতে কেমন অচেনা ভয়ঙ্কর একটা ভয় তড়িৎ প্রবাহের মতো সঞ্চালিত হয়ে গেল। যদি তার বাবাও বাতাসীর বাবার মতো এখন...। আর ভাবতে পারল না স্ েতার ছোট ঠোঁট দুটি অসহায় কান্নার বেগ সামলাতে গিয়ে মুচড়ে গেল। ক্ষুদ্র পায়বার মতো ধুকপুক করতে লাগল বুকটা অনিশ্চিত আশঙ্কায়। ওদিকে ফুলজান তখন দ্রুত হাতে শাড়ির আঁচল দিয়ে স্বামীর গালের কস বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছিয়ে দিয়েছে। দুর্বর হাড়সর্বস্ব আঁকাবাঁকা শরীরটাকে কোনোরকম তুলে চটের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গেদীকে নির্দেশ দিল : যা তো গেদী, দৌঁড়ায়ে মোড়ের গণি মিয়ার দোহানথে দুই আনার সাগু কর্জ আন। কইস, মা কাইল পয়সা দিয়ে দেবানে।
গেদী ঝাপ খুলে এক ছুটে বেরিয়ে গেল। ক্রন্দনরত ছেলে দুটির দিকে তাকিয়ে ফুলজান কোমল কণ্ঠে বলল : কাইন্দ না সোনারা। এটটু সবুর কর ভাত দেবানি।
স্বামীকে শুইয়ে দিয়ে ফুলজান উঠে চালের বাতায় ঝুলিয়ে রাখা বর্ষার সঞ্চিত জ্বালানি ঘুঁটের বস্তা থেকে দুখানা ঘুঁটে বের করে মাটির মালসায় আধখানা নারকেলের ছোবড়া আর একমুঠো কাঠকয়লা দিয়ে পাতা জ্বালিয়ে তাতে একটু আগুন ফেলে ক্ষিপ্র দক্ষতায় কয়েক পলকে ‘আইলা’ জ্বালিয়ে এনে স্বামীর পায়ের কাছে রাখল। এ আগুনে হয়তো ঘরটার স্যাঁতসেঁতে ভাব কমবে। রোগী আরাম পাবে। তারপর পলকে চুলোর আগুন জীবন্ত করে একটা ছেঁড়া চট দিয়ে মাটির মেঝে থেকে ‘ফ্যান মুছে কিছুটা শুকনো করল।
এই কাজগুলো সারল ফুলজান ঝড়ের ক্ষিপ্রতায়। চুলোয় আবার টগবগিয়ে উঠল ভাতের হাঁড়ি। ফুলজান স্বামীর মাথার কাছে এসে বসে বুকে হাত বুলাতে লাগল নীরবে। মাংসহীন সারি সারি বাঁকানো পাঁজর হাড়ের ওপর চামড়ায় ঢাকা বুক। ফুলজান ভাবতে পারল না, এই শীর্ণ বৃদ্ধত্ব প্রাপ্ত বুকটির বয়স মাত্র ছত্রিশটা বছর। একি সেই বুক! যে বুকে একদিন নাকে নথ, গলায় হাঁসুলি, কোমরে বিছে আর দুই পায়ে খাড়–র বিচিত্র মধুর শিঞ্জন তুলে বারো বছরের ফুলজান এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এই বুকই কি একদিন পেশি-উদ্ধত সিংহের বুকের মতো বাইশ বছরের যৌবনগর্বিত কৃষাণের বুক ছিল? যেখানে আশ্রয় নিয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী আর নিরাপদ মনে হয়েছে একদিন ফুলজানের। কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে ছেঁড়া-ছেঁড়া টুকরো টুকরো আকাশের নীল যেমন হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেয়, তেমনি এই বিপন্ন দিনের অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত ফুলজানের মনটাকে এক-একটি বেদনার ঢেউয়ে তোলপাড় করে বিগত মধুর এক-একখানি চিত্র ভেসে উঠতে লাগল।
সেই কবে একবার- ফুলজানের তখন প্রথম সন্তানেরও জন্ম হয়নি- পাছদুয়ারের চার মুখয়ালা রাবণের চিতার মতো গনগনে আগুন-ভরা চুলায় ধান সিজাচ্ছিল ফুলজান। বড় একটা বৈঠা দিয়ে গরম ভাপ-ওঠা ধানগুলোকে নেড়ে ওপিঠ-ওপিঠ করছিল। বেলা দুপুরের রৌদ্রে আলো ছিল, তাপ ছিল না। আকাশটা ছিল ঝলমলে নীল। ধান সিদ্ধ করতে করতে বারবার আনমনা হচ্ছিল ফুলজান। এই সময় ক্ষেতে হালটির কাজের মধ্যে একবার বাড়ি আসে আকবর ভাত খেতে। এই নিয়ে ননদদের ঠাট্টা আর জায়েদের গাত্রদাহের অন্ত ছিল না। টিপ্পনী কাটত তারা। নতুন বউ ফুলজান মাথা নিচু করে শরমে মাটিতে নুইয়ে যেত প্রায়। কারণ এ সময় ভাসুর শ্বশুর আর কেউ ক্ষেতের কাজ ফেলে বাড়ি আসে না। বাইরে লজ্জা পেলেও এই হেমন্তবেলার সোনালি প্রহরে ভ্রমরের মতো গুনগুন করে একটা প্রতীক্ষার আনন্দ তাকে চঞ্চল করে তুলত। অকারণে বারবার মাথার ঘোমটা খসিয়ে মাথায় কাপড় তুলে দেবার উছিলায় গ্রীবা বাঁকিয়ে ঘনঘন তাকাত উঠানের শেষ খড়ে-ছাওয়া মাটির দেয়ালের বাইরের আঙিনার দরজার দিকে। সেদিনও এমনি উন্মনা ছিল ফুলজান, চুলোর আঁচ কমে যাওয়ার একরাশ তুষ পায় ঠেলে চুলোর মুখে দিতে যাবার সময় আচমকা ক্ষেতের কাদামাটি মাখা দুটি বলিষ্ঠ হাত পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছিল পাখির পালকের মতো নরম ষোড়শী ফুলজানকে। আর হঠাৎ তাল রাখতে না পেরে ফুলজানের একটা পা ফসকে চলে গিয়েছিল একেবারে চুলোর মধ্যে। অস্ফুট চিৎকার করে ছটফটিয়ে উঠেছির ফুলজান। ইস্, সে যন্ত্রণার কথা আজও মনে করলে গায় কাঁটা দেয়। ভাগ্যি, ননদ-জায়েরা সে সময় পুকুরঘাটে ছিল। এক পলকে পাজা করে ফুলজানকে বুকে তুলে নিয়ে ঘরে ছুটে গিয়েছিল উদভ্রান্ত আকবর। প্রায় একমাস ধরে ফুলজানের পোড়া পায়ের ঘা সারাবার জন্য কী সেবা আর পরিশ্রমই না করেছিলে। আর পা পোড়ার মিথ্যে বলতে বলতে নাকাল হয়েছিল ফুলজান বাড়ির মানুষ আর পাহাপড়শীদের কাছে। আর একবার সেই কা-টাই না ঘটেছিল! মনে পড়লে হাসি আর ভয় দুটো বিচিত্র অনুভূতিতে মনটা দুলে ওঠে।
ভাদ্রের শেষ। খাল-বিলগাঙের পানিতে তখনো টান ধরেনি। পূর্ণযৌবন বর্ষা তখনো অপরূপ লাবণ্যে ভরপুর। এর মধ্যেই একদিনÑ সেদিন ছিল পূর্ণিম্ ারুপো-গলা আলো ছড়িয়ে শাদা মেঘের ঢাকনা ছিঁড়ে নিজেকে পরিপূর্ণ বিকশিত করেছিল গোল থালার মতো চাঁদ। ফুলজানের শ্বশুর সেবার ব্যাড়জাল ফেলেছে বড়গাঙে। ছেলেরা পালা করে রাত জেগে জাল পাহারা দেয়। সেদিন পালা পড়েছিল আকবরের। সন্ধ্যার পর খেয়েদেয়ে ডিঙি নিয়ে পাহারায় চলে গিয়েছল আকবর। এদিকে নির্ঘুম ফুলজানের বুকটায় শূন্যতার হাওয়া বইছিল। বাইরে ফুটফুটে জ্যোৎনা। রাতের হাওয়ায় গাছ-পালায় শোঁ শোঁ কান্নার মতো শব্দ। ঘরের বেড়ার ফুটো দিয়ে ছোটবড় নানা পরিধির গোলাকৃতি চাঁদের শাদা আলো এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে চাটায়ের উপরে নকশি কাঁথা দিয়ে পাতা ফুলজানের পরিপাটি বিছানা আর বালিশের ওপর, মুখ চেপে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ডুরে শাড়ি পরা ফুলজানের বঙ্কিম দেহ রেখার ওপর! তখন মাঝ রাত। অনেকক্ষণ জেগে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করার পর ফুলজানের চোখে একটু তন্দ্রা নেমেছে। হঠাৎ দরজায় মৃদু আঘাতের শব্দে চমকে জেগে ধড়মড় করে উঠে বসল ফুলজান। আবার টোকা- পরপর কয়েকটা টোকা। চীৎকার করে উঠতে গিয়ে থেমে গেল ফুলজান। আকবরের সাবধানী ফিসফিসে কথা শোনা গেল- ফুলুরে। আমি। দোয়ার খোল। ভয়ের পরিবর্তে এবার হাসির বুদ্বুদ উঠল ফুলজানের কণ্ঠ বেয়ে! অমন লম্বা চওড়া জোয়ানটা, সে এমন বউয়ের ন্যাওটা হয়! এক রাত বউকে ছেড়ে থাকতে পারল না। পালিয়ে এল। বিজয়িনীর মতো শাড়ির আঁচল লুটিয়ে সাবধানী হাতে দরজার খিল খুলল ফুলজান। সঙ্গে সঙ্গে একরাশ চাঁদের আলো এসে ফুলের মতো ছড়িয়ে পড়ল ফুলজানের মুখে, বুকে, নরম দুখানি পায়ের কাছে। ঘরে ঢুকে ফুলজানের সেই অপরূপ আলোছায়া মাখা শরীরটাকে দুহাত দিয়ে ঝপ কর বুকে তুলে নিল আকবর। তারপর অজর উত্তপ্ত আদরে ভরে দিতে লাগল ফুলজানের চোখ, ঠোঁট, মুখ, কপাল চিবুক, আর গুনগুন সুরে বলতে লাগল : ফুল, আমার ফুল/ আমার পরান, তরে থুইয়া আমি কই যাইমু। ফুলজান আমার ক্যামনে ক্যামনে... তরে ছাইড়ে...।
অজর আদর আর একটানা প্রেমগুঞ্জনের সুখে ফুলজান যেন বিবশ হয়ে গেল। এর মধ্যেই আকবরের বুক থেকে মাথা তুলে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল : দোয়ারডা খুইলে থুইছ। খিল দাও। কেউ যদি দেইখে ফ্যালায়?
হঠাৎ আদরের ¯রােত বন্ধ করে ফুলজানকে নিচে নামিয় দিল আকবর। তারপর ফুলজানের কানের কাছে মুখ নিয়ে অসম্ভব অথচ অপূর্ব একটা পরিকল্পনর কথা পেশ করল। শুনে বুকটা ভয় আর খুশিতে ধ্বক করে উঠল ফুলজানের। ভয়ে ভয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে রাজি হয়ে গেল ফুলজান শেষপর্যন্ত। চটপট ভেঙে পড়া খোঁপা জড়িয়ে বেঁধ নিল। শাড়ির আঁচল গাছকোমর করে জড়াল। তারপর চুপিচুপি ঘর থেকে দুজন বেরিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিল। টিপিটিপি পায় বার বাড়ির আঙিনা পার হলো। বার বাড়ির সামনে খামারের একধারে খড়ের পালান। তার ওপরে গিয়ে হেসে কুটি-কুটি হয়ে গড়িয়ে পড়ল ফুলজান। এমন দুঃসাহসিক অভিযান, এমন অপূর্ণ আনন্দের স্বাদ নীরবে কেমন করে সহ্য করবে? চাপা গলায় আকবরও হাসল। তারপর ফুলজানের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে কাছে টেনে এনে আর এক পশলা আদরের বৃষ্টি ঝরিয়ে বলল : ‘ন, আর কিডকিডাইয়া হাসিস না। কেডা শ্যাষে দেইখে ফ্যালাবে।’ ফুলজান যদিও হাসি বন্ধ করল। আকবরের হাত ধরে বাগানের পথ ধরে এগিয়ে যেতে যেতে বলল : দ্যাখবে তো কি হবিনে? আমি কী পরপুরুষের সাথে যাতিছি?
বাগান পার হয়ে হাকিম মোল্লার দহলিজ ঘর। সেখানে থেকে কে একজন লোক এগিয়ে আসছিল। ওদের দুজনের ছায়া-সম্ভবত ফুলজানের উড়ন্ত শাড়ির আঁচলের কোণা দেখে চেঁচিয়ে হেঁকে উঠল : কিডা রে ওহান দে যাবার নাইগছে? কিডা? কথা কয় না ক্যান?
আকবর জবাব না দিয়ে ফুলজানের হাত ধরে একছুটে হাকিম মোল্লার বাড়ির কবরখানার পাশে ঝাঁকড়া পেয়ারাগাছটার আড়ালে বসে পড়ল। প্রশ্নকারী হাকিম মোল্লার চাচা বুড়ো আবু মোল্লা। গোরস্তানের দিকে কাপড়ের আঁচলটা মিলিয়ে যেতে আবু মোল্লার হাতের লাঠি আর বদনা মাটিতে গড়ে গেল। কাঁপা কণ্ঠে বুড়ো চেঁচিয়ে উঠল : লা হাউলা কুয়াতা... আসতাগ ফিরুল্লা... লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদর...।
দরুদ, কলমা পড়তে পড়তে আবু মোল্লা বাড়ির দিকে পড়িমরি করে ছুট দিল। আবু মোল্লা বাড়ি ঢুকে যেতেই পেয়ারাগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ফুলজানের হাত ধরে আকবর ঊর্ধশ্বাসে ছুটল। একছুটে একেবারে বাগান পার হয়ে ক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে খালপাড়ে এসে হাজির। হিজল গাছের মোটা গুঁড়ির সঙ্গে ডিঙিটা বাধা ছিল। একলাফে ডিঙিতে নামল আকবর। তারপর এক হাত দিয়ে ডিঙির বাঁধনের দড়ি খুলতে খুলতে আর এক হাতে লুফে রি ফুলজাকে।
খালের ¯্রােতের উজানে লগি ঠেলতে ঠেলতে আকবর বলল : আবু মোল্লার আইজ জ্বর না আইসলি হয়! যা ডরাইছে বুড়ো।
ফুলজান হেসে গড়িয়ে পড়ল : উহ্ এ্যাতোঃও তুমি জানো!
চাঁদের আলোয় চারদিকে যেন বান ডেকেছে। জ্বলজ্বল করে জ্বলছে খালের পানি। এদিকে ওদিকে ডিঙি নিয়ে এলপাতাড়ি ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একসময় দুজনেরই যেন হুঁশ হলো। থালার মতো গোল চাঁদরটা লাল হয়ে পশ্চিমদিকের গাছপালার মাথায় হেলে পড়েছে। আর আকাশের রং ফিকে হয়ে আসছে। কী সর্বনাশ! দুজনে গল্পে এতক্ষণ এত মশগুল ছিল যে খেয়ালই করেনি ডিঙির মুখ বড় গাঙের দিকে মোটেও যায়নি। বরং তারা চলে এসেছে বিলের দিকে। সামনে দেখা যাচ্ছে কালো বিলের দিগন্ত-বিসারী ধুধু রেখা। ফুলজান ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরল আকবরকে : হায় হায়, এ কী করলা? কোহানে লইয়ে আইলে?
আকবরও যথেষ্ট ঘাবড়েছিল। কিন্তু কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ না ফুটিয়ে বলল : ছাড় দিহি। ঠিক হইয়ে বয়। আমি নাওডারে ঘুরাইয়া লই।
কে জানত, ডিঙিনৌকা ঘুরতে গিয়ে এই বিপত্তি হবে। সামনেই খালের পানির প্রচ- বেগে পাক খেয়ে ঘূর্ণি¯রাতের সৃষ্টি করেছে। আর সেই ¯রাতের ঘূর্ণি প্রবল বেগে ছুটে চলেছে বিলের কালো জলের দিকে। আচমকা ঘূর্ণির মুখে পড়েই ডিঙিটা প্রচ- বেগে পাক খেয়ে ঘুরে গেল। আর আলগা হয়ে বসে থাকা ফুলজান তাল সামলাতে না পেরে সরু ডিঙিনৌকা থেকে ছিটকে পড়ে গেল পানিতে। মুহূর্তে ঘটে গেল ঘটনাটা। লগি ফেলে পাগলের মতো আবকরও ঝাঁপিয়ে পড়ল খালে।
তারপর কী হয়েছিল, ¯রাতে আর মানুষে কতক্ষণ লড়াই চলেছিল, সেসব কিছুই মনে নেই ফুলজানের। সজ্ঞানে যখন তাকাল, তখন বুঝল- না, সে বিলের কালো পানিতে ডুবে মরেনি। কালো কঠিন পেশিবহুল একটা বুক তাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে খালের পাড়ে। তখন মাত্র কাকডাকা ভোর। লজ্জায় ফুলজানের মনে হলো মাটি দুভাগ হলে সে তারই মধ্যে নিজেকে গোপন করত। টিয়ারঙের তার ডুরে শাড়িটা ¯রাতের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ফুলজানকে বিবস্ত্র করে। খালি ঊর্ধ্বাঙ্গে ছিটের পিরানটা আছে। লজ্জায় রাঙা হয়ে আকবরের বুকেই আবার চোখ ঢাকল ফুলজান। ছি ছি কী লজ্জা! এর চাইতে সে বিলের পানিতে ডুবে মরল না কেন? আকবর হাসল : নে, আমারে আর শরমাইতে হইবে নানে। আমি গামছাটা পিন্দছি। তুই আমার লুঙিটা জড়ায়ে নে। তারপর জলদি চল। বাপজান উঠার আগে বাড়ি পৌঁছতি অইবে।
ভেজা মাথায় দুজনে ভেজা গামছা আর ভেজা লুঙি পরে গাছপালার ছায়াঘন আড়াল দিয়ে যখন বাড়ির দিকে দ্রুত পা চালাল, তখন লোকজন বিশেষ ওঠেনি। খালপাড়ের পথ একরকম নির্জন। শেষপর্যন্ত নিজেদের বিচিত্র চেহারা কাউকে না দেখিয়েই বাড়িতে এসে পৌঁছল তারা।
কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। বাড়ির দেউড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে স্বযং ফুলজানের শ্বশুর। বৌ আর ছেলেকে এই কাকডাকা ভোরে বিচিত্র ভেজা বেশে দেখে বাক্যহারা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন।
আবার একটা কাশির দমকে মুচড়ে উঠল আকবরের দেহটা। বুকে-পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে অসহায়ভাবে একবার চারদিকে তাকাল ফুলজান। না, এই কঠিন পৃথিবীতে কেউ নেই... কার কাছে সাহায্য চাবে সে? কাশির দমকের সাথে আবার টাটকা এক ঝলক রক্ত উঠে এল। গালের পাশে আঁচর চেপে ধরল ফুলজান। ফুলজানের ময়লা তেলচিটে কাপড়টা লাল রক্তে ভিজে উঠল। দুহাত দিয়ে বুক চেপে ধরল আকবর। ফুলজান দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে উদ্যত কান্না রোধ করে স্বামীর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। কেন? কেন এমন হলো? শ্বশুর-শাশুড়ি দুনিয়া ছেড়ে গেলেন আর সঙ্গে সঙ্গে কলেরায় ধুয়েমুছে শেষ করে নিয়ে গেল বাড়িটা। রইল কেবল সে আর তার স্বামী। স্বামীর মাথায় রইল বাপ-দাদার আমলের একবোঝা ঋণ। যার দায়ে ধানের জমি, বাগান, ভিটেবাড়ি পর্যন্ত মহাজনের হাতে চলে গেল। নিরাশ্রয় হলো তারা। তবু কি সে নিরাশ্রয় হয়েছিল? ছিল না কি একটা কঠিন বিশাল বুকের ছায়ার আশ্বাস? যার ফলে লোকের বাড়ি বাড়ি ধান ভেনে কোনোরকমে তোলা একটু ছাপড়ার তলায় নিশ্চিন্ত আরামে সে ঘুমিয়েছে। কেমন আশা হয়েছে, এই বুকের শক্তিই আবার তাদের সুদিন ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু ফুলজানের একান্ত নির্ভরতার সেই আশ্রয়টুকুও কপালে সইল না। বেছে বেছে সেই বুকটিতেই মৃত্যুকীটরা বাসা বাঁধল। দেশে থাকতে ঝাঁড়ফুক, তেলপড়া কোনোকিছু বাকি রাখেনি। এদিকে এক এক করে চারজন এল কোলে। ছোটটা তো আঁতুড়েই মরল। একদিকে অভাব আর একদিকে রোগÑ দিশেহারা হয়ে চোখে অন্ধকার দেখল ফুলজান। গ্রামের দু-চারজনে পরামর্শ দিল, ঢাকায় যাও। সেখানে পেট চালাবার মতো কাজও জুটবে। আর বড় বড় ডাক্তার হাসপাতাল আছে এই ক্ষয়রোগের জন্য। সে হাসপাতালে নিলে আকবর নির্ঘাত ভালো হয়ে যাবে। আশায় বুক বেঁধে গ্রামের একজনের সঙ্গে শহরে রওনা দিল ফুলজান। স্বামীর ঘোর আপত্তি ছিল ঢাকায় আসায়। অনেক গ্রামের লোকের মতো আকবরেরও কেমন শহরের ওপরে বিতৃষ্ণা ছিল। সেখানে আব্রু-ইজ্জত নেই। মেয়ে পুরুষ একই সাথে পথেঘাটে ঘোরে। নানা কেলেঙ্কারি আর কুকীর্তির কেন্দ্র হলো শহর। কিন্তু তবুও আসতে হলো। হয়তো তার মনেও সামান্য আশা দেখা দিয়েছিল- ভালো হয়ে যাবার, বেঁচে থাকার আশা।

-চলবে